মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ১১:০৩ অপরাহ্ন

সবাই তাহারে পারে না বুঝিতে

সবাই তাহারে পারে না বুঝিতে

Professor Dr. Md. Abdul Jalil (প্রফেসর ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল)

লেখক: প্রফেসর ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল, উপ-উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী।

বাংলার লোকসংস্কৃতির অঙ্গনে এক অত্যজ্জ্বল প্রতিভা লালন ফকির। তাঁর সঙ্গীতের সুরলহরিতে হিল্লোলিত হয় লোকমানসের হৃদয়-কানন। শৈল্পিক সত্তায় অনুরণিত হয় অনিন্দ্য ব্যঞ্জন। লালন গীতির কথনসৌকার্য, অভিব্যক্তির অভিনবত্ব, ছান্দসিকতার নৃত্য-চপল গতিশীলতায় পাঠক হৃদয় হয় বিমুদ্ধ-বিমোহিত। লালনের সুপরিছন্ন মানস-গঠন, সত্য-সন্ধ আলোকোজ্জ্বল জীবনায়ন, সুগভীর বিশ্বাত্মবোধে উজ্জ্বীবন, চিরসুন্দরের সাধনায় নিমজ্জন, লোকোত্তর প্রতিভার জাদুস্পর্শের উদ্ভাসন, প্রাণোচ্ছল অনুভূতির অভূতপূর্ব আলোড়ন, সুবচন ও সুভাষণের বহুমাত্রিক গুণেও লালন চরিত্রের মাধুর্য হয়ে উঠে অনন্যসাধারণ।

লালন সঙ্গীতের উদ্ভব কখনো আত্মগত সুখের অণে¦ষায়, কখনো শিষ্য ও ভক্ত-শ্রোতাদের শ্রবণমানসে। গুরুবাদী সাধনায় গুরু-শিষ্যের মধ্যে গুহ্যতত্ত্বের আলোচনা-পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয় একান্তে ও সংগোপনে। সর্বসমক্ষে এসবের প্রকাশ ঘটে তাত্ত্বিকতার আবরণে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, বাউলের সাধনা মূলত দেহতাত্ত্বিক সাধনা। এ ধরনের সাধনার আদর্শিক ঐক্য পরিলক্ষিত হয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে রচিত চর্যাপদে। চর্যার অধিকাংশ পদ তত্ত্বপ্রধান ও সংকেতধর্মী। চর্যার কতিপয় পদের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই উল্লেখ করা যেতে পারে লুইপাদের একটি পদের কথা। তিনি পদটি শুরু করেছেন এভাবে-

কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠা কাল ॥

এর আধুনিক অর্থ হলো- শ্রেষ্ঠ তরু এই শরীর, পাঁচটি তার ডাল (ডাল মানে- পঞ্চ ইন্দ্রিয়, যথা- চক্ষু, কর্ণ, নাসিক্য, জিহবা, ত্বক)। চঞ্চল চিত্তে কাল প্রবেশ করে।

কুক্কুরী পদের একটি পদে অনুরূপ সাংকেতিক অর্থের নিদর্শন মেলে। যেমন-

দুলি দুহি পীঢ়া ধরণ ন জাই।
রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাই ॥

আধুনিক বাংলা হচ্ছে- কচ্ছপ দোহন করে ভাঁড়ে ধরা যাচ্ছে না। কুমীরে খেয়ে নিচ্ছে গাছের তেঁতুল।

এর ভাবার্থ- যারা অনভিজ্ঞ তারা চিত্তকে নির্বাণমার্গে চালিত করতে পারে না, সহজানন্দও উপভোগ করতে পারে না। কিন্তু যে গুরুর উপদেশ পেয়েছে সে কুম্ভুক সমাধির সাহায্যে তার চিত্তকে নিঃস্বভাবে নিয়ে যেতে পারে।

