রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৫:০১ পূর্বাহ্ন

রবীন্দ্রনাথের লোকসংস্কৃতি অন্বেষা | প্রফেসর আবদুল খালেক

রবীন্দ্রনাথের লোকসংস্কৃতি অন্বেষা | প্রফেসর আবদুল খালেক

Professor Dr. Abdul Khaleque (প্রফেসর ড. আবদুল খালেক)

লোকসংস্কৃতি চর্চার ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে লোকসংস্কৃতি জিজ্ঞাসায় রবীন্দ্র প্রতিভার স্বরূপ সন্ধান এবং লোকসংস্কৃতি অন্বেষায় রবীন্দ্র মনন ও কর্মসাধনার গতি-প্রকৃতির নবমূল্যায়ন অপরিহার্য।

বাংলা লোকসংস্কৃতি শব্দটি যখন আমরা উচ্চারণ করি তখন দুটো ইংরেজি শব্দ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে যায় যেমন- ফোকলোর এবং ফোককালচার। ফোকলোরের জগৎ এবং ফোককালচারের জগতের মধ্যে বড় রকমের পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবু শব্দ দুটির আলাদা তাৎপর্যকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। ফোককালচার শব্দটি অধিক প্রচলিত এবং অধিক পরিচিত। রবীন্দ্রনাথ লোকসংস্কৃতিকে ইংরেজি ফোককালচারের সমার্থক শব্দ হিসেবেই ব্যবহার করেছেন ফোকলোরকে নয়।

লোকসংস্কৃতি নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি বলেই অধিক পরিচিত। প্রাচীন এবং মধ্যযুগের বাংলাদেশে নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর প্রাধান্য বিবেচনায় আমরা বলতেই পারি আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী মোটামুটিভাবে লোকসংস্কৃতি নির্ভর জনগোষ্ঠী। আমরা জানি মানুষের জীবন এবং মানুষের সংস্কৃতি অবিচ্ছিন্ন। এ কথাই যদি সত্য হয়, সে ক্ষেত্রে লোকসংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে আমাদের জীবনচর্চার কোন সুযোগ নেই।

লোকসংস্কৃতি চর্চার ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে লক্ষ্য করা যায় ভারতীয় উপমহাদেশে ঊনিশ শতকে ইংরেজ শাসন শুরু হবার আগ পর্যন্ত লোকসংস্কৃতি সৃষ্টির দিকটা যতটা উজ্জ্বল, গবেষণা বা অনুসন্ধানের দিকটি ততটা উজ্জ্বল নয়। পাশ্চাত্য মনীষীদের আগ্রহ ও উদ্যোগে প্রাচ্যতত্ত্ব ও ভারত বিদ্যার অনুষঙ্গে দেশীয় ক্ষেত্রে লোকসংস্কৃতি চর্চার সূত্রপাত হয়েছিল। এ ব্যাপারে পথিকৃতের গৌরব এবং মর্যাদা ইংরেজ মিশনারী, পর্যটক, প্রশাসক, নৃতাত্ত্বিক, সমাজতাত্ত্বিক গবেষক-অনুসন্ধানকারীদেরই প্রাপ্য।

আমাদের দেশে লোকসংস্কৃতি চর্চায় ব্যক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণকারীদের মধ্যে সর্বপ্রথম যাঁর নাম করতে হয় তিনি হলেন ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের অধ্যক্ষ উইলিয়ম কেরী। কলেজ প্রতিষ্ঠার সূত্রে পাঠ্যপুস্তকের অভাব দূর করার জন্য দুটি অভিনব গ্রন্থের পরিকল্পনা করে কলেজের প-িত মুনসীদের দিয়ে তিনি লিখিয়ে নিয়েছিলেন। প্রথম গ্রন্থটির নাম ‘কথোপকথন’ (১৮০১) এবং অপরটি হল ‘ইতিহাসমালা’ (১৮১২)। কথোপকথনের মধ্যে সংকলিত হয়েছে বাংলাদেশের নানা স্তরে বিভক্ত জনজীবনের মুখের ভাষা। ‘ইতিহাসমালা’ ইতিহাস গ্রন্থ নয়, গাল-গল্পের সমষ্টি। পঞ্চতন্ত্র, হিতোপদেশ, বেতাল পঞ্চবিংশতি প্রভৃতি থেকে যেমন কিছু কাহিনীর অনুবাদ করা হয়েছে, তেমনি এতে আছে বাংলাদেশে প্রচলিত লৌকিক গল্পকথার সমাবেশ। শ্রীরামপুর মিশনের মুখপাত্র মার্শম্যান সম্পাদিত ‘সমাচার দর্পন’ পত্রিকায় বাংলার লোকসংস্কৃতি বিষয়ক বেশ কয়েকটি রচনা-বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল। অর্থাৎ ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ এবং শ্রীরামপুর মিশনের উদ্যোগে লোকায়ত জীবনের ভাষা, গল্প, প্রথা, আচার, উৎসব-অনুষ্ঠান সম্পর্কে আগ্রহ-সচেতনতার বিকাশ লক্ষ্য করা যায়।

