শুক্রবার, ২৯ নভেম্বর ২০১৯, ০২:২১ পূর্বাহ্ন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু

প্রফেসর ড. আবদুল খালেক
প্রফেসর ড. আবদুল খালেক

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি আছে। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাজে অনেকবার তাঁকে রাজশাহীতে আসতে হয়েছে। ১৯৬০ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স করেছি, ১৯৬২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় মাস্টার্স করেছি। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শুরু হয় আমার অধ্যাপনা জীবন। বলা যেতে পারে আমার পুরো জীবনটাই কেটে গেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

উত্তরাধিকারসূত্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাথে রয়েছে আমার আত্মিক সম্পর্ক। আমাদের পিতা ছিলেন সোহরাওয়ার্দী সাহেবের আদর্শের অনুসারী, সেই ধারায় পরবর্তীকালে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করেন। আমার বড়ভাই মযহারুল ইসলাম পঞ্চাশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে এবং ভাষা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে শেখ মুজিবের সান্নিধ্য লাভ করেন এবং একপর্যায়ে শেখ মুজিবের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে তাঁদের বন্ধুত্বের ভিত ক্রমান্বয়ে অত্যন্ত শক্ত হয়ে উঠতে থাকে। বড়ভাই মযহারুল ইসলামের মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে আমার পরিচয় ঘটে।

১৯৬৬ সালে চীন সরকারের বৃত্তি নিয়ে উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্যে আমি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখা-পড়া করতে যাই। পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী ছিলেন পেশোয়ার ইউনিভার্সিটির খাতিয়ার গজনভী। তাঁর কাছ থেকে আকস্মিকভাবে জানতে পারি পূর্বপাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে। কে পূর্বপাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন, সে সম্পর্কে খাতিয়ার গজনভির হাতে কোন তথ্য ছিল না। পাকিস্তানি দূতাবাস থেকে খবর পাওয়া গেল শেখ মুজিব ৬ দফা ঘোষণা করেছেন। শেখ মুজিবের ৬ দফার মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ বপন করা হয়েছে, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের তা বুঝতে কোন রকম অসুবিধে হয় নি।

১৯৬৬ সালের শেষের দিকে চীন দেশে শুরু হয় ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। উক্ত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দান করেন ‘মাও-সে-তুং’। সাংস্কৃতিক বিপ্লব এতটা ব্যাপক আকার ধারণ করে যে, শেষ পর্যন্ত ১৯৬৬ সালের অক্টোবর মাসে চীনের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। আমরা ততদিনে চীনা ভাষায় ডিপ্লোমা করে ফেলেছি। আমাদেরকে জানানো হয় বিদেশি শিক্ষার্থীদেরকে নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে, সাংস্কৃতিক বিপ্লব শেষ হয়ে গেলে শিক্ষার্থীদেরকে পুনরায় ডেকে পাঠানো হবে। চীন সরকারের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৬ সালের শেষের দিকে আমি দেশে ফিরে আসি।

দেশে ফিরে এসে লক্ষ্য করলাম বড়ভাই মযহারুল ইসলাম শেখ মুজিবের ৬ দফা প্রচারে গ্রামে-গঞ্জে ছুটে বেড়াচ্ছেন। ৬ দফার পক্ষে কাজ করতে তাঁর সাথে আমিও মাঠে নেমে পড়লাম। ৬ দফাকে কেন্দ্র করে বড়ভাই মযহারুল ইসলাম শেখ মুজিবের সাথে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। আমার জানামতে, ৬ দফা প্রণয়নের সময় শেখ মুজিব বেশ কিছু বুদ্ধিজীবীর সহযোগিতা নিয়েছিলেন, সে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে মযহারুল ইসলামও ছিলেন।

‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ শীর্ষক আমার এই লেখাটিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর দৈহিক উপস্থিতির চেয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক উপস্থিতি বেশি প্রাধান্য পাবে। ষাটের দশকে জেনারেল আইউব খানের শাসনকালে শেখ মুজিবকে বেশিরভাগ সময় জেলখানায় কাটাতে হয়েছে। জেলের বাইরে এসে সভা-সমাবেশ করবার তেমন সুযোগ শেখ মুজিবের ছিল না। জেলের ফাঁকে ফাঁকে যখনই সুযোগ পেয়েছেন, শেখ মুজিব রাজশাহীতে এসেছেন। রাজশাহীতে যখনই শেখ মুজিব এসেছেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের সাথে মতবিনিময় করে গেছেন।

রাজশাহী শহরের রাজনীতিবিদদের মধ্যে যাঁদের সাথে শেখ মুজিব বেশি ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁদের মধ্যে এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং এ্যাডভোকেট আবদুস ছালাম সাহেবের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে যাঁর সাথে শেখ মুজিবের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল, তিনি বাংলা বিভাগের প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম। যতদূর মনে পড়ে রাজনৈতিক কোন কর্মসূচিতে শেখ মুজিব রাজশাহী এলে শহরে এডভোকেট আবদুস ছালাম এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান সাহেবের বাসায় অবস্থান করতেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শেখ মুজিব তাঁর নির্ধারিত কর্মসূচি শেষ করে যতটুকু সময় পেতেন, সে সময় তিনি মূলত ড. মযহারুল ইসলামের বাসায় কাটাতেন। প্রফেসর মযহারুল ইসলামের ছিল একটি ওপেল রেকর্ড গাড়ি। সেকালে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা রাজশাহীতে ছিল অত্যন্ত সীমিত। বঙ্গবন্ধু রাজশাহীতে এলে ড. মযহারুল ইসলামের গাড়িটি সার্বক্ষণিকভাবে তাঁর চলাফেরার কাজে নিয়োজিত থাকতো। মযহারুল ইসলাম নিজে গাড়ি চালাতেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর বামপাশের সিটে বসতেন। প্রফেসর মযহারুল ইসলাম আমার অগ্রজ, কাজেই বঙ্গবন্ধু যে সময়টুকু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং ভাইয়ের বাসায় কাটাতেন, আমি খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখবার সুযোগ পেতাম।

‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ শীর্ষক আমার এ লেখার মধ্যে দৈহিকভাবে বঙ্গবন্ধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কতদিন এসেছেন, থেকেছেন, সে তালিকা দেয়ার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কতটা নিষ্ঠার সাথে লালিত-পালিত হয়েছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীগণ তাঁদের হৃদয়ে বঙ্গবন্ধুকে কতটা ধারণ করে রাখতে পেরেছেন, সে কথাগুলোই প্রাধান্য পাবে।

আমার জানামতে ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মযহারুল ইসলাম শাহ্ মখদুম হলের প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষার্থীরা হলে কোন সিট পেতে হলে প্রাধ্যক্ষের কাছে না গিয়ে পারে না। মূলত প্রাধ্যক্ষই হলে শিক্ষার্থীদের সিট বণ্টনের মালিক। হলে আবাসিক সিট প্রদানের ব্যাপারে প্রাধ্যক্ষ ড. মযহারুল ইসলাম ছাত্রদের মৌখিক পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা করেন। মৌখিক পরীক্ষায় মূলত ছাত্রদের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ৬ দফার বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়। যে সমস্ত ছাত্র ৬ দফা সম্পর্কে ভাল বলতে পারতো, হলে তাদের সিট পেতে কোন অসুবিধে হতো না। ৬ দফা সম্পর্কে ছাত্রদেরকে সচেতন করবার লক্ষ্যেই ড. মযহারুল ইসলাম এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

