শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:৫৩ পূর্বাহ্ন

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্: একজন একক এক | হামিদুর রহমান

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্: একজন একক এক | হামিদুর রহমান

‘ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’ (১০ জুলাই, ১৮৮৫-১৩ জুলাই, ১৯৬৯)- নামটি জ্ঞান ও গরিমার সমার্থক। আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতিশব্দ তিনি। একা নিজ হাতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে যে উচ্চাসনে তিনি স্থাপন করেছেন- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়া আর কাকে তাঁর পাশে রাখা যায়! গবেষণায় যেসব বিষয় আপাতদৃষ্টিতে কারও স্পর্শসাধ্য ছিল না, সেসব বিষয়েই তিনি দিয়েছেন মনোযোগ, করেছেন অনবরত-অনলস তথ্যানুসন্ধান ও নিত্যনতুন সব সাহিত্যবিষয় উদ্ঘাটন। জ্ঞান আহরণের সাহসিকতা ও আগ্রহে যে অসীমতাকে তিনি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিলেন তা ভাবলে সত্যিই বিস্মিত হতে হয়। কি নিয়ে কাজ করেননি তিনি! ভাষা-সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতি-শিশুতোষ-প্রশাসনিক-ধর্মতাত্ত্বিক-একাডেমিক-সৃজনশীল-মননশীল প্রভূত বিষয়ে তাঁর ঐকান্তিক সাধনা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে উন্নীত করেছে অনন্য এক উচ্চাসনে। একাধারে তিনি ছিলেন কবি-গল্পকার-প্রাবন্ধিক-গবেষক-ভাষাতাত্ত্বিক-বৈয়াকরণ-ভাষাবিজ্ঞানী-লোকসাহিত্যিক-পত্রিকাসম্পাদক-অভিধানপ্রণেতা-অনুবাদক-সাহিত্যসম্পাদক-সংস্কৃতিসংস্কারক-লোকসংস্কৃতি সংগ্রাহক ও ব্যাখ্যাকার-প্রাচীন ও মধ্যযুগবিশারদ এবং ইসলামী চিন্তাবিদ।
এছাড়া ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র অন্য অনন্য দিক হলো- বাংলা ও সংস্কৃতি ছাড়াও প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রায় ত্রিশটি (৩০টি) ভাষার উপর ছিল তাঁর অসাধারণ ব্যুৎপত্তিজ্ঞান ও পান্ডিত্য। প্রাচ্যের আসাম-উড়িয়া-মৈথিলী-পাঞ্জাবী-গুজরাটী-মারাঠী-সিন্ধী-হিন্দী-কাশ্মিরী-সিংহলী-উর্দু-আরবী-ফারসি এবং পাশ্চাত্যের ফরাসি-ইংরেজি-জর্মানী প্রভৃতি ভাষায় ছিল অনায়াস স্বতঃস্ফূর্ততা।
সাধারণ এক জীবনায়ু নিয়েও অনন্যসাধারণ উদ্দীপনা-অধ্যবসায়-জ্ঞানস্পৃহায় প্রাচীন বাংলার অস্পর্শী ও আপাতদৃষ্টিতে ভীতিপ্রদ সুকঠিন সব বিষয়াদি নিয়ে তাঁর অনলস গবেষণা ও সিদ্ধিলাভ আমাদের কাছে এক চিরকালীন বিস্ময়। বস্তুত, সাহিত্যসাধনায় তাঁর পরিধি-গভীরতা ও সূক্ষèতা যেকোন মাপকাঠিতেই জ্ঞানচর্চার এক বিরলতম প্রচেষ্টা। বাংলা ভাষার উদ্ভব ক্রমবিকাশ এবং চর্যাপদের রচনাকাল নিয়ে তিনি তাঁর মৌলিক মতবাদকে নমুনাসমেত প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বাংলা ভাষার উৎপত্তি সংক্রান্ত ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও ড. সুকুমার সেনের বহুল প্রচলিত মতবাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে গৌড়ীয় প্রকৃত থেকেই যে বাংলা ভাষার জন্ম এতদসংক্রান্ত প্রমাণ প্রদর্শনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তাঁর অনবদ্য পান্ডিত্য দেখাতে পেরেছিলেন। এছাড়া মধ্যযুগের কবি চন্ডীদাস একজন নাকি একাধিক ব্যক্তি সে বিষয়েও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ই প্রথম সাহিত্যমনস্কদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন ও তদ্সংক্রান্ত দ্ব›দ্বের সমাধানও দিয়েছিলেন। সর্বোপরি তিনিই চর্যাপদের রচনাকাল ৬৫০-১১০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বলে প্রমাণ করতে সর্বপ্রথম সক্ষম হয়েছিলেন।
