মঙ্গলবার, ১৮ মে ২০২১, ০৭:৪৫ পূর্বাহ্ন

বিচিত্র দৃষ্টিতে ফোকলোর

বিচিত্র দৃষ্টিতে ফোকলোর

ফোকলোর সম্পাদনায় ড. মযহারুল ইসলামের আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গ: বিচিত্র দৃষ্টিতে ফোকলোর

পৃথিবীর অন্যান্য সব দেশের মতো প্রথমদিকে এ দেশেও ফোকলোর ছিল গ্রামীণ ও উপেক্ষিত বিষয়। প্রাথমিক অবস্থায় বাঙালি মনীষীদের বর্ণনামূলক ফোকলোর চর্চা শুরু হয়। বাংলা ফোকলোর গবেষণার প্রবাদপুরুষ ড. মযহারুল ইসলাম ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় হতে The History of Folktale Collections In India and Pakistan বিষয়ে পিএইচ.ডি. গবেষণা করে ফিরে আসার পর এ দেশে ফোকলোর গবেষণা ধারাটির আমূল সংস্কারে মনোনিবেশ করলেন। তাঁর বিভিন্ন গবেষণামূলক লেখা ও বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে সচেষ্ট হন ফোকলোর কেবল গ্রামীণ লোকদের বিষয় নয় তা শহর-গ্রাম সর্বত্রই বিরাজমান। তিনি এর সংজ্ঞা, প্রতিশব্দ, শ্রেণীকরণের পাশাপাশি Lore এর সাথে Folk কেও সমান গুরুত্ব দিলেন। কেবল বিবরণ নয় বিশ্লেষণও করতে হবে আন্তর্জাতিক মেথড বা তত্ত্ব অনুসারে এর উপর জোর দিলেন। বহু-গ্রন্থ প্রবন্ধ লিখে ও সম্পাদনা করে ফোকলোরকে সাধারণ পাঠকের কাছাকাছি নিয়ে এলেন। তাঁর সম্পাদনা-লেখা ও বক্তৃতায় আন্তর্জাতিক চেতনার ছাপটিও স্পষ্ট।

বাংলাদেশে ফোকলোর চর্চার ধারাটিকে ক্রমাগত এগিয়ে নেবার জন্য ‘বাংলাদেশ ফোকলোর সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করলেন। এ প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বেশ কটি ফোকলোর সম্মেলনে আয়োজন করে। এ সোসাইটির মুখপত্র হিসাবে ‘ফোকলোর’ শিরোনামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়, যার সম্পাদনার কাজটিও তিনি নিজ তত্ত্বাবধানে করেছেন। ১৯৯০, ১৯৯২ ও ১৯৯৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ফোকলোর সম্মেলনে পঠিত বেশ কিছু বাংলা ও ইংরেজী প্রবন্ধকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে তিনি একটি গ্রন্থাকারে ‘বিচিত্র দৃষ্টিতে ফোকলোর’ শিরোনামে সম্পাদনা করেন। গ্রন্থটির প্রবন্ধ নির্বাচনে ফোকলোর সম্পর্কে তাঁর দূরদৃষ্টি পাঠককে মুগ্ধ করে। ফোকলোরের বিচিত্র বিষয় সম্পর্কে গবেষকদের মূল্যায়নকে সঠিক সম্পাদনায় পাঠকদের কাছাকাছি নিয়ে যাবার বিজ্ঞান মনস্কতায় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

