বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ০২:০৫ পূর্বাহ্ন

লালন সঙ্গীত: সর্বজনীন সঙ্গীত

লালন সঙ্গীত: সর্বজনীন সঙ্গীত

লালন ফকির সাধারণ পরিবারের এক অসাধারণ সন্তান; অসাধারণ সমাজের এক সাধারণ মানুষ। সাধারণ্যেই তাঁর পরিচিতি, সাধারণ্যেই তাঁর প্রতিষ্ঠা, সাধারণ্যেই তাঁর খ্যাতি-প্রতিপত্তি। লালনের জীবনের ব্যাপ্তি ছিল শতোর্ধ বছরের। অষ্টাদশ শতাব্দীর সপ্তম দশক থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশক (১৭৭৪-১৮৯০ খ্রি.) পর্যন্ত। মধ্যযুগের মুসলিম শাসন-আমলের (১২০৩/৪-১৭৫৭ খ্রি.) সাড়ে পাঁচশ বছরের চিন্তার জগত ছিল স্থবিরতায় আকীর্ণ। অধিকাংশ মানুষ ছিল বর্ণপরিচয়হীন, অশিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত। হিন্দুসমাজের ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ ছাড়া নিম্নবর্ণের শূদ্র ও পেশাজীবী শ্রেণীর মানুষ ছিল বর্ণবাদের অভিশাপে বিপর্যস্ত। মুসলিম সমাজের কৃষক শ্রমিকের অবস্থা ছিল শূদ্রেতর গোত্র অপেক্ষাও শোচনীয়। শেষোক্ত শ্রেণীর হিন্দু মুসলমানের ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল প্রসাদ নির্ভর পুরোহিত ও মোল্লা-মৌলবীদের হাতে শৃঙ্খলিত। প্রথানির্ভর সামাজিক আচার-আচরণই ছিল দৈনন্দিন জীবনের ধর্মকর্মের মূল ভিত্তি। মুক্ত চিন্তার সকল পথ ছিল অবরুদ্ধ। অস্পৃশ্যবাদী সামাজিক রীতি-নীতির দুঃসহ অত্যাচারে জনজীবন ছিল যন্ত্রণাবিদ্ধ; আশু মুক্তির প্রত্যাশায় উৎকণ্ঠিত।

তদুপরি বাংলার মুসলিম শাসনের অবসান, নব্য প্রতিষ্ঠিত ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসক-প্রশাসকদের পাশবিক নিপীড়ন-নির্যাতন, শোষণ-বঞ্চনা, বেনিয়াদের দালাল গোমস্তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উন্মাদনা, বুভুক্ষ মানুষের হাহাকারে ধর্মীয় মূল্যবোধ হয়েছিল ক্ষয়িত ও অপসৃত। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের এই বৈরী পরিবেশের মধ্যেই জন্ম লালন ফকিরের।

ভাগ্য বিড়ম্বিত জীবনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত লালন ফকির। তিনি ঝিনাইদহ জেলার হরিশপুর গ্রামের দরীবুল্লাহ দেওয়ানের সন্তান নাকি কুষ্টিয়া জেলার চাপড়া গ্রামের মাধব করের সন্তান এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া আবশ্যক বোধ করেন নি। কারণ তাঁর বহুমাত্রিক সঙ্গীত সুধার মধ্যেই আবিষ্কৃত হতে পারে তাঁর সামগ্রিক জীবনের খতিয়ান। প্রকৃতপক্ষে লালন তাঁর জীবদ্দশাতেই আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে রহস্যালোক তৈরী করে গেছেন। অদ্যাবধি এই রহস্য লোকের ধূম্রজাল অতিক্রম করা গবেষকদের পক্ষে সম্ভব হয় নি।

