রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:৩০ পূর্বাহ্ন

আমাকে যে পিছু ডাকে । এম এ কাইউম

আমাকে যে পিছু ডাকে । এম এ কাইউম

আগের দিনে গাঁয়ে মাঝে মাঝে ছেলে ধরার রব উঠতো। গলাকাটা সৈয়দ আর হুক্কির গল্প ছড়িয়ে পড়তো চারধারে। রাতের আঁধারে কারা নাকি ঘরের দহলিজ থেকে ছেলে চুরি করছে। সাক্ষাৎ যারা দেখেছেন স্বাক্ষি-সাবুদও থাকতো তাদের সাথে। আমেনার মাকেও অমন কথা বলতে শোনা গেল। তো এতো বিভিষীকার মধ্যে কার সন্তান কোনটা উঠানে পায়খানা করেছে, কোনটাই বা বর্ষা কাদায় লুটোপুটি খাচ্ছে, কেউ আচারের বোয়ম ভাঙলো কিনা এতো ঠিকুজি রাখার সময় কোথায়! মায়েদের ঘর গেরস্থালিতে শুধু কাজ আর কাজ। ধানের গোলাটাও লেপে-পুছে রাখতে হতো। তেল-নুনের হিসেব করতেই ব্যস্ত থাকতে হতো সারাটা সময়। তার সাথে হাঁস-মুরগি, ছাগল-বকরি, গোলায় ধান তোলা, চাল কুটিদের চাল ঠিকমতো এলো কিনা তার হদিস, শীল-নুড়ো, যাঁতায় কত্তো কাজ। ওরি ভেতর সুজনি কাঁথার ধাগা (সুতা) তুলতে হতো পুরনো শাড়ির পাড় থেকে। তো মা ঠিক কবে সংসারে এসেছিলেন মনে নেই। তখন শিশু কালেই বিয়ে হতো মেয়েদের। বউয়ের পাশে স্বামীকে বাপ বাপ দেখাতো। রাতে স্বামীরা দু’তিনবার কাঁথাও পাল্টাতো। ছিট কাঁদুনে বউকে ভাগাড়ে জন্তু ফেলার মতো টেনে-হেঁচড়ে বাপের বাড়ি ফেলে আসতো। মুক্তির স্বাদে বউয়ের তখন যে কী আনন্দ! ডোবার ধারে ফড়িংয়ের লেজে সুতো বেঁধে নেচে নেচে ছড়া কাটতো। পাড়ার আর সব বন্ধুদের সাথে পুতুল খেলায় মেতে উঠতো। কখনো শ্বশুর বাড়ির লোকেরা বউ নিতে আসলে ভয়ে খড়ের গাদার ভেতর লুকিয়ে পড়তো। ধরা পড়লে টেনে হেঁচড়ে আবার দিয়ে আসতো স্বামীর ঘরে। সঙ্গে দাদি-নানিরাও যেতেন মান ভাঙাতে।

শুনেছি মায়ের উর্বরা জমিনে মরা-বাঁচা হালি হালি সন্তানদের ভেতর আমার অবস্থান ষষ্ঠ। একদিন মাকে জিজ্ঞেস করলাম- মা আমার জন্ম কবে গো? মা বললেন, অত কি আর হিসেব আছে বাপু। তখন-
আম-কাঁঠালের শাওন ছিল
দেশ ভাগেরই স্বাদটা ছিল
ঝান্ডা ছিল ছেয়ে-
জন্ম যে তোর অমন সময়
বৃটিশ তখন দেশান্তরি
হুড়কনিটা পেয়ে।

উড়ো উড়ো জন্মের ঠিকুজির হদিসটা পেলেও তা পাকাপাকি হয়ে গেল যখন মেজ ভাই আমার হাত ধরে টানতে টানতে এনে পাড়ার শেষ মাথায় সাবিত্রী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিলেন। মাস্টার মশাই আমার জন্ম সাল জ্যোতিষীর মতো হাতড়ে হুতড়ে আঙ্গুল গুণে বসিয়ে দিলেন ২৬ নভেম্বর ১৯৪৮। দুর্য্যু মাস্টার মশায়, ভুপেন বাবু আর উষা দিদিমণিকে আমার নমস্কার সেদিনের বয়স বেঁধে দেবার কলা কৌশলের কথা ভেবে। তাঁদের দেয়া কিশোরী বউয়ের বৃদ্ধ বর ঘাড়ে টানার মতো আজও টেনে চলেছি সেই জন্ম সালকে।

তো শিশুবেলা থেকেই উদ্ভাবনি শক্তি ছিল প্রখর। বাড়ির দলিল-খতিয়ান, চেক পরচার টিকিট উপড়ে খাতায় সেঁটে এ্যালবাম তৈরি, আনি কাটা সিকি বানানো, মাথায় কাগজ ঘষে অন্যের আঁকা ছবি নকল, পূজা-পার্বণে পুরুত ঠাকুরের প্রতিমা গড়া দেখে চিলে কোঠায় মূর্তি গড়া, টমেটো, বেগুন, শসা, কামরাঙা, খড়খড়ি গাড়ি আর গুলতির গুলি বানিয়ে চুলার গনগনে আগুনে পুড়িয়ে রং করাই ছিল দিন মানের কাজ। তারপরও থাকতো ঢেলিয়ে বরই পাড়া, মেওয়া আতা চুরি, ঘুড়ি ওড়ানো ইত্যাতি ইত্যাদি। এতে যে বিপত্তি ঘটেনি তা নয়, জমির খতিয়ানের টিকিট না থাকায় একবার মোকদ্দমায় বড় ক্ষতি হয়ে যায়। তাতে মেজ ভাইয়ের পিটুনির ঘায়ে দুদিন বিছানায় পড়েছিলাম। সুস্থ হয়ে গোপনে আবার লেগে যাই কাজে। দইয়ের ভাঁড়ের মুখে গরু-খাসির চামড়ার পর্দা সেঁটে ঢোল-ডুগডুগি, বাইস্কোপের বাক্স আর শিমুল গাছের কাঁটা কেটে ছাপচিত্রের শীল বানিয়ে দেয়ালে দেয়ালে মাখামাখিতে সে কি আনন্দ! একবার বাড়িতে পিঠে বানানোর ধুম পড়েছে। তার দুটো হাতিয়ে মাটিতে পুঁতে গাছ লাগিয়েছি। তাই নিয়ে কী হাসাহাসি। ভোতা বুদ্ধির অমন ছেলের কা- দ্রুত চাউর হলে সবাই আমাকে খেপাতো। মেজ ভাই ডাকতেন মটর বলে।