‘বিচিত্র দৃষ্টিতে ফোকলোর’ গ্রন্থের প্রথমেই জাতীয় ফোকলোর কনফারেন্স পঠিত সভাপতির ৩টি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশে ফোকলোর চর্চা সংগ্রহ, উপাদানিক পরিচয় ও বহির্বিশ্বের মতো জাতীয় উদ্যোগে ফোকলোর গবেষণার গুরুত্ব এসব ভাষণে স্পষ্ট। বাংলাদেশের ফোকলোর চর্চায় বিবরণমূলকতাকে পরিহার করে Contextual Study-র মাধ্যমে সমাজ-সংস্কৃতির ইতিহাস নির্মাণে গুরুত্ব দিয়েছেন। সেই সাথে আন্তর্জাতিক ফোকলোর চর্চায় এ দেশীয় গবেষকদের সম্পৃক্তির কথা উল্লেখ করেছেন। গ্রন্থের শুরুতে ড. মযহারুল ইসলামের স্থান প্রাপ্ত প্রবন্ধ তিনটি হচ্ছে যথাক্রমে ‘ফোকলোর ও আন্তর্জাতিকতা’, ‘বাংলা প্রবাদে মেটাফোকলোর’, ‘মৌলবাদ বিরোধী ভাবনা ও ফোকলোর’। প্রবন্ধগুলি যে নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ তা স্বীকার করে নিতে হয়। প্রথম প্রবন্ধটিতেই তিনি ফোকলোর পঠন পাঠনের আন্তর্জাতিকতা এবং ফোকলোর গবেষণায় বহির্বিশ্বের প-িতদের অবদান সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন। ভনসিডো, মেলিনোগুস্কি, র‌্যাডক্লফ ব্রাউন, ভ্লাদিমির প্রপ প্রমুখ প-িতেরা ফোকলোর বিশেষত লোককাহিনীর উৎপত্তি, পরিভ্রমণ, কাঠামোগত বিশ্লেষণ, মোটিফ অনুসন্ধানে কিভাবে বিভিন্ন মেথড ও তত্ত্ব প্রয়োগ করেছেন এ দেশীয় লোককাহিনীর আলোকে তা বিশ্লেষণের প্রয়াস পান। পাশাপাশি পাশ্চাত্যে তার সহপাঠী এলান ডানডেজ যখন Text texture এবং Context নিয়ে আলোচনার ঝড় তুলছে, মেটাফোকলোর তত্ত্বের প্রয়োগ করছে সে বিষযটির সাথেও এদেশীয় গবেষকদের পরিচয় করে দেন। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফোকলোর পঠন পাঠনের সমসাময়িক অবস্থা এবং বাংলা লোককাহিনী বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক তত্ত্বের প্রয়োগ দুটি কাজই তিনি একসাথে করেছেন। গ্রন্থের দ্বিতীয় প্রবন্ধটিতেই তিনি মেটাফোকলোর তত্ত্বের আলোকে বাংলা প্রবাদ বিশ্লেষণে প্রয়াসী হয়েছেন। ফোকলোরে তাঁর আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততাই এদেশীয় গবেষকদের সমসাময়িক বহু মেথড ও তত্ত্বের সাথে পরিচিত করে দেয়। এদেশে সম্ভবত তিনিই প্রথম মেটাফোকলোর তত্ত্বের প্রয়োগ করেন। গ্রন্থের তৃতীয় প্রবন্ধটিতে মৌলবাদ বা সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ভাবনায় ফোকলোরের সম্পৃক্ততাকে সাবলীলভাবে আলোচনা করেছেন। বাংলা লোকসংগীত ও লোকনাট্যের বেশ কিছু উপাদান এতে বিশ্লেষিত হয়েছে। বাংলার লোকগোষ্ঠী যে প্রতিনিয়ত ভাতৃপ্রতিম, বন্ধু সুলভ ও জাতপাতহীন মূলত এটিই প্রবন্ধটির মূল বক্তব্য।