কাহ্নুপাদের একটি পদের দুটি চরণ এরূপ-

ত্রিশরণ ণাবী কিঅ আঠক মারী।
নিঅ দেহ করুণা শূন মেহেরী ॥

আধুনিক বাংলা হচ্ছে- ত্রিশরণকে নৌকা ক’রে আট (অর্থাৎ অষ্টবিধ বিকল্পকে) মারলাম। নিজ দেহ (হল) করুণা ও শূন্য-মহিলা বা শূন্য অন্তঃপুর।

ভাবার্থ হলো- ত্রিশরণ অর্থে সাধারণত বুদ্ধ ধর্ম ও সঙ্ঘ এই তিনের শরণ বুঝায়। কিন্তু টীকা অনুসারে ত্রিশরণ হচ্ছে কায় বাক চিত্তের শরণ অর্থাৎ মহাসুখকায়। এই ত্রিশরণকে আশ্রয় করে আটকে মারা হলো অর্থাৎ স্কন্ধ ধাতু-আয়তন ও পঞ্চেন্দ্রিয় এই আট প্রকারের বিকল্পাত্মক জ্ঞান পরিহার করা হলো। এর ফলে দেহের মধ্যে মিলন হলো শূন্য ও করুণা।

লালন সঙ্গীতে এমনি ধরনের সাংকেতিক অর্থপ্রধান কিছু চরণ রয়েছে যেগুলো চর্যাপদের অনুরূপ তাত্ত্বিকতার আবরণে সমাচ্ছন্ন। যথা-

আহা মরিরে মরিরে মরিরে
তিন গর্ভে এক আছেরে ছেলে,
সে সবারে কয় মনের কথা
আমায় কয় না প্রাণ গেলে।

এখানে রূপকার্থে শুক্রকে ছেলে বলা হয়েছে। খাদ্য সার ও রক্ত এই তিন আশ্রয়ে শুক্র অবস্থান করে বলে শুক্রকে তিন গর্ভ অতিক্রমকারী সন্তান বলা হয়েছে।

আরেকটি গানে রয়েছে-

বাঁজা নারীর ছেলে মরলো
একি হলো দায়,
মরা ছেলের কান্না দেখে
মোল্লাজি ডরায় ॥

রূপকসাহিত্যে শুক্রকে বাঁজা নারী আর পুরুষাঙ্গকে ছেলে বলা হয়। শুক্রপাত রূপ মৃত্যুকে বাঁজা নারীর মরা ছেলে বলা হয়ে থাকে। অনুরূপ রূপকসাহিত্যে পুরুষাঙ্গকে মোল্লা বা মুনসিও বলা হয়। শুক্রপাতের পর পুরুষাঙ্গ নিস্তেজ হয়ে পড়ে, একেই মোল্লার ডরানো তথা ভীত হওয়ার কথা অনুমিত হয়েছে।

লালনের দেহতত্ত্ব বিষয়ক আরো কতিপয় জনপ্রিয় সঙ্গীত রয়েছে যাতে রূপকার্থের প্রয়োগ ঘটলেও তত্ত্বপ্রাধান্যের ততোটা বিড়ম্বনা স্বীকার করতে হয় না। তাঁর ‘খাচার ভেতর অচীন পাখি’ ‘আমার ঘরখানায় কে বিরাজ করে’ ‘আমার ঘরের চাবি পরের হাতে’ ‘আমার বাড়ির কাছে আরশী নগর’ ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে’ ‘পাখি কখন যেন উড়ে যায়’ ‘কে কথা কয়রে দেখা দেয় না’ ‘আঠারো মুকামের মাঝে’ প্রভৃতি সঙ্গীত যার বিশেষ দৃষ্টান্ত।

লালন দেহ-আত্মার পারস্পারিক সম্পর্ক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে যত্রতত্র রূপকধর্মী শব্দের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। যেমন দেহ বলতে- ‘খাঁচা’, ‘ঘর’, ‘বাড়ি’, ‘নৌকা’, ‘বৃক্ষ’, ‘কানন’, ‘রংমহল’ এবং আত্মা নির্দেশ করতে- ‘পাখি’, ‘মনের মানুষ’, ‘সখের মানুষ’, ‘অচিন মানুষ’, ‘ভাবের মানুষ’, ‘রসের মানুষ’ ইত্যাদি নামে সম্বোধন করেছেন। এধারার একটি বিখ্যাত সঙ্গীত হচ্ছে-

‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কমনে আসে যায়’

এখানে খাঁচা- মানে দেহ, আত্মা মানে পাখি বোঝানো হয়েছে। বাউলের দৃষ্টিতে বায়ূই হচ্ছে আত্মা। যে কারণে তারা বায়ূকে প্রাণবায়ূ নামেও অভিহিত করে থাকেন। আমরা প্রতিনিয়ত যে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ-বর্জন করে থাকি প্রকৃতপক্ষে তাই খাঁচা রূপ দেহের মধ্যে পাখিরূপ আত্মার গমনা-গমন বোঝানো হয়েছে।

লালন শুধু সাধক নন- কবি ও শিল্পী। তার দেহ তত্ত্বপ্রধান গানে তাঁর শৈল্পিক সত্তার যথেষ্ট পরিচয় লক্ষ্য করা যেতে পারে। তিনি মানব দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমূহের কার্যকারিতার যে নান্দনিক ব্যাখ্যার অবতারণা করেছেন তা সত্যি প্রশংসার দাবিদার। তিনি যখন বলেন-

আট কুঠরি নয় দরজা আঁটা
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা,
তার উপরে সদরকোঠা
আয়না মহল তায়।

তখন সাধারণ শ্রোতার পক্ষে এর মর্মোদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠে। লালনের এসব তাত্ত্বিক কথার মর্মোদ্ধারের জন্য প্রয়োজন তান্ত্রিক সাধনলব্ধ জ্ঞান; অথবা এ্যানাটমিক্যাল নলেজ (দেহ গঠনতন্ত্র বিষয়ক জ্ঞান)। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই উল্লেখ করা যাচ্ছে ‘আট কুঠরি’র কথা। মানবদেহে আট কুঠরি সন্ধান মেলে মাথার খুলির গঠন প্রণালী দেখে। খুলির বাম পাশ্বে চারটি এবং ডান পাশ্বে চারটি গোলাকৃতির গর্ত দেখতে পাওয়া যায়। মস্তিস্কের সিটিস্ক্যান করলেই দৃশ্যটি স্পষ্ট হবে। আগের দিনে তান্ত্রিক সাধকেরা শিষ্যদের দেহতত্ত্ব বিষয়ক জ্ঞান প্রদানের ক্ষেত্রে শিষ্যের সামনে মৃত ব্যক্তির মস্তিস্ক উন্মুক্ত করে এর গঠন প্রণালী ও কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা প্রদানের চেষ্টা করতেন।

অতঃপর বলতে হয় দেহের নয়টি দরজার কথা। এই দরজাগুলো হচ্ছে- চোখ-২, নাক-২, কান-২, মুখ-১, গুহ্যদ্বার-১ আর যৌনদ্বার-১। এভাবেই নির্ণয় করা যেতে পারে নয়টি দ্বার বা দরজা। মানব দেহের ‘মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা’ বলতে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমূহের অন্যান্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বায়ূপথ যথা লোমকুপের গোড়ালিসমূহকে নির্দেশ করা হয়েছে। একই স্তবকের তৃতীয় চরণে উল্লেখ্য রয়েছে- ‘সদর কোঠা’ তথা মস্তিস্কের কথা। হিন্দু তন্ত্রে একেই সহ¯্রার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তান্ত্রিকেরা মেরুদন্ডের নিম্নভাগ থেকে শুরু করে মেরুদন্ডের শীর্ষভাগ মস্তিষ্ক পর্যন্ত অংশগুলো মোট সাতটি চক্র তথা তলায় বিভক্ত করে মূল্যায়ন প্রয়াসী হয়েছেন। এই চক্রগুলি হচ্ছে যথাক্রমে- মূলাধার চক্র, স্বাধিষ্ঠান চক্র, মণিপুরি চক্র, অনাহত চক্র, বিশুদ্ধ চক্র, আজ্ঞা চক্র, সহস্রার তথা মস্তিষ্ক। লালন যাকে সদর কোঠা বলেছেন সেটাই মস্তিস্ক আর সেখানেই রয়েছে ‘আয়না মহল’ তথা ‘চোখ’।