ষাটের দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে রাজনীতির প্রধান দুটো ধারা লক্ষ্য করা গেছে ১. প্রগতিশীল মূল্যবোধে বিশ্বাসী শিক্ষক ২. ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী শিক্ষক সম্প্রদায়। ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী শিক্ষক সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে ছিলেন ড. মুহম্মদ আবদুল বারী, ড. মকবুল হোসেন এবং আরও কিছু অবাঙালি শিক্ষক। প্রগতিশীল শিক্ষকদের নেতৃত্বে ছিলেন ড. এ আর মল্লিক, ড. মোশাররফ হোসেন. ড. এফ এইচ চৌধুরী, অধ্যাপক বদরুদ্দীন উমর, ড. মযহারুল ইসলাম, অধ্যাপক হবিবুর রহমান প্রমুখ। প্রগতিশীল শিক্ষকগণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক রাজনীতিতে ঐক্যবদ্ধ থাকলেও দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দর্শনে দ্বিধা বিভক্ত ছিলেন। যেমন- ১. বামপন্থী ২. আওয়ামীপন্থী।

ষাটের দশকের গোড়ার দিকে খোলামেলাভাবে শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলা এবং কাজ করার মত শিক্ষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব একটা বেশি ছিলেন না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক ছিলেন বামপন্থী ঘরানার। বামপন্থী ঘরানার প্রগতিশীল শিক্ষকগণ ষাটের দশকে শেখ মুজিবকে নেতা হিসেবে মেনে নিতে চান নি বরং বিরূপ সমালোচনা করেছেন। প্রগতিশীল শিক্ষকদের মধ্যে একমাত্র ড. মযহারুল ইসলাম আওয়ামী লীগ এবং শেখ মুজিবের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন।

জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে ষাটের দশকে ছাত্র সংগঠনগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের দলীয় আদর্শ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কাজ করতো। এক্ষেত্রে ছাত্র সংগঠনগুলোর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে, যেমন ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, ইসলামী ছাত্র সংঘ, এন এস এফ ইত্যাদি। বামপন্থী শিক্ষকগণ পৃষ্ঠপোষকতা করতেন ছাত্র ইউনিয়নের, আওয়ামীপন্থী শিক্ষকেরা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন ছাত্রলীগের, জামায়াতে ইসলামপন্থী শিক্ষকেরা পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন ইসলামী ছাত্র সংঘের। ষাটের দশকের শেষের দিকে চীন এবং রাশিয়ার মতবিরোধের কারণে ছাত্র ইউনিয়ন দ্বিধা বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল একটি মতিয়া গ্রুপ, অপরটি মেনন গ্রুপ। ছাত্র ইউনিয়নের উভয় গ্রুপই কমবেশি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী শিক্ষকদের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলো।

ড. মযহারুল ইসলাম তাঁর সমস্ত শক্তি নিয়োগ করেন ছাত্রলীগকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে। এস. এম. হলের প্রভোস্ট থাকবার সুবাদে তিনি এস. এম. হলের ছাত্রলীগের শক্তি বৃদ্ধি করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এস. এম. হলে সিট পেতে হলে শেখ মুজিবের ৬ দফা সম্পর্কে ধারণা রাখা ছাত্রদের জন্য অপরিহার্য ছিল। শুধু এস. এম. হলে নয়, ড. মযহারুল ইসলামের আন্তরিক প্রয়াসের ফলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য হলেও ছাত্রলীগের বিস্তৃতি ঘটতে থাকে। ছাত্রলীগের শক্তি বৃদ্ধির ফলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার প্রচার কাজ জোরদার হয়ে ওঠে এবং শিক্ষকদের মধ্যে একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবের ৬ দফা ঘোষণার পর সমস্ত দেশ জুড়ে সরকার বিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীগণও সে আন্দোলনে যোগ দেন। শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক হারে বাড়তে থাকে। শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা দেখে আইউব সরকার ভয় পেয়ে যায়। তাঁকে হত্যার লক্ষ্যে শেষপর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। এতে শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়।