এ সত্য সর্বজনবিদিত যে কোনো মানুষই ধর্মীয় বিশ্বাসের ঊর্ব্ধে নয়। সে ধর্ম হতে পারে আস্তিক্যবাদী, হতে পারে নাস্তিক্যবাদী। ধর্মীয় বিশ্বাস অর্জনের সুস্পষ্ট দুটো পথ। এক. জন্মসূত্রে প্রাপ্ত ধর্ম; দুই. কর্ম বা চিন্তাসূত্রে প্রাপ্ত ধর্ম। জন্মসূত্রে প্রাপ্ত ধর্মীয় বিশ্বাসের শেকড় প্রোথিত থাকে হৃদয়ের অন্তর্মূলে। এর প্রভাব অব্যাহত থাকে অন্তরের অন্তঃসলিলায়, সক্রিয় থাকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত পর্যন্ত।

লালনের ধর্মীয় বিশ্বাস অর্জিত হয় উভয় সূত্রে। ভাগ্যের পরিহাসে তাঁকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে হয়। দীক্ষা গুরু সিরাজসাঁইয়ের আশীর্বাদ ধন্য হয়ে তিনি ইসলামী শাস্ত্র জ্ঞানে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন। ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে শিক্ষা গুরু অপেক্ষা দীক্ষা গুরুর গুরুত্ব যে অধিকতর লালনের জীবনদর্শনে তা স্পষ্টতা লাভ করেছে। এ প্রসঙ্গে আরো প্রমাণ পরিলক্ষিত হয়, গুরু সিরাজ সাঁইয়ের প্রতি তাঁর বিনম্র শ্রদ্ধানিবেদনায়।

লালন তাঁর ব্যক্তিজীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে হিন্দু-মুসলিম সমাজের ধর্মীয় বিশ্বাস-সংস্কার সম্পর্কে ব্যাপক অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ে সক্ষম হন। হিন্দু-মুসলিম লোকসমাজে ধর্মীয় কুসংস্কারের অনুসৃতি যে অশিক্ষা ও কুশিক্ষারই ফলশ্রুতি এই সত্য উপলব্ধিতে তাঁর বিলম্ব ঘটে নি। তৎকালে হিন্দু-মুসলিম উভয় সমাজে যারা শাস্ত্রজ্ঞ হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন তাদের অধিকাংশেরই শাস্ত্রীয় জ্ঞানের পরিধি ছিল সংকীর্ণতর। স্বধর্ম ছাড়া ভিন্ন ধর্মের শাস্ত্র জ্ঞান অর্জনে তাদের মধ্যে ছিল ঔদাসীন্য। তার ফলে সাধারণ মানুষ অপেক্ষা শাস্ত্রজ্ঞরাই ছিল পরধর্মে বিদ্বিষ্ট। প্রকৃতপক্ষে এরা ছিল জ্ঞানপাপী। লালন এদেরই পরিচয় প্রদান করেছেন কানা রূপে-

এসব দেখি কানার হাটবাজার।
বেদবিধির পর শাস্ত্র কানা;
আর এক কানা মন আমার।
পণ্ডিত কানা অহংকারে
মাতব্বর কানা চোগল খোরে।
আন্দাজি এক খুটা গেড়ে
চেনে না সীমানা কার।

লালন সর্বদাই শাস্ত্রীয় জ্ঞানের প্রতি ছিলেন বীতশ্রদ্ধ। কারণ শাস্ত্র জ্ঞাননির্ভরধর্ম হৃদয় ধর্মকে সর্বদাই উপেক্ষা করে; সামাজিক জীবনে সম্প্রীতির বাতাবরণ সৃষ্টি অপেক্ষা ভেদ-বুদ্ধির প্রাচীর গড়ে তোলে। লালনের কথায়-

কার বা আমি কেবা আমার
আসল বস্তু ঠিক নাহি তার
বৈদিক মেঘে ঘোর অন্ধকার
উদয় হয় না দিনমণি।

লালন এই জ্ঞানান্ধ ও শাস্ত্রকানাদের লক্ষ্য করে আরো বলেছেন-

তাইতো বলি ওরে কানা
সর্বজীব হয় গুরুজনা,
চৈতন্য গুরু কর সাধনা
তাতে কর্ম দোষ যায়।

ধর্ম নিয়ে সমাজে-সমাজে, জাতিতে-জাতিতে, দেশে-দেশে এতো যে বিরোধ-বিভেদ এর মূল অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে অধিকাংশ মানুষের ধর্ম সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো ধারণাই নেই। সাধক লালন ধর্মের সংজ্ঞা নির্ণয় করতে গিয়ে বলেছেন-