এমনি ধরনের রূপকার্থ প্রধান আরেকটি উল্লেখ্যযোগ্য সঙ্গীত-

‘আমার বাড়ির কাছে আরশি নগর,
সেথায় এক পড়শি বসত করে’।

এই চরণটিতে তিনটি রূপক শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে; যথা- ‘বাড়ি’, ‘আরশিনগর’, ‘পড়শি’। বাড়ি বলতে সাধক তার দেহভান্ডের কথা বোঝাতে চেয়েছেন। অতঃপর বলেছেন- আরশিনগর এর কথা। হৃদয়কেই বলা হয়েছে আরশিনগর। হৃদয় প্রকৃত অর্থেই আয়না বিশেষ। সেখানে ‘পড়শি’ তথা প্রতিবেশির অবস্থানের কথা স্থান পেয়েছে। আমাদের দেহে দুটো আত্মার সহঅবস্থান, একটি জীবাত্মা, অপরটি পরমাত্মা। সাধক এই পরমাত্মাকেই ‘পড়শি’ নামে অভিহিত করেছেন। সাধক দুঃখ করে বলেছেন- ‘আমি একদিনও না দেখিলাম তারে’। লালন যথার্থই বলেছেন- কেননা, পরমাত্মাকে দেখা যেতে পারে না, তাকে হৃদয় দিয়েই হৃদয়াঙ্গম করতে হয়। সাধনার শীর্ষস্তরে উপনীত না হওয়া পর্যন্ত যা সম্ভব নয়। সুফি সাধনায় একেই বলা হয়েছে ‘হকিকত’ এর স্তর যথা অতীন্দ্রিয়লোকে উপনীত হওয়ার স্তর।

এই গানে একটি চরণের পাঠান্তর পরিলক্ষিত হচ্ছে। মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন সম্পাদিত ‘হারামণি’র সপ্তম খন্ডের ২৮ নং সঙ্গীতে স্থান পেয়েছে এই পাঠান্তর। সেখানে উল্লিখিত হয়েছে-

‘আমি একদিনও নারে ‘না’ দেখিলাম তারে।’

এই চরণে অতিরিক্ত একটি ‘না’ শব্দের প্রয়োগ ঘটেছে। তার ফলে দুটো ‘না’ শব্দ প্রয়োগের ফলে সমগ্রবাক্যের অর্থান্তর ঘটে যাচ্ছে। আঙ্কিক শাস্ত্রে যাকে উড়ঁনষব ঘবমধঃরাব এ চড়ংরঃরাব বলা হয় এক্ষেত্রেও ঘটেছে তাই। এ থেকে সাধক লালন বুঝাতে চেয়েছেন এমন একটি দিনও নেই যেদিন সে তার পড়শিকে দেখেনি অর্থাৎ তাঁর পরমাত্মাকে হৃদয়াঙ্গম করতে পারেন নি।

সাধক অতঃপর পড়শির অবস্থানের পরিচয় প্রসঙ্গ বলেছেন- ‘সে ভাসে শূন্যাকারে’, ‘ভাসে নীরে’। সাধক এখানে দুটো অবস্থানের পরিচয় নির্দেশ করেছেন। একটি ‘শূন্যাকার’ অপরটি ‘নীরে ভাসমান’। লালনের অভিব্যক্তি- সে তো প্রকৃত অর্থেই নীরাকার, নিরাবয়ব, শূন্যময়। নামান্তরে তিনি নিরঞ্জন। অধিকাংশ শ্রোতা শূন্যাকারের পরিচয় পেলেও ‘নীরে ভাসমান’ কথাটির তাৎপর্য উদ্ধারে গলদঘর্ম হয়ে পড়েন। কারণ এই ‘নীর’ অর্থ বাসা বা আশ্রয়স্থল নয়। নীর অর্থ পানি বা জল।