‘ইউরোপে সাম্প্রতিক ফোকলোর চর্চা’ এবং ‘বাংলাদেশের ফোকলোর: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আধুনিকতার নতুন মাত্রা’ শিরোনামে শামসুজ্জামান খানের দুটি প্রবন্ধ গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে। শামসুজ্জামান খান বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় জাদুঘর ও শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন। তাঁর সময় বাংলা একাডেমিতে ফোকলোর বিষয়ে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। শুরু থেকেই বাংলাদেশের ফোকলোর চর্চাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্পৃক্ত করার ভাবনা তাঁর ছিল। তাই বাংলাদেশের ফোকলোর গবেষণায় তাঁর অবদান কম কিছু নয়। ‘ইউরোপে সাম্প্রতিক ফোকলোর চর্চা’ প্রবন্ধটিকে বিশ্ব ফোকলোর ইতিহাসের ক্ষুদ্রতম রূপ বলা চলে। প্রবন্ধের শুরুতেই ফোকলোরকে উপেক্ষিত বিষয় হিসাবে দেখার বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থান। Folk এবং Lore কে সমান গুরুত্বের বিবেচনায় এটি সংস্কৃতির ঘূর্ণায়মান চাকা। তাই মাঠ পর্যায়ে Field work এর বিকল্প নেই। এ সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছেন ফোকলোরকে সংস্কৃতির একটা চলমান অংশ হিসাবে মেনে নিচ্ছি, দেশের সামগ্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে এর সম্পর্ক নির্ণয়ের কথা বলছি, ডায়াক্রনিক বা সিনক্রনিক পদ্ধতিতে এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি এবং কনটেক্টচ্যুয়াল পদ্ধতিতে পরিবেশনা থেকে পাঠ নির্মাণের কথা বলছি, তাদের জন্য মাঠ পর্যায়ের গবেষণা তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ বাধ্যতামূলক হয়ে যাচ্ছে।১ ফোকলোর চর্চায় রাষ্ট্রের ভূমিকার প্রসঙ্গটিও এখানে স্থান পেয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ জার্মানী, ফ্রান্স, রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, ইংল্যান্ড শুরু থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত ফোকলোর চর্চা ধারাটি তুলে ধরেছেন। নৃতাত্ত্বিক E. B. Tylor সংস্কৃতিবিদ Raymond Williams লেভিস্ট্রস, মার্কসবাদী গবেষক রুশ পন্ডিত ভ্লাদিমির প্রপ, এক্সেল গুলরিক, ডেভিড বুকান বহু প-িতের স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গির বিভিন্ন তত্ত্ব ও সংগ্রহ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তাঁর দ্বিতীয় প্রবন্ধটিতে বাংলা ফোকলোরের কয়েকটি ধারা বর্ণিত হয়েছে। যাদুভিত্তিক আচার ‘ভাদু’ ও ‘তুষু’ কীভাবে ধর্মীয় আবেশ যুক্ত হয়ে লোকউৎসবে পরিণত হয়েছে, মঙ্গল গানের পাঁচালী ধর্মের অনুষঙ্গ হয়েছে তার অনুসন্ধিৎসু আলোচনা প্রবন্ধটির শুরুতেই। বাঙালির প্রাণসম্পদ হিসাবে গীতিকাব্য, ধাঁধা, প্রবাদ লোকসংগীত, লোকশিল্পের বৈজ্ঞানিকভাবে সংগ্রহ-সংরক্ষণ এবং বিশ্লেষণে তাঁর সুচিন্তিত মতামত উঠে এসেছে। বাংলার এই আত্ম সম্পদের সংগ্রহ, জাতীয় আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা করে সংরক্ষণ, এসব উপাদানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আধুনিকতার পারস্পরিক বিজ্ঞান ভিত্তিক সাম্প্রতিক পদ্ধতির অনুপস্থিতি শেষ পর্যন্ত প্রবন্ধকারকে হতাশ করলেও এর প্রয়োজনীয়তা পাঠককে সচেতন করে।

এরপর ডক্টর আবদুল খালেকের দুটি প্রবন্ধ যথাক্রমে ‘বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের লোকসংস্কৃতি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ’ এবং ‘মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে লোক উপাদান’ গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে। প্রসঙ্গত বলা দরকার ড. আবদুল খালেক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। তিনি একজন ফোকলোর গবেষক ও সংগঠক। তাঁর প্রচেষ্টাতেই বাংলাদেশের প্রথম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোকলোর একটি স্বতন্ত্র বিভাগ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। উত্তরবঙ্গের মানুষ হবার কারণে এ অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি নিয়ে তাঁর চিন্তা ও গবেষণা দীর্ঘদিনের। প্রথম প্রবন্ধটি তাঁর সাধনার ফসল। উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে প্রবন্ধটি একটি প্রাথমিক ধারণা উপস্থাপন করে। এছাড়াও এ অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির সংগ্রহ ও সংরক্ষণে মিশনারিদের অবদান পাঠককে স্মরণ করে দেয়। অঞ্চলভিত্তিক লোকসংস্কৃতির উপাদান সংগ্রহ ও তাঁর সম্ভাবনা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।

তাঁর দ্বিতীয় প্রবন্ধটিতে মধ্যযুগের বাংলা কব্যে লোক উপাদান কিভাবে স্থান পেয়েছে তা জানা যায়। এ বিষয়টি নিয়ে তিনি উচ্চতর গবেষণা করেছেন। তাই এ প্রবন্ধটিকে তাঁর থিসিসের সারকথা হিসাবেও উল্লেখ করা যেতে পারে। মধ্যযুগের বাংলা কাব্যের বন্দনা ও ভণিতা যে লোকরীতি খুব সম্ভব ড. আবদুল খালেকই তা প্রথম পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেন। প্রবাদ, বারমাসী গান, লোককথার বিভিন্ন উপাদান মধ্যযুগীয় সাহিত্যেও যে ব্যবহৃত এ সম্পর্কে এ প্রবন্ধটি স্বচ্ছ ধারণা দেয়। সাধারণ পাঠক যারা মধ্যযুগের সাহিত্য ও Folk সম্পর্কে জানতে আগ্রহী প্রবন্ধটি নিঃসন্দেহে তাদের কাছে গুরুত্বের।