ধর্মাধর্ম সব নিজের কাছে
জানা যায় ধর্ম যেচে,
লালন কয় আমার ভুল হয়েছে
ভেবে দেখি তাই।

সবধর্মই কল্যাণ নির্ভর। সে কল্যাণ হতে পারে ব্যক্তিক, পারিবারিক, সামাজিক বা রাষ্ট্রিক। ধর্ম সর্বদাই দুটো জগৎ কল্পনায় অভ্যস্ত। এর একটি ইহলৌকিক জগত অপরটি পারলৌকিক জগত। পাপ-পুণ্য কর্মের হ্রাস-বৃদ্ধির মধ্যেই উভয় জগতের শান্তি-অশান্তি বিরাজমান।

এক্ষেত্রে লালনের বিশ্বাস ছিলো কিছুটা ভিন্নতর। তাঁর দৃষ্টিতে পাপের কোনো শাশ্বত দিক নেই। দেশাচার ভেদে এর পার্থক্য ঘটে থাকে। তাঁর কথায় এক দেশে যা পাপ গণ্য অন্য দেশে তাই পুণ্য। এ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য যেমন যুক্তিনির্ভর তেমনি অখণ্ডনীয়। তিনি গেয়েছেন-

পাপপুণ্যের কথা আমি কারেবা সুধাই।
এদেশে যা পাপ গণ্য, অন্য দেশে পুণ্য তাই।
তিব্বত আইন অনুসারে এক নারী বহু পতিধরে
এদেশেতে হলে পরে ব্যাভিচারে দণ্ড দেয়।

প্রকৃতপক্ষে পাপ-পুণ্য বোধের সঙ্গে হিত-অহিতের সম্পর্ক ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। পাপে বিষাদ, পুণ্যে প্রশান্তি। ভারতীয় মুনী-ঋষিদের অভিজ্ঞানে পাপের উৎসক্ষেত্র মূলত হৃদয়। হৃদকর্ম নিয়ন্ত্রিত হয় ষড়রিপুর তাড়নায়। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য এই ছটি রিপু নিয়ন্ত্রণ ব্যতীত মানব চরিত্র নিস্কলুষ ও সাধনায় সিদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। লালন সর্বদাই শিষ্যদের রিপু নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন।

লোভ মানবচরিত্র বিনষ্টির অন্যতম শক্তিশালী দিক। লালন লোভের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে বলেছেন-

লোভে পাপ পাপে মরণ,
তাকী জানো নারে মন।
লালন বলে যা যা এখন,
মরগে ঘোর বিমারে।

অন্য একটি সঙ্গীতে তিনি আরো উল্লেখ করেছেন-

শোনরে মন তোরে বলি,
তুই আমারে ডুবালি।
পরের ধনে লোভ করলি
সে ধন আর কয় দিন খাবি।

বাউল সাধনায় কামের দিকটিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। কারণ সাধনক্ষেত্রে কাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা মানেই সাধন সিদ্ধির জগতে অনিবার্য ব্যর্থতা। লালন তাই শিষ্যদের সতর্ক করে বলেছেন-

আগে কপাট মার কামের ঘরে,
মানুষ ঝলক দেবে রূপ নেহারে।

‘মোহ’ আরেকটি উল্লেখ্যযোগ্য রিপু। মোহের আভিধানিক অর্থ মিথ্যাভিনেশ। মোহ প্রকৃত অর্থে মায়ারই নামান্তর। মায়া হতে পারে জগতের প্রতি, পুত্র-কন্যার প্রতি, ভিন্নজন বা পশু-পাখির প্রতি। মায়া একপাক্ষিক আকর্ষণ বিশেষ। অধিকতর মায়া সাধককে সত্যাকর্ষণে বিমুখ করে ফেলতে পারে। বৌদ্ধ দর্শনে মায়াবাদের ভয়াবহ ক্ষতির দিকটির কথাই ব্যক্ত হয়েছে। আত্মিক সাধনার জগতে মায়া বা মোহ অন্তরায় বিশেষ। লালন এই বিরূপ দিকটির কথাই উল্লেখ করেছেন-