ষাটের দশকের শেষের দিকে জেনারেল আইউব খান শেখ মুজিবকে মোকাবেলা করতে গিয়ে একটি প্রহসনমূলক বিচারের ব্যবস্থা করেন, উদ্দেশ্য শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝুলানো। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে কেন্দ্র করে দেশে শুরু হয় প্রচণ্ড গণবিক্ষোভ এবং আন্দোলন। ১৯৬৮-৬৯ সালের দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল বামপন্থী শিক্ষকদের মধ্যে শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন দ্রুত বাড়তে থাকে। প্রগতিশীল বামপন্থী শিক্ষকদের মধ্য থেকে খোলামেলাভাবে যে সমস্ত শিক্ষক শেখ মুজিবের পক্ষে কথা বলতে শুরু করেন, তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক হবিবুর রহমান (শহীদ), অধ্যাপক মশাররফ হোসেন, অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, অধ্যাপক এফ এইচ চৌধুরী প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাম ঘরানার শিক্ষকগণ শেখ মুজিবের ৬ দফা কর্মসূচির প্রতি সমর্থন এবং আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে সোচ্চার হবার ফলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের এবং আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের শক্তি কমতে থাকে।

১৯৬৮-৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামীপন্থী শিক্ষক এবং ছাত্রলীগের আন্দোলন ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করতে থাকে। তবে এই সময় বামপন্থী শিক্ষকদের ঐক্যে ফাটল ধরে। শিক্ষকদের মধ্যে চীনপন্থী বাম এবং মস্কোপন্থী বামের মধ্যে বিভাজন ঘটে যায়। মস্কোপন্থী বাম শিক্ষকগণ শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সাথে হাত মিলিয়ে দেয়। এর ফলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের শক্তি আরও বৃদ্ধি পায় এবং পাশাপাশি ছাত্রলীগও শক্তি অর্জন করতে থাকে।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটি ছিল ‘শেখ মুজিব বনাম রাষ্ট্র’। সামরিক শাসক জেনারেল আইউব খান এই মামলাটির মাধ্যমে শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝুলাতে চেয়েছিলেন, সেই লক্ষ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার কাজও শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিচার কাজ যখন শুরু করা হয়, তখন সমগ্র পূর্ববঙ্গে আইউব বিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। চারদিক থেকে শ্লোগান উঠতে থাকে ‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো’। আন্দোলনের ফলে রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৫ তারিখে আগরতলা মামলার অন্যতম আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হককে ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সে ঝড় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে স্পর্শ করে।

১৯৬৯ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি তারিখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজশাহী শহরের দিকে মিছিল নিয়ে যেতে থাকে। সে সময় ড. জোহা ছিলেন প্রক্টর। আমি ছিলাম সহকারী প্রক্টর। জানা গিয়েছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল সহকারে শহরের দিকে এগোলে ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর গুলি চালানো হবে, বহু ছাত্র-ছাত্রী মারা যাবে। ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে ১৮ই ফেব্রুয়ারি তারিখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. জোহা শহিদ হয়েছিলেন। ড. জোহাকে হত্যার সাথে সাথে সমগ্র দেশ জুড়ে বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। জেনারেল আইউব সে বিদ্রোহ দমনের শক্তি হারিয়ে ফেলে। ২২শে ফেব্রুয়ারি তারিখে আইউব সরকারের পতন ঘটে। ২৩শে ফেব্রুয়ারি তারিখে শেখ মুজিব কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন এবং বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হন।

