বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৩:৩৫ অপরাহ্ন

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ও মানবসম্পদ ভাবনার গতিপ্রকৃতি

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ও মানবসম্পদ ভাবনার গতিপ্রকৃতি

প্রফেসর ড. আবদুল খালেক
Professor Dr. Abdul Khaleque (প্রফেসর ড. আবদুল খালেক)

শিক্ষা এবং মানবসম্পদ একে অপরের পরিপূরক। শিক্ষার সাথে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির একটি ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র আছে। জন্মগতভাবেই মানবজাতি একটু বেশি পরিমান মেধার অধিকারী। বাঙালি জাতি মেধাহীন এ কথা বলবার কোন সুযোগ নেই। মেধাবিহীন কোন জাতি কখনও স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে একসাগর রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে বেছে নেয়া হয়, সে গানের শুরুতেই বলা হয়েছে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।’ ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি তারিখে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসবার পর বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। বিদেশী সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, বাংলাদেশে কোনরকম খনিজদ্রব্য সোনা-দানা, হীরা-মুক্তা, তেল সম্পদ বলতে কিছুই নেই, তা সত্ত্বেও বাংলাদেশটিকে আপনি বারবার সোনার বাংলা বলে চিহ্নিত করছেন কেন? সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘আমার বাংলার মাটি আছে, আমার বাংলার মানুষ আছে। আমি বাংলার মাটি এবং মানুষকেই সোনা বলে মনে করি। দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ খনিজ সম্পদের চেয়েও বড় সম্পদ। এই মানবসম্পদই একদিন বাংলাদেশকে উন্নতির শীর্ষে নিয়ে যাবে।’

বঙ্গবন্ধু জানতেন দেশের মানুষকে সত্যিকার অর্থে সম্পদে রূপান্তরিত করতে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধু মাঝে মাঝে তাঁর বক্তৃতায় বলতেন- ‘সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই।’ আর সে সোনার মানুষ পেতে হলে শিক্ষা অপরিহার্য। শিক্ষা বলতে তিনি শুধুমাত্র স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গতানুগতিক শিক্ষাকে মনে করেন নি, তিনি মনে করতেন নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে অক্ষরজ্ঞান দান থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষাকে একই রেখায় নিয়ে আসতে হবে। দেশের শাসনভার হাতে নেয়ার পর বঙ্গবন্ধু সেই লক্ষ্যেই নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পাঠ করে আমরা জানতে পারি শেখ মুজিব তাঁর বাল্য এবং কৈশোর জীবন থেকেই গ্রামের নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষর করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ কাজটি শুরু করেন তাঁর একজন বাল্য শিক্ষকের হাত ধরে। গ্রামের বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কেটে এনে তিনি নিরক্ষরদেরকে অক্ষর শেখানোর জন্য শিক্ষাকেন্দ্র নির্মাণ করেছেন, তাদের বই কেনা, হারিকেনের তেল খরচ এবং অন্যান্য খরচ বহনের জন্য তিনি গ্রামের প্রতিটি বাড়ি থেকে মুষ্টির চাল আদায় করেছেন। এ কাজে তাঁকে নানারকম প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবে সমস্ত প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করে তিনি গ্রামের নিরক্ষর মানুষদেরকে সাক্ষর করার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা নিয়ে কথা বলতে হলে গ্রামের নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে যে দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সাক্ষর করতে চেয়েছিলেন, আমাদের আলোচনা সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। আমাদের ভাবতে অবাক লাগে বাল্য-কৈশোরকালে তাঁর গ্রামের নিরক্ষর মানুষদের শিক্ষা দানের ব্যাপারে শেখ মুজিবের মধ্যে যে ধ্যান-ধারণার জন্ম হয়, সেই একই ধ্যান-ধারণা সমস্ত জীবন ধরে তিনি লালন করেছেন এমনকি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপিতা হবার পরও তিনি সেই ধ্যান-ধারণার বাস্তবরূপ দিতে প্রয়াসী হয়েছেন।

১৯৪৭ সাল থেকে এই ভ‚-খÐে যত রকমের প্রতিবাদ ও সংগ্রামের ঘটনা ঘটেছে, বঙ্গবন্ধু সেগুলোর সাথে একাত্ম হয়েছিলেন। তিনি নিজেকে ছাত্র আন্দোলন ও শিক্ষা আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ থেকে কখনও দূরে রাখেন নি। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, পাকিস্তান আমলে নানারকম বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি এদেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেগুলোর প্রতিবাদে এদেশের ছাত্র-জনতা বারবার শেখ মুজিবের নেতৃত্বে রাজপথে আন্দোলন করেছে। ১৯৪৭ সালের পর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মোট ছয়টি শিক্ষা কমিশন গঠন করে। ১৯৫২ সালে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ শিক্ষা কমিশন, ১৯৫৭ সালে আতাউর রহমান খান শিক্ষা কমিশন ১৯৫৯ সালে এস এম শরীফ শিক্ষা কমিশন, ১৯৬৪ সালে বিচারপতি হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন, ১৯৬৯ সালে এস এম নূর খান শিক্ষা কমিশন এবং ১৯৭০ সালে শামসুল হক শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। এই শিক্ষা কমিশন দেশকে কার্যকর কোন শিক্ষা ব্যবস্থা দিতে পারে নি। বরং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শিক্ষা বিষয়ে তাদের বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে বাংলার মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালিয়েছে। তবে বাংলার মানুষ আন্দোলনের মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করেছে।

একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু সবসময় জনগণের আবেগ ও অনুভ‚তিকে অনুধাবন করেছেন। বিভিন্ন শিক্ষা নীতির বৈষম্যমূলক সুপারিশের প্রতিবাদে বাংলার ছাত্র-জনতা যখন মাঠে নেমেছে, তখন শেখ মুজিব ও তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীবৃন্দ সবসময় ছাত্র-জনতার পাশে থেকেছেন। জনগণের পাশে থাকার এই বিষয়টিকে শুধু যে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে জনগণের চাহিদা ও মনোভাবকে সমর্থন করা বিষয়টি তেমন নয়, বরং শেখ মুজিব বিষয়টিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে একটি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মনোভাব গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। যার ফলে বাংলাদেশকে স্বাধীন করবার পর নানারকম সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যুদ্ধ বিধ্বস্ত নবগঠিত বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শিক্ষাকে সম্প্রসারিত করবার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

শিক্ষাব্যবস্থা একটি জাতির আশা-আকাক্সক্ষার রূপায়ণের ও ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণের হাতিয়ার। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা ছাড়া কোন জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষার সাথে নিরক্ষরতার যদি তুলনামূলক আলোচনা করা যায়, তাহলে বলতেই হবে শিক্ষিত জাতিই একটি পরাধীন দেশকে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, নিরক্ষর জনগোষ্ঠী কখনও কোন পরাধীন দেশকে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে নেয়ার নেতৃত্ব দিতে পারে না। শিক্ষার সাথে দেশপ্রেম কোন বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভালো করেই জানতেন জাতিকে শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে জাতির মুক্তি নেই।

আমরা জানি শেখ মুজিবের জন্ম হয়েছিল ১৯২০ সালে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুংগীপাড়া গ্রামে। ফরিদপুর শহর থেকে গ্রামটির দূরত্ব ছিল বিস্তর, যাতায়াত ব্যবস্থা মোটেই ভালো ছিল না। দুর্গম এলাকাই বলা যায়। এলাকার মানুষ ছিল দরিদ্র। শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা ছিল নগণ্য। এলাকার নিরক্ষর মানুষদেরকে কীভাবে অক্ষরজ্ঞান দান করা যায়, কিশোর শেখ মুজিব এ ব্যাপারে ছিলেন তৎপর। কিশোর শেখ মুজিব শিক্ষার আলো বিস্তারের জন্য সর্বপ্রথম তাঁর গ্রামকেই বেছে নেন। গ্রামের নিরক্ষর বয়স্ক মানুষদের সাক্ষর করার কাজে কিশোর বয়সেই তিনি তৎপর হয়ে ওঠেন। গ্রামের মানুষদেরকে সাথে নিয়ে বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে গ্রামের নিরক্ষর মানুষদেরকে অক্ষর চেনানোর জন্য স্কুলগৃহ নির্মাণ করেছেন। গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে মুষ্টির চাল নিয়ে স্কুলের খরচ বহন করেছেন। এটি শেখ মুজিবের কিশোর বয়সের শিক্ষা ভাবনার উদাহরণ।