বাংলা ভাষার জন্মকথা, বিকাশের ধারা ও ভাষা সুরক্ষার জন্যে অভিধান প্রণয়ন ছাড়াও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সুবিশাল শিক্ষায়তনিক পরিসরে এনে একাডেমিক অধ্যয়নের অধিভুক্তকরণে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র অবদান সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে বাংলা বিভাগের স্বতন্ত্রকরণ বা পৃথকীকরণের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তিনি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে স্বতন্ত্রভাবে একাডেমিক পর্যায়ভুক্ত করায় তাঁর বলিষ্ঠ যুক্তি ও অবদান চিরস্মরণীয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম পিএইচডি’র তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন তিনি। ড. মযহারুল ইসলাম কৃত ১৯৫৮ সালের সেই পিএইচডি অভিসন্দর্ভের শিরোনাম ছিল ‘মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে হেয়াত মামুদ: তুলনামূলক আলোচনা’- যা আজও রা.বি.র কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের মূল ফটকে সম্মানসহ বিশেষভাবে সংরক্ষিত।
আজীবন অনবরত অধ্যয়ন আর নিরলস গবেষণাকর্মে নিয়োজিত থাকা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র শিক্ষাজীবন আমাদের কাছে নিকট এক শিক্ষণীয় বিষয়বিশেষ। তিনি তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রাকৃতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক নানাবিধ চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করতে পেরেছিলেন অদম্য বিদ্যাস্পৃহা ও সুদৃঢ় মনোবলের পরিপ্রেক্ষিতে। জন্মস্থান পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশপরগনা জেলার বশিরহাট মহকুমার ভাসলিয়া নামক সওলাতিয়া মক্তবে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূত্রপাত। এরপর হাওড়ার বেলিলিয়াস মিডল ইংলিশ স্কুল-পঞ্চাননতলা এম. ই, স্কুল- হাওড়ার জিলা স্কুল ও কলকাতা মাদ্রাসায় পাঠান্তে তিনি বি.এ. পড়ার জন্য ভর্তি হন হুগলী কলেজে। অথচ পরীক্ষার প্রাক্কালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় বিএ পরীক্ষা দেওয়া হয়ে ওঠে না। সুস্থতাপ্রাপ্তির পর শিক্ষাজীবনের ছেদ ঘটিয়ে প্রবেশ করেন কর্মজীবনে। যোগ দেন যশোহর জেলা স্কুলের সহকারী শিক্ষক হিসেবে। কিন্তু কিছুদিন পরেই চাকুরি ছেড়ে কলকাতা সিটি কলেজে সংস্কৃত বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন এবং ১৯১০ সালে বিএ পাশ করেন। এরপর ¯œাতকোত্তর সম্পন্ন করার মানসে ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে কিন্তু খুব অদ্ভুত ও দুঃখজনক যে, বিভাগের তৎকালীর চরম রক্ষণশীল শিক্ষক সত্যব্রত সামশ্রীর বিরোধিতা ও অসহযোগিতার কারণে তাঁকে সংস্কৃত বিভাগ ছাড়তে হয়। সত্যব্রত সামশ্রী কোন অহিন্দু ছাত্রকে বেদ পড়াতে সম্মত হননি বলেই এমন অযাচিত ও অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি ঘটে। তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ও পরামর্শে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রথম ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগে এবং ১৯১২ সালে এম.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯১৪ সালে বিএ পরীক্ষা পাশের পর উপাচার্য মহাশয় তাঁকে ভারত সরকারের উচ্চশিক্ষা বৃত্তি প্রদান করে সুদূর জার্মানীতে যাবার সুব্যবস্থা করেন। অথচ অতীব দুঃখজনক হলেও সত্য যে, স্বাস্থ্যগত সমস্যা আর পারিবারিক কিছু অসুবিধার কারণে তিনি এই সুযোগ গ্রহণ করতে পারেননি। উপরন্তু ১৯১৪ সালেই তাঁকে যোগদান করতে হয় চট্টগ্রামের সীতাকু- কলেজে।