ড. জোহার আত্মদান দেশের সর্বস্তরের মানুষকে প্রচ-ভাবে আবেগতাড়িত করে ফেলে। ড. জোহার আগে রাজনৈতিক কারণে দেশের কোন বুদ্ধিজীবী শহীদ হন নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, সে খবরে দেশের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষক সরকার বিরোধী আন্দোলনে মাঠে নেমে পড়ে। আন্দোলনের এত ব্যাপকতা এর আগে কখনও ঘটে নি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে কেন্দ্র করে এত সব ঘটনা, শেখ মুজিব যেহেতু এই মামলার প্রধান আসামি, দেশের সর্বস্তরের মানুষ দেশের সরকার বিরোধী আন্দোলনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বকেই বেছে নেয়। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে দেশের মানুষের আস্থা বেড়ে যায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বাইরে নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম ধারার শিক্ষকবৃন্দ ধীরে ধীরে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সাথে মিলতে থাকেন। বাম শিক্ষকদের সাথে তাঁদের ভক্ত বাম ঘরানার তরুণ শিক্ষকগণও আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করতে থাকেন। শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে এর প্রভাব পড়ে। ইসলামপন্থী শিক্ষকদের শক্তি কমতে থাকে। আওয়ামী-বাম জোট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে।

১৯৬৯ সালে ড. জোহাকে হত্যার কারণে দেশে যে গণঅভ্যুত্থান ঘটে, এর ফলেই শেখ মুজিব কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। ড. জোহার আত্মদান বঙ্গবন্ধুর হৃদয়কে স্পর্শ করে। আমার যতদূর মনে পড়ে ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসের দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ড. জোহার কবর জিয়ারত করতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। বড়ভাই ড. মযহারুল ইসলাম তাঁর ওপেল রেকর্ড গাড়িতে বঙ্গবন্ধুকে ড. জোহার কবরের পাশে নিয়ে এসেছিলেন। আমি যেহেতু ড. জোহা হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী, আমার কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু জানতে চেয়েছিলেন কিভাবে ড. জোহাকে হত্যা করা হয়েছিল। আমি ড. জোহা হত্যার নৃশংস ঘটনা তাঁর কাছে তুলে ধরেছিলাম এবং আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসতে পারলে ড. জোহা হত্যার বিচার দাবি করেছিলাম।

ড. জোহাকে নির্মমভাবে হত্যা করার ফলে দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ড. জোহা হত্যা, বঙ্গবন্ধুর মুক্তি, সত্তরের নির্বাচন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়, ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আজ এক সূতোয় গাথা পড়ে গেছে। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ যখন বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রস্তুতি নেন, ২৫শে মার্চ দিবাগত রাত ১০টা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু তাঁর ৩২ নম্বর বাসায় আওয়ামী লীগের কতিপয় শীর্ষ নেতার সাথে দেশের স্বাধীনতা বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। উক্ত আলোচনায় জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ, এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী প্রমুখের সাথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন বাংলা বিভাগের প্রধান ড. মযহারুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন। মযহারুল ইসলাম তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির অন্যতম নেতা। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার প্রাক্কালে মযহারুল ইসলামের উপস্থিতির অর্থ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতাকামী সকল শিক্ষকের উপস্থিতি। বঙ্গবন্ধু ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার আগে আওয়ামী লীগের নেতাদেরকে কিছু পরামর্শ, কিছু নির্দেশ দিয়েছিলেন, নেতাদের সাথে শিক্ষাবিদ হিসেবে মযহারুল ইসলামও শেখ মুজিবের নির্দেশ বহন করে এনেছিলেন।

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ তারিখ গভীর রাতে বঙ্গবন্ধুকে যখন ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে বন্দি করা হয়, ঠিক একই সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ড. মযহারুল ইসলামের বাসাটি সামরিক বাহিনীর লোকজন ঘিরে ফেলে। উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত কাছের একজন বুদ্ধিজীবীকে বন্দি করা। ড. মযহারুল ইসলাম যেহেতু বাসায় ছিলেন না, তিনি তখন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সাথে ঢাকায় ছিলেন, সে কারণে ড. মযহারুল ইসলামকে বন্দি করতে পারে নি, কিন্তু সামরিক বাহিনীর লোকজন তাঁর বাসার আসবাবপত্র তছনছ করে ফেলে।