শেখ মুজিব স্কুল পর্যায়ের লেখাপড়া করেছেন নিজ এলাকায়। কলেজ পর্যায়ের লেখাপড়া করেছেন কোলকাতায়। কোলকাতার ইসলামীয়া কলেজে লেখাপড়া করতে গিয়ে তিনি বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্য লাভ করেন। এর ফলে শেখ মুজিবের অন্তরে রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত হতে থাকে। দেশ তখন এক ক্রান্তিলগ্নে। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতবর্ষ তখন স্বাধীনতা অর্জনের পথে। ১৯৪৪-৪৭ সাল পর্যšত শেখ মুজিবের কোলকাতা জীবন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন তখন তুঙ্গে। স্বাধীনতা অর্জনের প্রাক্কালে দেশে দেখা দেয় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার ফলে মুসলমানদের পক্ষ থেকে পাকিস্তান আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। পাকিস্তান আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারেন নি শেখ মুজিবের মত রাজনীতি সচেতন মানুষ। তবে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সান্নিধ্যে থেকে শেখ মুজিব যে ধরনের পাকিস্তান চেয়েছিলেন, ১৯৪৭ সালে সে পাকিস্তান অর্জিত হয় নি। বাংলার বিভাজন শেখ মুজিব চান নি। অনেক চেষ্টা করেও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং তরুণ শেখ মুজিব বাংলার বিভাজন ঠেকাতে পারেন নি। দেশ ভাগ হয় দ্বিজাতিতত্তে¡র ভিত্তিতে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তত্ত¡ই শেষ পর্যন্ত গৃহীত হয়। মুসলমান প্রধান এলাকা হবে পাকিস্তান, হিন্দু প্রধান এলাকা হবে হিন্দুস্তান। দ্বিজাতিতত্তে¡র ভিত্তিতে দেশ ভাগ হবার পর শেখ মুজিবকে চলে আসতে হয় ঢাকায় ১৯৪৭ সালে। ততদিনে শেখ মুজিব ইসলামীয়া কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ঢাকায় এসে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

শেখ মুজিবের শিক্ষা ভাবনা এবং রাজনৈতিক ভাবনাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখবার কোন সুযোগ নেই। রাজনীতি যেমন জীবন বিচ্ছিন্ন কোন বিষয় নয়, শিক্ষাকেও তিনি জীবন বিচ্ছিন্ন করে দেখেন নি। যে কারণে ব্যক্তি জীবনে স্কুল কলেজে শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি তিনি রাজনীতি চর্চা করেছেন। ১৯৪৮ সালে দেশের তরুণ শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে তিনি গঠন করেছেন ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম ছাত্রলীগ’ নামের একটি সংগঠন। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ছাত্রলীগের জন্ম। শেখ মুজিব স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন বাঙালির মাতৃভাষা বাংলা যদি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা না হয়, বাঙালি জাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। শিক্ষার ক্ষেত্রে জাতি পিছিয়ে পড়বে। তিনি বুঝতে পারেন বাঙালি জাতিকে আর একটি স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত হতে হবে। উর্দুকে যখন পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হয়, শেখ মুজিব উপলব্ধি করতে পারেন শিক্ষা থেকে তাঁর দেশের মানুষ বঞ্চিত হবে। পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ, নির্যাতনের ফলে শেখ মুজিবের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া প্রকৃত অর্থে শিক্ষা সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। ১৯৫৪ সালে শেখ মুজিবের যুক্ত ফ্রন্টের আন্দোলন, ১৯৫৮ সাল থেকে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ৬ দফার আন্দোলন, ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান ঘটানো, ১৯৭০ সালে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ, ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা সবকিছুর মূলে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেমিক শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গঠনের অক্লান্ত প্রয়াস।

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ তারিখে বঙ্গবন্ধু যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তাঁকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানের জেলখানায়। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি তারিখে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এসেই উপলব্ধি করতে পারেন পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী দেশকে বিধ্বস্ত করে রেখে গেছে। এই বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তুলতে হলে মানবসম্পদকে কাজে লাগানো ছাড়া আর কোন পথ নেই। মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান অবলম্বন শিক্ষা। শিক্ষাকে শৃঙ্খলায় আনতে গেলে প্রয়োজন একটি সুশৃঙ্খল নীতিমালা। শিক্ষার নীতিমালা পেতে হলে প্রথমে প্রয়োজন একটি রাষ্ট্রপরিচালনার নীতিমালা। কাজেই বঙ্গবন্ধু সর্বপ্রথম দেশে সংবিধান রচনায় হাত দেন। সংবিধানের আলোকেই তিনি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাজানোর কথা ভেবেছিলেন। অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টিতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সংবিধান থেকে বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। আমরা জানি বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি তারিখে দেশে ফিরে এসে অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে একটি সংবিধান প্রণয়ন করেন। দ্রæত কাজটি করা সম্ভব হয়েছিল এ কারণে যে, বঙ্গবন্ধু তাঁর সারাজীবনের আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগোতে গিয়ে নিজের মনের গভীরে দেশের সংবিধানের একটি ছক তৈরি করে রেখেছিলেন। যে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানের ২৩ বছরে ১৩/১৪ বছর বঙ্গবন্ধুকে জেলে কাটাতে হয়েছে, সম্ভবত সেই জেলে বসে থেকেই তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করে ফেলেছিলেন। দেশ স্বাধীন হবার অল্পসময়ের মধ্যেই রচিত সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর সমগ্র জীবনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটে। সংবিধানে ৪টি মূলনীতি স্থান পায় যেমন- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ। সংবিধানের নীতিমালার আলোকেই ১৯৭২ সালের ২৬শে জুলাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এ দেশের কৃতি সন্তান, প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে ১৮জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা প্রশাসকদের নিয়ে কমিশনটি গঠিত হয়। এটি সঙ্গত কারণেই ‘খুদা শিক্ষা কমিশন’ নামে পরিচিতি লাভ করে। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা পুরোটাই প্রতিফলিত হয়েছে ‘খুদা শিক্ষা কমিশনে’। খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট এবং বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা অবিচ্ছিন্ন । বঙ্গবন্ধু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন একটি জাতির উন্নতির চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়তে হলেও শিক্ষা হচ্ছে প্রধান অবলম্বন। মেধা ও মননে আধুনিক এবং চিন্তা-চেতনায় প্রাগ্রসর একটি সুশিক্ষিত জাতিই একটি দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে।

পাকিস্তান সরকার দীর্ঘ ২৩ বছরের শাসনকালে শিক্ষার জন্য কোন নীতিমালা তৈরি করতে পারে নি। অথচ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দেশের শাসনভার হাতে নেয়ার মাত্র ৯ মাসের মধ্যে ‘খুদা শিক্ষা কমিশনে’র মাধ্যমে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত একটি শিক্ষানীতি জাতিকে উপহার দিতে সমর্থ হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর তারিখে ‘খুদা শিক্ষা কমিশনে’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। ভূমিকায় বলা হয়েছে বর্তমান শিক্ষায় নানাবিধ অভাব ও ত্রæটি বিচ্যুতি দূরীকরণ, শিক্ষার মাধ্যমে সুষ্ঠু জাতি গঠনের নির্দেশ দান এবং দেশকে আধুনিক জ্ঞান ও কর্মশক্তিতে বলীয়ান করার পথ নির্দেশের উদ্দেশেই সরকার এই কমিশন নিয়োগ করেন। ৩০শে মে, ১৯৭৪ তারিখে ৩৬টি অধ্যায়ে বিভক্ত ৪৩০ পৃষ্ঠার (মুদ্রিত) এ রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা পুরোটাই প্রতিফলিত হয়েছে কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে।

দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছেন শিক্ষাব্যবস্থা একটি জাতির আশা-আকাক্সক্ষা রূপায়ণের ও ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণের হাতিয়ার। দেশপ্রেম এবং সুনাগরিক তৈরির ক্ষেত্রে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশা প্রত্যেক নাগরিককে অবশ্যই তার নিজের দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসতে হবে। এই দেশপ্রেম বলতে কোন অস্পষ্ট ভাবাবেগপূর্ণ অনুভূতির কথা বোঝায় না। বাংলাদেশের আদর্শের যথার্থ উপলব্ধির কথাই বোঝায়। এর লক্ষ্য হচ্ছে জাতির ঐতিহ্যে গর্ববোধ করা, তার বর্তমান ভূমিকা সম্পর্কে উৎসাহী হওয়া এবং তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দৃঢ় আস্থা পোষণ করা। দেশপ্রেমের মূল অর্থ হচ্ছে প্রত্যেকটি নাগরিক জাতীয় সংহতিবোধে উদ্বুদ্ধ হবে এবং জনগণের সমষ্টিগত আশা-আকাক্সক্ষার সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠবে। সে অনুভব করবে যে, সে দেশের একজন, যেমন সে তার পরিবারের একজন। সে আরও অনুভব করবে যে, দেশের ভাগ্যে ভালোমন্দ যা কিছুই ঘটুক তা যেন তার নিজের ভাগ্যেই ঘটছে।

সুনাগরিক সৃষ্টিতে এবং সমাজের প্রগতিশীলতা বিকাশের ক্ষেত্রে শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্য রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক যেন জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষা ও ভাবধারার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয় এবং মাতৃভূমি ও কল্যাণ চিন্তায়-চেতনায় দেশপ্রেমিক সুনাগরিকরূপে গড়ে ওঠে। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু দেশের জন্য যে সংবিধান রচনা করেছিলেন সেখানে দেশপ্রেমিক এবং সুনাগরিক গড়বার লক্ষ্যেই সংবিধানের মূল লক্ষ্য স্থির করা হয়েছিল গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ। সংবিধানের যে চার মূল নীতির কথা বলা হচ্ছে এটাই আসলে বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শন। দেশ ভাবনা, মানব ভাবনা, শিক্ষা ভাবনাকে বঙ্গবন্ধু আলাদা করে দেখেন নি। বঙ্গবন্ধু আন্তরিকভাবে চেয়েছেন আমাদের শিক্ষার মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবোধ শিক্ষার্থীদের চিত্তে জাগ্রত ও বিকশিত করে তুলতে এবং তারা বাস্তব জীবনে যাতে এর সম্যক প্রতিফলন ঘটাতে পারে সে দিকে দৃষ্টি রাখতে।