প্রসঙ্গত ডক্টর জ্ঞানেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য প্রণীত ‘বাংলা লোকসাহিত্যে তান্ত্রিক সংস্কার ও চেতনা’ প্রবন্ধটি আলোচনা করা যেতে পারে। বাংলার লোকসাহিত্যের অনেক ধারাতেই যাদুবিশ্বাস সংস্কার ও তান্ত্রিক চেতনার প্রভাব রয়েছে। তবে এই তান্ত্রিক প্রভাবই বাংলা লোকসাহিত্য সৃষ্টির প্রধান নিয়ামক নয়। প্রবন্ধটিতে তন্ত্রের প্রভাবের কারণেই নাথ গীতিকা প্রধানত লোকসাহিত্য এমন একটি তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে যা মননশীল পাঠকদের দ্বিধান্বিত করে। বিষয়টিকে প্রবন্ধকার আরও পরিষ্কার করতে পারতেন। নাথ গীতিকায় তন্ত্রের প্রভাবকে অস্বীকার করা যায়না তবে এর বন্দনারীতি, ভাষাশৈলী, সবকিছুই লোকায়ত আঙ্গিকে উপস্থাপিত। আমরা নাথগীতিকার চরিত্রগুলিকে বিশ্লেষণ করলে শিব, পার্বতীর যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পাই তাতে শিব একান্তই লৌকিক এবং নাথ গীতিকার পার্বতীও চ-ী মঙ্গলের চ-ীদেবীর মতো লৌকিক যে তার শিষ্য বা অনুসরণকারীদের অভিশাপ দেয়, ক্রোধান্বিত হয়। তাই কেবল তন্ত্রের বিচারে নয় ভাষা, চরিত্র, বন্দনারীতি, সামাজিক অবয়ব, বৈবাহিক রীতি প্রভৃতি সম্মিলনেই নাথ গীতিকা লোকসাহিত্য।

ড. শীলা বসাক বাংলা ধাঁধা নিয়ে সুদীর্ঘ সময় গবেষণা করছেন। গ্রন্থে ‘বাংলা ধাঁধার সমাজ মনস্কতা’ শীর্ষক তাঁর একটি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। প্রবন্ধটির প্রথম অংশে প্রাচীন কাল হতে বর্তমান পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে ধাঁধার ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সমাজ জীবনের বিচিত্র ক্ষেত্রে ধাঁধার ব্যবহার-প্রয়োগ, উপযোগিতা ও অন্তর্নিহিত সমাজচেতনা প্রবন্ধটির মূল বক্তব্য। প্রবন্ধটি পাঠে উপলব্ধি হয় ধাঁধা কেবল ব্যক্তিগত সুখ দুঃখের অনুভূতি নয় এর সৃষ্টির মূলে ছিলো লৌকিক সমাজ বাস্তবতা। ধাঁধা লোকসমাজের আত্মসম্পদ। লোকসমাজ নিজ ভাষাতেই এর সৃষ্টি ও ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু উল্লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করে বিস্মিত হতে হয় এতে ব্যবহৃত ধাঁধাগুলির ভাষা পরিমার্জিত রূপে স্থান পেয়েছে। ফোকলোর গবেষণায় এই সীমাবদ্ধতাকে পেরিয়ে আসা দরকার। তাছাড়া প্রবন্ধকার কোথা হতে, কার নিকট থেকে ধাঁধাগুলি সংগ্রহ বা ব্যবহার করেছেন সে তথ্যও উল্লেখ করেননি। লোকজীবনের প্রায় প্রতিটি অনুষঙ্গ ঘিরেই ধাঁধার জগত সৃষ্টি হয়েছে। প্রবন্ধটি যেহেতু ধাঁধার সমাজমনস্কতা শিরোনামে এগিয়েছে তাই এতে লোকগোষ্ঠীর সামাজিক সচেতনতা, মূল্যবোধ, মানবিক সম্পর্ক, মানসিক দ্বন্দ্ব প্রভৃতি বিষয়গুলি আরও প্রাঞ্জলভাবে উপস্থাপিত হতে পারত।