তো স্কুল পাঠের প্রথম দিন। বেবি ক্লাশ। পুবে বড় টিনের হলঘর। ঝাঁক ঝাঁক শিশু। কারো পোকা খাওয়া দাঁত, কেউ ফোকলা। খালি পা। কারো গায়ে গেঞ্জি-কলার ওল্টানো, পায়ে বিদ্যাসাগরের চটি কারো খালি পা। ভাঙ্গা শ্লেট পেন্সিল, ছেঁড়া ফাটা পুরনো বই। বই বলতে শিশুদের আদর্শ-পাঠ আর বিদ্যাসাগরের নবধারাপাত। দেয়ালের দিকটায় পায়া ভাঙ্গা টেবিলে বেত হাতে মীরা দিদিমণি। তো স্বরে অ স্বরে ‘আ হয়ে গেলে ঝাঁক ধরে নামতা কেটে ছুটি। আমরা তামার ফুটো পয়সায় তেতুলের চাটনি কিনে বন্ধুরা মিলে পাতা ছিঁড়ে চাটতে চাটতে বাড়ি ফিরেই লাটাই হাতে বিরুর মাঠে দে ছুট। ওপথেই যাচ্ছে গরুর গাড়ি। তাতে বোঝাই আখ। গাড়ির পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে গোপনে আখ টানায় তাড়া খেয়ে পালাতে গিয়ে কাঁচে পা চিরে দু’ফাঁক হয়ে গেল। ভুগে ভুগে জ্বর জ্বালা আর ঘা শুকানোর পর রাতে হেরিকেনের কালো চিমনির ধোঁয়ায় বই বিছিয়ে পড়ার ভান করে থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি- হঠাৎ মেজ ভাই এসে খামচে মাখার চুল ছিঁড়ে ঝাটনার মতো ছুঁড়ে ফেললেন। ব্যথায় সেরাতে আর ঘুম আসেনি।

পাড়ার শেষমাথায় সেবার সার্কাস এসেছে। নামকরা ‘কমলা সার্কাস’। নদী ঘেরা পাঁচানী মাঠ। ঈদের নামাজ, ফুটবল ম্যাচ ও মাঠেই হয়। রিং মাস্টার, সিংহ-হাতি, গাড়ল, বাঘ, গাধা ওসব ছিল সার্কাসের মূল আকর্ষণ। সকাল হলেই গলায় ঘন্টি বাজিয়ে শহর ঘুরতো সার্কাসের হাতি। কারো কলা গাছ, বট-পাকুড়ের ডাল টান দিয়ে ভেঙ্গে চিবড়ে খেতো ওই হাতি দুটো। আমরা ছুটতাম হাতির পিছে পিছে। ছোটরা বলতো- হাতি তোর পায়ের নিচে গরব। ওই সার্কাসে ছিল দুটো সার্চ লাইট। সাঁঝ গাঢ় হলেই আকাশে দেখা দিত মেঘ ছোঁয়া দুটো আলোর স্তম্ভ। মাঝে মাঝে দিক পরিবর্তন করতো। ভূত-পেতœীর ভয় দেখাতো বড়রা। চৌকিতে বসে ভয়ে জড়ষড় হয়ে থাকতাম আমরা। তখন ছারপোকার খুব দাপট। চক মেলানো বাড়ির মাঝে যে উঠোন সেখানে দিনমান রোদে পড়ে থাকতো কারো না কারো ধনুক বাঁকা ঘরের চৌকি। ওসব চৌকির ফাটা-ফুটোয় গরম পানি ঢেলে তোলা হতো ঘরে। গোলজান বুবু ছড়া কাটতেন-
উকুন আর ছারপোকাদের
শতেক নাতি-পুতি,
এক রাইতে নয় সন্তান
আবার গর্ভবতী।

