শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৯, ০১:০৬ পূর্বাহ্ন

হলদে পাখির ঝাঁক | এম এ কাইউম

“কোন বসন্ত মহোৎসবে বেনুবাণীর কলরবে/ মঞ্জরিত কুঞ্জবনের গোপন অন্তরালে/ কোন ফাগুনের শুল্ক নেশার যৌবনেরই নবীন নেশায়/ চকিতে কার দেখা পেতাম রাজার চিত্রশালে”

বসন্ত নতুন জন্মের ঋতু। তার বন্দনাগান সারা পৃথিবীর সব মানুষের। শীতের কুয়াশায় জমে থাকা শূণ্যতা পূর্ণ করতে গাছে গাছে কোমল সোনা রং পাতা কেমন ধিরে ধিরে প্রাণময় সবুজ হয়ে ওঠে। বসন্ত তাই সব দেশেরই ঋতু। জাপানের চেরী ফুল ইউরোপের মজার স্প্রিং ফেস্টিভেল, চীনে বসন্তোৎসব আর নববর্ষ জার্মানিতে গোলাপ যেখানে আর বাংলায় অশোক-শিমুল পলাশ। সেখানে সুরেলা কোকিলের ডাক পঞ্চমে বাঁধা। হাওয়ায় এমনিতেই উৎসবের আমেজ। ‘ধিতাং ধিতাং বোলে মাদলে তাল তোলে, খুশির কলরোলে নতুন জীবন গড়ি আয়।’ ফাগুন পূর্ণিমাতে আছে অনেক উপকথা আর অনুভূতির উত্তরাধিকার। এর মধ্যে আছে ঋতুরাজকে আনন্দে বরণ করার বহু প্রাচীন প্রথা, সূর্যের সাতরং অঙ্গে ধারণ করার এক ইচ্ছা। সবার স্পর্শে পবিত্র করা আর মানুষের চিরকালীন ইচ্ছাপূরণ কাহিনীতে সত্য জয়ের আনন্দময় উদযাপন। এদিন খোঁপার ফুলদানীতে ওঠে ফুল, রং বর্ষে সারা বাংলায়। আনন্দের খেলায় নামবার জন্য এক ঝাঁক হলদে পাখির অনিয়মের মেজাজ। এদিন সর্বজন গ্রাহ্য অনুনয় তারুণ্যের ছোটাছুটি। নৃত্যরত উর্মিমালার মতো তরঙ্গায়িত তারুণ্যের সঙ্গে সুরের আলাপন। ‘বসন্ত ফুল গাঁথল আমার জয়ের মালা, / বইল প্রাণে দক্ষিন হাওয়া, আগুন জ্বালা।’

