রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৪:৪১ অপরাহ্ন

বঙ্গবন্ধুর আমিত্বচেতনার গতিপ্রকৃতি। প্রফেসর ড. আবদুল খালেক

বঙ্গবন্ধুর আমিত্বচেতনার গতিপ্রকৃতি। প্রফেসর ড. আবদুল খালেক

Professor Dr. Abdul Khaleque (প্রফেসর ড. আবদুল খালেক)

বিশ্বের যাঁরা মহান কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, যাঁরা খ্যাতিমান রাষ্ট্রনায়ক, তাঁদের সকলের মধ্যেই কম-বেশি আমিত্ববোধের প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। আমিত্ববোধের মধ্যে ইতিবাচক দিক যেমন রয়েছে, নেতিবাচক দিকটিকেও উপেক্ষা করা যায় না। আমিত্ববোধের মধ্যে থাকে অহংবোধ। অহংবোধকে আমরা ইতিবাচক বলেই বিবেচনা করতে পারি কিন্তু সেই অহংবোধ যদি অহঙ্কারে রূপান্তরিত হয়, বিপদ সেখানে। আমিত্বকে যখন কেউ মানুষের কল্যাণে বিলিয়ে দিতে পারেন, তখন তিনি মহৎ মানুষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন, অপরদিকে কারও আমিত্ব যদি আমি-সর্বস্ব হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারেন না। তিনি তখন হয়ে ওঠেন ভয়ানক আত্মকেন্দ্রিক, যার মধ্যে একটা হাম্বরা ভাব এসে বাসা বাঁধে, তখন তাকে সমাজে চিহ্নিত করা হয় একজন অতি আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর মানুষ হিসেবে। কাজেই বলা যায়, আমিত্বের মধ্যে নানা প্রকারভেদ আছে। আমিত্ব প্রকাশের মধ্যে নানা বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য আছে। প্রসঙ্গক্রমে বাংলা সাহিত্যের দু’জন প্রখ্যাত কবির নাম এখানে উল্লেখ করা যায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

রবীন্দ্রনাথের আমিত্বের মধ্যে একটি বিনয়ী ভাব আছে। রবীন্দ্রনাথের আমিত্বের প্রকাশ তাঁর কবিতায় কেমনভাবে এসেছে এখানে দু’একটি উদাহরণ তুলে ধরছি।
ক. আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার
চরণধূলোর তলে।
খ. বিপদে মোরে রক্ষা করো
এ নহে মোর প্রার্থনা
বিপদে আমি না যেন করি ভয়।
গ. আমার সোনার বাংলা
আমি তোমায় ভালবাসি।

অপরদিকে নজরুলের কবিতায় আমিত্বের প্রকাশ ঘটেছে ভিন্নরূপে ভিন্ন আঙ্গিকে। উদাহরণ নিম্নরূপ :
ক. আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ।
খ. আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন
আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন।
গ. আমি চির বিদ্রোহী বীর
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা-চির উন্নত শির।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের কবি, অপরদিকে নজরুলকে আমরা বলে থাকি জাতীয় কবি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহান দুই কবির দ্বারা নানাভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছেন। বিপদে-সংকটে বঙ্গবন্ধু সবসময় রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের কবিতার কাছে আশ্রয় গ্রহণ করতেন। নজরুলের আমিত্ববোধ এবং বঙ্গবন্ধুর আমিত্ববোধের মধ্যে অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

বঙ্গবন্ধুর আমিত্ববোধের স্বরূপ বুঝতে হলে তাঁর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটি পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি। বঙ্গবন্ধুর জন্ম গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী শেখ পরিবারে। অপরদিকে নজরুলের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী কাজী পরিবারে। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার হলেও তাঁদের সময়কালে পরিবার দুটি ক্ষয়িষ্ণু। নজরুল এবং শেখ মুজিব ছোটবেলায় একটু দুষ্টু বা দুর্দান্ত প্রকৃতির ছিলেন। শেখ মুজিব তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন- “ছোট সময়ে আমি খুব দুষ্টু প্রকৃতির ছিলাম” (পৃ. ৮)। নজরুলের জীবন পাঠেও জানা যায় ছোটবেলায় তিনিও বেশ দুষ্টু প্রকৃতির ছিলেন।