তো বর্ষা এলেই ধুম পড়তো মাছ ধরার। বিকেল হলেই যেতাম নদীর ধারে। ওখানেই শ্মশান ঘাট। বটপাকুড়ের ডালে ডালে হরেক রঙের মানতের ত্যানা বাঁধা। দিনমান কোপনি ঠোঁকা সাধু-সন্ন্যাসীরা গাঁজার ব্যাসন টানতো। ডাঙ্গায় বাঁশ পুতে লম্বা বাঁশের মাথায় ছাকনি বেঁধে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ইলিশ শিকারের ভিড় ধরতো। কাছিম শিকারীরাও থাকতো গুচ্ছেক। কোনদিন দু’আনায় আস্ত ইলিশ কিনে বাসায় ফিরতো আসগর। ওখানে খবিরের গল্প জমতো। ছোটরা গোল হয়ে ঘিরে ধরতো। পাশেই বালিশ পায়ে থাকতো চার-চারটে হেলিকপ্টার। ওসব ওঠা-নামা করতো রাতদিন। গোরা সাহেবেরা কী সব করতো। সি-প্লেনও নামতো নদীতে। দেখতে ছুটতাম আমরা। কখনো কখনো সিনেমার বিজ্ঞাপন ছিটাতো আকাশে। কাটাঘুড়ি ধরার মতো আমরা ছুটতাম ধরার জন্য। খাটা পায়খানা তাতে কি সেখানেও ঢুকেছি। আন, শশী, বৈজুবাওরা, নাগিন, বহুতদিন হুয়ে ইত্যাদি সব সিনেমার বিজ্ঞাপন। ভারি কদর ছিল ওসবের। আবার সাঁঝে মাঝে মাঝে বুড়োদের মাঠে চিত্রে খবর দেখাতে আসতো সরকারি গাড়ি। ভটভট শব্দে পাড়ার সবাই ভেঙ্গে পড়তো। আবার ডালডা, গুড়া দুধ ও বিতরণ হতো ল্যাংড়া মাস্টারের বাড়ি থেকে। স্কুলে টিফিন দিত পোকা খাওয়া ভালগার হুইটের পায়েস। ক্ষুধায় অমৃত মনে হতো।

তখন কিই বা বয়স। বাবার মৃত্যুর টাটকা স্বাদ। মায়ের হাত নেড়ো হয়ে গায়ে চেপেছে সাদা থান। উড়োনচূড়ো স্বভাবের বড় ছেলে বেচতে শুরু করলো হাতে পাওয়া একচ্ছত্র জোত-ভিটে। রিক্সা, পিয়ানো, গ্রামোফোন, রেডিও, ফ্যান এমন কি বাড়ির পোঁতা টিউবওয়েল পর্যন্ত গেল বদ নেশায়। তাতে কলতলার গল্প এবং কলতলা থেকে ট্রায়াঙ্গলি পঞ্চাশ ফুট দূরত্বের বাড়িটা প্রতিদিনের আলোচনায় এক নম্বরে উঠে এলো। বাধ্য হয়ে হ্যাপা পোহাতে ছোটদের নিয়ে মা ঘুরে দাঁড়ালেন। কলকাতার হোস্টেলে হোস্টেলেই তো বড়ো হয়ে উঠেছে ছেলে। ঘোড়ায় চড়ে ক্লাসে যাওয়ার এই বিদ্যেয় যারা গ্যাম্বলার সঙ্গী জুটেছিল, থিয়েটার-আউটিং ইত্যাদি সব মিলিয়ে চুটিয়ে এনজয় করে ততোদিনে সবাই পালিয়েছে। আমাদের জৌলুসে তখন রিফু। পায়ে হেঁটে স্কুল। বেতন বাকির কারণে দু’একবার ডিফলটার হয়েছি। আত্মীয়-স্বজন এলে যন্ত্রণাবৃত মায়ের লজ্জায় গুটিয়ে থাকা স্বভাব দেখে আমরা আহত হতাম। তবু মা হাল ছাড়লেন না। সরস্বতী-লক্ষ্মী দুটোর কাঁধে ভর করে পড়ালেখায় ঠেলে তুলতে থাকলেন কোন মতে। দশ টাকা মণ দরে ধান বেচে মেজ ভাইকে দিলেন মেডিক্যাল কলেজে পড়তে। ওখানে তখন হাতে গোনা ক’জন ছাত্র মাত্র। চেয়ে-চিন্তে আনা বই পত্তর হাড়-হুড্ডি আর কঙ্কালের খুলিই সম্বল। মনে হতো রাতে ওসব নড়ে উঠছে। ভীষণ ভয় পেয়ে আমার জ্বর এসেছিল। ওগুলো ফেলে আসতে বলতাম ভাবিকে।
বাবার হাউস ফিজিসিয়ান ডা. মোহাম্মদ আলীর মৃত্যুর পর আলমারী ভর্তি ভর্তি ওষুধে পরবর্তীতে মেজ ভাই পরিবারের সবার চিকিৎসা সেবা দেয়া শুরু করেন। নানান ওষুধের পাউডার ঘুঁটে ঘুঁটে শিশির গায়ে কাগজে দাগ কেটে কেটে দিতেন ‘কারমিনেটিভ মিকচার’। বিচ্ছিরি গন্ধ। ওতেই তিন-চার দিনেই জ্বর পালাতো। জ্বর না ছাড়া পর্যন্ত গিলতে হতো সাগু-বার্লি। একবার লুকিয়ে হেঁসেল ঘরে ঢুকে পান্তা খেয়েছিলাম। তারপর যা কা-! জ্বর আরো বেড়ে গেল। ঘুমে ভুল বকতাম। জ্বর ছাড়তেও সময় নেয়।

সেবার প্রচন্ড শীত। ঈদ-পূজোর একসাথে লম্বা ছুটি। রাতভর দেবদারু আর বেতগাছের পাতায় ক্লাস সাজানোর প্রতিযোগিতা হয়ে গেল। পুরস্কারের আগেই ঘটলো বিপত্তি। ঊষা দিদিমণি নদীতে স্নান করতে জলে ডুবে মারা গেলেন। সেদিন স্কুল ভেঙ্গে পড়েছিল কান্নায়। সে কষ্ট আজও বুকে বাজে।