বাউল শাস্ত্রে ‘নীর’ ও ‘ক্ষীর’ তত্ত্ব জীবনধর্মী একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব বিশেষ। বাউল মতে ‘নীর’ অর্থে নারীর রজঃ আর ‘ক্ষীর’ অর্থে পুরুষের বীর্য বা শুক্র বোঝায়। রজঃ ও বীজের মিলনের ফলে সৃষ্ট হয় মানব দেহ। এখানে পরমাত্মাকে সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় ভাসমান সত্তা রূপে দেখার প্রয়াস রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটিও শূন্যাকার সত্তারই ভিন্নতর রূপ।

লালন ফকিরের তাত্ত্বিক সঙ্গীত জগতে আকড় সঙ্গীতের ভূমিকায় রয়েছে-

‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে
আমরা ভেবে করব কী,
ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম
তাকে তোমরা বলো কী।

দেহতাত্ত্বিক সাধনায় দেহভান্ডকে বিশ্বব্রহ্মান্ডের প্রতীক রূপে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। ব্রহ্মান্ডলোকে যেমন- সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ-নক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত, জলাশয় প্রভৃতি বিরাজমান তেমনি দেহভান্ডেও উদিত হয় সূর্য-চন্দ্র, প্রবাহিত হয় নদীর প্রবাহ, আবির্ভাব ঘটে অমাবস্যা-পূর্ণিমার। চন্দ্রোদয়ের সঙ্গে সমুদ্রের জোয়ার ভাটার যেমন ওতপ্রোত সম্পর্ক তেমনি চন্দ্রোদয়ের সঙ্গে নারীর রজঃ ধারার উৎসারণ ও তিরোধানের সুগভীর সম্পর্ক। এখানে একজন নারীকে চাঁদ এবং তার রজঃপ্রবাহকালীন অবস্থাকেই আরেকটি চাঁদের আবির্ভাব কল্পনা করা হয়েছে। অতঃপর একেই ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে’ বলা হয়েছে।

এছাড়া বাউলরা ‘চন্দ্র’ শব্দটি বিভিন্নার্থে ব্যবহার করে থাকেন। চন্দ্র শব্দে তারা শুক্র, শুক্ররূপী মনের মানুষ, প্রেম, সাধনালব্দ জ্ঞান, চন্দ্রবৎ জ্যোর্মিয় পদার্থ যথা- ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, বোম এই পঞ্চভূতের সম্মেলনে দেহভান্ডের মধ্যে অবস্থিত মল, মূত্র, রজঃ ও শুক্রকে তারা ‘চারি চন্দ্র’ নামে অভিহিত করেছেন। কোনো কোনো বাউল এর সঙ্গে নারী দেহের বিভিন্ন স্থানে চন্দ্রের অবস্থানের কথা আরোপ করেছেন। তাদের মতে নারী দেহের মধ্যে মোট সাড়ে চব্বিশ চন্দ্রের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এগুলো হচ্ছে- করনখে ১০, পদেনখে ১০, দুই গন্ডে ২, অধরে ১, ললাটে ১/২ এই মোট সাড়ে চব্বিশ চন্দ্র। কেউ কেউ আট চন্দ্রের কথাও উল্লেখ করেছেন এগুলো হচ্ছে যথা- মুখে ১, স্তনে ২, হস্তে ২, বক্ষে ১, নাভীতে ১, উপস্থে ১ মোট আট।২৫ এই স্তবকের অবশিষ্ট দুটো চরণে স্থান পেয়েছে- ‘ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম’। এক্ষেত্রে কোনো কোনো গবেষকের মতে- ‘দেহ’ হচ্ছে ‘ঝি’, আর ‘রতি’ হচ্ছে মা। এ থেকেই ‘ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম’ তত্ত্বের উদ্ভব বিচার করেছেন।

অতঃপর যে জটিল তত্ত্বটি এই গানে স্থান পেয়েছে তা হলো-

ছয় মাসের এক কন্যা ছিল
নয় মাসে তার বিয়ে হলো,
এগার মাসে তিন সন্তান হলো
কোনটা করবে ফকিরি।