২৬শে মার্চ তারিখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কারফিউ জারি করা হয়েছিল, এর ফলে আমরা পথে নামতে পারছিলাম না। বেলা ১১টার দিকে ঘণ্টাখানেকের জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়। সেই ফাঁকে আমি ভাইয়ের বাসায় গিয়ে ভাই-ভাবী এবং ছেলে-মেয়েদেরকে আমার প/৭৩/ডি বাসায় নিয়ে আসি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক ধরনের থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল। বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, বিবিসি থেকে এমন খবর প্রচারিত হওয়ার ফলে আমরা স্বস্তি অনুভব করতে থাকি। কিন্তু আমাদের বড়ভাই মযহারুল ইসলাম কোথায় অবস্থান করছেন, সে সম্পর্কে আমাদের কিছুই জানা ছিল না। রাজশাহীতে খবর রটতে থাকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। বাঙালি পুলিশ এবং বাঙালি ইপিআর বাহিনীর লোকজন সেনা বাহিনীর সঙ্গে মাঝে মাঝে খ- যুদ্ধ চালাচ্ছে। রাজশাহীতে সেনা বাহিনীর লোকজন ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নিয়েছে। যার ফলে রাজশাহী শহর মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে। মুক্তিযোদ্ধাদেরকে খাদ্য সরবরাহের জন্য ক্যাম্পাসের ছেলে-মেয়েরা বাড়ি বাড়ি থেকে রুটি তৈরি করিয়ে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করছে। গণিত বিভাগের প্রফেসর হবিবুর রহমান সাহেব মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যের নানা খবর দিতে থাকেন। তিনি তাঁর বাসায় বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের পতাকা তুলে রাখেন। তিনি প্রচার করতে থাকেন বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা নিস্ফল হবে না। অল্প ক’দিনের মধ্যেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাবে।

এপ্রিলের ৩/৪ তারিখের দিকে রাজশাহীতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদেরকে লক্ষ্য করে বিমান থেকে শেল নিক্ষেপ শুরু হয়ে যায়। আমাদের পাশেই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। সেখানে বিমান থেকে শেল নিক্ষেপের ফলে ক’জন ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা মারা যায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শিক্ষকগণ অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন। ছাত্র-ছাত্রীরা হল ছেড়ে চলে গেছে। শিক্ষকেরাও ক্যাম্পাস ছেড়ে পালাতে শুরু করেন। আমরাও সিরাজগঞ্জে দেশের বাড়িতে চলে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। ড. মযহারুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে না থাকায় সে সময় আওয়ামী লীগপন্থী তথা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীগণ খানিকটা দিশাহারা, এই সঙ্কটময় মুহূর্তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ হয়ে নেতৃত্ব দান করতে থাকেন গণিত বিভাগের বিখ্যাত প্রফেসর জনাব হবিবুর রহমান। এপ্রিলের ৪/৫ তারিখের দিকে বিমান বাহিনী যেমন রাজশাহীতে আকাশপথে হামলা চালাতে থাকে, অপরদিকে ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেয়া সেনা বাহিনীও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে। এর ফলে শহর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য গ্রামের দিকে ছুটতে থাকে। আমার পরিবার এবং ভাইয়ের (মযহারুল ইসলাম) পরিবার একসাথে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ত্যাগ করি ৪ঠা এপ্রিল (১৯৭১) তারিখে। প্রফেসর হবিবুর রহমান সাহেবের সাথে দেখা হয়, কথা হয়। যারা ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে, তাদেরকে তিনি কাপুরুষ বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস দু’এক মাসের মধ্যে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করবে।