বঙ্গবন্ধু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন শিক্ষার মূল লক্ষ্য হতে হবে ‘মানবতা বা মানব কল্যাণ’। জাতীয় কল্যাণের স্বার্থে শোষণহীন নতুন সমাজ সৃষ্টির মহৎ প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ বিশ্বের সকল সংগ্রামী মানুষের প্রতি বন্ধুত্ব ও একতার হস্ত প্রসারিত করতে হবে। মানুষে মানুষে মৈত্রী, সৌহার্দ্য, প্রীতি, মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মনোভাব সৃষ্টি করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু নৈতিক শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন জ্ঞান শুধু কর্মদক্ষতা ও কৌশল অর্জন নয়, শিক্ষার্থীর মনে মৌলিক ও নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে হবে। কর্মে ও চিন্তায়, বাক্যে ও ব্যবহারে যেন সে সদা সর্বদা সততার পথ অনুসরণ করে। চরিত্রবান, নির্লোভ ও পরপোকারী হয়ে ওঠে এবং সর্বপ্রকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত হয় সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে। বঙ্গবন্ধু মনে করতেন যুব মনে মূল্যবোধ সৃষ্টি ও তাদের চরিত্র গঠনের ব্যাপারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পাঠক্রমে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের পরিবেশে তার অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষকদের শিক্ষকতায় যাতে বহু প্রত্যাশিত উচ্চ নৈতিক মান সৃষ্টি হয় সে জন্য সত্যিকার পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও নিপুণ শিক্ষাদান পদ্ধতির সঙ্গে শিক্ষকদেরকে সততা, নিরপেক্ষতা, কঠোর পরিশ্রম এবং ছাত্রদের প্রতি প্রকৃত দরদও অবশ্যই আয়ত্ত করতে হবে। ছাত্র-শিক্ষক এবং কর্তৃপক্ষের মধ্যে পারস্পারিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঐক্যবোধ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার অগ্রগতির জন্য তাঁর বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার ব্যাপারে যে কল্পনা, উদ্যম ও সাহসিকতার প্রয়োজন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই সকল গুণাবলী উন্মেষের জন্য আমাদের অবশ্যই ব্রতী হতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শিক্ষাকে সবসময় সামাজিক রূপান্তরের হাতিয়াররূপে দেখতে চেয়েছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন দীর্ঘদিনের শোষণ জর্জরিত সমাজে দ্রæত সামাজিক রূপান্তর ও অগ্রগতির জন্য শিক্ষাকে বিশেষ হাতিয়াররূপে প্রয়োগ করতে হবে। প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক সমাজ সৃষ্টির স্বার্থে সকল নাগরিকের মধ্যে মেধা ও প্রবণতা অনুযায়ী শিক্ষা লাভের সুযোগ সুবিধার সমতাবিধান দ্বারা জাতীয় প্রতিভার সদ্ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যেকটি মানুষ যাতে স্ব স্ব প্রতিভা ও প্রবণতা অনুযায়ী সমাজজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের সকল ক্ষেত্রে সৃজনশীল ক্ষমতা নিয়ে অগ্রসর হতে পারে, সে জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে তার বাহন হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের প্রয়োজনীয় সকল প্রকার দক্ষতা সৃষ্টিরও বন্দোবস্ত করতে হবে। নানাবিধ কুসংস্কার, অজ্ঞতা, অনাচার ও দুর্নীতি অবসানের অনুকূল বিজ্ঞানমুখী, আদর্শবাদী ও সামাজিক উন্নয়নের পরিপোষক মনোভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে। এজন্য দেশের প্রতিটি নাগরিকের ন্যূনতম মান পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বঙ্গবন্ধু তাঁর বিভিন্ন ভাষণে প্রয়োগমুখী অর্থনৈতিক অগ্রগতির অনুকূল শিক্ষার কথা বলেছেন। দেশের সামগ্রিক কল্যাণ ও উন্নতির উদ্দেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধির বিশাল দায়িত্ব শিক্ষা ব্যবস্থার। বঙ্গবন্ধু যখন দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন তখন বাংলাদেশ বিধ্বস্ত একটি দরিদ্র দেশ। আমাদের জীবনযাত্রার মান পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত জাতির তুলনায় অনেক নি¤œস্তরে। জাতি হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা একটি সামাজিক পুঁজি বিশেষ। জনসাধারণের শিক্ষা লাভের সঙ্গে সঙ্গে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচিত হয়। প্রধানত একটি দেশের সকল স্তরের মানুষকে শিক্ষিত করে তোলার আয়োজনের ফলেই জাতীয় সম্পদের ব্যাপক অগ্রগতি সম্ভব হয়। সে অগ্রগতিকে দ্রæততর করে তোলার জন্য শিক্ষাকে প্রয়োগমুখী করে তোলা প্রয়োজন। আমাদের বিপুল জনশক্তি কর্মে নিয়োজিত হলে এবং আধুনিক সমাজের উপযোগী বিভিন্নমুখী দক্ষতা অর্জন করলে অনিবার্যভাবে জাতীয় সম্পদ সমৃদ্ধ হবে।

কিন্তু জনশক্তিকে কর্মে নিয়োগের সেই শিক্ষা এবং উপযুক্ত দক্ষতা দানের সেই ব্যবস্থা থাকতে হবে সামগ্রিক শিক্ষা পরিকল্পনায়। কৃষির ক্ষেত্রে প্রাচীন পদ্ধতির পরিবর্তন সাধন করে আধুনিক বিজ্ঞান পদ্ধতির প্রবর্তন করতে হলে, কৃষি ও শিল্পের ঘনিষ্ঠ সংযোগ গড়ে তুলতে হলে, শিক্ষাক্ষেত্রে নতুনতর ও স্বার্থকতর উদ্যোগ গ্রহণ সম্ভব করে তুলতে হলে কৃষি, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, কারিগরি ও বাণিজ্য বিষয়ক প্রশিক্ষণকে ব্যাপক ও অর্থপূর্ণ করে তুলতে হবে। এইসব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব গ্রহণে উপযোগী উচ্চমানের যোগ্যতা সম্পন্ন এবং স্থানীয় সম্পদ কাজে লাগানোর দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ বিশেষজ্ঞ গড়ে তুলতে হবে।

জাতি হিসেবে আমাদের প্রধান দুর্বলতা হচ্ছে হাতের কাজের প্রতি অনীহা এবং কায়িক শ্রমের মর্যাদা দানে কুণ্ঠাবোধ। বঙ্গবন্ধু মনে করতেন এই মানসিকতা বিদ্যমান থাকলে দেশের গঠনমূলক উন্নয়নকর্ম মন্থরগতি হতে বাধ্য। এই অবস্থা থেকে মুক্তি লাভের জন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় হাতের কাজের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

বঙ্গবন্ধু সবসময় বলতেন কুশলী জনসম্পদ সৃষ্টির জন্য যেমন একদিকে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োগমুখীতার মাধ্যমে মানসিক শ্রমের সাথে উৎপাদনমুখী কায়িক শ্রমের সমন্বয় সাধন করতে হবে, তেমনি অন্য দিকে কৃষি, বিজ্ঞান, কলা, শিল্প, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, বাণিজ্য, শিক্ষক-শিক্ষণ প্রভৃতি বহুমুখী শিক্ষাধারা প্রবর্তন করতে হবে। যেসব বয়স্ক কর্মজীবী ইতোপূর্বে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পান নি, তাঁদের শিক্ষার মাধ্যমে শ্রম, দক্ষতা ও মানসিক গুণাবলী উন্নয়নের সুযোগ দিতে হবে।

পাকিস্তান আমলে শিক্ষার ক্ষেত্রে মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং মৌলিক চিন্তার অবকাশ খুব কমই ছিল। সে অবস্থার দ্রæত অবসান চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। নতুন গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাধীন চিন্তা, সৃজনশীলতা, সাংগঠনিক ক্ষমতা ও নেতৃত্বের গুণাবলী বিকাশের উপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থায় শুধু তথ্য আহরণ নয় উপলব্ধি, বিশ্লেষণ, অনুসন্ধিৎসা, গবেষণা, স্বাধীনভাবে সত্যানুসন্ধান প্রভৃতি গুণাবলী বিকাশের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এজন্য তারুণ্যের সৃজনশীলতা ও কর্মশক্তির যথাযথ মর্যাদা দান এবং সামগ্রিক ও শিক্ষাদান পদ্ধতির গণতান্ত্রিক রূপায়ণের প্রয়োজনীয়তকে অপরিহার্য হিসেবে গণ্য করেছেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু শিক্ষার কোন স্তরকেই বিচ্ছিন্নভাবে দেখবার পক্ষপাতি ছিলেন না। তিনি শিক্ষার বিষয়টিকে সামগ্রিকভাবে দেখেছেন, কখনও খণ্ডিতভাবে বিবেচনা করেন নি। তিনি প্রাইমারি থেকে উচ্চশিক্ষা সর্বক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন। শিক্ষার কোন স্তরকেই তিনি ছোট করে দেখেন নি। প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা এমনকি টোল-মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়েও বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব কিছু ভাবনা ছিলো।