স্কুল ছুটি। ঝাই-ঝাপ্পা, কানামাছি, ডাংগুলি আর কাঠ সাজিয়ে টেনিস বলে টিপু খেলতে খেলতে বিরুর মাঠটা হঠাৎ থমকে গেল। সবার চোখ তখন পশ্চিম আকাশে। রমজানের চাঁদ উঠেছে। বাঁধানো দাঁতে চিকন তারের মতো ফালি। খুশিতে লোহার চাবির ফুটোয় ম্যাচের বারুদ ঢুকিয়ে পেরেক ঠুকে কেউ পটকা ফুটালো। কেউ সাবান ফেনার বুদবুদ ওড়ালো। আনন্দে খেলা ফেলে দৌড়ে আসি বাসায়। খোলামেলা দোতলার চিলের সা¤্রাজ্যে সবাই আকাশে চাঁদ দেখছে। বড়দের অন্য রকম আবেগ আর ছোটদের চলছে হৈ-হুল্লোড়। আঁধার নামতেই শীতের ভান করে ক্যাঁথার বাকল জড়িয়ে বসে বসে বড়দের গল্প শুনতে থাকি। মা সন্ধ্যা রাতেই রান্না সেরে রাখতে চান। শেষ রাতে ভাতটুকু ফুটিয়ে নিলেই চলবে। নিজেকে কাটাছেঁড়া করে মাকে রোজা রাখার কথাটা পেড়ে বসি। মা শ্বাসিয়ে দিলেন, -একদম না। যা ঠা-া পড়েছে। জ্বর ধরলে শেষে ঈদটাই মাটি হয়ে যাবে। ধাতানি খেয়ে অন্য ফন্দি এঁটে বেড়াল কু-লী দিয়ে পড়ে থাকি লেপের ভেতর। রাত প্রায় দেড়টা। চারধারে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা-গম্ভীর। জানালার ফুটো গলে বিড়াল পায়ে হু হু করে কনকনি উত্তরে হিম বাতাস ঢুকছে কাঁথার ফুটোয়। ঠান্ডাটা ভারি হয়ে আসছে ক্রমশই। দূরে কড়ি ফকিরের গলা। ওদের কেউ বলতো পয়গম্বর। প্রতি বছর শীত, গ্রীষ্ম-বর্ষায় পাড়ায় পাড়ায় ঘুম ভাঙ্গিয়ে বেড়াতো। অপূর্ব সে সুরেলা ডাক- জাগো জাগো আল্লাহকা পিয়ারে, রাতি হুয়ি ভোর। সঙ্গী-সাথি মিলে ওরা সংখ্যায় দু’জন থাকতো। অবাঙালি। হাতে অদ্ভুত লাঠি। পেতল ঝালাইয়ে নানান কারুকাজ। খানিকটা সর্পাকৃতি। কালো। তেলচুকচুক লাঠিটা আমরা অনেকবার নেড়ে চেড়ে দেখেছি। কাঁধে প্যাকাটে হাত পাঠিয়ে ধরে থাকতো কুচকুচে কালো তরমুজ ফালির ডোঙার মতো প্রায় একফুট লম্বা নারকেলের খুলির মত শক্ত ফলের খোল। ওতে ধরা থাকতো মুষ্টির চাল, আনি-দু’আনি আর তামার ফুটো এক পয়সা। হাতের নখে মেহেদীর ম্যেনিকিওর। কাঁধ সমান চুল-বুক বরাবর দাড়ি। তখন ছোট্ট একমুঠো শহর। তালাইমারী থেকে কোর্ট, উত্তরে স্টেডিয়াম পুবে ভদ্রা। কুমারপাড়া লঞ্চঘাট হয়ে স্লুইস গেটের বড় ড্রেন সোজা সাহেব বাজার হয়ে উত্তরে বারানই নদীতে মিশতো। বর্ষায় কলকলানি জল যেতো ওই ড্রেনে। মূল বাজারে ছিল বিশাল টমটম স্যান্ড। নাটোর রোড বাদ দিলে পুরটাই ধুলোর রাস্তা। তাতে দু’বেলা পানি ছিটাতো মিউনিসিপ্যালিটির গাড়ি। আমরা পিছে পিছে দৌড়ে পা ভিজাতাম। উত্তরে রেল গেট পেরুলেই লাটা-কাঁটার ঘন ঝোপ। সিঁথির আইলের মতো খোলার কুচি বিছানো চিকন রাস্তা ঝোপ ফেড়ে এগিয়েছে পবা থানা অব্দি। দূরে বাঘ-শিয়ালের আস্তানা। সাঁঝ নামলেই বেরুতো ফেউ। শিয়াল ডাকতো রাতভর। দিনের বেলা ঝোপা ঝোপা পাকা বেতফল পেড়ে আনতাম টমটমে চড়ে। তো পরীক্ষায় ফল বেরুবে শুনেই সারা রাত হাতুড়ির ঘায়ে হৃদয়ের বার্ণিশ খুলে খুলে পড়ে। ভয়তো ওই মেজ ভাইকে। তো ছুটির পর ফল বেরুলো। গোঁজ দিয়ে দিয়ে পার পেয়ে আছড়ে পড়ি থ্রিতে। বেঁচে গিয়ে এবার একটা শক্ত দল গোছাই। প্রায় স্কুল পালিয়ে বাঁধ ধরে ধরে পঞ্চবটি ঘাট। বর্ষায় বাঁধের নিচে থাকতো সার সার আম-ইলিশের নৌকা। ফেরারি যৌবনের গা ঘিনঘিনে ঝাটু পাগলির তাড়া খেয়ে দিক পাল্টে এবার আস্তানা গাড়ি মাদ্রাসা মাঠে। ওখানে খালি সিটে মাজেদ ভাই একশ পাঁচ ঘণ্টা সাইকেল চালাচ্ছে। গলা ভর্তি টাকার মালা। ভারি ভালো লাগতো। ফিরতি পথে দেখতাম রাহুচ-ালের যাদু, কখনো কাবুলিওয়ালাদের সিলাজুত আর হাত কাটা মহাশংকের তেল বিক্রি। মাস্টার মশাই দেখে ফেলায় পরদিন স্কুলের মাঝ মাঠে সূর্যের দিকে মুখ উঁচিয়ে নিলডাউন করে রেখেছিলেন। ক’দিন ভালো হয়ে