রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৭:০২ পূর্বাহ্ন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা | প্রফেসর ড. আবদুল খালেক

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা | প্রফেসর ড. আবদুল খালেক

Professor Dr. Abdul Khaleque (প্রফেসর ড. আবদুল খালেক)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, বাঙালি জাতি ও স্বাধীন বাংলাদেশ আজ এক সূতোয় গাঁথা পড়ে গেছে। কোন কিছুকে বিচ্ছিন্ন করে দেখবার  পথ নেই। বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে স্বাধীন বাংলাদেশের  জন্ম হতো না, এটি শুধু আবেগের কথা নয়, বাস্তব সত্য। অতীত ইতিহাসের কিছু পাতা উল্টালেই তার প্রমান মেলে। আজ থেকে হাজার বছর আগে বঙ্গভাষাভাষি একটি জনগোষ্ঠী এই অঞ্চলে বাঙালি জাতি হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল এবং অঞ্চলটি এক সময় বঙ্গদেশ বলেও পরিচিতি লাভ করেছিল, কিন্তু ১৯৭১ সালের  আগে এই বঙ্গদেশটি কখনও স্বাধীনতার মুখ দেখে নি।
ভারত বিভক্তির মাধ্যমে যখন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তখন শেখ মুজিব কোলকাতার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র ছিলেন। কোলকাতার সিরাজদ্দৌলা হলে আয়োজিত এক সভায় তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিব তাঁর বক্তব্যে সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে আমাদের আশায় উজ্জীবিত হওয়ার কারণ ঘটেছে। কিন্তু এ কথাও সত্য যে, সেই রাষ্ট্রের বাঙালিদের অবস্থান কি হবে, সে সম্পর্কে আমাদের যথেষ্ট সংশয় আছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অতি দ্রুত শেখ মুজিবের সেই সংশয় সত্য হতে দেখা যায়।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম লগ্নেই দেখা দেয় রাষ্ট্রভাষা নিয়ে সমস্যা। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে যখন ঘোষণা দেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, এই ঘোষণার বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সমাজ তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। সেই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯৪৮ সালের গোড়ার দিকে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে গঠিত হয় “পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ”। ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে শেখ মুজিবেক জেলে যেতে হয়।
১৯৪৯ সালের ৩রা জুন তারিখে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামের একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়্। দলের সভাপতি নির্বাচিত হন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। শেখ মুজিব কারারুদ্ধ থাকলেও তাঁকে দলের সহসম্মাদক নির্বাচিত করা হয়।বাঙলাভাষা কেন্দ্রিক বাঙালি জাতি তার ভাষার প্রতি সবসময় আবেগপ্রবণ। নিজের ভাষার অবমাননা এ জাতি কখনও সহজভাবে মেনে নতে পারে নি। নিজের মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে ১৯৫২ সালে এ দেশের মানুষকে জীবন পর্যন্ত ।উৎসর্গ করতে হয়েছে । ভাষা শহীদদের  রক্তের দিকে তাকিয়ে বাঙালি জাতি নতুন করে আত্ম আবিষ্কারে ব্রতী হয়।নিজেদের অধিকার আদায় করতে গিয়ে ১৯৫৪ সালে গঠন করা হয় যুক্তফ্রন্ট। নেতৃত্ব দেন প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতা জনাব এ কে ফজলুল হক,মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়র্দী  জনাব শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হলেও পশ্চিম পাকিস্তানীদের নানারকম ষড়যন্ত্রের কারণে যুক্তফ্রন্ট রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারে নি। ১৯৫৮ সালে দেশে শুরু হয় আইউব খানেরর সামরিক শাসন।রাজনৈতিক নেতাদের ওপর নেমে আসে নানারকম অত্যাচার নির্যাতন।
আইউব খান  অস্ত্রের বলে পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পর থেকে তাঁর সামরিক শাসনের সমস্ত আক্রোশ শেখ মুজিবের উপর একে একে গিয়ে পড়তে থাকে। আইউবের এক দশকের উর্ধ্বকাল শাসন আমলে শেখ মুজিব প্রায় আট বছর কারাগারে আবদ্ধ থাকেন। কোনো কোনো সময় তাঁর কারাবাসের মেয়াদ এক বছরের চেয়ে দীর্ঘায়িত হয়। এ ছাড়া অসংখ্য মামলা চাপিয়ে তাঁকে হয়রানি করা হতে থাকে। কিন্তু এতে মুজিবকে দমানো যায়নি। যখনই তিনি মুক্তি পেয়েছেন তখনই পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে এবং আইউবীয় স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, ভাষণ দিয়েছেন। ফলে পুনরায় তাঁর ওপর মামলা নেমে এসেছে, তিনি কারারুদ্ধ হয়েছেন। ষাটের দশকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আকস্মিক মৃত্যুর ফলে আওয়ামী লীগের সার্বিক নেতৃত্ব চলে আসে শেখ মুজিবের হাতে। দলের সামনে তখন এক কঠিন পরীক্ষা।  আমরা লক্ষ্য করেছি বয়সে তরুন হলেও শেখ মুজিব তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার দ্বারা এই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।শেখ মুজিব ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের মাধ্যমে লব্ধ করুণ অভিজ্ঞতার আলোকে ১৯৬৬ সালে তাঁর বিখ্যাত ছয় দফা দাবি ঘোষণা করেন।
ছয় দফাকে একটু নিবিষ্টচিত্তে বিশ্লেষণ করলে সহজেই অনুভব করা যায় যে, এর মধ্যে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার বীজ শুধু লুকিয়ে নেই, তা অঙ্কুরিত হয়েছে। সুচতুর আইউব খান ও তাঁর অনুসারীগণ উপলব্ধি করলেন যে, শেখ মুজিবকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই-অর্থাৎ তাঁকে ফাঁসিতে লটকাতে হবে। এই উদ্দেশ্যে ১৯৬৮ সালের ২১ এপ্রিল একটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে সুপ্রিমকোর্টের সাবেক বিচারপতি এস এ রহমানের নেতৃত্বে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি করে পঁয়ত্রিশজনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। সে মামলার নামকরণ হয় মুজিব বনাম রাষ্ট্র।
মামলা চলাকালেই অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে ১৯৬৯ সালের ১৫ র্ফেরুয়ারি বন্দি অবস্থায় ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রতিবাদে ১৭ ফের্রুয়ারি সারাদেশে হরতাল পালিত হয়। ১৮ র্ফেরুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা যখন ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে একটি সাহসী ভূমিকা পালন করছিলেন ঠিক সেই সময়ে বর্বর পাকিস্তানের সৈনিকদের হাতে তিনি নির্মম ভাবে নিহত হন।