ছোটবেলা থেকেই শেখ মুজিব নিজেকে মানব সেবায় নিয়োজিত রাখেন। ১৯৩৭ সাল, শেখ মুজিবের বয়স তখন ১৭ বছর। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের যখন তিনি ছাত্র, তাঁর গৃহশিক্ষক ছিলেন কাজী আবদুল হামিদ এমএসসি। মাস্টার সাহেব গোপালগঞ্জে একটি ‘মুসলিম সেবা সমিতি’ গঠন করেন। শেখ মুজিবকে করা হয় ‘মুসলিম সেবা সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক। শেখ মুজিব তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন “বাড়ি বাড়ি থেকে মুষ্টির চাউল উঠিয়ে আনতাম এবং এই চাউল বিক্রি করে গরীব ছেলেদের বই এবং পরীক্ষার খরচ দেয়া হতো” (পৃ. ৯)।

শেখ মুজিবের নেতৃত্বদানের গুণ ছোটবেলা থেকেই লক্ষ্যণীয়। তিনি আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন- “আমি ভীষণ একগুঁয়ে ছিলাম। আমার একটা দল ছিল। কেউ কিছু বললে আর রক্ষা ছিল না। মারপিট করতাম। আমার দলের ছেলেদের কেউ কিছু বললে এক সাথে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। আমার আব্বা মাঝে মাঝে অতিষ্ট হয়ে উঠতেন” (পৃ. ১০)।

১৯৩৮ সালের ঘটনা। শেখ মুজিবের বয়স তখন ১৮ বছর। শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী। বাংলার এই দুই নেতা এক সাথে গোপালগঞ্জে এসেছিলেন একটি এক্সিবিশন উদ্বোধন করতে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে শেখ মুজিবের প্রথম সাক্ষাৎ এবং কথাবার্তার পরই সোহরাওয়ার্দী সাহেব উপলব্ধি করতে পারেন শেখ মুজিবের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী আছে। সোহরাওয়ার্দী সাহেব কোলকাতায় গিয়েই শেখ মুজিবকে একটি চিঠি লেখেন, কোলকাতায় এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেন।