থেকে আবার বদ বুদ্ধিটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। স্কুল গেটে বাইস্কোপে চোখ ভিড়িয়ে দেখতাম তাজমহল, কুতুব মিনার, মিনা কুমারীর ছবি। দেখতাম সোনাদীঘির কালোজলে আট ঘণ্টা পানিতে ডুবে থাকার মত তাজ্জব ঘটনা, বাঁদর খেলা, মহররমের তাজিয়া মিছিল, লাঠি খেলা ইত্যাদি ইত্যাদি। একবার পাড়ার স্বর্ণকারপট্টিতে কালিপুজার পটকার দোকানে আগুন ধরে গেল। আমি তখন চৌকিতে বসে। মুহূর্তে মাথার চুল নেড়ো হয়ে কপালে আছড়ে পড়লো একটা ভারি পটকা। খুবলে উড়ে গেল কপালের মাংশ। কিভাবে যেন বেঁচে যাই। মেজ ভাইয়ের চিকিৎসায় সেরে উঠতে সময় লাগে বটে তবে চিকিৎসার চেয়ে গাল-মন্দই ছিল ঢের। তো পয়গম্বররা বুড়ো হাড়ে কাঁপুনি ঠেকাতে রাস্তায় আগুনের আঁচে গা সেঁকে নিতো। ঈদের দু’একদিন বাকি থাকতে বকসিস তুলে চলে যেত দেশে। শিরইল বিহারি কলোনিতে থাকতো ওরা। গলার স্বরটা জোরালো হয়ে এবার আমাদের দরজায় আছড়ে পড়ে। মা বাতি জ্বালতেই ডাকটা আরেক বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। হাঁড়ির ঘুটমুটে ভাত চেপেছে। আমি তক্কে তক্কে থাকি। ঘুম এঁটে আসলেও চোখ বন্ধ করে জেগে থাকি। রান্না শেষে বড়দের গুজগুজ করে গল্পের ভেতর ফোটানো ভাতে সবার খাওয়া প্রায় শেষ। বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে বেরিয়ে সোজা থালা পেড়ে বসতেই ভূতগ্রস্ত হয়ে গেলেন সবাই। উপায়ন্তর না দেখে শরীরের কাঁপুনি ঠেকাতে মা তাড়াতাড়ি লুঙ্গি পেঁচিয়ে গলায় গিট্টি মেরে দিলেন। তখন কারোর সোয়েটার ছিল না। চাদরই সম্বল। তাও অনেক পুরোনো। বড়রা হাঁটুর কোঁচড়ের নিচে সানকির আগুনের আঁচ নিত। আমি খেয়ে দেয়ে ঢুকে পড়ি কাঁথার ভেতর। ঠা-ার ঝাঁকুনিতে শরীরটা লাফাতে থাকে। গল্প শুনি আব্দুলের মা’র। একটা ডুবুরির মাস্ক সমেত আব্দুলকে সঙ্গে করে ওরা এবাড়িতে এসেছিল। আব্দুল আমার সমবয়সি হলেও হতে পারে। হেমচন্দ্র লেনে আমাদের বাড়িটার খোলা মেলা ঢাউস শরীর। চাঁদ ওঠা আকাশ। মাঝ বাগান থেকে উঠে আসা হাসনাহেনা আর মাধবিলতার গন্ধ। সব মিলিয়ে অন্যরকম আবেগে একযুগ আর কোথাও যায়নি ওরা। থেকে গেছে। ডুবুরি স্বামীর মৃতদেহের মাস্ক আর একমাত্র সন্তান বুকে এ বাড়ির কূলে কিভাবে ভিড়েছে তারও এক বিচিত্র কাহিনি! এখন করগেট টিন ঝোলানো বারান্দার ঘেরার ভেতর ওদের মা-ছেলের পাকাপাকি থাকবার ব্যবস্থা। তবে কখনোই ঝি হিসেবে কেউ আমরা দেখিনি। টকটকে গায়ের রং। কাজে কামে মাকে সাহায্য করতো। বেশ বিশ্বাসী আর ধার্মিক। ছেলেটা আর একটু বড় হলেই ওকে নিয়ে চলে যাবার ইচ্ছে। পাশেই খোকনদের বাড়ি। আমার খেলার সাথি। ওর বাবার কাছে আসতেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী যামিনী রায়। আমরা লুকিয়ে ছবি আঁকা দেখতাম। বাড়ির সবার ছবি দেয়ালে দেয়ালে লটকানো। ওগুলো ওর বাবা বিমলা চরণ মৈত্রের আঁকা। একবার দুটো টিউব কালার চুরি করে নিজেও আঁকতে শুরু করে দেয়াল নষ্ট করে ফেলি। মা খুব বকেছিলেন। খোকনদের বাগানে ফুল ছিল দেখার মতো। গাছের অন্তিম ফরিয়াদে কাতর মিনতি থাকায় আমরা কখনো ফুল ছিড়তাম না। বরং আর সব বন্ধু মিলে খোকনদের বাগানে ঘুড়ি ওড়ানোর সুতোয় মাঞ্জা দিতাম। ডুঙ্গি ভাঁড়ে সাগু-বার্লি আর কাঁচের গুড়ো জ্বাল দিয়ে সুতোয় মাখিয়ে হতো মাঞ্জা। ওরই ফাঁকে বন্ধুরা মিলে বাগানের আম চুরি করে ঝিনুক ঘষে ফুটো করে ছিলে লবণ-ঝালে খেতাম। কী স্বাদ! ওই সময়ও ঝড় হতো কালবৈশাখী। ধুমশে আম কুড়াতাম। কালিডলা আকাশ ফুটো করে হাঁটু ডোবা শীল-ঝড়ে পশু-পাখি মরতো কুমড়োগাদি করে। আমরা ছড়া কাটতাম। বৃষ্টি ছাড়লে মানপাতার ছাতা মাথায় ধরে ঘরে ফিরতাম।

