রবিবার, ১৮ অগাস্ট ২০১৯, ০৫:২৩ অপরাহ্ন

পলাশ: প্রত্যুষে ঝরেপড়া এক মানবফুলের নাম । হামিদুর রহমান

পলাশ: প্রত্যুষে ঝরেপড়া এক মানবফুলের নাম । হামিদুর রহমান

মোখলেছুর রহমান পলাশ (২৫ জানুয়ারি ১৯৯৩ - ২৭ জুলাই ২০১৯)

‘পলাশ’ শব্দটি থেকে খসে পড়লো ‘প’। ফুলটি হয়ে গেল লাশ! মাটিতে নয়, পানিতে ঝরে পড়লো সে মানবফুল! খুব অকালে- খুব নিদারুণভাবে- খুব হঠাৎ করেই পৃথিবীবাগান থেকে বৃন্তচ্যুত হয়ে গেল মানবফুলটি। বলছি- বন্ধু-সহকর্মী মোখলেসুর রহমান পলাশের (জন্ম ২৫ জানুয়ারি, ১৯৯৩ – মৃত্যু ২৭ জুলাই, ২০১৯) বিয়োগান্ত বিদায়ের কথা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের মেধাবী সন্তান, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির তরুণ শিক্ষক এগুলো তার একাডেমিক বা প্রফেশনাল পরিচয় কিন্তু সর্বাগ্রে উচ্চার্য বিষয়টি হলো- ‘নিখাদ ভালো মনের বিনয়ী মানুষ’ ছিলেন তিনি। সুদর্শনীয় দেহাবয়ব, পৌরুষদীপ্ত চেহারা, গৌরবর্ণের বিভা সবকিছুকে ছাপিয়ে তার অকৃত্রিম ও অত্যান্তরিক মায়াময় সদাহাস্যোজ্জল মুখশ্রীখানা সত্যিই অমলিন থেকে যাবে পরিচিত সকলের কাছে। দেখা হলে কথার আগেই একটি সুমিষ্ট হাসি দিতেন পলাশ। তখন তার টোলপড়া দু’গালের কোণে যেন চিকচিক করে উঠতো ভালোবাসার হীরককণা। কুশলাদিজিজ্ঞাসার পর আবারও মায়াবী আর মধুমাখা সে হাসির বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে খুব বিনয়াবনতভাবে তার নিশ্চুপ পদচারণা চলতো। সত্যিই এমন নিশ্চুপ, নির্ঝঞ্ঝাট- খোলামনের হাসিখুশি মানুষ শত সমস্যাজর্জরিত এই সময়ে খুবই দুর্লভ। দুবছরের বেশি সময় দেখেছি তাকে সহকর্মী-বন্ধু হিসেবে। কখনো দেখিনি হাসিহীন মলিনমুখ, রাগত কণ্ঠস্বর বা কারো সাথে দু’কথা হতে। সিনিয়র সহকর্মীদের সম্মান করতেন শিক্ষকের মতোন- সমস্ত শ্রদ্ধাবোধ দিয়ে। সবকিছুমিলিয়ে বিজনেস ফ্যাকাল্টির সকল শিক্ষকদের মধ্যে তো বটেই সমস্ত ক্যাম্পাসজুড়েই প্রিয়তমমুখ- ভালো ও ভদ্র মানুষ হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল সর্বাগ্রে, সর্বোচ্চে। যেকোন বাড়তি অফিসিয়াল কাজে- সহকর্মীর ক্লাস প্রক্সি দেওয়াতে কিংবা নিয়মিত অফিস শেষে ঘোরাঘুরিতে ‘না’ বলাতে তিনি ছিলেন অনভ্যস্ত। এমন তুমুল আড্ডাপ্রিয়তার জন্যেই হয়তো ২৭ জুলাইতে সহকর্মীদের সহযাত্রী হয়ে ঘুরতে গেলেন নাটোরের হালতির বিলে- মিনি কক্সবাজার যার মুখচলতি নাম। নৌকাভ্রমণকালে প্রচন্ড স্রোতের তোপে সহকর্মী পানিতে পড়ে গেলে আগপিছমধ্য কোন কিছু না ভেবে তিনি দিলেন ঝাপ। মিনিট কয়েকের জীবনপণ প্রচেষ্টায় সাঁতার না জানা সহকর্মীকে নৌকাতে উঠাতে পারলেন ঠিকই কিন্তু নিজেকে ওঠানোর দম ততক্ষণে নিঃশেষ। চোখের সামনে প্রবল স্রোতের ফেনায়িত ঘুর্ণনে তলিয়ে গেলেন পলাশ- মানবফুল একজন। মর্মান্তিকতার শেষ এখানেই নয়! বিলের পানিতে তার নিথর দেহ শতসহস্র প্রচেষ্টাতেও আর খুঁজে পাওয়া যাছিল না। অনেক ডুবুরি-মাঝি-স্থানীয়জন-আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের বিরতিহীন নিরলস খোঁজাখুঁজির পরও নেই পলাশ। নেই তাঁর দেহ অথবা লাশ!