১৯৪১ সালে মেট্টিক পাস করবার পর শেখ মুজিব কোলকাতার ইসলামিয়া কলেজে আই.এ. ক্লাসে ভর্তি হন, থাকতেন বেকার হোস্টেলে। এই সময় জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শেখ মুজিবকে রাজনীতির পাঠ দিতে থাকেন এবং শেখ মুজিবও গভীর নিষ্ঠার সাথে সে পাঠ গ্রহণ করতে শুরু করেন। ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশ মতো কাজ করতে গিয়ে রাজনীতিতে অনেক পরিপক্কতা লাভ করেন। সে সময় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে নানা রকম বিভাজন ছিল। সেই বিভাজন ছাত্রদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রদের মধ্যে দুটো দল হয়ে যায়। দলাদলি মিটমাট করবার জন্য এক পর্যায়ে ছাত্রদেরকে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী সাহেব উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। এই সময় কোন একটি বিষয় নিয়ে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে শেখ মুজিবের মতপার্থক্য দেখা দেয় এবং কথা কাটাকাটি হয়। শেখ মুজিব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন- যে ছাত্রটিকে সোহরাওয়ার্দী সাহেব সমর্থন করছেন তিনি তাকে গ্রহণ করবেন না। একথা শুনে উত্তেজিত হয়ে সোহরাওয়ার্দী সাহেব ইংরেজিতে শেখ মুজিবকে বলে ফেলেন- “Who are you? You are nobody.” শেখ মুজিব অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জবাব দিয়েছিলেন- “If I am nobody, then why you have invited me, you have no right to insult me. I will prove that I am somebody. Thank you sir, I will never come to you again. একথা বলে চিৎকার করতে করতে বৈঠক ছেড়ে বের হয়ে এলাম”। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারেন নি শেখ মুজিব। সোহরাওয়ার্দী সাহেব দ্রুত নিজের ভুল বুঝতে পারেন। এবং শেখ মুজিবকে পথ থেকে ফিরিয়ে আনবার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। শেখ মুজিব শেষ পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী সাহেবের আহ্বানে ফিরে আসেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব শেখ মুজিবের দাবী মেনে নিয়ে বলেন- “যাও তোমরা ইলেকশন কর, দেখ নিজেদের মধ্যে গোলমাল করো না।” শেখ মুজিবের আত্মজীবনীতে উল্লেখ আছে- “সোহরাওয়ার্দী সাহেব আমাকে আদর করে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন, আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন”- বললেন, আমি তো আর কাউকেই এ কথা বলি নাই, তোমাকে বেশি আদর ও স্নেহ করি বলে তোমাকেই বলেছি” (পৃ. ২৯)। এভাবেই শেখ মুজিবের আমিত্বের বিজয় শুরু হয়। অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ছাড়া এই আমিত্ববোধের প্রকাশ ঘটতে পারে না। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সঙ্গে যখন শেখ মুজিবের বিতর্ক হয়, তখন শেখ মুজিবের বয়স মাত্র ২৪ বছর। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে যে তরুণ বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারণ করতে পারে- “I will prove that I am somebody.” উপলব্ধি করা যায় কি প্রচ- আমিত্ববোধ তরুণ শেখ মুজিবের মধ্যে দানা বেধে উঠতে থাকে।

শেখ মুজিব তাঁর জীবনকালে রাজনৈতিক কারণে কতবার জেলখানায় বন্দী অবস্থায় কাটিয়েছেন, তা আজ গবেষণার বিষয়। জেলের ভয়ে কখনও তিনি পালিয়ে বেড়ান নি। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা পর্যন্ত অধিকাংশ সময় শেখ মুজিবকে জেলের অভ্যন্তরে কাটাতে হয়েছে। শেখ মুজিবের সমালোচকেরা প্রায়ই অভিযোগ করে থাকেন ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে তিনি না পালিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু পালানোর ব্যাপারটি যে শেখ মুজিবের চরিত্রেই ছিল না, সেটি জেনে রাখা প্রয়োজন। এটি তাঁর জীবন দর্শন। আর এই জীবন দর্শনের উন্মেষ ঘটে তাঁর ছোটবেলা থেকেই। প্রসঙ্গক্রমে একটি উদাহরণ তুলে ধরছি। শেখ মুজিবের বয়স যখন ১৮ বছর, সেই সময় শেখ মুজিবের মালেক নামের এক বন্ধু হিন্দু সম্প্রদায়ের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়। বন্ধুকে উদ্ধার করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত মারপিটের ঘটনা ঘটে যায়। বিষয়টি নিয়ে প্রতিপক্ষ থানায় এজহার দায়ের করে। এজহারে আসামি হিসেবে যাদের নাম থাকে, তাদেরকে গ্রেফতারের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। শেখ মুজিবকে জানানো হয় গ্রেফতারের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে কিছু সময়ের জন্য বাড়ি থেকে সরে যেতে হবে। শেখ মুজিবের ভাষায়- “আমার ফুফাতো ভাই, মাদারীপুর বাড়ি। আব্বার কাছে থেকেই লেখা-পড়া করত, সে আমাকে বলে, “মিয়া ভাই, পাশের বাসায় একটু সরে যাও না।” আমি বললাম, “যাবো না, আমি পালাবো না, লোকে বলবে, আমি ভয় পেয়েছি।” ১৮ বছরের মুজিব গ্রেফতারের ভয়ে বাড়ি থেকে সেদিন পালিয়ে যেতে যেমন রাজি হন নি, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার পূর্বমুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা যখন তাঁকে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন তখনও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের উত্তর ছিল- “আমি পালাবো না।” শুধু তাই নয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য যখন তাঁর ৩২ নম্বরের বাড়ি ঘিরে ফেলা হয় এবং প্রচ-ভাবে আক্রমণ শুরু হয়ে যায়, তখন সামরিক বাহিনীর জনৈক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধুকে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- “আমি পালাবো না।” তিনি শুধু পালাননি তাই নয়, বরং অসীম সাহসিকতার সাথে তিনি ঘাতকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। লক্ষ্যণীয়, ঘাতকের গুলি তাঁর বুকে লেগেছিল, পেছনে নয়। মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তাঁর নীতিতে অটল থেকেছেন- “আমি পালাবো না।” এখানেই বঙ্গবন্ধুর আমিত্বের বিশেষত্ব, এরকমই বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। এই অহংবোধ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চরিত্রের বড় বৈশিষ্ট্য।