‘রবীন্দ্রনাথ ও বাংলাদেশ’ শিরোনামে ড. আনোয়ারুল করীমের একটি প্রবন্ধও এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রবন্ধটি পাঠককে রবীন্দ্রনাথ ও বর্তমান বাংলাদেশ সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে সাহায্য করবে। বাংলার প্রকৃতি প্রেম জীবনাচরণের নানাদিক রবীন্দ্র প্রতিভাকে আরও পরিপুষ্ট করেছিল একথা স্বীকার্য। বাউল দর্শন ও বাউল গান রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ ভ্রমণ এবং একবছর পর লালনের মৃত্যুকে বেশ গুরুত্বের সাথে বলতে চেয়েছেন। কেমন যেন একটি যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা। তবে আমাদের একথা ভুললে চলবে না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম শিলাইদহে ভ্রমণ বা জমিদারী তদারকি যে কাজেই আসুক না কেন এর পূর্বে তার হৃদয়ে বাউল দর্শন ও সংগীত সম্পর্কে কৌতূহল থাকলেও তা প্রবল ছিলনা। শিলাইদহ-পাবনা-কুষ্টিয়া অঞ্চলের এ লৌকিক দর্শন তাকে আচ্ছন্ন করে এ অঞ্চলে তাঁর আগমনের পরেই। পূর্বেই যদি এর প্রভাব প্রবল হতো তবে তাঁর লেখায় এ বিষয়টি বাদ যাবার কথা নয় এবং এ কথাও সত্যি যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনোই লালনের সাথে তাঁর সাক্ষাতের কথা বলেননি। আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ ও বাউল এলেও রবীন্দ্রনাথ ও লোকজীবন বিষয়টি মূর্ত নয়। বিশেষত ছেলে ভুলানো ছড়া, মেয়েলিগীত ও গ্রাম্য সংগীতকে ঘিরে রবীন্দ্রনাথকে মূল্যায়নের দিকটি প্রাণবন্ত ভাবে উপস্থাপিত হলে পাঠক যেমন রবীন্দ্রনাথের ফোকলোর ভাবনাকে জানতে পারত তেমনি গ্রন্থের নামকরণেরও বিষয়বস্তুর সাথে প্রবন্ধটির সামঞ্জস্য বজায় থাকত।

বাংলাদেশে ফোকলোর চর্চায় যে কজন গবেষক ক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে সংগ্রহ ও গবেষণা করেছেন ডক্টর মোমেন চৌধুরী তাঁদের অন্যতম। লোকউৎসব, লৌকিক দেব দেবী, লোকধর্মের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর কর্মের বিস্তৃতি। বাংলার লোকজীবনে লৌকিক দেব-দেবীর আচার উৎসবের শেষ নেই। নদীমাতৃক বাংলার জলদেবতা খোয়াজ খিজিরকে ঘিরে ‘বেড়া ভাসান’ উৎসব পালনের রীতি হিন্দু মুসলিম উভয় সমাজেই বিদ্যমান। পৃথিবীর প্রায় সব লোকসমাজেই উৎপাদনমুখী দেবতার (Fertility God) নির্দিষ্ট কিছু মাহাত্ম্য আছে। খোয়াজ খিজিরকে তেমন দেবতাই বলা চলে। বর্তমানে এই দেবতাটি বাংলার লৌকিক দেবতা হয়ে লোকউৎসবে তার প্রভাব স্থায়ী করে নিলেও আদিতে এটি বাঙালির দেবতা ছিল না। ড. মোমেন চৌধুরীর অনুসন্ধিৎসু গবেষণা থেকে জানা যায় এ দেবতা গ্রীক পৌরাণিক কাহিনী এবং পরে সিরিয়া-দামেস্ক আরব পরিভ্রমণে তুর্কিদের মাধ্যমে উত্তরভারত হয়ে বাংলায় আসে। নদী বিল হাওড় তীরবর্তী লোকগোষ্ঠী জীবন জীবিকার ক্ষেত্রে জলের প্রভাবকে অস্বীকার করতে পারেনি তাই বহিরাগত খোয়াজখিজিরকে আপনার করে ‘বেড়া ভাসানে’র মাধ্যমে তার সন্তুষ্টির লৌকিক রীতি গড়ে উঠেছে। বাংলার লোকজীবনে প্রতিনিয়ত সংস্কৃতির আদান প্রদান ঘটেছে। তাই বহিরাগত জলদেবতা এদেশীয় লোকগোষ্ঠীর কাছে পূজিত হলেও অনার্য গঙ্গাবেদী কিন্তু তার আসন হতে বঞ্চিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই দুজন একসাথেও পূজিত হয়। ড. চৌধুরীর সমীক্ষালব্ধ এ প্রবন্ধ পাঠককে একটি বিষয়ে পরিষ্কার করে তা হল লোকধর্মের ও লৌকিক দেব দেবীর কোন নির্দিষ্ট সীমানা বা গ-ী নেই। জাত সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে এই মানবতার ধর্ম লোকগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক সমন্বয়তাকে আরও সুদৃঢ় করে।