প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা
দেশের জনগণকে জাতীয় কর্মে ও উন্নয়নে গঠনমূলক অংশগ্রহণের জন্য শিক্ষিত করে তুলতে হলে বঙ্গবন্ধু একটি সার্বজনীন শিক্ষা পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। তিনি মনে করতেন পাঁচ বছরী মেয়াদের প্রাইমারি শিক্ষা দায়িত্বশীল নাগরিক ও উন্নত ব্যক্তি গঠনের জন্য যথাপযুক্ত নয়। তাছাড়া পাঁচ বছর সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও তত্ত¡ সম্পর্কে বালক-বালীকাদের মনে ধারণা ও বোধশক্তি জাগ্রত করার এবং অর্থকরী বিদ্যার প্রাথমিক বিষয়গুলি তাদের শিক্ষা দেবার মতো সময় পাওয়া যায় না। আট বছরের কম মেয়াদী স্কুল শিক্ষায় এসব উদ্দেশ্য সফল করা সম্ভব নয়। সুনাগরিকত্ব অর্জনের জন্য এই আট বছরের শিক্ষা অত্যাবশ্যক। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন দুনিয়ার জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে প্রসার হচ্ছে, তাতে শিক্ষায়তনে কমপক্ষে আট বছর মেয়াদের একটি জীবন্ত ও বাস্তব পরিবেশভিত্তিক সুপরিকল্পিত শিক্ষাক্রম চালু না করতে পারলে সে শিক্ষাকে দেশের অগ্রগতি ও সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়াররূপে কাজে লাগানো যাবে না। পৃথিবীর উন্নত দেশসমূহে ৮ থেকে ১২ বছরের বাধ্যতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনাকে কুদরাত-ই-খুদা কমিশনে বাস্তবরূপ দেয়ার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। উক্ত কমিশনে প্রস্তাব করা হয়েছিল- প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে প্রাথমিক শিক্ষারূপে পরিগণিত করে তাকে সার্বজনীন করতে হবে এবং প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত যে অবৈতনিক শিক্ষা চালু রয়েছে, তা ১৯৮০ সালের মধ্যে বাধ্যতামূলক করতে হবে। এরপর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা ১৯৮৩ সালের মধ্যে প্রবর্তন করতে হবে। বঙ্গবন্ধু প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

সম্প্রতি Secret Document of Intelligence of Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সে গ্রন্থে উল্লেখ আছে, ৪৮ সালের ১লা জুন নরসিংদীতে এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘বাংলাদেশের মানুষ প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।’ এ থেকে প্রমাণিত হয় প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাপারে তিনি অনেক আগে থেকেই চিন্তা-ভাবনা করেছেন। তিনি মনে করতেন গরীব মানুষ শিক্ষার আলো পেলে তারা জেগে উঠবে এবং দেশ উন্নত হবে। প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে তিনি বিভিন্ন স্থানে বলেছেন ‘বাংলাদেশে ৯-১০ ধরনের প্রাইমারি শিক্ষা আছে। এত ধরনের তো থাকতে পারে না। এটা এক বা দুই ধরনের হওয়া উচিত।’

মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-ভাবনা
আমরা জানি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা কাঠামোর দ্বিতীয় স্তর। মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-ভাবনা প্রতিফলিত হয়েছে কুদরাত-ই-খুদা কমিশন রিপোর্টে। কমিটির রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ আছে-
১. নবম থেকে একাদশ/দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত শিক্ষা হবে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা। নবম/একাদশ/দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষাক্রমের যোগসূত্র বজায় রাখা ও মাধ্যমিক স্তুরের শিক্ষায় সমতা নিশ্চিত করার জন্য একই শিক্ষায় এনে এই তিন/চারটি শ্রেণির শিক্ষা দানের ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়।

২. মাধ্যমিক স্তুরের শিক্ষা অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য প্রান্তিক শিক্ষা এবং স্বল্প সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চ শিক্ষার প্রস্তুতি পর্ব হিসেবে বিবেচিত হবে। এ উদ্দেশে নবম শ্রেণি হতে শিক্ষা মূলত দ্বিধা বিভক্ত হবে- বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষা। বৃত্তিমূলক শিক্ষা মোটামুটি তিন বছর মেয়াদী (নবম, দশম ও একাদশ শ্রেণি) হবে। সাধারণ শিক্ষা চার বছর মেয়াদী (নবম, দশম, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি) থাকবে। এই বিশেষ প্রশিক্ষণ দেশের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের চাহিদা এবং কর্মপ্রদান সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনানুযায়ী নির্ণীত হবে। বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রাপ্ত সকলের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করা দুরূহ কাজ। সেক্ষেত্রে এদের অনেকেই নিজের উদ্যোগে স্বনির্ভর হয়ে কর্মসংস্থান করে নেবে।

প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের রূপরেখাও বঙ্গবন্ধু দিয়ে রেখেছিলেন যেমন (ক) একাদশ শ্রেণি মাধ্যমিক স্কুল সম্পর্কে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকালে দেশের কিছু সংখ্যক শিক্ষায়তনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলুক। পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক প্রমাণিত হলে দ্বিতীয় জাতীয় পঞ্চবার্ষিকীর পরিকল্পনায় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তার ক্রম রূপায়ণের কার্যক্রম স্থির করা যাবে, এ ক্ষেত্রে প্রথম ডিগ্রি কোর্সের মেয়াদ হবে তিন বছর এবং মাস্টার্স ডিগ্রি কোর্সের মেয়াদ হবে দু’বছর।

মাদ্রাসা শিক্ষা ও টোল শিক্ষা বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা
বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষাকে আমুল সংস্কারের মাধ্যমে যুগোপযোগী করে তোলা হোক। দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ন্যায় মাদ্রাসাগুলোতে একই প্রাথমিক শিক্ষাক্রম প্রবর্তীত হবে এবং সর্বস্তরে বাংলাকেই শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ধর্ম শিক্ষা আবশ্যিক পাঠ্য বিষয় হিসেবে পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

আট বছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষায় মাদ্রাসার ছাত্ররা তিন বছর মেয়াদী বৃত্তিমূলক ধর্ম শিক্ষা কোর্স পড়তে পারবে। এ কোর্সের নবম ও দশম শ্রেণিতে তাদেরকে বাংলা, গণিত, সাধারণ বিজ্ঞান ও ইংরেজি এই চারটি আবশ্যিক পাঠ্য বিষয় অধ্যয়ন করতে হবে। এই শিক্ষার পরবর্তী স্তরবিন্যাস হবে তিন বছরের ডিগ্রি কোর্স এবং দু’বছরের পোস্ট গ্রাজুয়েট কোর্স।

প্রস্তাবিত আট শ্রেণির প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার সাথে সঙ্গতি রেখে হিন্দু ও বৌদ্ধ টোল শিক্ষার সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল। টোল সমূহের আদ্য কোর্স সপ্তম শ্রেণি থেকে শুরু না করে নবম শ্রেণি থেকে শুরু করতে হবে এবং তার মেয়াদ হবে তিন বছর। এ কোর্সে নবম ও দশম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীরা অন্যান্যদের মতই ধর্ম শিক্ষার সঙ্গে আবশ্যিক চারটি বিষয় বাংলা, গণিত, সাধারণ বিজ্ঞান ও ইংরেজি পাঠ করবে।

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা
আধুনিক সমাজের অগ্রগতি উচ্চশিক্ষার প্রকৃতি ও মানের উপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। কারণ উচ্চশিক্ষার ভূমিকা হচ্ছে- ক. বিভিন্ন উচ্চতর কাজের জন্য সুনিপুণ জ্ঞান এবং দক্ষ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি তৈরি করা; খ. এমন শিক্ষিতগোষ্ঠী সৃষ্টি করা যাদের কর্মানুরাগ, জ্ঞানস্পৃহা, চিন্তার স্বাধীনতা, ন্যায়বোধ ও মানবিক মূল্যবোধ সম্যক বিকশিত হয়েছে; গ. গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞানের নবদিগন্ত উন্মোচন করা এবং ঘ. সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাবলীর বিশ্লেষণ ও সমাধানের পন্থা নির্দেশ করা।