আমরা গ্রামে বসেই খবর পাই ৮/১০ তারিখের মধ্যেই সেনা বাহিনী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী শহরকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফেলে। প্রফেসর হবিবুর রহমান এবং অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দারকে সামরিক বাহিনীর লোকজন ধরে নিয়ে গেছে, তাঁদের কোন খোঁজ মিলছে না। পরে জানা যায় তাঁদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। প্রফেসর হবিবুর রহমান ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ সমর্থক। শোনা যায় সামরিক বাহিনীর লোকজন যখন তাঁকে বাংলাদেশের পতাকা নামিয়ে ফেলতে বলে, তখন তিনি বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন- বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে যে পতাকা তুলেছি, আমার হাত দিয়ে সেই পতাকা আর নামবে না। তিনি জীবন দিয়েছেন, পতাকা নামান নি। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা সবাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেন। যারা মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য। ১৯৭১ সালে একমাত্র বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কোন রাজনৈতিক নেতার অস্তিত্ব ছিল না রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যখন বিজয় অর্জিত হয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল ড. মযহারুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হয়ে আসবেন। ড. মযহারুল ইসলামও তেমন কথাই ভাবছিলেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ই জানুয়ারি ঢাকায় এসে ড. মযহারুল ইসলামকে জানিয়ে দেন তাঁকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব নিতে হবে। বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছের বাইরে আসবার সুযোগ ড. মযহারুল ইসলামের ছিল না; কারণ তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম অনুসারী। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৭১ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে ড. মযহারুল ইসলামকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর ড. খান সারোয়ার মুর্শিদ।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাতে শহীদ হন। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর হাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। শহীদ মিনারটি ছিল বর্তমান শহীদুল্লাহ্ কলা ভবনের সামনে। শহীদ মিনার আমাদের আবেগের সাথে সম্পৃক্ত। কাজেই প্রফেসর খান সারোয়ার মুর্শিদ উপাচার্য হয়ে এসে সর্বপ্রথম যে কাজটিতে হাত দেন, তা হলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার নির্মাণ। ১৯৭২ সালেই নতুন শহীদ মিনার নির্মাণের একটি নকশা প্রণীত হয়। নতুন শহীদ মিনার নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বঙ্গবন্ধুকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। নানা ব্যস্ততার মধ্যেও বঙ্গবন্ধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে সম্মত হন। ১৯৭২ সালের ৯ই মে তারিখে বঙ্গবন্ধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং ফিজিক্স বিল্ডিংয়ের মাঝখানে খোলা মাঠে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্দেশে ভাষণ প্রদান করেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। দেশ স্বাধীন হবার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষকদের কাছ থেকে দাবি ওঠে পাকিস্তান আমলের অধ্যাদেশ বাতিল করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি গণতান্ত্রিক অধ্যাদেশ প্রদান করতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অত্যন্ত দ্রুততার সাথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবি মেনে নেন এবং পার্লামেন্টের মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি গণতান্ত্রিক অধ্যাদেশ প্রণীত হয় যে অধ্যাদেশের নামকরণ হয় ১৯৭৩ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটি ছিল বঙ্গবন্ধুর উত্তম উপহার।

১৯৭৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য প্রফেসর সারোয়ার মুর্শিদের প্রশাসনিক কর্মকা- নিয়ে কিছু অসন্তোষ দেখা দেয়। শিক্ষক সমিতি তাঁর বিরুদ্ধে হঠাৎ করেই আন্দোলনমুখী হয়ে ওঠে। তাতে প্রফেসর ড. সারোয়ার মুর্শিদ বিব্রতবোধ করেন এবং উপাচার্য পদ ছেড়ে দিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ইংরেজি বিভাগে প্রত্যাবর্তন করেন। এই পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে ড. মযহারুল ইসলামকে মনোনীত করেন। ততদিনে বাংলা একাডেমিকে ড. মযহারুল ইসলাম বেশ গুছিয়ে নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ড. মযহারুল ইসলাম ১৯৭৪ সালের আগস্ট মাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে দেশে মারাত্মক আর্থিক সংকট বিরাজ করছিল। এত সব সমস্যার মধ্যেও বঙ্গবন্ধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকল্পে নানাভাবে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধুর আর্থিক সহযোগিতায় রবীন্দ্র কলা ভবন এবং একাত্তরের শহীদ হবিবুর রহমানের নামে একটি হল নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন ১৯৭৫ সালের প্রথম দিকে উক্ত শহীদ মিনার নির্মাণের কাজ সমাপ্ত হয়। ড. মযহারুল ইসলাম আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু এসে শহীদ মিনারটি উদ্বোধন করবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় নানা কাজে ব্যস্ত থাকায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ মিনার উদ্বোধনের জন্য পাঠিয়ে দেন।