এ গ্রন্থে সন্নিবেশিত ড. খোন্দকার রিয়াজুল হকের ‘লোকসাহিত্যে কিংবদন্তী: সংজ্ঞা ও প্রকরণ’ শীর্ষক প্রবন্ধটি পাঠককে কিংবদন্তী সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিতে সক্ষম। তবে কিংবদন্তীর ব্যাখ্যায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তিনি নিজ মতামতকে গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশ্চাত্য বা বহির্বিশ্বের মতামত সঠিকভাবে স্থান পায়নি যা পাঠককে তুলনামূলক জ্ঞান আহরণে সীমায়িত করে। এর সংজ্ঞায় তিনি বলেছেন ‘কিছু সংস্কার ও বিশ্বাস ঐতিহাসিক ব্যক্তি ও স্থানের সাথে জড়িত হয়ে মুখরোচক লোকগল্প সৃষ্টি করে, এগুলোই কিংবদন্তী। সুতরাং ইতিহাস ও কল্পনার মিশ্রণে লৌকিক কথাসাহিত্যের রূপ ধারণকারী লোককাহিনীকে কিংবদন্তী বলে সংজ্ঞায়িত করা যায়। তবে ফোকলোর পরিভাষায় এক স্থানিক কাহিনীই বলা সংগত।২ কিংবদন্তী কোন ব্যক্তি বা স্থানকে ঘিরেই গড়ে ওঠে ইতিহাস ও কল্পনার আশ্রয়ে এ কথা সত্যি তবে এর মধ্যে যুক্ত থাকবে লোকগোষ্ঠীর প্রবল আকাক্সক্ষা এবং রোমাঞ্চকর কিছু অনুভূতি যা ক্ষণে ক্ষণে শ্রোতাকে শিহরিত করবে। তিনি একে স্থানিক কাহিনীর পরিপূরক বলতে চেয়েছেন। আমরা জানি স্থানিক কাহিনীর আঞ্চলিক একটি সীমা থাকে কিন্তু কিংবদন্তী তার অন্তর্নিহিত মোটিফগুলোর কারণে আঞ্চলিক সীমানাকে অতিক্রম করে। তিনি কিংবদন্তি ও পুরাণকাহিনীকে একই বলেছেন যা পাঠককে দ্বিধান্বিত করে। পুরাণকাহিনী ও কিংবদন্তী দুটোর মধ্যেই ঐতিহাসিক মাত্রা থাকলেও সাময়িক বিষয় নিয়েও কিংবদন্তী রচিত হতে পারে, পুরাণ কাহিনীতে যা হয়না। আবার পুরাণ কাহিনীর চরিত্রগুলি পৌরাণিক, কিংবদন্তীর চরিত্র পৌরাণিক না হলেও চলে। বরং দুটোকে সহঅবস্থানে এনে আলোচনা করলেই পাঠক আরও উপকৃত হত। তিনি কিংবদন্তীর যে শ্রেণীকরণ করেছেন তা আরও বিস্তৃত হতে পারত যেমন: পশু পাখি কেন্দ্রীক কিংবদন্তী। তবে সঠিক বিচারে পাঠকের কাছে প্রবন্ধটির বিষয়গত আবেদন কম নয়।