কর্মজীবনের শুরুতে বশিরহাট আদালতে কিছুকাল ওকালতি করবার পর মিথ্যা-অসততা এবং প্রবঞ্চণার এই পেশা থেকে নিজেকে চিরতরে সরিয়ে নেন তিনি। কয়েক মাস অনিশ্চয়তা ও বেকারত্বের মাঝে কাটানোর পরই তাঁর ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ‘শরৎকুমার লাহিড়ী গবেষণা’ সহায়ক পদে যোগদানের সুযোগ পান তিনি। আর সহকর্মী হিসেবে লাভ করেন ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের সান্নিধ্য। এরপর শিক্ষকতার মতো মহানতম পেশাকেই আজীবনের জন্য সঙ্গী করে নিয়েছেন। ১৯২১ সালের ২ জুন-১৯৪৪ সালের ৩০জুন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা এবং খ-কালীন হিসেবে আইন বিভাগের শিক্ষকতা, ১৯৪৪-১৯৪৮ সাল পর্যন্ত বগুড়া আযীযুল হক কলেজের অধ্যক্ষ, ১৯৪৮-১৯৫৩ পর্যন্ত ঢাবির বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে অধ্যাপনা, ১৯৫৫ সালের ১লা নভেম্বর থেকে-১৯৫৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বপালন, ১৯৫৯-১৯৬৭ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমির বিভিন্ন অভিধান প্রণয়ন প্রকল্পের প্রধান হিসেবে কর্মরত, অতঃপর ১৯৬৭ সালের ১লা এপ্রিল থেকে আমৃত্যু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্কে ঢাবির বাংলা বিভাগের ‘প্রফেসর এমেরিটাস’ পদে নিয়োগ দিয়ে সম্মানিত করা হয়।
আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র অনবদ্য অবদান কি এক নিগূঢ় কারণে ততটা উচ্চকিত নয়, বিস্মৃতপ্রায়- যা বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষাভাষি মানুষ হিসেবে আমাদের চরম অকৃতজ্ঞতা ও অতীতভোলা স্বার্থপর মনোবৃত্তিরই বহিঃপ্রকাশ।
অন্য অনেককিছুর পাশাপাশি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ চলনে-বলনে ও লিখনে ছিলেন একজন বলিষ্ঠ ভাষাসৈনিক। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ উর্দুকে যখন প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রভাষা করবার সুপারিশ করেছিলেন তখন তাৎক্ষণিকভাবে এই উক্তির তীব্র প্রতিবাদ করে তারপরের দিনই ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা” নামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলেন এবং তাতে তিনি বলেছিলেন- “পাকিস্তান যে ৫টি প্রদেশ নিয়ে গঠিত হতে যাচ্ছে তার ১টি প্রদেশের মাতৃভাষাও উর্দু নয়; তাদের মাতৃভাষা হলো পশতু, বেলুচি, পাঞ্জাবী, সিন্ধী, বাংলা। ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তান প্রদেশসমূহের বিদ্যালয়শিক্ষার বাহনরূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষার সপক্ষে যে অভিমত প্রকাশ কারয়াছেন, আমি একজন শিক্ষাবিদরূপে উহার তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেছি। ইহা কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিক শিক্ষানীতিবিরোধীই নহে, প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতি বিগর্হিতও বটে।”
‘মা-মাতৃভাষা-মাতৃভূমি প্রত্যেক মানুষের কাছে পরম আরাধ্য বস্তু’- এই আপ্তবাক্যটি যিনি মর্মে ধারণ করতেন তিনি যে লেখালেখিতেও ভাষা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন, তা তো বলাই বাহুল্য। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, স্বাধীন এ দেশের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আজ অনুচ্চারিত একটি নাম! জাতি হিসেবে এটি আমাদের জন্যে যে কত বড় লজ্জার তা অনুধাবন করবার যোগ্যতাও বোধকরি আমরা আজ হারাতে বসেছি। একজন সচেতন-বলিষ্ঠ ভাষাসৈনিক ও কলমযোদ্ধা কিভাবে ভাষাবৈজ্ঞানিক এবং ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও লিখনশৈলী নিয়ে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন- তা আমরা আর কবে বুঝবো!