এই চরণ চারটি থেকে তিনটি তত্ত্বের ইঙ্গিত লাভ করা যায়। যথা- ১. উদ্ভিদ তত্ত্ব, ২. সংখ্যাতত্ত্ব ও ৩. মানবসৃষ্টি তত্ত্ব। উদ্ভিদ তত্ত্বের দিক থেকে একটি কদলি বৃক্ষের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যেতে পারে। সাধারণত একটি কদলি বৃক্ষ পরিবর্ধনের ক্ষেত্রে ছয় মাসে পূর্ণতা পায়, নয় মাসে ফলবান হয়ে ওঠে ও এগারো মাসে ফলগুলো খাদ্যের উপযোগিতা লাভ করে। অনুরূপ সংখ্যা তত্ত্বে ত্রিশ সংখ্যাটি জাগতিক ও পারমার্থিক বিশ্বের অনেক কিছুর ইঙ্গিত বহন করে। এ প্রসঙ্গে ত্রিশ সংখ্যাটি যথার্থভাবে নির্ণয় করার প্রয়াস পাওয়া যাচ্ছে; যেমন- ছয় মাস থেকে সংখ্যা-৬, এক কন্যা থেকে-১, নয় মাস থেকে-৯, এগারো মাস থেকে-১১ এবং তিন কন্যা থেকে-৩ সর্বমোট ৩০ সংখ্যাটি লাভ করা যাচ্ছে। ত্রিশ সংখ্যাটির প্রভাব পরিলক্ষিত হয় মূলত তিনটি ক্ষেত্রে যথা- সৌরবর্ষ গণনায় ৩০ দিনে মাস হয়, নারীর রজঃ চক্র ৩০ দিনে ঘূর্ণায়মান হয় এবং ইসলামি জগতের পবিত্র কুরআন ৩০ পারায় তথা অধ্যায়ে পূর্ণতা পেতে দেখা যায়। এ বিষয়ে অধিকতর অনুসন্ধান করতে পারলে এ সংখ্যাটির আরো জীবন উপযোগী নানামাত্রিক বৈশিষ্ট্যের সন্ধান মিলতে পারে। অতঃপর মূল্যায়ন করা যেতে পারে মানব সৃষ্টি তত্ত্বের কথা। আমরা যদি গানে স্থান প্রাপ্ত ৬ মাস, ৯ নয় মাস ও ১১ মাসকে বছরে রূপান্তর করে নিতে পারি তাহলেও এ তত্ত্বের অর্থোদ্ধার করা সম্ভব।

সামাজিক প্রথানুসারে একটি মেয়ের ছয় বছরে বিয়ে হতে পারে, নয় বছরে সে রজঃস্বলা হতে পারে, নয় বছর দশ মাসে একটি সন্তানের জননী হতে পারে। অতঃপর চল্লিশ দিন পিরিওডিকাল অধ্যায় বাদ দিয়ে পুনরায় নয় মাস দশ দিনে আরেকটি সন্তানের জননী হতে পারে। এর ফলে দুটি সন্তানের জননী হতে তার সর্বমোট সময় লাগে ৫৮০ দিন তথা ১ বছর ৭ মাস। দুই বছর পূর্ণ হতে অর্থাৎ ১১ বছর হতে বাকি থাকে ৫ মাস। এই সময়ের মধ্যে একটি সন্তান দান করা কোনো মায়ের পক্ষেই সম্ভব নয়, তবে সন্তান সম্ভবা হতেই পারে। সে ক্ষেত্রে গর্ভবতী সন্তানের বয়স হবে ১১০ দিন অর্থাৎ তিন মাস বিশ দিন (পিরিওডিকাল অধ্যায়ের ৪০ দিন বাদে)। এক্ষেত্রে বিতর্কের সমাধানার্থে তিন সংখ্যাটি যদি বহুবচনার্থে ধরে নেই তাহলে একজন নারীকে ১১ বছরে তিন সন্তানের জননী হওয়ার গৌরব প্রদান করা যেতেই পারে। বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। এক্ষেত্রে অধিকতর গবেষণার দাবী রাখে।

এই গানের তৃতীয় স্তবকের চরণ চারটিও তাত্ত্বিকভাবে অপেক্ষাকৃত জটিলতর। যেমন-

ঘর আছে দুয়ার নাই,
মানুষ আছে তার কথা নাই,
কেবা তাহার আহার জোগায়
কে দেয় সন্ধ্যাবাতি।