কিন্তু মিশনারীদের এই সব ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধ প্রয়াসের অনেক আগে থেকেই স্যার উইলিয়ম জোনস্-এর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’র (১৭৮৪) মাধ্যমে ভারত বিদ্যাচর্চার সূত্রপাত ঘটেছিল। পুরাতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক, সমাজতাত্ত্বিক ও ভাষা-তাত্ত্বিক গবেষণার সূত্রে লোকসংস্কৃতি বিষয়ক তথ্য ও উপকরণাদির বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনায় বৈজ্ঞানিক অন্বেষার সূত্রপাত এশিয়াটিক সোসাইটির মাধ্যমেই আমরা প্রথম লক্ষ্য করি। এশিয়াটিক সোসাইটির কার্যাবলীর সঙ্গে কয়েকজন বিশিষ্ট বাঙালিও নিজেদের যুক্ত করেছিলেন। এশিয়াটিক সোসাইটি ছাড়াও ডিরোজিও পন্থীদের দ্বারা পরিচালিত ‘জ্ঞানোপার্জিকা সভা’ (১৮৩৮) এবং মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ও তাঁর অনুগামীদের দ্বারা পরিচালিত ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ (১৮৩৯)র কথাও উল্লেখ করা যায়। এ দুটি সভার মাধ্যমে অন্য অনেক বিষয়ের মধ্যে ভারতীয় পুরাবৃত্ত ও ইতিহাস আলোচনারও একটি পরিম-ল সৃষ্টি হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে কবি ঈশ্বরগুপ্ত কর্তৃক ‘সংবাদ প্রভাকরে’র মাধ্যমে প্রাচীন কবি সঙ্গীত সংগ্রহের আন্তরিক প্রচেষ্টার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। এসব ব্যক্তিগত প্রয়াস ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পটভ’মিকাতেই এবার আমরা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠা, লোকসংস্কৃতি বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ উদ্যোগের পরিচয় গ্রহণ করবো।

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠার মূলে নিহিত রয়েছে জাতীয় আত্ম প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা। হিন্দুমেলার (১৮৬৭) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই প্রচেষ্টার শুভ সূচনা ঘটেছিল। পরবর্তীকালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উক্ত প্রচেষ্টাকেই আমরা আরো পরিকল্পিত ও সুসংহত রূপে বিকশিত হতে দেখি।

জাতীয় আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা থেকেই দেশকে জানার আগ্রহ সূচিত হয়েছিল। আর দেশকে জানার অর্থ হল দেশের সজীব জনসাধারণের জীবনের সঙ্গে, তার আনন্দ-বেদনার সঙ্গে পরিচিত হওয়া। স্বাভাবিকভাবেই লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই সময় যে শিক্ষিত দেশবাসীর মনের সন্ধানী আলো গিয়ে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য। রবীন্দ্রনাথ যে দিন বাঙালি জাতির এই সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে পৌরাহিত্য করার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। ১৮৯৪ সালের এপ্রিল মাসে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠা হয়, আর অক্টোবর মাসে চৈতন্য লাইব্রেরীতে আয়োজিত এক সভায় রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মেয়েলি ছড়ার উপর একটি প্রবন্ধ পাঠ করে লোকায়ত সংস্কৃতির প্রতি সমাজের শিক্ষিত শ্রেণীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আলোচ্য প্রবন্ধটি পরে ‘সাধনা’ পত্রিকায় মুদ্রিত হয় এবং ঐ বছরেরই একেবারে গোড়ার দিকে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মুখপত্রে (মাঘ-১৩০১) ছেলে ভুলানো ছড়ার সংকলন প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলে ছিলেন, ‘জাতীয় পুরাতন সম্পত্তি সযতেœ সংগ্রহ করিয়া রাখিবার উপযুক্ত সময় উপস্থিত হইয়াছে।’ এই দাবীকে তিনি সেদিন যথার্থই জাতীয় দাবী করে তুলতে চেয়েছিলেন।

দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল জোড়া সাঁকোর ঠাকুর বাড়ির ঐতিহ্য, সতেরো বছর বয়সে বিলেত অবস্থানকালে লব্ধ অভিজ্ঞতা, দেশীয় পটভূমিতে বিদেশী মিশনারী, প্রশাসক ও ভারততত্ত্ববিদদের সৃষ্টিশীল কর্মপ্রয়াস, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, শরৎচন্দ্র মিত্র, লালবিহারী দে প্রমুখের সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ এবং বাইশ বছর বয়সে ভারতী পত্রিকায় (১২৯০) ‘বাউলের গান’ প্রবন্ধ প্রকাশÑ এই বিস্তৃত পটভূমিকায় তেত্রিশ বছর বয়সি রবীন্দ্রনাথের লোকসংস্কৃতি বিষয়ক আগ্রহ আকর্ষণকে স্থাপন করে দেখলে আমরা বুঝব যে, ক্ষেত্র পূর্ব থেকেই প্রস্তুত হয়েছিল, শুধু এই সময়ে পূর্ববঙ্গে জমিদারি কার্য পরিদর্শনের সূত্রে পল্লী বাংলার নিরক্ষর সরল সাধারণ মানুষের প্রতিদিনকার জীবনযাত্রার সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় এবং নব উদবোধিত জাতীয় আন্দোলনের প্রেরণায় এতদিন যা ছিল ব্যক্তিগত আগ্রহের ব্যাপার, রবীন্দ্রনাথ তাকেই এবার ছড়িয়ে দিতে প্রয়াসী হলেন দেশবাসীর সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে।

‘জাতীয় পুরাতন সম্পত্তি’ সংগ্রহ করার যে আহ্বান তিনি পরিষদের পত্রিকা মারফত জানিয়েছিলেন, তার সুফল সেদিন হাতে হাতেই পাওয়া গিয়েছিলÑ পরিষদ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের “ছেলে ভুলানো ছড়া” নামক প্রবন্ধটি প্রকাশিত হবার পরবর্তী দশ বৎসর কালের পরিষদ পত্রিকার পাতা উল্টিয়ে দেখলেই বুঝতে পারা যাবে যে, রবীন্দ্রনাথের এই প্রবন্ধটি কি সুদূর প্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছিল। সাহিত্য পরিষদ পত্রিকাতেই শুধু নয়, স্বল্প স্থায়ী সাধনা ভারতী ও বালক প্রভৃতি পত্রিকাতেও রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ উৎসাহে বাংলা লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা ধারাবাহিকভাবে এই সময় প্রকাশিত হচ্ছিল।

১৯০৫ সালে বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলনের অভিঘাতে জাতির গৌরব ও মর্যাদাবোধের পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টা তথা স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি দেশপ্রেমী বাঙালির মনের গভীরে গিয়ে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। জাতীয় সাহিত্যের শক্তিশালী বনিয়াদ রচনার আগ্রহে দেশীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য অনুশীলনের প্রয়োজনীয়তা আরো ব্যাপকভাবে সেদিন অনুভূত হয়েছিল। নতুন উৎসের সন্ধানে জীবনের গভীরে অনুপ্রতিষ্ঠা হওয়ার আহ্বান রবীন্দ্রনাথ সেদিন জাতির সামনে রেখেছিলেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আয়োজিত সভায় (চৈত্র-১৩১১) রবীন্দ্রনাথ জাতির ভবিষ্যৎ তরুণ ছাত্র সমাজকে বাঙালি সংস্কৃতির দৃঢ় ভিত্তি রচনার কাজে লোকসংস্কৃতির ঘনিষ্ঠ অনুশীলন, সংগ্রহ-সংরক্ষণের কাজে ব্রতী হওয়ার জন্য উদার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

লোকসংস্কৃতির অনুশীলনে রবীন্দ্রনাথের প্রেরণা প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞ মহলে দুটি বিষয়ে ঐকমত্য লক্ষ্য করা যায়। প্রায় অধিকাংশের মত হল দেশপ্রেমের অনুপ্রাণনা এবং শাহজাদপুর-শিলাইদহ বারে সূত্রে রোমান্টিক পল্লীপ্রীতির পটভূমিতে রবীন্দ্রনাথ সংস্কৃতি চর্চায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন এবং দেশবাসীকে লোকসংস্কৃতির লুপ্ত প্রায় উপকরণসমূহ সংগ্রহের জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন।