বঙ্গবন্ধু গঠিত কুদরাত-ই-খুদা কমিশন বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারে আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার বর্তমান পদ্ধতি নানা দিক দিয়ে ত্রুটিপূর্ণ। সমাজের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগসূত্রহীন এ শিক্ষা সমাজের চাহিদা মেটাতে অক্ষম। আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা সরকারি চাকরি লাভের ছাড়পত্র মাত্র। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা না করেই নতুন নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং চালু কলেজগুলোর সম্প্রসারণ করা হয়েছে। অপরিকল্পিত এরূপ সম্প্রসারণ কাজের ফল হয়েছে শিক্ষার উন্নতমান অর্জনের পরিবর্তে শিক্ষার মানের গুরুতর অবনতি। জাতির ভাগ্য ও জাতির অর্থনীতির সঙ্গে উচ্চশিক্ষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় শিক্ষিত জনসম্পদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে অবশ্যই সুসমন্বিত করতে হবে। আমাদের জীবনে অর্থনীতির তাৎপর্য বিপুল। শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জাতির অন্যতম লক্ষ্য। সুতরাং সমাজের সকল স্তরের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত রাখতে হবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যাতে সুনির্বাচন হয় তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।

পাকিস্তান আমলে কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেভাবে পড়ানো হতো, বঙ্গবন্ধুর গঠিত কুদরাত-ই-খুদা রিপোর্টে বেশ পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। পাস কোর্স অনার্স কোর্সে এবং মাস্টার্স কোর্সের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হয়। যে সমস্ত কলেজে অনার্স কোর্স রাখা হয়, সেগুলো ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। পাস কোর্সের কলেজগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আধুনিক উচ্চতর বিজ্ঞান শিক্ষা দানের জন্য খুলনায় একটি বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের গুরুত্ব কেউ অস্বীকার করতে পারে না। প্রাথমিক স্তর থেকে শিক্ষার উচ্চস্তর পর্যন্ত বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয়। কৃষি, চিকিৎসা, বাণিজ্য, আইন, ললিত কলা অর্থাৎ শিক্ষার যাবতীয় শাখা নিয়ে কুদরাত-ই-খুদা কশিমন অত্যন্ত গঠনমূলক সুপারিশ প্রদান করে। সে সুপারিশসমূহ তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে পাকিস্তানি আমলের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর ব্যবস্থা করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি মনে করতেন বিশ্ববিদ্যালয় হতে হবে স্বায়ত্বশাসিত এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বিশ্ববিদ্যালয় হবে প্রকৃত অর্থেই মুক্তবুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্র। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিশ্ববিদ্যালয় গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, আর তাই তিনি সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত দেশের চারটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় যথা- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালনার জন্য Presidential order 1973 জারি করেন যা পরবর্তীকালে সংসদে পাস হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ৪টি এখনও ৭৩ সালের অধ্যাদেশ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর উচ্চ শিক্ষা ভাবনা ৭৩ সালের অধ্যাদেশে পরিপূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে দেশে উচ্চশিক্ষার প্রসারে স্বায়ত্বশাসন ও মুক্তচিন্তা বিকাশের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার চাহিদা নিরূপণ, উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা প্রণয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণার উৎকর্ষ সাধন এবং বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের আর্থিক চাহিদা নির্ধারণ।

স্বাধীনতার পর সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ অত্যন্ত উদারভাবে শিক্ষার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। বঙ্গবন্ধু সে সব দেশের সাথে প্রটোকল সই করেন। দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা তখন বৃত্তি নিয়ে পূর্ব ইউরোপের সে সব দেশে বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়তে যায়। ১৯৭২ সালে শুরু হয়ে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এই চার বছরে শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নেই পড়তে যায় এক হাজারের বেশি ছেলে-মেয়ে। আজকের বাংলাদেশের বহু প্রথিতযশা শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, গবেষক সেদিনের বঙ্গবন্ধুর সেই সুদূর প্রসারী ভাবনার সোনালি ফসল। সরকারি চাকরি, শিক্ষা প্রশাসন, রাজনীতি এমনকি কূটনীতিতেও তাঁদের অনেকেই মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন।

বিদেশে পড়াশুনা করে উন্নত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বাংলাদেশের ছেলে-মেয়েরা বিদেশে থেকে যাবে, এমনটি বঙ্গবন্ধু চাইতেন না। তিনি চাইতেন সবাই দেশে ফিরে আসবে, দেশের জন্য কাজ করবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় বঙ্গবন্ধুর শাসনকালে প্রতিবছর কোন নির্দিষ্ট সময়ে বৃত্তি নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা যখন বিদেশে যেতো, বঙ্গবন্ধু তখন তাদেরকে ডেকে কথা বলতেন এবং উপদেশ দিতেন। তিনি বলতেন ‘তোরা সোনার ছেলে হয়ে দেশে ফিরবি, সোনার বাংলা গড়বি’।

উচ্চশিক্ষার মান খারাপ হোক, বঙ্গবন্ধু তা চান নি। উদাহরণ হিসেবে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করেছিলেন দেশের প্রখ্যাত গবেষক, কথা সাহিত্যিক জনাব আবুল ফজল মহোদয়কে। তাঁর সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোর বি.এ পরীক্ষার ফলাফল ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। সম্ভবত পাশের হার ছিল ৩%। এ জন্য উপাচার্য মহোদয়ের বিরুদ্ধে নানারকম আন্দোলন শুরু হয়ে যায় এবং শেষপর্যন্ত উপাচার্যের অপসারণ দাবি করা হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সে দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। এ থেকে বুঝা যায় একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান অপর দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য়ের মান মর্যাদাকে সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু কতটা সচেষ্ট ছিলেন।

বৃত্তিমূলক শিক্ষা
বঙ্গবন্ধু মনে করতেন বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে হাতে-কলমে শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার প্রসার ও উৎকর্ষ সাধন ব্যতিত কোন জাতি কৃষি শিল্পকারখানা এবং অন্যান্য উৎপাদন ও কারিগরি ক্ষেত্রে উন্নতি লাভ করতে পারে না। বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিস্তার লাভের দ্বারা জনসাধারণের অর্থনৈতিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি করা সম্ভব। বৃত্তিমূলক শিক্ষা তুলনামূলকভাবে অল্পসময় সাপেক্ষ এবং সে জন্য অল্পকালের ভেতরেই এর সুফল লাভ করা যায়।

কারিগরি শিক্ষাকে সুসংহত করার জন্য দেশের সমস্ত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীনে আনতে হবে। বৃত্তিমূলক শিক্ষাক্রম থেকে উত্তীর্ণ মেধাবী শিক্ষার্থীদেরকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তির সুযোগ দিতে হবে। বঙ্গবন্ধু বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদেরকে সমবায়ের ভিত্তিতে ছোট ছোট কারখানা/খামার ইত্যাদি গড়ে তুলতে উৎসাহিত করে তাদের কর্মসংস্থান সমস্যার সমাধানের কথা ভেবেছিলেন। কৃষির উন্নতির জন্য বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা স্তরের কৃষি কারিগরি কোর্স চালু করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

শিক্ষকদের মর্যাদা ও বেতন
শিক্ষাদান একটি সৃজনশীল কর্ম এবং এই শিক্ষাদানের মানের উপরই নির্ভর করে আগামী দিনের শিক্ষিত জনসম্পদের গুণাগুণ। এ জন্য সমাজের সর্বাপেক্ষা প্রতিভাশালী এবং সৃজনশীল ব্যক্তিগণকে শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করা প্রয়োজন। শিক্ষকতাকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে উপযুক্ত মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে উন্নয়ন প্রচেষ্টা সফল হবে না।

স্বীয় যোগ্যতা অনুযায়ী শিক্ষকের বেতন ও সামাজিক মর্যাদা লাভ করা উচিৎ। শিক্ষকদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিকল্পে বঙ্গবন্ধু সরকার অনেক মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন শিক্ষকেরা যাতে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আত্মসম্ভ্রম রক্ষার উপযোগী একটি নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে চলতে পারেন সে জন্য তাদেরকে এমন বেতন দিতে হবে যাতে তাঁরা মানসম্মান নিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে চলতে পারেন।

পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি
দেশে শিক্ষার মান এবং পরীক্ষা পদ্ধতি একে অপরের পরিপূরক। শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত উন্নতির মান বা মূল্য নিরূপণ যে কোন শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছিন্ন অংশ। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের জন্য পূর্ব নির্ধারিত উদ্দেশ্যাবলীর সঙ্গে ঐ সমস্ত স্তরে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর পাঠ ব্যবস্থা এবং তার ফলাফল কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে, উন্নতমানের পরীক্ষা ব্যবস্থা ও পদ্ধতির মাধ্যমে তা বহুলাংশে নিরূপণ করা সম্ভব। বঙ্গবন্ধু সরকার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চস্তর পর্যন্ত পরীক্ষা গ্রহণের যে রূপরেখা তৈরি করেছিলেন, সে সম্পর্কে দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে।