আজীবন শিক্ষকতার পাশাপাশি অবিরত গবেষণা ও সাহিত্য সাধনা ছিল তাঁর অন্বিষ্ট। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ রচিত গ্রন্থসংখ্যা ৮৬; প্রবন্ধের সংখ্যা তিন শতাধিক আর গবেষণাগ্রন্থগুলো বাংলা ভাষার জন্মকথা ও বাংলা সংস্কৃতি সাধনার এক একটি আকর সদৃশ। তন্মধ্যে অবশ্যউল্লেখ্য কয়েকটি গ্রন্থ যথা- ১. হাজার বছরের পুরান বাঙ্গালায় সিদ্ধা কানুপার গীত ও দোহা (১৯২০), ২. বাংলা ব্যাকরণ (১৯৩৬), ৩.ভাষা ও সাহিত্য (১৯৩১), ৪.আমাদের সাহিত্য (১৯৪৯), ৫. বাংলা সাহিত্যের কথা (১ম খ- ১৯৫৩, ২য় খ- ১৯৬৫), ৬. বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত (১৯৫৯), ৭. Buddhist Mystic Songs (১৯৬৬),  ৮. Traditional Culture in East Pakistan (১৯৬১), ১০. ইসলামী বিশ্বকোষ।
দুষ্প্রাপ্য সাহিত্য ও নিগূঢ় বিষয় নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি এই বাংলা ভূখন্ডের লোকসংস্কৃতির প্রতি ছিল তাঁর প্রগাঢ় আগ্রহ ও অনুরাগ। ‘লোকসাহিত্য সংগ্রহ সমিতি’র প্রতিষ্ঠাতা তিনি। পাশ্চাতের ফোকলোরচর্চার বৈজ্ঞানিক ধারণায় বিশ্বাসী হয়ে তিনি ফোকলোর শব্দের প্রতিশব্দ করেছেন ‘লোকবিজ্ঞান’। আঞ্চলিক এসব সাহিত্য সংগ্রহের তাৎপর্য বর্ণনায় ‘পল্লীসাহিত্য’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন: ‘পল্লীর মাঠে মাঠে, পল্লীর আলো বাতাসে, পল্লীর প্রত্যেক পরতে পরতে সাহিত্য ছড়িয়ে আছে। কিন্তু বাতাসের মধ্যে বাস করেও যেমন আমরা ভুলে যাই যে, বায়ু সাগরে ডুবে আছি, তেমনি পাড়াগাঁয়ে থেকেও আমাদের মনে হয় না যে, এখানে কত বড় সাহিত্য ও সাহিত্যের উপকরণ ছড়িয়ে আছে।’
এই ভূখন্ডের বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক স্বাধীকার এবং বাংলা বুলির প্রাতিষ্ঠানিক রূপপ্রদানের লক্ষ্যে বাংলা ভাষায় স্বতন্ত্র অভিধানচিন্তার অধিনায়ক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। অভিধানপ্রণেতা হিসেবে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ অনতিক্রম্য এক ব্যক্তিত্ব। ১৯৬৫ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘পূর্ব পাকিস্তানী আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’- সম্পাদনায় তিনি যে পরিশ্রম ও পান্ডিত্য প্রদর্শন করেছেন তা অনবদ্য ও অনস্বীকার্য। বাংলা উপভাষার এমন সার্থক ও সার্বিক সন্নিবেশনের অভিধান সম্পাদনা তাঁর পূর্বেই শুধু নয় অদ্যাবধি আর কারও পক্ষে তা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। আলোচ্য অভিধানটি গ্রীয়ার্সনের ‘Linguistic survey of India’ গ্রন্থের আদর্শপ্রসূত হলেও মৌলিকত্ব ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমন্ডিত পরিকাঠামোর উপস্থিতিতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ যে অনেক ক্ষেত্রেই গ্রীয়ার্সনকে অতিক্রম করে যেতে সক্ষম হয়েছেন একথা বিদগ্ধজন সম্মত। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র সম্পাদনা জীবনের আরেকটি আলোকিত দিক হলো, তিনি শিশুপত্রিকাসহ সর্বমোট ৭টি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। বাংলা ভাষায় গবেষণার পাশাপাশি এ ভাষার ভবিষ্যৎ লেখক সৃষ্টিতে এসব পত্রিকা অব্যর্থভাবে ক্রিয়াশীল থেকেছে- যা তাঁর দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গিমার আর এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