এ গ্রন্থে সন্নিবেশিত ড. মুহম্মদ আবদুল জলিলের ‘বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি’ প্রবন্ধটিতে আগ্রহী পাঠকের দৃষ্টি নিবন্ধিত থাকে দুটি কারণে। প্রথমটি হলো: প্রবন্ধটির ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক মূল্য এবং তাতে সাবলীল ব্যবহৃত মধ্যযুগীয় সাহিত্যের উপাদান। আর দ্বিতীয়টি হলো: সমগ্র মুসলিম জাতির নয় বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক চরিত্র ও জাতিগত পরিচয় নির্মাণ। প্রবন্ধের শুরু থেকে শেষ অবধি বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব সত্তাকে মূল্যায়নের প্রয়াস রয়েছে। মুসলিম মাত্রেই তারা বাঙালি হবে কিংবা সমগ্র বিশ্বের মুসলিমের সাথে বাঙালি মুসলিম যে অভিন্ন এসব ভ্রান্ত ধারণাকে প্রবন্ধকার খ-ন করেছেন। বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণ ধর্মবোধ ভাষা সাহিত্য লোকাচার উৎসব, বিশ্বাস সংস্কার বুঝিয়ে দেয় বাঙালি মুসলমান ও বহিরাগত মুসলমান ভিন্ন। প্রবন্ধকার দুটিকে আলাদা জাতিবাচক শব্দ বলে উল্লেখ করেছেন। প্রবন্ধকার মুসলিম সংস্কৃতির সাথে বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির ফারাকটি বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন। মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর উদ্ভব এদেশে নয় বরং এদেশের ভূমিজ সন্তানেরা নানা ধর্ম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এক পর্যায়ে মুসলিম হয়েছে এ ঐতিহাসিক সত্যটি প্রবন্ধকার নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছেন। বহিরাগত ধর্মভিত্তিক জাতিসত্তার বিধানগুলিকে ভাষাভিত্তিক বাঙালি লোকগোষ্ঠী মেনে নেবার পরও তাদের জীবন আচারে ধর্মে কর্মে রয়ে যায় লৌকিকতা। তাই তো নবী রসূল এদের অনাদৃত না হলেও লৌকিক শিবও মক্কেশ্বর। তাই নৃতাত্ত্বিক ও জাতিতাত্ত্বিক দিক থেকে প্রবন্ধটির গুরুত্ব অপরিসীম।

গ্রন্থের শেষ দিকে ৪টি ইংরেজী প্রবন্ধ রয়েছে। ড. মযহারুল ইসলাম একটি লিখেছেন যেখানে সাঁওতালি লোককাহিনীর Contextual আলোচনা করেছেন। আন্তর্জাতিক মেথড অনুসরণ করে এগুলোর Type & Motif নির্ণয় করেছেন। বাহা উৎসবের সাথে সম্পৃক্ত বালিকার কাহিনীর বিভিন্ন পাঠান্তর ও জ্যামিতিক ডায়াগ্রামের মাধ্যমে বিশ্লেষণ এতে রয়েছে। ড. আশরাফ সিদ্দিকী তার প্রবন্ধটিতে ফোকলোর চর্চায় ফ্রয়েডের স্বপ্নতত্ত্ব এবং কিছু Similar Motifs এর আলোকে বাংলা ফোকলোর বিশ্লেষণে প্রয়াসী হয়েছেন। মাহমুদ শাহ্ কোরেশীর প্রবন্ধটিতে লালন ও লোকধর্মকে মূল্যায়নের চেষ্টা রয়েছে এবং সব শেষে J.S.K. Pau এর লেখা প্রবন্ধটি ফোকলোরকে প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাশৃঙ্খলায় এনে বাঁচানোর আর্তি পাঠকদের অনুপ্রাণিত করে।

‘বিচিত্র দৃষ্টিতে ফোকলোর’ গ্রন্থটিতে ড. ইসলাম এই প্রবন্ধগুলিকেই স্থান দিয়েছেন। সম্পাদনার ক্ষেত্রে এ গ্রন্থের বিষয়গুলিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হয়। কারণ সম্পাদক ফোকলোরের বিভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে রচিত প্রবন্ধগুলিকেই এখানে স্থান দিয়েছেন, সেই সাথে কিছু ইংরেজী প্রবন্ধও রয়েছে যা তাঁর আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও দৃঢ়ভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করে।

তথ্যনির্দেশ
১. বিচিত্র দৃষ্টিতে ফোকলোর, সম্পাদনা ডক্টর মযহারুল ইসলাম।
২. পূর্বোক্ত।

লেখক: আ. ফ. ম. রুকুনুল ইসলাম, এনজিও কর্মকর্তা।


Share this post in your social media

© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com