প্রাথমিক স্তরে প্রথম শ্রেণি হতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন বিদ্যালয়ে তার বছরব্যাপী লেখাপড়া, শ্রেণি কক্ষে কর্মদক্ষতা এবং আচার-আচরণের উপর নির্ভর করবে। এ পর্যায়ে শিক্ষকগণ স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ক্লাশ পরীক্ষার ব্যবস্থা করবেন। বছরের শেষে বাৎসরিক পরীক্ষা ছাড়াও প্রতি বছর অন্তত তিনটি পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। মূল্যায়ণের বিভিন্ন ফল সঞ্চয় রেকর্ডে লিপিবদ্ধ করতে হবে। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির শেষে বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন জেলা ভিত্তিক হতে হবে, তবে পরীক্ষা হবে স্কুল ভিত্তিক। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির শেষে বর্তমান বৃত্তি পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকবে। প্রত্যেক স্কুল থেকে অন্তত শতকরা ১০ ভাগ শিক্ষার্থী যাতে এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমিক স্তরেও প্রাথমিক স্তরের ন্যায় অন্তত পরীক্ষার উপর গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। বাড়ির কাজ, টিউটোরিয়াল, শ্রেণিকক্ষে সাময়িক পরীক্ষা, প্রাকটিক্যাল ও প্রয়োগমূলক ইত্যাদি কাজ ছাড়াও এ স্তরে প্রতিবছর অন্তত চারটি অন্তঃপরীক্ষা গ্রহণ করতে হবে। অন্তঃপরীক্ষার ফল নোটিশ বোর্ডে প্রকাশ এবং প্রোগ্রামে রিপোর্ট লিপিবদ্ধ করতে হবে।

দশম শ্রেণির শেষে বর্তমান প্রচলিত এসএসসি পরীক্ষা এবং দ্বাদশ শ্রেণির শেষে এইচএসসি পরীক্ষা সংস্কার সাপেক্ষে চালু থাকবে। এ সকল পরীক্ষাতে প্রত্যেক বিষয়ে ১০% নম্বর মৌখিক পরীক্ষার জন্য সংরক্ষিত থাকবে। সার্টিফিকেটে প্রত্যেক বিষয়ের অন্তঃপরীক্ষা ও বহিঃপরীক্ষার নম্বর প্রদর্শিত হবে। মাধ্যমিক স্তরের ন্যায় প্রথম ডিগ্রি পর্যায়ের পাস কোর্সে ও অন্তঃপরীক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। পাস ডিগ্রি পরীক্ষায় মৌখিক পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে এবং এ জন্য প্রতি বিষয়ের পূর্ণ নম্বরের শতকরা দশভাগ সংরক্ষিত হবে।

অনার্স ডিগ্রি এবং মাস্টার্স ডিগ্রি পরীক্ষার ফলাফল অন্তঃপরীক্ষা ও বহিঃপরীক্ষার সমন্বিত ফলাফলের উপর নির্ভরশীল হবে। শিক্ষকগণ টিউটোরিয়াল ক্লাশে, প্রায়োগিক এবং গবেষণামূলক কাজ ইত্যাদির জন্য নম্বর প্রদান করা ছাড়াও প্রতিবছর তিনটি আনুষ্ঠানিক অন্তঃপরীক্ষা গ্রহণ করে নম্বর প্রদান করবেন। মানবিক, বাণিজ্যিক এবং সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়সমূহের প্রত্যেক পেপারে শতকরা ২৫ নম্বর শিক্ষকের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ণের জন্য সংরক্ষিত হবে। আর বিজ্ঞানের বিষয়সমূহের প্রত্যেক পেপারে শতকরা ১৫ নম্বর শিক্ষকের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ণের জন্য বরাদ্দ থাকবে এবং প্রত্যেক পেপারে শতকরা ২৫ নম্বর প্র্যাকটিক্যাল কাজের জন্য সংরক্ষিত করা হবে। অনার্স ডিগ্রি ও মাস্টার্স ডিগ্রির শিক্ষার্থীগণকে একটি মৌখিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে এবং তার জন্য পূর্ণ নম্বরের শতকরা ১০ নম্বর বরাদ্দ রাখতে হবে। প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার নম্বর হবে শতকরা ৬০ বা তার বেশি, দ্বিতীয় শ্রেণির নম্বর হতে হবে শতকরা ৬০ থেকে কম অথচ শতকরা ৫০ নম্বর অথবা তার অধিক। শতকরা ৫০ নম্বরের কম অথচ শতকরা ৪০ বা তার অধিক নম্বরপ্রাপ্ত পরীক্ষার্থীরা শুধু ‘পাস’ বলে পরিগণিত হবে। শতকরা ৪০ এর নীচে যারা নম্বর পাবে, তারা ‘অনুত্তীর্ণ’ বলে পরিগণিত হবে। এভাবে শিক্ষার প্রতিটি শাখা এবং স্তরে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা গ্রহণ এবং ফলাফল প্রদানের নীতিমালা তৈরি করে দেয় বঙ্গবন্ধুর সরকার।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গ্রন্থাগার
বঙ্গবন্ধু মনে করতেন গ্রন্থাগার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হৃৎপিণ্ড স্বরূপ। যে কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কি ধরনের গ্রন্থাগার থাকবে, সে সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু সরকার অত্যন্ত উন্নতমানের রূপরেখা দিয়ে রেখেছিলো। বইয়ের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি, বইয়ের প্রতি মর্যাদাবোধ জাগানো এবং পাঠাভ্যাসের বীজ বপনের জন্য ছোটদের হাতে বই তুলে দেয়ার দায়িত্ব প্রথমে অভিভাবকের এবং পরে স্কুলের ওপর বর্তায়। আমাদের দেশের অধিকাংশ অভিভাবক এ ব্যাপারে উদাসীন। বঙ্গবন্ধু গঠিত শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছিল-‘অবিলম্বে গণ-গ্রন্থাগারের মাধ্যমে প্রাথমিক স্কুলে বই পরিবেশনের যথাসম্ভব ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্য দেশের প্রত্যেকটি থানা সদরে একটি গণ-গ্রন্থাগার স্থাপন করতে হবে। প্রাথমিক স্কুলে বই পরিবেশন এ গ্রন্থাগারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হবে। প্রত্যেক ইউনিয়নের এক বা একাধিক নির্বাচিত প্রাথমিক স্কুলকে ভ্রাম্যমান বইয়ের শিবিররূপে ব্যবহার করতে হবে। থানা গ্রন্থাগার থেকে বই প্রেরণ করা হবে এ শিবিরে। এখান থেকে এলাকাভুক্ত প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকগণ নিজেদের স্কুলের চাহিদা অনুযায়ী বই সংগ্রহ করবেন এবং ব্যবহারান্তে এখানেই ফেরত দেবেন। অপেক্ষাকৃত নিকটবর্তী প্রাথমিক স্কুলে থানা গ্রন্থাগার থেকে সরাসরি বই পরিবেশন চলবে।

থানা গ্রন্থাগার স্থাপনের ব্যয়ভার বহন করবে জাতীয় সরকার। আমাদের জাতীয় লক্ষ্য হতে হবে দেশের প্রত্যেকটি প্রাথমিক স্কুলে গ্রন্থাগার স্থাপন। প্রাথমিক স্কুলের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষে উন্মুক্ত সেলফে শিক্ষার্থীদের জন্য বই পুস্তক রাখার ব্যবস্থা বাঞ্ছনীয়। এ সমস্ত শ্রেণির শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীর কাছে বই-পুস্তক পরিবেশন করবেন। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য যে পাঠাগারের রূপকল্প বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন, আজও তা পূরণ হয় নি।’

মাধ্যমিক স্কুলের গ্রন্থাগার
বঙ্গবন্ধু গঠিত শিক্ষা কমিশনের পক্ষ থেকে যে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, সে পরামর্শ প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুরই মনের কথা। রিপোর্টে বলা হয়েছে-‘মাধ্যমিক স্কুলের গ্রন্থাগারগুলো নানা কারণে অচল হয়ে পড়েছে। মাধ্যমিক স্কুলের গ্রন্থাগারে বহু পুরাতন জরাজীর্ণ, কীটদৃষ্ট অকেজো বইয়ের গাদায় পড়ে নতুন বইগুলোও নষ্ট হয়ে যায়। স্থান বা আলমারীর অভাবে অকেজো বইগুলো আলাদা করা সম্ভব হয় না। কমিশন মনে করে মাধ্যমিক স্কুলের গ্রন্থাগার মামুলি উন্নয়ন বা জোড়াতালির ব্যাপার নয়, একে সম্পূর্ণরূপে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।’

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার
বঙ্গবন্ধু গঠিত শিক্ষা কমিশনের মতে কলেজ গ্রন্থাগারগুলোর দৈন্য মূলত মাধ্যমিক স্কুল গ্রন্থাগারের দৈন্যের মতোই। এখানেও স্থানাভাব সর্বত্র প্রকট। কলেজ গ্রন্থাগারের উন্নয়নের নি¤œতম মান সম্বন্ধে কমিশনের সুপারিশ ছিল- ‘কলেজ গ্রন্থাগারের জন্য আলাদা ভবন নির্মাণ অপরিহার্য। কলেজ গ্রন্থাগার সকাল ৮টা থেকে রাত্রি ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে’।