তুমি কার আজ কে বা তোমার
এ সংসারে,
মিছে মায়ায় মজিয়ে মন
কী করো রে।

ধর্ম মূলত বিশ্বাস নির্ভর। প্রবাদে বলা হয়ে থাকে- ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহু দূর’। লালন কিন্তু ধর্মকে উদ্দেশ্য নির্ভর কর্ম হিসেবে অভিহিত করেছেন-

সৎ উদ্দেশে যদি
আল্লাহ নির্ণয় করা যায়,
তা হলে সকল ধর্মেই
আল্লাহ পাওয়া যায়।

তিনি এ সম্পর্কে আরো বলেছেন-

তালেবুল মাওলা যে হয়
সব ধর্মেই সে তারে পায়,
আল্লাহ কারো একান্ত নয়
চেয়ে দেখ এ দুনিয়ায়।

ধর্ম সম্পর্কে লালনের আরো কিছু গানে এরূপ শাশ্বত বাণীর অভিব্যক্তি পরিলক্ষিত হয়। যেমন-

সবাই কি আর হয়রে মন
ধর্ম পরায়ণ,
যার যার ধর্ম সে সে করে
তোমার বলা অকারণ।

লালনের স্বচ্ছ-সুন্দর আলোকোজ্জ্বল হৃদয় বেদনার কৃষ্ণমেঘে সমাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে যখন দেখেন জাত-পাতের ভেদাভেদে সমাজ জীবন ক্ষত-বিক্ষত। বেদনাহত লালন তখনই সাশ্রুনয়নে গেয়ে ওঠেন-

যবন কাফির ঘরে ঘরে।
দেখে আমার নয়ন ঝরে,
লালন বলে মারিস কারে
চিনলি না মনের ধোকায়।

জাত বিচারে তাঁর সুষ্পষ্ট অভিমত পরিলক্ষিত হয়। যখন বলেন-

হয় কেমনে জাতের বিচার
একেক দেশে একেক আচার
লালন বলে জাত ব্যবহার
গিয়াছি ভুলে।

লালন মুসলমানের সন্তান নাকি হিন্দুর সন্তান এ থেকে অতি সহজেই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যেতে পারে। লালনের কোন জাত-পরিচয় নেই একথা বলা যথার্থ হবে না। তারও জাত ছিল- সে জাত হলো মানবজাত। তার বড় পরিচয়- তিনি মানুষ।

সাধকেরা, মহামানবেরা কখনো নৈরাশ্যের শিকার হন না। লালনও নৈরাশ্যবাদী ছিলেন না। এর প্রমাণ মেলে যখন বলেন-

এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে
যেদিন হিন্দু-বৌদ্ধ খ্রীষ্ট-মুসলমান
জাতি গোত্র নাহি রবে।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে আরো বলেছেন-

ধর্মকূল গোত্র জাতির
তুলবে না কেউ জিকির,
কেঁদে বলে লালন ফকির
কে বা দেখিয়ে দিবে।

লালন মানবতার সাধক, জগত কল্যাণে বিভোর। তিনি সান্ত¦নার বাণী শুনতে পান এবং বলেন-

ভক্তের দ্বারে বাঁধা আছেন সাঁই
হিন্দু কি যবন বলে জাতের বিচার নাই।

ফকির লালনের সাধনার জগত ছিল বিশ্বপরিম-লব্যাপী। তাঁর ধর্মের আদর্শিক দিক ছিল বুদ্ধের জ্ঞান ও যুক্তিবাদ, হযরত মোহাম্মদের আস্তিক্য ও সাম্যবাদ, শ্রী চৈতন্যের ভক্তি ও প্রেমবাদের মহাসমুদ্রে অবগাহন করা ও অতলস্পর্শী জগত থেকে মানবমুক্তা আহরণ করা। তিনি তার লক্ষ্যে উপনীত হতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর এ থেকেই বলতে পেরেছিলেন-

ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
সর্ব সাধন সিদ্ধি হয় তার।

মানব জীবনের এমন গৌরবগাথা থেকেই তিনি বলতে পেরেছিলেন- ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’।