দিন পাল্টেছে। ফকিরের পাশাপাশি এলো টিকাপাড়া মহল্লার ডঙ্কাপার্টি। ঢোল পিটিয়ে এলো বাল্লবপাড়ার কসিরের দল। ওতেও কারো ঘুম না ভাঙলে প্রতিবেশীরা ডেকে দিয়ে আসতেন। রোজার নেকির সাথে বাড়তি সোয়াবের কাজে অনেকেই আগ্রহি ছিলেন। আমিও জানলায় মুখ ভিড়িয়ে মামিমাকে ডাকতাম। নিজে রোজাদার হয়ে সকালটা বুক ফুলালেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে রোজা ভাঙার ফিকির খুঁজতে থাকি। বাড়ির পেছনে ডোবা থেকে যে শশার লতাটা ফুল দিয়ে পাঁচিলে উঠে এসেছে তাতে উঁকি দিচ্ছে কাঁটা কাঁটা কচি শশা। পুট পুট করে ছিঁড়ে পকেটে ঢুকিয়ে নিই। ঘুড়ি ওড়ানোর নাম করে স্বপনদের চিলেকোঠায় লুকিয়ে গতি করি। মুক শুকনো দেখে ভোম্বল দুপুরে বেশ করে খাইয়েছিল। পরদিন আমার লাটাইটা ওকে দিয়ে দিলাম। প্রথম রোজাটা সরস্বতী পুজোর দিন হওয়ায় এবাড়ি ওবাড়ি ঢোল-করতাল তুঙ্গে। প্রসাদের ছড়াছড়ি। না খেয়ে থাকার অভ্যেস নেই। খালি পেটে খুব বেশি সময় থাকতেও পারি না। পকেটে হাত সাফাইয়ের এটা ওটা তাই থাকতোই। সেদিনও তাই হলো। প্রসাদ আর ঢক ঢক করে পানি পান করে মা’র কাছে সহজ সরল স্বীকারোক্তি। বড়দের উত্তর এলো ছোটরা ভুল করে একবার কেউ কিছু মুখে দিলে রোজা ভাঙ্গে না। ব্যাস হয়ে গেল- ইচ্ছেকৃত ভুলের অভ্যেস। কখনো ট্যাপ কখনো পুকুরে স্নান করতে ডুব পেড়ে পানি পান। প্রায় দুপুর গড়ালে অসিতের বাড়িতে কাকিমার কাছে ধর্ণা দিয়ে দিব্বি এক গাল খেয়ে রোজার সংখ্যা বাড়াতে থাকি। ওভাবে সপ্তমী-অষ্টমী কাটলো। দশমীতে পুলকদের পুকুরের পাড়ে পূজোর থানে কালীজবা ফুলের সাথে রাখা সিঁদুর দেয়া কলা আর গরুর গাড়ির পেছন থেকে টেনে বার করা আখ ছিলে খেতে আব্দুল দেখে ফেলায় লজ্জায় মাথায় চিড়িক দিয়ে ওঠে। দিনে অন্তত গোটা পাঁচ-ছ’বার লুকিয়ে খাওয়ার খেসারত এক আনার টোপ দিয়ে মিটিয়ে ফেলি। সামনের রথে এটা ওটা কিনে দেবার প্রতিশ্রুতিতে অবশ্য কাজ হয়েছিল। আব্দুল আর মুখ খোলেনি। উল্টে আমার কষ্ট আর বুকের বাতা বেরিয়ে যাচ্ছে বলে নানির কাছে রোজা রাখতে না দেয়ায় সুপারিশ করেছিল। ততোদিনে আমার গর্বের রোজার সংখ্যা পাঁচে উঠেছে। এ নিয়ে ছেলের গর্বে মা অন্যদের উদাহরণ দিতেন। খুশি হয়ে এসলাম দর্জ্জিকে ডেকে ফিতেওয়ালা পেল্টুন আর ছিটের হাফ হাতা জামা বানাতে দেন। দেত্তকীর বাবা যোগরূপ মুচি পুরনো স্যান্ডেল রং করে বাড়িতে দিয়ে গেল। সাদমানী চাচা দিলেন ঝুঁটিওয়ালা লাল টুপি। রাতভর সে কী আনন্দ! খুশিতে লেপের ভেতর বাতাসের সাথে গুজগুজ করে স্লেট-পেন্সিলে কেটে কেটে লিখে রাখি আমার নামের সাথে যোগ চিহ্ন দিয়ে অন্য এক সহপাঠিনীর নাম। ইচড়েপনায় জুলফির গুচ্ছেক চুল ছিঁড়েছিলেন মেজবুবু। ব্যথাটা আজও মনে আছে।

