বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:০১ অপরাহ্ন

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব শ্রদ্ধাঞ্জলি | অধ্যাপক রাশেদা খালেক

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব শ্রদ্ধাঞ্জলি | অধ্যাপক রাশেদা খালেক

“কোনকালে একা হয় নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারি,
প্রেরণা দিয়াছে শক্তি দিয়াছে বিজয়লক্ষ্মী নারী”

এই বিজয়লক্ষ্মী নারী হচ্ছেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিনী হিসাবে তিনি যে ধৈর্য-সহ্য-উদারতা-সাহসিকতা ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে অনেক জটিল পরিস্থিতিতে স্বামীর পাশে থেকে সৎ পরামর্শ দিতে ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছেন তা আজ ইতিহাস সত্য। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা শেখ মুজিবকে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হতে, বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির পিতা হতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের এই অসামান্য অবদানের জন্য জাতি আজ কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁকে স্মরণ করছে।

বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ১৯৩০ সালে ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শেখ জহুরুল হক। মাতা হোসনে আরা বেগম। ফজিলাতুন্নেছার ডাক নাম রেনু। রেনুরা দুই বোন। কোন ভাই নেই। দু’বছরের বড় বোনের নাম জিনাতুন্নেসা, ডাক নাম জিন্নি। পিতা জহুরুল হক লেখাপড়া শেখে যশোরে চাকুরি করতেন। হঠাৎ করেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রেনুর তিন বছর বয়সেবাবাকে এবং পাঁচ বছর বয়সে মাকে হারান। পিতৃ-মাতৃ হারা দুই শিশু-নাতনীকে নিয়ে দাদা শেখ কাশেম দিশেহারা হয়ে পড়েন। প্রচুর ধন-সম্পদের অধিকারি দাদা অনেক চিন্তা ভাবনা করে বড় নাতনি জিনাতুন্নেসাকে সম্পর্কীয় এক নাতির সাথে বিবাহ দেন। আর চাচাতো ভাই শেখ লুৎফর রহমানের পুত্র শেখ মুজিবের সাথে রেনুর বিয়ে দিয়ে সমস্ত সম্পত্তি দুই নাতনির নামে লিখে দিয়ে অভিভাবক হিসাবে লুৎফর রহমানকে দায়িত্ব দেন। শাশুড়ি সাহেরা খাতুন পিতৃ-মাতৃহারা শিশু রেনুকে মাতৃ¯েœহে কোলে টেনে নেন। এবং নিজ সন্তানদের সাথে অত্যন্ত আদরে লালন পালন করেন।

ছোটবেলা থেকে রেনুর লেখাপড়ার প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ ছিল। গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। পরবর্তীতে টুঙ্গিপাড়া গ্রামে গৃহ শিক্ষকের কাছে বাংলা ইংরেজি ইতিহাস অংক এসব বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন। ফজিলাতুন্নেছা রেনুর আচার-ব্যবহার, চাল-চলন ছিল অত্যন্ত মার্জিত, ভদ্র, অমায়িক। রেনু ছিলেন শান্ত প্রকৃতির। ধীর-স্থির, প্রখর মেধা ও স্মরণশক্তির অধিকারি। স্বল্পবাক রেনু ছিলেন নীরব কর্মী। বাড়ির ছোট-বড় সকলের ফাই ফরমাস খাটতেন নীরবে। ছোটবেলা থেকেই তিনি অনেক ধৈর্য ও সহ্যশক্তির পরিচয় দিয়েছেন। জীবনে কোন চাহিদা বা কোন মোহ ছিল না। সাদা সিধে জীবন যাপনে অভ্যস্থ ছিলেন, পছন্দও করতেন। স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বান্তকরণে সহযোগিতা করে এসেছেন। ছাত্র রাজনীতি করতে গিয়ে যখনই অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয়েছে সেই অর্থের যোগান দিয়েছেন স্ত্রী রেনু তাঁর পিতৃপ্রদত্ত সম্পত্তি থেকে।বঙ্গবন্ধু জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় জেলে কাটিয়েছেন।তাঁর অবর্তমানে মামলা পরিচালনার ব্যবস্থা করা,দলকে সংগঠিত করতে সহায়তা করা,আন্দোলন পরিচালনায় পরামর্শ দেয়াসহ সংসারের হাল ধরা, সন্তানদের লালন-পালন, লেখাপড়া করা, শ্বশুর-শ্বাশুড়ি সহ পরিবারের অন্যান্যদের দেখাশোনা, সেবাযতœ করাএসবই তিনি দক্ষ হাতে সামলিয়েছেন এবং খরচপত্র করেছেন। অত্যন্ত বিনয়ী, আদর্শময়ী নারী হিসাবে তিনি সকলের প্রিয় ও শ্রদ্ধার পাত্রী হয়ে উঠেছিলেন।