লালন ফকিরের সাধনার আরেকটি ভিন্নমাত্রিক দিক ছিল অধ্যাত্মবাদ। এ পথের দ্বার সকল সাধকদের জন্য উন্মুক্ত। সুফীর ফানাতত্ত্ব যার মূল মন্ত্র। ‘ফানা’ আরবী শব্দ। আভিধানিক অর্থে পরমসত্তার সঙ্গে বিলীন হয়ে যাওয়া। লালন ফকির যে ফানা তত্ত্বে কতটা অনুরাগী ছিলেন তার একটি গান থেকে এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন-

শাহ দরবেশ যারা
আপনারে ফানা করে
অধরে মিশায় তারা।

এ ধারায় যারা শ্রেষ্ঠত্বের আসন অলঙ্কৃত করে আছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন অষ্টম শতাব্দীর সাধিকা রাবেয়া বসরী, নবম শতাব্দীর জুননুন মিশরী, ফরিদুদ্দীন আত্তারী, বায়াজিদ বুস্তামী, মুনসুর হাল্লাজ প্রমুখ। তবে এ ধারার কুলমনি ছিলেন শেষোক্ত সাধক মনসুর হাল্লাজ। তার সম্পর্কে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে লালন বলেছেন-

মনসুর হাল্লাজ ফকির সেতো
বলেছিল আমি সত্য,
সহি হলো সাঁইয়ের আইন মত
সবাই কী জানতে পায়।

‘আনাল হক’ (আমিই স্রষ্টা) তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা দাবী করায় মনসুর হাল্লাজকে মৃত্যুদণ্ড ভোগ করতে হয়। অতঃপর তার দেহ ভষ্মীভূত করে নদীতে ভাসিয়ে দিলে সে ভষ্ম থেকেও উত্থিত হয় ‘আমিই সত্য’। মনসুর হাল্লাজ অমরত্বের জগতে আজ রাজাধিরাজ।

প্রকৃতপক্ষে সাধক সত্তা যখন পরম সত্তায় একীভূত হয়ে যায় তখনই সাধকের অন্তরের ও বাইরের অনুভূতি অভিন্ন পর্যায়ে উপনীত হয়। লালন পরমাত্মাকে হৃদয়াঙ্গম করার অনুভূতি থেকেই গেয়ে ওঠেন-

তারে আমি ভুলি কেমনে
দিয়েছি মন যে চরণে
যে দিকে ফিরি সে দিকে হেরি
ঐ রূপের মাধুরী দু’নয়নে।

ভাববাদী শিল্পী হাছন রাজার একটি গানেও অনুরূপ অনুভুতির অভিব্যপ্তি পরিলক্ষিত হয়-

রূপ দেখিলাম রে নয়নে
আপনার রূপ দেখিলাম রে।

রবীন্দ্র দৃষ্টি এদের থেকে মোটেই ভিন্নতর নয়। যখন তার কণ্ঠে ধ্বনিত হতে শুনি-

আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে
তাই হেরি তায় সকল খানে,
আছে সে নয়ন তারায় আলোক ধারায়
তাই না হারায়
ওগো তাই দেখি তায় যেথায় সেথায়
তাকাই আমি যে দিক পানে।

সীমা-অসীমের লীলা-খেলা সাধক শিল্পী হৃদয়ে যে ভাবে অভিব্যক্ত হয় সাধারণ মানুষের জীবনে তা আদৌ সম্ভব নয়। লালন একাধারে সাধক, গীতিকার, সুরকার, গায়ক ও শিল্পী। তিনি স্রষ্টাকে কল্পনা করেছেন নান্দনিক সৌন্দর্যের অভিনবত্বে, তাকে অনুভব করেছেন পুষ্পিত সৌরভের মাধুর্যে, হৃদয়াঙ্গম করেছেন অনন্তলোকের অসীমত্বে। তার পরিচয়ের ঠিকানা বিশেষ কোনো দেশ-কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতপক্ষে তার অবস্থান বিশ্বজনীন মানব সমাজে, তার স্থিতি অনন্তকালীন বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে।

*প্রফেসর ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল, উপ-উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী।


Share this post in your social media

© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com