বঙ্গবন্ধুর আমিত্ব বা অহংবোধ নিয়ে একটি বিশাল গ্রন্থ রচিত হতে পারে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তারিখে রমনার রেসকোর্স ময়দানে যে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন, সেই ভাষণে তাঁর আমিত্বের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। একজন রাজনৈতিক নেতার ভাষণ শুনে শ্রোতা-সাধারণ উদ্বেলিত হয়, আবেগাচ্ছন্ন হয়ে বলে ওঠে নেতা তার মনের কথা, হৃদয়ের আকাক্সক্ষার কথা প্রকাশ করেছেন, তখন নেতার সাথে কর্মীর কোন রকম ব্যবধান থাকে না। নেতার সুর এবং কর্মীর কণ্ঠস্বর তখন মিশে একাকার হয়ে যায়। প্রসঙ্গক্রমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণের ব্যাপারে আমাদের দেশের বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ কবি নির্মলেন্দু গুণের একটি কবিতার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আমরা মূলত অসাধারণ রাজনৈতিক নেতা বলেই বিবেচনা করে থাকি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে ঐতিহাসিক ভাষণ তিনি দিয়েছিলেন, নির্মলেন্দু গুণ সে ভাষণটিকে একটি শ্রেষ্ঠ কবিতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য লক্ষ লক্ষ শ্রোতা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়-
একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্য কী ব্যাকুল
প্রতীক্ষা মানুষের : কখন আসবে কবি? …
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি:
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি ভবিষ্যতে মহাকাব্য হিসেবে বিবেচিত হওয়া অসম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ইতিমধ্যেই উচ্চারিত হয়েছে তিনি প্রকৃত অর্থে একজন ‘রাজনীতির কবি’ (Poet of Politics)।

৭ মার্চের ভাষণ প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ছাড়া আর কিছু নয়। এটি তাঁর নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ ভাষণ বলে যেমন চিহ্নিত হয়, তুলনামূলকভাবে সমগ্র বিশ্ব জুড়ে এমন ভাষণ আর নেই বলে গবেষকদের অভিমত। উক্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধুর আমিত্বের প্রকাশ কিভাবে ঘটেছে, ভাষণে কতবার তিনি ‘আমি’ ‘আমার’ এবং ‘আমাকে’ বিষয়ক শব্দ ব্যবহার করেছেন, সেদিকে একটু দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে।