পাঁচ সন্তানের জননী ফজিলাতুন্নেছা মুজিব স্বামীর আদর্শে সন্তানদের গড়ে তুলেছেন। তিনি শুধু আত্মীয়-স্বজন নয় দলীয় কর্মীদের সুখ-দুঃখের ভাগিদার ছিলেন।নেতাকর্মীদের রোগে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, কারাগারে আটক নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নেয়া ও তাদের পরিবারে নানা সংকটে পাশে দাঁড়িয়েছেন ,প্রয়োজনেআর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। অতিথি আপ্যায়নে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। নিজ হাতে রান্না করে স্বামী-সন্তান এবং অভ্যাগতদের কাছে বসিয়ে খাওয়াতে পছন্দ করতেন। প্রতিদিন নিজে রান্না করে টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবার পাঠাতেন। অফিসে সরকারি বাবুর্চির হাতের রান্না স্বামীকে খেতে দিতেন না। পরিপাটি করে ঘরবাড়ি সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতেন। এলো মেলো অপরিচ্ছন্ন ঘরবাড়ি পছন্দ করতেন না। অবসরে বই পড়তেন। পান খেতে পছন্দ করতেন। যেখানেই যেতেন সঙ্গে থাকতো পেতলের পানডালা। প্রতিদিন সকালে ফজরের নামাজের পর কোরআন তেলাওয়াত করতেন। এরপর গরু বাছুর হাঁস মুরগি কবুতর ইত্যাদি পোষ্য পশু-পাখির তদারকি করতেন। কবুতরকে নিজ হাতে দানা খাওয়াতেন। এরপর ঘরে এসে চা এবং সংবাদপত্র নিয়ে বিছানায় বসতেন। এরমধ্যে ছেলে-মেয়েরা ঘুম থেকে উঠে মায়ের বিছানায় বসে আব্বা-মায়ের সাথে গল্প করতে করতে চা খেত। কি চমৎকার একটি ঘরোয়া সুখের ছবি।

রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হিসাবে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন রাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি। কিন্তু তিনি নিজেকে কখনও ফার্স্ট লেডি হিসাবে দেখেন নি, মানেন নি এবং সে পর্যায়ে নিজেকে তুলে ধরার কথা ভাবেনও নি। কখনও স্বামীর দেশে-বিদেশের সফরসঙ্গী হয় নি। নির্লোভ-নির্মোহ এই নারী- সারাটি জীবন স্বামীর পাশে থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বান্তকরণে শুধু সহযোগিতা করে গেছেন।

১৯৬৬ সাল। বঙ্গবন্ধু ৬ দফা দাবি পেশ করেন। পাকিস্তান শাসকেরা ৬ দফা দাবি পেশ করার অপরাধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১নং বিচ্ছিন্নতাবাদী আসামি হিসাবে ১৯৬৬ সালের ৮ মে তারিখে গ্রেফতার করে এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী করে । আওয়ামি লীগের উচ্চ পর্যায়ের অনেক নেতাসহ প্রশাসন এবং সেনাবাহিনীর বাঙালি কয়েকজন সদস্যকে জড়িয়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে সবাইকে গ্রেফতার করে ঢাকা কারাগারে বন্দী করে রাখে এবং অমানবিক নির্যাতন চালায়। দেড় বছরের অধিক সময় বিনা বিচারে জেলখানায় রাখার পর ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে বন্দি করে এবং অত্যাচার করে। কেস কোর্টে ওঠার আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন- জীবিত না মৃত তার খবর কেউ জানতে পারে নি। ফজিলাতুন্নেছা মুজিব স্বামীর খবরের জন্য পাগলের মত ছুটাছুটি করেছেন, কিন্তু কোন খবর সংগ্রহ করতে পারেন নি।