দু’দিন অতিক্রান্ত তবু খোঁজ নেই! কি অদ্ভুত এই দু’দিন কেউই আর বলছে না- ‘পলাশকে পাওয়া যাচ্ছে না’ সবাই শুধু বলছে ‘লাশ এখনো পায়নি’! সত্যিই কেমন সব নিয়ম! মৃত্যু নিশ্চিত হলেই মানবনাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়! সুন্দর নামের মানুষের ডাকনাম হয়ে যায় ‘লাশ’! আহা মানবজীবন! হায় জীবন!।

দু’দিন গত হবার পর হঠাৎ বিলের জলে ভেসে উঠলো পলাশ। ক্ষতবিক্ষত ফুল! হাতপা পানিতে ছড়ানো- মাথা উপুড় হওয়া- গায়ের শার্ট উধাও-জিন্স প্যান্টের পকেটে তখনো উপস্থিত মুঠোফোনটি- জীবিত নেই শুধু পলাশ! কী নিদারুণ কী করুণ সে দৃশ্য!! সুরত দেখে উপায় নেই, পোশাক দেখে নির্ধারণ করতে হচ্ছে মানবফুলটি নাম মোখলেসুর রহমান পলাশ। অর্ধগলিত লাশ-মুখশ্রী খুবলে খাওয়া- হাতপা আঙুলহীন- পেটফুলে বেঢপ আকৃতির- এরকম বীভৎস শরীর আর বাস্তবের মায়াবী পলাশের কি বিশাল তফাত!! হায়! সহকর্মীকে বাঁচানোর জন্য জীবনোৎসর্গ করা আমাদের পলাশ! আমাদের বীর মানবফুল!

তাঁর সুন্দর হাসির মুখটা জানি না কোন কাঁকড়া বা মাছদের খাদ্য হয়েছিল- সুমিষ্ট কণ্ঠের সে গলাখানা জানি না পেঁচিয়েছিলো কোন জলজ লতাপাতা, জানি না তার গায়ের শার্টটি কোন জলজ খড়কুটো শোকের পতাকা বানিয়ে উড়াচ্ছে এখনো – বিশাল হৃদয়কে ধারণ করা তাঁর বুকটাকে জানি না কোন জলীয় স্রোত ক্ষতবিক্ষত করেছিল গত দু’দিন ধরে!!- শুধু বুঝি ‘মানুষের মৃত্যু হলে তবু মানব থেকে যায়’।
পলাশ আমাদের তেমনতর মৃত্যুঞ্জয়ী মানবফুল।
ভালো থেকো ফুল.. ভালো থেকো…

লেখক: সাবেক সহকর্মী


Share this post in your social media

© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com