১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মযহারুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সমাবর্তনের আয়োজন করতে যাচ্ছিলেন এবং চ্যান্সেলর হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে অনুষ্ঠানে আনবার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সমাবর্তনে আসবেন বলে কথাও দিয়েছিলেন মযহারুল ইসলামকে। বিষয়টি তখনও ছিল অনানুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আনুষ্ঠানিকতা শুরু করবেন, এমন সময় অত্যন্ত আকস্মিকভাবে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট তারিখে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শুধু বঙ্গবন্ধু নন, বেগম মুজিবসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রায় সকল সদস্যকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। সমগ্র দেশ জুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। দেশে শুরু হয় সামরিক শাসন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপরই কারারুদ্ধ করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. মযহারুল ইসলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. আবদুল মতিন চৌধুরীকে।

সামরিক শাসক জেনারেল জিয়ার দৃষ্টিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মযহারুল ইসলামের সবচেয়ে বড় অপরাধ, তিনি ১৯৭৪ সালে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ শিরোনামে একটি বিশাল গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। পৃষ্ঠা সংখ্যা ১২০০। গ্রন্থটি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছিল বেগম মুজিবকে। সামরিক শাসকবর্গ ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ গ্রন্থটিকে এতটা ভয় পেয়েছিল যে, বাংলা একাডেমিতে যে কপিগুলো ছিল, তা রাতারাতি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। প্রফেসর মযহারুল ইসলাম রচিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ গ্রন্থটি একটি মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল। মযহারুল ইসলামের আগে বঙ্গবন্ধুর ওপর এত বিশাল তথ্যপূর্ণ গ্রন্থ আর কেউ রচনা করতে পারেন নি। এটাই বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের ওপর রচিত প্রথম মৌলিক গ্রন্থ।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার কিছু দিনের মধ্যেই যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মযহারুল ইসলামকে উপাচার্য ভবন থেকে রাজশাহীর জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হয়, সে সময় আমি তাঁর পাশেই ছিলাম। তিনি আমার অগ্রজ। তাঁর বাসভবনের লাইব্রেরি থেকে তাঁর লেখা ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ গ্রন্থটি লুকিয়ে সরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন আমার সহধর্মিনী অধ্যাপিকা রাশেদা খালেক। গ্রন্থটি এখনও আমরা সযত্নে সংরক্ষিত রেখেছি। সময়ের আবর্তনে এখন আওয়ামী লীগ দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায়। বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। দেশে-বিদেশে আওয়ামী লীগের পক্ষে এখন সুবাতাস বইছে। বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হচ্ছে। কিন্তু এক সময় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বই লেখার অপরাধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলামকে জেল খাটতে হয়েছে, সে কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। ১৯৭৪ সালে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ গ্রন্থটি রচনা করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

বঙ্গবন্ধু দৈহিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু বঙ্গবন্ধু আজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীর মনের গভীরে বিরাজ করছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে ব্যাপক উচ্চতর গবেষণা কাজ চলছে। তাঁর নামে নির্মিত হয়েছে বিশাল আকৃতির বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল। বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এবং বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নামে নির্মিত হয়েছে বিশাল দুটি ছাত্রী হল। ইতিহাসে তাঁকে অমর করে রাখবার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’, ‘বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট’ এবং আরও অনেক সংগঠন। এ সব ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি মানুষের মনের গভীরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চিরঞ্জীব হয়ে আছেন।

লেখক: সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী; সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ; চেয়ারম্যান, শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক উপ-কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।


Share this post in your social media

© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com