আমৃত্যু জ্ঞানসাধনা ও গবেষণায় নিবিষ্ট থাকা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তাঁর পান্ডিত্যপূর্ণ অনবদ্য সব কাজের স্বীকৃতি পেয়েছেন জীবৎকালে যতোটা না, তার চেয়ে বেশি মরণোত্তর সময়ে- যা প্রায় প্রত্যেক জ্ঞানসাধকের জীবনেরই এক বিরূপ বাস্তবতা। শিক্ষকতার জীবনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯২৬ সালে প্যারিসের সর্বোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফারসি ভাষায় ‘Les chants mystiques de kanna at de saraha’ শীর্ষক থিসিস সম্পন্নের জন্যে ডি.লিট. ডিগ্রি লাভ করেন, এছাড়া একই বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে ‘Les sons due Bengali’ নামক প্রবন্ধের জন্য Diplo-phon সনদপত্র প্রাপ্ত হন তিনি। এছাড়া ফরাসী জাতীয় দিবসে তাঁকে ‘chavellar en ordre des arts et des letters’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। দেশীয় পরিসরে, ১৯৫২ সালে ঢাকা সংস্কৃতি পরিষদ ‘বিদ্যাবাচস্পতি’ এবং ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’ উপাধীতে সম্মানিত করে। ১৯৭৪ সালে মরণোত্তর ‘ডক্টর অব লিটারেচার’ প্রদান করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এছাড়া ‘ঢাকা হল’-এর নাম পাল্টিয়ে তাঁর সম্মানে ‘শহীদুল্লাহ্ হল’ রাখা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এই জ্ঞানতাপসের প্রতি চিরসম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ১৯৭৫ সালে নবনির্মিত কলাভবনের নামকরণ করা হয় ‘শহীদুল্লাহ্ কলাভবন’- যেটি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও ছাত্রপ্রিয় স্থান বলে সর্বজনস্বীকৃতি।
পরিশেষে ক্ষুদ্র পরিসরে বলতে চাই- পাকিস্তান আমলে ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি’ এমন উক্তি করা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র বিবিধমাত্রিক জ্ঞানসাধনা-গবেষণা-প্রজ্ঞা ও পান্ডিত্য আমাদের মতো তরুণ সাহিত্য-শিক্ষার্থীদের কাছে এক অনুসরণীয় এবং অবশ্যমান্য দৃষ্টান্ত বলেই বোধ করি। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র সমগ্র কর্ম এবং বাংলাভাষা উভয়েই সমান আয়ু নিয়ে এই ভূখন্ডে চিরকাল অম্লান থাকবে- এতে আর সন্দেহ কী!
তাঁর তিরোধান দিবসে তাঁকে জানাই সর্বাধিক সম্মান ও শ্রদ্ধা।
জয়তু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্।
লেখক: প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী।


Share this post in your social media

© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com