তো ঘটনাস্থল শহর থেকে খানিক দূরে চোদ্দপায়ার কালের উজ্জ্বয়িনীতে। গেট পেরিয়ে বাগান ছুঁয়ে মঞ্জরিত কিশোরী আমগাছের ঘনকালো সার। দূর থেকেই দেখলে মনে হয় সেখানেইতো প্রাণের উৎসব আর যতো উপলক্ষ। সৌরমন্ডিত প্যান্ডেল ঘেরায় কতো কচি রাঙাপায়ের দাপাদাপি। একপাশে রান্নার আয়োজন। জামসেদ হোসেন টিপু’র ক্যাফে, আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের পিঠা স্টল। অনুষ্ঠানের অভিষেক হলো সশব্দে। বসন্তের সুবাসিত ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হলেন শিক্ষার্থীরা। শব্দের অনুরণনে ভেসে উঠলো- ‘ফাগুন হাওয়ায় করেছি যে দান/ আমার বাঁধন হারা প্রাণ/ আমার বাঁধন ছেঁড়া প্রাণ’। তাতে দক্ষিণা প্রথম ফাগুনের ভোরের বাতাস হৃদয়ে এঁকে দিল নিসর্গের অন্য এক অনুভূতি। বসন্তের কুশিলবে লুকিয়ে থাকা পারিজাত পাখির রঙিন কোলাহল। আলোর নাচনের মতো তারুণ্যের ঋতু। রঙিন পলাশ আর আমের মঞ্জরি এঁদো সোদা মাটিতে পড়ে থাকলেও এ সময়ের তারুণ্যদিপ্ত তরুণ-তরুণীরা কিন্তু বসে থাকতে রাজি নয়। তাইতো আবির রাঙায় আর বাসন্তী শাড়িতে দোল খায় পাগলা হাওয়ায়। খোঁপার ফুলদানিতে বর্ণিল ফুলের শোভা হাতে হাত রেখে বেরিয়ে পড়ে উদাম প্রান্তরে। তাদের কান ছুঁয়ে গাছের শুকনো ঝরা পাতার বাতাস গুণগুণিয়ে জানান দেয় শীত শেষ। আর শীতের শেষ মানেই বসন্তের লুকোচুরি। এসেছে ঋতুরাজ বসন্ত। প্রেমের সাথে মিতালি। ভাষার সাথে মিতালি। বাঙালির স্বাধীনতার বীজ রোপনে বসন্ত, বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধে বসন্ত আর ২১শের ভোরে প্রভাত মিছিলে বসন্ত। ফুল ফুটবার এই পুলকিত দিনে খোপায় শিমুলের কোলাহল। শীতের খোলস থেকে বসন্ত আনে পূর্ণতা। তাই বসন্ত মানেই নতুন প্রাণের কলরব। বসন্ত মানেই আনন্দ আর প্রকৃতির নান্দনিক মোহনায় নিসর্গে ভেসে যাওয়া। তাইতো সেদিন ভেসে গেছিল নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির চোদ্দপায়ার আপন ক্যাম্পাস। আমের বোল উঁকি দিয়ে দেখেছিল দিনব্যাপি শিক্ষার্থী-শিক্ষক আর কর্মমূখর কর্মচারীদের চঞ্চলতা। সেদিন বসন্ত এসেছিল সবার মনে। পা ফাটা মানুষেরাও চেতনে-অবচেতনে শুনেছিল গান। আর দেখেছিল পাখির নাচের মতো তরুণ-তরুণীর নাচ। বাঙালি ললনাদের মতো বাসন্তি রঙের শাড়ি আর মাথার মুকুটে এঁটেছিল রঙিন ফুল। উৎসবের বিবর্তনের পালায় ছিল টমেটোর মত ফোলা ফোলা টোপা খাওয়া গালে পলাশ রঙের ছিটে। বঙ্গাব্দ ১৪০১ সাল থেকে যে উৎসব উদযাপনের রীতি তাইতো বুধবার ১ ফাল্গুনে তারই বিবর্তন হলো। এদেশে ছায়ানট বসন্ত উৎসব শুরু করে ১৯৬২-তে। সেই থেকে গাঁয়ের বধূরা উঠোন লেপে বরণ করেছে যে ফাগুনকে তাকেই তো মিষ্টি শীতে আবাদের মাঠে না গিয়ে শিক্ষার্থীরা কৃষকের মতো নেমেছিল স্থায়ী ক্যাম্পাসের মমতা ঘেরা মাটির ঘ্রাণে। দিনের শুরুতেই ছিল বসন্ত বরণ। সার দিয়ে বসেছিলেন ধীমান শব্দ বর্ণের কবি প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নদ্রষ্টা চেয়ারম্যান-নারী নেত্রী অধ্যাপিকা রাশেদা খালেক। যাঁকে ঘিরেছিল হলদে পাখির ঝাঁক। পাশেই উপমহাদেশের অন্যতম ফোকলোর গবেষক নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অন্যতম রূপকার প্রফেসর ড. আবদুল খালেক, প্রখ্যাত লালন গবেষক আর ফোকলোর বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল। পাশ ছুঁয়ে বসে ছিলেন চিফ কো-অর্ডিনেটর এবং রাবি বাংলা বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. পি.এম. সফিকুল ইসলাম, প্রাণ রসায়ন অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. ফারজানা নিক্কন, সাবেক উপ-উপাচার্য প্রফেসর নূরুল্লাহ, প্রফেসর সুজিত কুমার সরকার, প্রফেসর ড. দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস, প্রখ্যাত কবি রুহুল আমিন প্রামানিক, প্রফেসর মো. আব্দুর রউফ, প্রফেসর ড. মকসুদুর রহমান, এনবিআইউ রেজিস্ট্রার রিয়াজ মোহাম্মদ প্রমুখ।

তখন ড্রামবিটের আওয়াজে ভাসছিল- ‘আহা আজি এ বসন্তে/ এতো ফুল ফোটে পাখি গান গায়।’ তারপর মৃদু ভাষণে চেয়ারম্যানের বসন্তকে নিয়ে আকুতি। প্রকৃতির এই নান্দনিক মোহনায় নিসর্গে হারিয়ে গিয়ে নিকুঞ্জবনে দোল খাচ্ছিলেন যেন। বললেন- বসন্ত মানে আনন্দ, বসন্ত আনে পূর্ণতা, বসন্ত মানে নতুন প্রাণের কলোরব। তিনি শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার পাশাপাশি সংস্কৃতি চর্চার ভেতর মানবিক মূল্যবোধে মানুষ হয়ে ওঠার পরামর্শ দেন। অনুষ্ঠানের সভাপতি নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও রাবি সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. আবদুল খালেক বলেন- এ ইউনিভার্সিটি আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক ও যথোপযোগি শিক্ষা প্রদানে এগিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে আমরা স্থায়ী ক্যাম্পাসে রূপ দিতে যাচ্ছি। দ্বিতীয়ার্ধে ছিল মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সঞ্চালনায় ছিলেন শিক্ষক ড. নাসরীন লুবনা, হাফিজুর রহমান ও হাসান ঈমাম সুইট। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সাঁঝ অবধি চলে হৃদয় ছোঁয়া এ অনুষ্ঠান।

লেখক: পরিচালক, জনসংযোগ দপ্তর, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী।


Share this post in your social media

© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com