শৈশবের সুখ স্মৃতির অনেক সকাল-দুপুর জীবনের সেরা সম্পদ। একবার নৃপেন নাজির, দুদু, শাজাহান, সিকান্দার, মানিক, সদুর সাথে স্কুল পালিয়ে খাজা কেনার পয়সায় বিড়ি কিনে পদ্মার চরে প্রথম অভ্যেস করতে ভীষণ ফাঁপরে পড়েছিলাম। দম প্রায় আঁটকে বালুতে মুখ গুঁজে মাখা মাখি। সবাই ধরাধরি করে মাথায় জল ঢেলে তবেই রক্ষে। তুলসীপাতা-লেবুপাতা চিবিয়ে বাড়ি ফিরে ওইদিন আর স্কুলে যাইনি। বইখাতা বন্ধুরাই টেনে নিয়ে গেছিল বাড়ি।

পাড়ায় তখন একটাই সেমাই কল। বেঞ্চের মাথায় সেট করে পেট ঠুসে ঢোকাতে হতো রুলি আটা। হাতল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নুডুলসের মতো নেমে আসা সেমাই রোদে বিছিয়ে শুকাতে সময় আর শ্রমের শ্রাদ্ধ হলেও আনন্দের স্বাদটাই ছিল ভিন্ন। বাড়ি বাড়ি কলের চাহিদা থাকায় সারা মাস জুড়ে চলতো ধুম। কেঁচোর মতো মোটা থেকে দাঁতের খিলানের মত তিন ধরনের সেমাই নামতো হাতল ঘোরানো পেতলের ওই কলে। একবার ওটা চুরি হওয়ায় পাড়াসুদ্ধ কি হুলুস্থুল। বাটি চালান, হাত চালান- টোটকা সবকিছুর পর ঈদ ফুরিয়ে পাওয়া গেল কাবুল সেখের বাড়িতে। ওরা ঘরে আঁটকে গ্রামের বাড়ি যাওয়ায় অমন বিপত্তি ঘটেছিল। সেই থেকে কবিরের মা সবাইকে আর কলটা দিতেন না। সে সময় ঢেকি ঘরেও ছিল সুখ। দিনমান দুমদাম লেগেই থাকতো। যাঁতার ঘরে ঘড় ঘড় মেঘের ডাক। নাত বউদের নিয়ে দাদি-নানির কতো রসের গপ্পো। যেন একই গাছের ফুল। ঝড়-বাতাসে কখনো পাঁপড়ি ঝরবে না। পাড়ায় গরমের বিকেলে কাঠের গুড়ো মেশানো বরফের চাঁই ভেঙ্গে ভেঙ্গে বেচতো বুড়ো মুন্সি। বোঁচা হাজি বেচতো গাছপাকা বেল। ঘড়ি না থাকায় মেঘলা কিংবা বর্ষায় ভারি অসুবিধে। মসজিদ দূরে দূরে থাকায় ঠিক মতো আজান শোনা যেত না। মাইক নেই- খালি গলার আজান শনশনি বাতাসে না শোনায় ঘটতো নানান বিপত্তি। একবার দেখা গেল ইফতারির খানিক বাদেই রোদ ঝলমলে আকাশ। রোজদারদের মুখ শুকিয়ে আমচুর। সবার রোজাটাও নষ্ট হয়ে গেল। তো অমন ঘটনা চুরিওয়ালীরাও বলতো। দিনের বেলা পাড়া-মহল্লায় ওরা চুরি পরিয়ে বাড়ি বাড়ি বেচে বেড়াতো। ইরানী মেয়েরা বেচতো কিসমিস-বাদাম আর কাঁচি-ছুরি। টারসেল কাঁকই, টিকলি, আলতা, হিমানি, পাউডার, গন্ধতেল মাথায় ডালি সাজিয়ে ফেরি করতে আসতো বিহারী কলোনির বয়সি মেয়েরা। একবার আমি ভিড়ের ভেতর একটা আলতার শিশি চুরি করে পড়ার বইগুলোর কিনার রং করে বন্ধুদের নজরে আসি। মাথার ব্যামো সারতে শিঙে ফুঁকতে আসতো ডোবা অঞ্চলের বেদেনীর দল। ঠকিয়ে সোনাদানা হাতিয়ে পালাতো। সময় অসময়ে আসতো কাবুলীওয়ালা ঋণ আদায়ে। ওদের কাছ থেকে সুদে পঞ্চাশ টাকা ঋণ নেওয়ায় ওদের দেখলেই বড়ভাই আগেই গা ঢাকা দিতেন। সূদের টাকা না পেলে বড়ো ঝামেলা করতো কাবুলীর দল। দরজায় লাঠির ঘা মারতো। ভয় পেয়ে আমরা চৌকিরতলায় কাট মেরে থেকে ইশারা পেলে বেরিয়ে আসতাম। টিকা দিতে আসলেও একই ঘটনা। খড়ের গাদায় বেজির আস্তানায় ঢুকে যেতাম। ঢিবি তোলা মাটির এদো গন্ধ আজো স্মৃতিতে দোল খায়।