বঙ্গবন্ধু ‘ভাইয়েরা আমার’ বলে ভাষণ শুরু করেন। এটি ব্যতিক্রমধর্মী সম্বোধন। শুরুতে বলেছিলেন- “আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন। …আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। …নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে ও আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। …আমি শুধু বাংলা নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাঁকে অনুরোধ করলাম ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না। তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। …আমি বললাম, অ্যাসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করবো, এমন কি আমি এও পর্যন্ত বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজন যদিও সে হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব। …আমি বললাম, এ্যাসেম্বলি চলবে। তারপর হঠাৎ এক তারিখে এ্যাসেম্বলি বন্ধ করে দেয়া হলো। এয়াহিয়া খান সাহেব প্রেসিডেন্ট হিসাবে এ্যাসেম্বলি ডেকেছিলেন, আমি বললাম যে, আমি যাবো। …তারপরে হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হল। দোষ দেওয়া হল বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। …আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে আপনারা হরতাল পালন করেন। আমি বললাম, আপনারা কল-কারখানা সবকিছু বন্ধ করে দেন। …আমরা পয়সা দিয়ে যে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরীব-দুঃখী-আর্ত মানুষের বিরুদ্ধে। …টেলিফোনে আমার সঙ্গে তাঁর কথা হয়। তাঁকে আমি বলেছিলাম, জনাব এহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কীভাবে আমার গরীবের উপরে, আমার বাংলার মানুষের বুকের উপরে গুলী করা হয়েছে। কী করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে। …তিনি বললেন, আমি নাকি স্বীকার করেছি যে, ১০ তারিখ রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স হবে। আমি তো অনেক আগেই বলেছি, কিসের আর.টি.সি.? কার সঙ্গে বসবো? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে তাদের সঙ্গে বসবো? হঠাৎ আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে পাঁচ ঘণ্টা গোপনে বৈঠক করে যে বক্তৃতা তিনি করেছেন, সমস্ত দোষ তিনি আমার উপরে দিয়েছেন।”

বক্তৃতার মাঝামাঝিতে এসে আবার তিনি উচ্চারণ করেছেন- ‘ভাইয়েরা আমার। ২৫ তারিখে এ্যাসেম্বলি কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি দশ তারিখে বলে দিয়েছি যে, ঐ শহীদদের রক্তের উপর দিয়ে, পাড়া দিয়ে আর.টি.সি.-তে মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না। এ্যাসেম্বলি কল করেছেন, আমার দাবি মানতে হবে প্রথম।” এরপর বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু ক্রমেই কঠিন অবস্থানে চলে যেতে থাকেন, কঠিন কর্মসূচি ঘোষণা করতে থাকেন। যেমন- “আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে বাংলাদেশে কোর্ট, কাচারি, আদালত, ফৌজদারি, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরীবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, যে জন্য সমস্ত অন্যান্য যে জিনিসগুলো আছে সেগুলোর হরতাল কাল থেকে চলবে না। …এরপরে যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর যদি একটি গুলী চলে, আর যদি আমার লোকদের উপর হত্যা করা হয়, তোমাদের উপর আমার অনুরোধ রইল: প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে, সব কিছু, আমি যদি হুকুম দেবার না পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। …তোমরা আমার ভাই- তোমরা ব্যারাকে থাক, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলী চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। …যারা পারেন আমার রিলিফ কমিটিতে সামান্য টাকা-পয়সা পৌঁছিয়ে দেবেন। …সরকারি কর্মচারীদের বলি; আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হয় খাজনা, ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হবে। কেউ দেবে না।”

১৮ মিনিটের ভাষণে বঙ্গবন্ধু মোট ৪০ বার ‘আমি’ ‘আমার’ এবং ‘আমাকে’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। শব্দটি ঘন ঘন উচ্চারণ করলেও শ্রোতাদের কাছে বিরক্তিকর হয় নি, বরং শ্রুতিমাধুর্য্য বেড়ে গেছে এবং আরও হৃদয়স্পর্শী হয়েছে। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি ছাড়া এত ‘আমি’ শব্দের ব্যবহার বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছাড়া অন্য কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। বঙ্গবন্ধুর আমিত্বের মধ্যে আত্মভোগের চিহ্নমাত্র নেই, আছে দেশের মানুষের কল্যাণে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করবার বলিষ্ঠ অঙ্গীকার। আছে আত্মত্যাগের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করবার দৃঢ় প্রত্যয়। কাজেই আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর ‘আমিত্বচেতনা’ আত্মত্যাগের মহিমায় চির ভাস্বর হয়ে থাকবে।

*প্রফেসর ড. আবদুল খালেক, উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।


Share this post in your social media

© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com