৬ মাসের অধিক সময় পর প্রথম যে দিন বিশেষ ট্রাইবুনাল শুরু হলো এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে কোর্ট বসল সে দিনই- বঙ্গবন্ধুকে প্রথম তাঁর পরিবার দেখতে পেল।বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন- এই ছিল সে দিন পরিবারের সান্ত¦না। আসলে এই মিথ্যা মামলা দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরিকল্পনা ছিল পশ্চিমা শাসকদের। কিন্তু তা সম্ভব হয় নি দেব্যাপী ছাত্র জনতার আন্দোলনের ফলে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে ওঠে। ৬ দফার সাথে ছাত্রদের ১১ দফা দাবি পেশ করে আন্দোলনকে আরো বেগমান করে তোলা হয়। এই মামলা পরিচালনা ও আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য ফজিলাতুন্নেছা মুজিব দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। গহনা বিক্রি করে ছাত্রনেতাদের হাতে টাকা তুলে দিয়েছেন।

আইয়ুব শাহীর গদি তখন টালমাটাল। গদি রক্ষার জন্য নানা ধরনের ষড়যন্ত্র শুরু করে আইয়ুব খান। ৬ দফার পরিবর্তে ৮ দফা নিয়ে ঢাকায় আসে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামি লীগের কয়েকজন নেতা। তাদের সাথে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামি লীগের অনেক নেতা হাত মেলায় এবং ‘আপস ফরমুলা’ নিয়ে মাঠে নামে। এসময় বেগম ফজিলাতুন্নেছা শক্ত অবস্থান নেন। দৃঢ় মনোবল নিয়ে শক্ত হাতে সংগঠনের হাল ধরে মাঠ পর্যায়ের নেতাদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম হন।৬ দফার প্রশ্নে কোন আপস নয়। আইয়ুব খান তখন নতুন চাল দেন। ইসলামাবাদে গোলটেবিল বৈঠক ডাকে। বন্দীখানা থেকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ইসলামাবাদে নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের প্রস্তাব দেয়। এই প্রস্তাবের সমর্থনে আওয়ামি লীগের অনেক নেতা, আইনজীবী, সাংবাদিক, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ প্যারোলে মুক্তিরপক্ষে কাজ করে। কিন্তু এর বিপক্ষে ছিলেন বেগম মুজিব। মাঠপর্যায়ের কর্মী এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা কর্মীরাও বেগম মুজিবের পক্ষে ছিলো। একদিন যখন উচ্চপর্যায়ের নেতারা শেখ মুজিবকে প্যারোলে নিয়ে যাওয়ার জন্য বন্দীখানায় হাজির হন। এয়ারপোর্টে পিআইএ বিমান প্রস্তুত,সেইসময় বেগম মুজিব কন্যা শেখ হাসিনাকে পাঠালেন শেখ মুজিবের কাছে একটা খবর পৌঁছে দিতে। শেখ হাসিনা মায়ের কথামত গিয়ে দেখলেন সেখানে প্রচন্ড ভিড়। ভেতরে নিজেদের পরিচিত অনেক নেতা থাকলেও তিনি ভেতরে যেতে পারছিলেন না। অনেক সময় অপেক্ষা করার পর অনেক চেষ্টা করে কয়েক মিনিটের জন্য বাবা শেখ মুজিবের কাছে পৌঁছে মায়ের কথাটা জানাতে পারেন। শেখ ফজিলাতুন্নেছা সে দিন কন্যা শেখ হাসিনার মাধ্যমে এই খবর পাঠিয়েছিলেন যে, ‘শেখ মুজিব যদি প্যারোলে মুক্তি নিয়ে ফিরে আসেন তবে তিনি সংসার ছেড়ে টুঙ্গিপাড়ায় চলে যাবেন’। শুনে- শেখ মুজিব জানালেন ৩৪জন আসামি সহ তাঁকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নিতে হবে, তবেই তিনি গোলটেবিল বৈঠকে বসবেন। শেখ মুজিব প্যারোলে যেতে রাজি হলেন না দেখে নেতারা ক্ষেপে গেলেন। তাদের অনেকে ৩২নং বাড়িতে এসে বেগম মুজিবকে অনেক ভয় দেখালেন। শেখ মুজিবকে মেরে ফেলা হবে। তিনি বিধবা হবেন। পিতৃহারা হলে তাঁর সন্তানদের কি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু বেগম মুজিবের এক কথা- ‘৩৪জন বন্দিকে রেখে মামলা প্রত্যাহার না করলে শেখ মুজিব প্যারোলে যাবেন না। বাংলার মানুষ তা চায় না’। নেতাদের তিনি বলেছিলেন- বিধবা হলে আমি হবো, পিতৃহীন হলে আমার সন্তানেরা হবে। তাতে অন্যদের কি?- ফজিলাতুন্নেছা ধৈর্যহারা হলেন না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আইয়ুব খানের পতন-সময়ের ব্যাপার মাত্র। ১৯৬১ এর ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নেন এবং শেখ মুজিব সহ সকল রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে বাধ্য হন। ২৪ মার্চ আইয়ুব খানের পতন হয়। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। কত বাস্তবধর্মী চিন্তাভাবনা করতেন তিনি। নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক এই নারী সে দিন যদি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল না থাকতেন, তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতার পরিচয় না দিতে পারতেন তবে হয়তো বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত।