এসব ঘটনায় পরিস্থিতি আইউব খানের নিযন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আইউব খান বাধ্য হয়ে ২২ র্ফেরুয়ারি একটি ঘোষণায় শেখ মুজিবকে বিনাশর্তে মুক্তি দিয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একটি গোলটিবিল বৈঠকে যোগ দেবার জন্যে বিশেষ দূত মারফত আমন্ত্রণ জানান।
পরদিন ২৩ র্ফেরুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবকে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের তরফ থেকে এক সংবর্ধনা জানানো হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি জনাব তোফায়েল আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
২৬ র্ফেরুয়াররি রাষ্ট্রপতি আইউব খানের সভাপতিত্বে গোলটেবিলের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। গোলটেবিল বৈঠকে শেখ মুজিব যে সমস্ত দাবি-দাওয়া পেশ করেন, আইউব খানের পক্ষে সে সমস্ত দাবি-দাওয়া পুরণ অসম্ভব হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে আইউব খান শেখ মুজিবকে প্রধান মন্ত্রীর আসন গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু মুিজব তা প্রত্যাখ্যান করেন। অবশেষে ২৫ মার্চ আইউবের পতন ঘটে এবং সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখল করেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি সেনানায়ক ইয়াহিয়ার নিকটেও তৎকালীন পূর্ব বাংলার আর কেউ নয়, এই একটি মানুষ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছিলেন তাঁর সকল মাথাব্যথার কারণ। তাঁকে উপেক্ষা করার সাধ্য এই সেনানায়কের ছিল না। মুজিব আপসের উর্ধ্বে। তাই শেষ পর্যন্ত ইয়াহিয়া খানকে ১৯৭০ সালে নির্বাচন দিতে হয়।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অসাধারণ বিজয় শেখ মুজিবকে নেতৃত্বের সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যায়। তখন ইয়াহিয়া ও তাঁর দোসরগণ পা দিলেন ষড়যন্ত্রের পথে। ততদিন বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার মুকুটবিহীন সম্রাট। তাঁর নিকট ইয়াহিয়া, ভুট্টো তুচছ। অতঃপর উভয়েই ছুটে এলেন ঢাকায়, মুজিবের সাথে বসলেন আলোচনায়। কিন্তু মজিব মনে মনে ঠিকই জেনেছিলেন যে, এই আলোচনা ছিল ভাওতা মাত্র। শেখ মুজিবের আহ্বানে অসহযোগ আন্দোলন চলতে থাকে। পূর্ব বাংলার সমগ্র প্রশাসন তখন বঙ্গবন্ধুর হাতে। ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষনে শেখ মুজিব দেশবাসীকে স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিলেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু নিজের হাতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন এবং দেশ বাসীকে জানিয়ে দেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর দূরে নয়। ২৫শে মাচের্র মধ্য রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একটি ঘোষণার মাধ্যমে জারি করেন Proclamation of Independence of Bangladesh.
এই সমস্ত ঘটনাই প্রমাণ করে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে যথার্থভাবেই জনকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

*উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী; সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


Share this post in your social media

© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com