বঙ্গবন্ধু গঠিত শিক্ষা কমিশন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গ্রন্থাগার নিয়েও তাঁদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। কমিশন অভিমত ব্যক্ত করেছিল- ‘বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের গ্রন্থাগার উন্নয়নের ব্যাপারে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।’ কমিশন বলেছিল- ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বই, সাময়িকীর বরাদ্দ বাড়াতে হবে, গবেষণা কর্মকে জোরদার করবার জন্য রেফারেন্স বিভাগকে শক্তিশালী করতে হবে এবং বিদেশী বই, ফিল্ম ইত্যাদি আমদানির জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা ও সরকারি আনুকূল্যের প্রয়োজন হবে।’ ভালো গ্রন্থাগার করতে হলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উন্নতমানের গ্রন্থাগারিক প্রয়োজন। চাহিদা পূরণের পক্ষে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। কমিশনের সুপারিশ ছিল- ‘যোগ্যতাসম্পন্ন গ্রন্থাগারিকদেরকে পদমর্যাদা ও পারিশ্রমিকের ব্যাপারে শিক্ষকদের পর্যায়ভুক্ত করা উচিৎ।’

শিক্ষা সৌকর্যের গরজে শিক্ষাঙ্গনে মিউজিয়াম প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। জাতীয় জীবনের ও ঐতিহ্যের বিবর্তনের রূপরেখা মিউজিয়ামে যথাসম্ভব বিবৃত হয়। তাই শিক্ষাঙ্গনে মিউজিয়ামের সাহায্যে শিক্ষাদান পর্ব অধিকতর প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধার সমতাবিধান
বঙ্গবন্ধু গঠিত শিক্ষা কমিশন থেকে বলা হয়েছিলো দেশে শিক্ষা বিস্তারের বৃহত্তর স্বার্থে শিক্ষা ক্ষেত্রে শ্রেণি বৈষম্য দূর করে সুযোগ-সুবিধার সমতা বিধান করতে হবে। পিতা-মাতার আর্থিক অবস্থা, বাসস্থান, ধর্ম প্রভৃতি কারণে যেন কারো প্রতিভার যথাযথ বিকাশ ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ ব্যাহত না হয় তা শিক্ষা ব্যবস্থায় নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধার সমতাবিধানের লক্ষ্য অর্জনে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিভিন্ন কার্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হলে বিদ্যালয়ে ছেলে- মেয়েদের প্রেরণের জন্য মাতা-পিতার যে অতিরিক্ত ব্যয় হবে, তা লাঘব করার ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য স্বল্পমূল্যে পাঠ্যপুস্তক, অতি প্রয়াজনীয় শিক্ষা উপকরণ ও স্কুল ইউনিফর্ম ইত্যাদি সরবরাহ করতে হবে। তা ছাড়া স্বল্পমূল্যে দুপুরে টিফিনের ব্যবস্থা করলে তাতে একটা ভালো ফল পাওয়া যাবে।

ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিভা, প্রবণতা ও আগ্রহের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহারের জন্য মাধ্যমিক স্তর থেকে বহুমুখী শিক্ষাক্রমের ব্যবস্থা থাকবে। তাই মাধ্যমিকে বিভিন্ন বৃত্তিমূলক এবং এ স্তর থেকে বহুমুখী শিক্ষাক্রমের ব্যবস্থা করতে হবে। উচ্চতর শিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ফলাফলের সঙ্গে উৎপাদনী শ্রম-অভিজ্ঞতা ও সমাজসেবার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

যাদের মেধা ও প্রতিভা উচ্চমানের তাদের জন্য উপযুক্ত উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ উদ্দেশে সরকারকে মাধ্যমিক স্তর থেকে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ব্যাপকহারে বৃত্তি দানের ব্যবস্থা করতে হবে, গ্রামাঞ্চলে নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান-সন্ততি যাতে উচ্চতর বা পেশাগত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয় সে জন্য মেধাবী গরীব শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ছাত্রাবাসের সম্পূর্ণ ব্যয় রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ ও রাষ্ট্রীয়করণের মাধ্যমে সকল শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষা উপকরণ এবং শিক্ষাদানের মানের যে বিশাল বৈষম্য বিদ্যমান, তা দূর করার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যতদিন সম্পূর্ণ জাতীয়করণ ও রাষ্ট্রায়ত্তকরণ সম্ভব না হয়, ততদিন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মানের উন্নয়নের জন্য ব্যাপক রাষ্ট্রীয় সাহায্যের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

ভৌগোলিক অবস্থান ও জনসংখ্যার সাথে সঙ্গতি রেখে এবং জাতীয় প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বিশেষত মেয়েদের মধ্যে দ্রুতহারে শিক্ষা বিস্তার অতীব প্রয়োজন সমাজের কল্যাণের স্বার্থে। বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে দেশের সর্বস্তরে সমমানের শিক্ষা প্রবর্তনের জন্য যথাযথ অগ্রাধিকার নির্ণয় করে পর্যায়ক্রমে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় যাতে ১৯৮৫ সালের মধ্যে দেশে উচ্চতম স্তর পর্যন্ত সমমানের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর সরকার বয়স্ক শিক্ষা ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেন, নারী শিক্ষা, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটির মধ্যে কোনরকম সমন্বয় ছিল না। ছুটির ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধন করা হয়।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ
বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন জাতীয় জীবনে উপযুক্ত শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত উৎকর্ষ শিক্ষকের সুষ্ঠু পেশাগত শিক্ষার উপর নির্ভরশীল। উন্নত রাষ্ট্রসমূহে শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য শিক্ষক-শিক্ষণের যে সকল আধুনিক রীতি ও পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়েছে, সেগুলোকে প্রয়োজনমত প্রয়োগ করে আমাদের দেশের উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা বঙ্গবন্ধু প্রায়ই বলতেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে শিক্ষক-শিক্ষণের যাবতীয় বিষয়ে পরামর্শ দেবার জন্য তিনি একটি জাতীয় শিক্ষা উপদেষ্টা কাউন্সিল গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এ থেকেই উপলব্ধি করা যায় শিক্ষক-শিক্ষণের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু কতটা সচেতন ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর গণমুখী শিক্ষাভাবনা
গণমুখী শিক্ষা বলতে সাধারণভাবে জনগণের জন্য জনগণের প্রয়োজনীয় শিক্ষাকে বোঝায়। এর প্রধান লক্ষ্য, দেশের শিক্ষাদানযোগ্য প্রত্যেকটি ব্যক্তিকে ন্যূনতমপক্ষে নিরক্ষরতা থেকে মুক্ত করা বা স্বাক্ষর করে তোলা এবং সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। উপরন্তু লব্ধ শিক্ষা যাতে ব্যক্তি ও সমাজের চাহিদা যেমন জনকল্যাণ, দেশ ও জাতির উন্নতি, সমৃদ্ধি এবং উৎকর্ষ সাধনে নির্দেশিত হয়, সে বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা। তাই ব্যক্তির ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা, সমাজ-চাহিদা ও জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে স্বল্পসংখ্যক শিক্ষিত বা ‘এলিট’ সৃষ্টি এ শিক্ষা নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী- যেমনটি ছিল ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আমলে ভারতে প্রবর্তিত শিক্ষা নীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন করবার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য শুধু জাতীয় মুক্তি বা রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনই ছিল না, তা ছিল বাঙালি জাতির সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে নির্দেশিত। অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র থেকে জনগণের রাষ্ট্র। এর সমুদয় নীতি বা কর্মকাণ্ড জনস্বার্থে বা জনকল্যাণে পরিচালিত হবে। ১৯৭১ এর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ সে আকাক্সক্ষাকে গণচেতনায় পরিণত করে। তাই আমাদের নতুন রাষ্ট্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নামে ‘গণ’ শব্দের প্রয়োগ। রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি (গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ) অনুযায়ী এই রাষ্ট্রের শিক্ষানীতি অবশ্যই গণমুখী হওয়ার কথা। বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক ১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানে এর সর্বোচ্চ স্বীকৃতি আমরা দেখতে পাই। এ সম্বন্ধে সংবিধানের ১৭নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্র-

ক. একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য,
খ. সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছা প্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য,
গ. আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।

গণমুখী শিক্ষা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি ছিল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন। ‘সবার জন্য শিক্ষা’ ব্যতিত আমাদের উন্নতি অগ্রগতির যে উপায় নেই, তা তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন। শিক্ষা বঙ্গবন্ধুর কাছে এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, তিনি একে ‘উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখেছেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষ্যে দেশবাসীর উদ্দেশে বেতার-টেলিভিশন বক্তৃতায় শিক্ষা সংক্রান্ত ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু যে কথাগুলো বলেছিলেন, সে বিষয়ের প্রতি একটু দৃষ্টি দেয়া যাক।

‘সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলবার জন্য শিক্ষাখাতে পুঁজি বিনিয়োগের চাইতে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর কিছু হতে পারে না। ১৯৪৭ সালের পর বাংলাদেশের প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এটা ভয়াবহ সত্য। আমাদের জনসংখ্যার শতকরা ৮০ ভাগ অক্ষরজ্ঞানহীন। প্রতি বছর ১০ লক্ষ্যেরও অধিক নিরক্ষর লোক বাড়ছে। জাতির অর্ধেকেরও বেশি শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। শতকরা মাত্র ১৮ জন বালক ও ৬ জন বালিকা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করছে। জাতীয় উৎপাদনের শতকরা কমপক্ষে ৪ ভাগ সম্পদ শিক্ষা খাতে ব্যয় হওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। কলেজ ও স্কুল শিক্ষকদের, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। নিরক্ষরতা অবশ্যই দূর করতে হবে। ৫ বছর বয়স্ক শিশুদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষাদানের জন্য একটা ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ চালু করতে হবে। দ্রুত মেডিক্যাল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়সহ নয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দারিদ্র্য যাতে উচ্চশিক্ষার জন্য মেধাবী ছাত্রদের অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায় সে দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।’