১৯৭১ এর ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিবেন। জনসভায় বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লাখ লাখ মানুষ ছুটে এসেছে তাদের নেতার কথা শুনতে। এই ভাষণদানের পূর্বে কয়েকটি দিন ধরে চলছে শুধু মিটিং আর মিটিং। চলছে সংবাদ সম্মেলন। হচ্ছে মিছিলের পর মিছিল। স্বাধীনতার বীজমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ বাঙালি জাতি আজ দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ- স্বাধীনতা আমাদের চাই, পশ্চিমাদের সঙ্গে আর নয়।- সারাটা দিন তেনাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর ৩২নং ধানমন্ত্রীর বাড়িতে আসছে তাদের কথা বঙ্গবন্ধু ধৈর্য সহকারে শুনছেন। সারাটা দিন এভাবেই কাটছে। জনসভায় যাওয়ার সময় হলে বঙ্গবন্ধু তৈরি হবার জন্য এলেন। ফজিলাতুন্নেছা বঙ্গবন্ধুকে শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন। দরজাটা বন্ধ করে স্বামীকে মিনিট পনের চুপচাপ শুয়ে থাকতে বললেন। কন্যা শেখ হাসিনা বাবার মাথা টিপে দিচ্ছেন। শর্দি লেগেছে বলে কপালে ভিক্স মালিশ করছেন। বঙ্গবন্ধু কাঁথা গায়ে দিয়ে চুপচাপ শুয়ে রইলেন। ফজিলাতুন্নেছা বেতের মোড়াটা টেনে স্বামীর পাশে বসলেন। পানদান থেকে পান নিয়ে বানাচ্ছেন আর ধীরে ধীরে বলছেন- “সমগ্র দেশের মানুষ আজ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সবার ভাগ্য আজ তোমার উপর নির্ভর করছে। তুমি আজ একটা কথা মনে রাখবে সামনে তোমার লাঠি পেছনে বন্দুক। তোমার মনে যে কথা আছে তুমি তাই বলবে। অনেকে অনেক কথা বলতে বলেছে। তোমার কথার ওপর সামনের অগণিত মানুষের ভাগ্য জড়িত। তাই তুমি নিজে যেভাবে বলতে চাও নিজের থেকে বলবে। তুমি যা বলবে সেটাই ঠিক হবে। দেশের মানুষ তোমাকে ভালবাসে, ভরসা করে।” -ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের এই পরামর্শ থেকে বোঝা যায় তিনি কত বাস্তবধর্মী চিন্তাভাবনা করতেন। দেশপ্রেমিক এই নারী ছিলেন স্বাধীনতা প্রশ্নে আপোসহীন।

বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ধানমন্ডি ৩২নং বাড়িটির বাইরে খুব বেশি যেতেন না। কিন্তু সারাদেশের রাজনীতি এবং প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি কাজ তাঁর জানা ছিল। বঙ্গবন্ধু কোন পদক্ষেপ যদি তাঁর উদ্বেগের কারণ হতো তা তিনি নির্দ্বিধায় প্রকাশ করতেন এবং মতামত জানাতেন। বাকশাল গঠনের পর তিনি ক্ষোভের সাথে বলেছেন- ‘এবার থেকে তুমি এই বাসায় নয়, তোমার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে গণভবনে থাকবে।’ তীক্ষèমেধার অধিকারি বেগম মুজিব হয়তো বহুদূর পর্যন্ত তাঁর দৃষ্টি প্রসারিত করে ভবিষ্যতের ছবি দেখতে পেয়েছিলেন,তাই একথা বলেছিলেন।

বেগম ফজিলাতুন্নেছা বিদ্যোৎসাহী ছিলেন। বই পড়তে খুব পছন্দ করতেন। প্রচুর বই কিনতেন।রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, বার্টান্ড রাসেল পড়তে ভালবাসতেন। তার কেনা বই দিয়ে ৩২নং ধানমন্ডির বাড়িতে একটি লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল। স্বামী ঘন ঘন কারাগারে যান।পড়বার জন্য তাঁকে বই দিয়ে আসেন।দেশের এবং দলের সব খবর জানাতেন।আবার বঙ্গবন্ধু যে নির্দেশ আদেশ দিতেন তা নেতা কর্মীদের কাছে পৌঁছে দিতেন। অনেক নিরলস সময় তাঁর কাটে। বেগম মুজিব তাই কারাগারে বসে বঙ্গবন্ধুকে লেখালেখি করবার পরামর্শ দেন। এবং নিজে কয়েকটি খাতা ও কলম কিনে জেল গেটে দিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধু কি লিখবেন, লিখতে যে তিনি পারেন না! কিন্তু তা বললে চলবে কেন? বেগম মুজিবের বারবার তাগাদায় লেখা শুরু করলেন- জীবনের কথা, পরিবারের কথা, আন্দোলন সংগ্রামের কথা।লেখাগুলি বহুকষ্টে সংগ্রহ করে সম্প্রতি গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হয়েছে- ১. বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ২. কারাগারের রোজনামচা। গ্রন্থদুটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতিহাসের প্রামান্য দলিল।এর পেছনে রয়েছে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অসামান্য অবদান।

ইতিহাসে স্বামীর অনুগামী হিসাবে অনেক নারীর নাম আমরা জানতে পারি যেমন- গান্ধী পতœী কস্তুরবাই, নেহেরুর কারাসঙ্গীনী কমলা, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সহধর্মিনী বাসন্তী দেবী, ম্যান্ডেলা পতœী উইনি। এরা সকলেই ইতিহাসে স্থান পেয়েছেন- স্বর্ণাক্ষরে তাঁদের নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে, অথচ বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নাম সেখানে অনুপস্থিত।

বেগম মুজিব বাঙালি জাতির মুক্তিদাতার স্ত্রী- যিনি আজীবন স্বামীর পাশে থেকে শুধু শক্তি ও প্রেরণাই যুগিয়ে যান নি কখনও কখনও নিজের অজান্তে ইতিহাস নির্মাণ করেছেন। জীবনও দান করেছেন¬।বঙ্গবন্ধুর আজীবন সুখ-দুঃখের সঙ্গী মৃত্যুকালেও তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার সময় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে ঘাতকেরা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে।ধর্মীয় বিধান মোতাবেক ধর্মপ্রাণা এই মুসলিম মহীয়সী নারীর দাফন-কাফন-জানাজা কোনটাই ঘৃণ্য ঘাতকেরা হতে দেয়নি। আমি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকুক এই প্রত্যাশা রাখছি।


Share this post in your social media

© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com