এখানে মাতৃগর্ভকালীন শিশুর কথা বলা হয়েছে। মাতৃগর্ভকেই ‘ঘর’ বলা হয়েছে, এমতাবস্থায় শিশু নির্বাক থাকে। মায়ের আহার্যেই তার আহার্য সম্পন্ন হয় এবং মায়ের আরাধনাতেই তার আরাধ্যজীবনের অভিব্যক্তি পায়। এছাড়া এ গানটির শেষ স্তবকে রয়েছে-

লালন সাঁইজি ভেবে বলে
মাকে ছুঁলে মরে ছেলে,
এ তিন কথার অর্থ নইলে
তার হয় না ফকিরি।

এখানে তিনটি রূপকধর্মী শব্দের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যথা- ‘মা’, ‘ছেলে’ ও ‘মরা’। রূপক সাহিত্যশিল্পে শুক্রকে মা, পুরুষাঙ্গকে পুত্র বা পিতা বলা হয়। শুক্রপাত হওয়ার ফলে পুরুষাঙ্গের নিস্তেজপ্রাপ্তি ঘটে। একেই মাকে ছুঁলে ছেলে মরার তত্ত্বটি পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে লালন দেহতত্ত্ব প্রধান সঙ্গীত রচনা করতে গিয়ে জৈবিক জীবনের নানা কার্যকারিতাকেই তাত্ত্বিকতার গৌরবে অভিষিক্ত করেছেন।

সাধক লালন ফকির জীবন সায়াহ্নে উপনীত হয়ে মর্মবিদারক একটি সঙ্গীত রচনা করেন যার আদ্যচরণ হচ্ছে- ‘পাখি কখন যেন উড়ে যায়’। লালন এ থেকে বুঝাতে চেয়েছেন ‘বনের পাখি যেমন খাঁজাবন্দি জীবন পছন্দ করে না, তেমনি মানবাত্মাও দেহাধারে বন্দি থাকতে চায় না’।

বার্ধক্যের অনিবার্যতায় দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো অচল হয়ে পড়েছে। লালন এই অবস্থার বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন- ‘খাঁচার আড়া পড়লো খশে, পাখি আর দাড়াবে কিশে’। লালনের উপলব্ধি ছিলো- ‘দেহ বলি আর আত্মাই বলি এরা কেউই কারো আপন নয়’। তার ভাষ্যে-

ভেবে চিন্তে নাহি দেখি,
কারবা খাঁচা কে বা পাখি,
আমার এই পিঞ্জিরায় থাকি
আমারে মজাতে চায়।

পরিণত জীবনে এসে তার উপলব্ধি ঘটেছে- আত্মার স্বরূপ প্রকৃত অর্থে জংলী পাখি সদৃশ। যত আদরই করা যাক না কেন সে কখনো পোষ মানবে না। তাই তাকে ভালোবাসার কোনো অর্থ থাকতে পারে না। লালন মানব জীবন সম্পর্কে সেই শ্বাশত উপলব্ধির কথাই এই গানের মধ্য দিয়ে অভিব্যক্তি ঘটিয়েছেন। দার্শনিক লালন জীবন প্রীতিকে যন্ত্রণার নামান্তর রূপে উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলেই লিখতে পেরেছেন-

আমার এই পিঞ্জিরায় থাকি
আমারে মজাতে চায়।

লালনের অধিকাংশ সঙ্গীত শ্রুতিমাধুর্যে অনন্য, কিন্তু উপলব্ধির ক্ষেত্রে কণ্টকাকীর্ণ। এ কারণে লালনের গান যথার্থভাবে উপলব্ধির জন্য মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন, আবশ্যক সূক্ষ্মজ্ঞানের পথে বিচরণ। এই দুইয়ের সমন্বয় ব্যতীত লালনগীত হৃদয়াঙ্গম করা কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়।


নিউজটি অন্যকে শেয়ার করুন...

আর্কাইভ

business add here
© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com