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু সরকার গণমুখী শিক্ষার বিষয়কে শুধু সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েই থেমে থাকেন নি, বরং নানা সীমাবদ্ধতা সত্তে¡ও এ লক্ষ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এর মধ্যে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ, ১১ হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন এবং শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ। জাতির জন্য একটি গণমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা যে কত আবশ্যক তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। আমাদের জন্য শিক্ষাই উন্নতি ও অগ্রগতির একমাত্র সোপান। আমাদের দেশে সম্পদের অভাব রয়েছে। জনসংখ্যা প্রচুর। বঙ্গবন্ধু শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে সম্পদে রূপান্তরিত করতে চেয়েছিলেন।

দীর্ঘ মেয়াদে এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হবে, সে কথা মাথায় রেখে শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার ও উন্নয়নের লক্ষে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে ড. মুহম্মদ কুদরাত-ই-খুদাকে প্রধান করে যে শিক্ষা কমিশন গঠন করেন, ১৯৭৪ সালের মে মাসে এই কমিশন বঙ্গবন্ধুর কাছে তাঁদের চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করেন। এই রিপোর্টের পাতায় পাতায় ছিল বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনাই প্রতিফলিত হয়েছে খুদা শিক্ষা কমিশনে। বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক রিপোর্টটি গৃহীত ও অনুমোদিত হয়েছিল। বলা যায় এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনার সার-সংক্ষেপ এখানে তুলে ধরা হলো । বঙ্গবন্ধু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন-

১. শিক্ষায় সব মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
২. শিক্ষার ব্যয়ভার মূলত সরকারকেই বহন করতে হবে।
৩. ছাত্র-ছাত্রীদের চরিত্র গঠন, তাদের মধ্যে দেশপ্রেম সৃষ্টি এবং তাদেরকে মানবতাবাদে উদ্বুদ্ধ করতে শিক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
৪. শিক্ষাদানের মাধ্যম হতে হবে মূলত মাতৃভাষা অর্থাৎ বাংলা ভাষা।
৫. শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
৬. বিজ্ঞান, কৃষি ও প্রকৌশল শিক্ষার উপর জোর দিতে হবে।
৭. শিক্ষায় ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। শুরুতে দেশের মোট জাতীয় আয়ের শতকরা ৫ ভাগ এবং ভবিষ্যতে তা ৭ ভাগে উন্নীত করতে হবে।

যুদ্ধ বিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুই প্রথম শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ করেন। তিনি প্রায় ৩৮ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ লক্ষ ৬২ হাজার শিক্ষককে জাতীয়করণের অনুমতি দিলে অর্থমন্ত্রী অর্থ সংকটের কথা বলেন। তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘আমার সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। শিক্ষকরা হলেন ‘সোনার মানুষ’ গড়ার কারিগর। শিক্ষকদের পেটে ক্ষুধা রেখে সোনার মানুষ তৈরি করা সম্ভব নয়। যেখান থেকে পারো, টাকা ব্যবস্থা কর। শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ করতে হবে। মানুষ যখন অশিক্ষিত হয়ে থাকে, তখন সে জাতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আর মানুষ যখন শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করে, তখন সে মানবসম্পদে পরিণত হয়।’

বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া কোন জাতির উন্নতি করা সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়- ‘শিক্ষা হচ্ছে বড় অস্ত্র যা যে কোন দেশকে বদলে দিতে পারে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলতেন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুরের মতো প্রাকৃতিক সম্পদবিহীন দেশ শুধু মানবসম্পদ সৃষ্টি করে যদি উন্নত দেশ হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশও একদিন উন্নত দেশ হবে। আর সে জন্যই তিনি নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর সে সব উদ্যোগের কিছু ছিলো তাৎক্ষণিক আর কিছু ছিল দীর্ঘমেয়াদী। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হতে না হতেই ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট তারিখে দুর্ভাগ্যক্রমে স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল ষড়যন্ত্রকারীদের এক চক্রের হাতে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশে শুরু হয় সামরিক শাসন। জেনারেল জিয়া শাসন ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ১৯৭২ সালের সংবিধান যেমন স্থগিত করে দেয়, পাশাপাশি ৭২ সালের সংবিধানের আলোকে বঙ্গবন্ধু দেশে যে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, সে শিক্ষা ব্যবস্থাকেও স্থগিত করে দেয়া হয়। ফলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বলা যেতে পারে পাকিস্তানি ধারায় ফিরে যায়। সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া এবং জেনারেল এরশাদ নতুন শিক্ষা কমিশন গঠনের মাধ্যমে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে মহাবিপদের মুখে ঠেলে দেয়। পাকিস্তান আমলের শিক্ষা ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবার ষড়যন্ত্র করা হয়। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০০৯ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনাকে পুনরায় কার্যকরের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বঙ্গরত্ন শেখ হাসিনার ২০১০ সালের শিক্ষা নীতির মধ্যে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনার ব্যাপক প্রতিফলন ঘটেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির জনকের স্বপ্নের ‘সোনার দেশ’ বিনির্মাণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ভিশন ২০২১, ভিশন ২০৪১ এবং সর্বশেষ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ ঘোষণা করেছেন এবং প্রত্যেকটি ভিশন সফলভাবে বাস্তবায়নে শিক্ষার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা জাতিকে পথ দেখাবে।

‘অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী’ প্রবাদ বাক্যটি দেশে আজ অনেকটা মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। অল্প বিদ্যা নিয়ে যারা দোকানে ক্রয় বিক্রয় করছে, অল্প বিদ্যা নিয়ে যারা মাঠে কৃষি কাজ করছে, পুকুরে মাছের চাষ করছে, গ্রামে গঞ্জে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের খামার নির্মাণ করছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়ে নানা শ্রম দিয়ে অর্থ উপার্জন করে দেশে তা পাঠাচ্ছে এই সমস্ত অল্প বিদ্যার মানুষগুলো অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করার কাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু এই অল্প বিদ্যার অধিকারী জনগোষ্ঠীকেও মানবসম্পদের অন্তর্ভূক্ত করে গেছেন। আমাদের গার্মেন্টস কারখানায় যারা কাজ করছে তাদের মধ্যে আনুমানিক শতকরা ৯০ ভাগ শ্রমিক অল্প বিদ্যার অধিকারী।

মোটকথা একসময় যাদের শিক্ষিত বেকার বলে অবজ্ঞা করা হতো তারাই আজ আমাদের দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা বঙ্গরত্ন শেখ হাসিনা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বঙ্গবন্ধুর পথ ধরেই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু যেমন স্বল্পশিক্ষিত মানুষদেরকে মানবসম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা বঙ্গরত্ন শেখ হাসিনাও দেশের স্বল্পশিক্ষিত বেকারদেরকে নানাভাবে দেশের উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত রেখেছেন। এর ফলে দেশ দ্রুত উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ও মানবসম্পদ ভাবনার মধ্যে দেশের সকল মানুষকেই অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছিলো। সেই ভাবনা থেকে দেশের প্রতিটি মানুষ যাতে সাক্ষর হতে পারে সে চেষ্টা বঙ্গবন্ধু তাঁর শৈশব-কৈশোর থেকে আজীবন চালিয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন যেদিন বাংলাদেশের শতভাগ মানুষ সাক্ষর হবে সেদিন বাংলাদেশ সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হবে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্যকন্যা বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গরত্ন শেখ হাসিনার হাত ধরে। কাজেই বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ও মানবসম্পদ ভাবনার গতি প্রকৃতি পর্যালোচনা শেষে বলা যায় তাঁর শিক্ষা ও মানবসম্পদ ভাবনার মধ্যে যে অসাধারণ প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শীতার প্রতিফলন ঘটেছে, তার তুলনা হয় না।

তথ্যসূত্র:
১. অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, ২০১২।
২. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট, বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি সম্পাদিত, প্রকাশকাল: ২২ নভেম্বর, ১৯৯৬।
৩. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, মযহারুল ইসলাম, বাংলা একাডেমি, ১৯৭৪।
৪. উচ্চশিক্ষা ও জাতীয় উন্নয়ন, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন, ড. আবদুল মান্নান সম্পাদিত, প্রকাশকাল: ১৯৮৪।
৫. ৪৬তম বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১৯, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত।
৬. শিক্ষা ক্ষেত্রে যুগান্তকারী উন্নয়ন (২০০৯-২০১৮), নূরুল ইসলাম নাহিদ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সেপ্টেম্বর-২০১৮।
৭. শিক্ষা বিষয়ক সেমিনার ও অন্যান্য প্রতিবেদন, শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক উপ-কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, প্রকাশকাল: ২০১৮।
৮. বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা, সম্পাদক- সৌমিত্র শেখর, প্রকাশকাল: ২০২১।


Share this post in your social media

© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com