ঈদ আসছে। আগে ভাগেই ব্যস্ত থাকতাম রঙিন কাগজের ঝালরে ঘর সাজাতে। পাড়ার মেয়েরা ঝাঁটা করে ছাড়তো মেহেদির গাছ। রবি ঘোষ আগাম দুধ দুয়ে যেতো বাড়ি বাড়ি। মা নদীয়ার মেয়ে। খুব একটা মাংশ-পোলাওয়ের চল নেই বাড়িতে। বংশের কেউ কখনো গো-মাংশ তোলেনি। যে কারণে মায়ের আমল কেটেছে হাঁস-মুরগি-খাসির ভেতর। তল্লাটে তখন একটাই ঈদের জামাত। পাঁচানী মাঠে দু’দিন আগে থেকেই তরুণরা বাঁশের সীমানার দড়িতে রঙিন কাগজ সাঁটতো। চৌকি বিছিয়ে শাড়ির ঘেরে মেহেরাবে থাকতো বাহারি ডেকোরেশন। ঈদের জামাতে লোকজন আসতেন নিজ নিজ আসন হাতে। ডঙ্কা পিটিয়ে চাঁদা তুলতে আসা লোকজন জানিয়ে যেত নামাজের সময়। নামাজ শেষে এবাড়ি ওবাড়ির মিলন হতো। দুখিনী পদুর মা ফেতরার টাকা পেয়ে সেবার নিজের ঘরে দুধ সেমায়ের আয়োজন করেছিল। পানের বাটাও সাজিয়েছিল।

ঈদের চাঁদ দেখার সৌভাগ্যে সবাই জড়ো হতো বাবুদের তালতলায়, খোলামাঠ অথবা বাঁধে। শহরে পুরনো পুরনো সব বাড়ি ঘর। হাই রাইজ বিল্ডিং নেই। মেয়েরা চিলের খোলায় চাঁদ দেখে। আমাদের পা তখন মাটিতে নেই। এ দিনটা যে অন্যকোন দিনের মতো নয় একদম আলাদা বোঝাই যেত। চারদিকে মানুষের আনন্দরঙা মুখ। মনে অন্য ধরনের এক অপার্থিব সুখানুভূতির জন্ম। ভিড় সবখানে। মুদি থেকে মুচি। বোঁচা খলিফা রাত জেগে জেগে ঘটিহাতা ব্লাউজগুলোর ডেলিভারি দিয়েছে। তখনো রিক্সায় শাড়ি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে পর্দা করে এ বাড়ি ও বাড়ির মেয়েরা আসছে তাগাদায়। মশারি চোখের বোরকায় বয়সি মেয়েরা এসে ছোটদের চিন্তায় ধর্ণা দিয়ে বসে থাকতো। ওদের বিদেয় করতে বোঁচা দ্রুত হাত চালায়। কর্মচারি বড় বড় ফোঁড়ে বোতাম আঁটকে লটকে রাখে টুপি ঝোলানো দড়িতে।

ঈদের দিনে মোরগ বাঁক দিতেই বাড়িটা তখন জেগে উঠেছে। চুলোর ঘেরায় ব্যস্ততা। এটা জমছে ওটা জমছে। পাহাড়ের ঝাঁপি খোলা শীত। কেউ কথা বললে মুখে ধোয়া ওড়ে। ওরই ভেতর বড়োরা কূয়োর তোলা জলে খানিক গরম জল মিশিয়ে নেয়ে ফেলে। ফিকে আলোয় আমরা রাণীপুকুরে ঝাপ দিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে আগুন এঁচে দাঁতের বাজনা থামাই। ততক্ষণে এ বাড়ি ও বাড়ির হাঁক ডাকে মাঠে আগাম যেতে শুরু করেছে কেউ কেউ। বাবা-কাকার হাত ধরে যারা তাদের পিছু পিছু বকরির বাচ্চার মতো লাফাতে লাফাতে আরও ক’জন শিশু সার দিয়েছে। মামার কাঁধে চড়েছে দু’একজন। সে এক ভারি মজার দৃশ্য। বাঁধের ওপর দিয়ে হেঁটে আসা লম্বা কাফেলা ঈদগাহ মাঠের চিপা গলির চিপার ভেতর ঢুকতেই গামছা-থালা বিছানো লুড়োগাড়া-আর নুলো ফকিরের ক্যারিকেচারে জট বেধে হুড়োহুড়ি। গণচাপের ঢেউয়ে আমার স্যান্ডেলের ফিতে ছিঁড়ে লাপাত্তা। তাড়াহুড়োয় কোনমতে কারো বিছানো আসনের ওপর গেড়ে বসি। দক্ষিণ পদ্মার খোলা হিম বাতাসের ঠকঠকে কাঁপুনিতে মেরুদন্ডের ঢাকনি খুলে যায়। তো হঠাৎ মোল্লার লঘু-গুরু ওয়াজের পর নামাজ শেষে প্রথম কাতারে দু’জন মুসল্লির শুরু হয় হাতাহাতি। গোলমালে ভরে যায় এলাকা। মোনাজাত ছাড়াই নদীর পাড় ধরে পালিয়ে বাঁচি।

তখন ছোটদের ‘পকেটমানির’ রেওয়াজ নেই। পরবির তেমন চল না থাকায় খালা-ফুফুরা বেড়াতে এসে ফিরে যাবার সময় যে যা দু’চারপয়সা দিতেন ওসব কোমরের জালিতে জমিয়ে রাখতাম সুখারি রামের চানা আর দেবেন কাকার খাজা খাওয়ার জন্য। এখন সেই সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম স্মৃতির প্রতিটি মোচড় আমার ভেতরের গোপন দরজা একটা একটা করে কে যেন খুলে দেয়। এতে কেমন অপার্থিব জগতের বাসিন্দা হয়ে পড়ি। বাতাসে কান পাতলে আজো শুনি নিঝুম দুপুরে রামের বাবার সেই দই বিক্রির হাঁক। চোখে জল আসে। প্রকৃতির ভেতর বেড়ে ওঠা হারানো সে দিনগুলোর মূল্য যে সোনার ওপরে!


Share this post in your social media

© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com