লোকসংস্কৃতি চর্চার প্রেরণা হিসেবে দেশপ্রেম এবং পল্লীপ্রীতি তথা পল্লীজীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ঘনিষ্ঠতার মূল্য অনস্বীকার্য। কিন্তু কেবলমাত্র দেশপ্রেম ও পল্লীপ্রীতির উপর নির্ভর করে অর্থাৎ হৃদয়াবেগকে সম্বল করে লোকসংস্কৃতির মত বস্তুনিষ্ঠ বিষয়ে অনুশীলন কখনই যথার্থ তাৎপর্যে ম-িত হতে পারে না। লোকসংস্কৃতির চর্চাকে সার্থক করে তুলতে হলে অনিবার্যভাবেই তাকে বস্তুনিষ্ঠ বিষয়গত শৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। রবীন্দ্রনাথের লোকসংস্কৃতি প্রচেষ্টার প্রেরণামূল সন্ধানে দেশপ্রেম এবং পল্লীপ্রীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞরা হৃদয়াবেগের অতিরিক্ত মননশীল বস্তুনিষ্ঠ দিকটির প্রতি যথাযথ দৃষ্টিপাত করেন নি।

এই প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম শ্রদ্ধেয় রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য উদ্ধৃত করা যেতে পারে। ভারতীতে প্রকাশিত ‘বাউলের গান’ বিষয়ক আলোচনার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথই যে সর্বপ্রথম দেশীয় কাব্যের সৌন্দর্য প্রকাশের সূত্রে ‘তথাকথিত ভদ্রেতর গীত ও কাব্যের প্রতি’ বাঙালির মনোযোগ আকর্ষণ করেন এ কথার উল্লেখ করে শ্রদ্ধেয় জীবনীকার এর কারণ অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হয়েছেন। তিনি লিখেছেনÑ “রবীন্দ্রনাথ স্পষ্টই বুঝিতে পারিতেছেন যে, শিক্ষিত সমাজ ক্রমেই দেশের অন্তমূল হইতে দূরে সরিয়া যাইতেছেন, দেশ ক্রমেই অপরিচিত হইয়া পড়িতেছে। ব্রিটিশ শাসন ও পাশ্চাত্য শিক্ষার ফলে দেশের মধ্যে শ্রেণীগত বৈষম্য নূতনভাবে দেখা দিয়াছে। ইংরেজি জানা ও ইংরেজি না জানা লোকের মধ্যে জ্ঞান সমুদ্রের যে দুস্তর ব্যবধান দেখা দিয়াছে তাহা পরিমাণগত নহে, তাহা গুণগত পার্থক্য। রবীন্দ্রনাথ বারবার বলিয়াছেনÑ দেশের লোকের অন্তরের সহিত পরিচিত হইতে না পারিলে, তাহাদের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাক্সক্ষা, উৎসব-বিনোদন প্রভৃতি সহজভাবে স্বীকার না করিলে দেশের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল প্রচেষ্টা নিষ্ফল হইবে।” (প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্র জীবনী, ১ম খ-, ১৩৭৭, পৃ. ১৬০-১৬১)

রবীন্দ্রনাথের লোকসংস্কৃতি অনুশীলনের উৎস সন্ধানে বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী শ্রী বিনয় ঘোষ কবির সুগভীর স্বজাতি প্রীতি তথা ‘জাতিজন প্রীতি’কেই সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর মতেÑ “ রবীন্দ্র সাহিত্যের ধারায় কতদিন থেকে বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির কত প্রবাহ এসে যে মিলিত হয়েছে, তার ঠিক নেই। ইংরেজি অভিমানী মাতৃভাষাদ্বেষী বঙ্গবাসীর দেশপ্রেমের সংকীর্ণ গন্ড¢ীর বাইরে এসে বৃহত্তর জনসমাজের মনের ন্দর মহলে প্রবেশ করার আন্তরিক আকাক্সক্ষা থেকে রবীন্দ্রনাথের স্বজাতি প্রীতির জন্ম এবং এই জাতিজন প্রীতি থেকেই লোকসংস্কৃতির প্রতি তাঁর প্রগাঢ় অনুরাগ উৎসারিত।” (বিনয় ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ও বাংলার লোকসংস্কৃতি, ২য় খ-, শ্রী পুলিন বিহারী সেন সম্পাদিত, ১৩৬৮, পৃ. ৬২-৬৩)

বিশেষজ্ঞগণের উক্তিসমূহ থেকে বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথের লোকসংস্কৃতি অন্বেষা প্রসঙ্গে সাধারণভাবে তাঁরা মনে করেছেন যে, দেশপ্রেম বা জাতিপ্রীতির ভাবাবেগই রবীন্দ্রনাথকে লোকসংস্কৃতি চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। কিন্তু গভীরভাবে অনুশীলন করে সংগৃহীত তথ্যাদির ভিত্তিতে অনুধাবন করা যায় যে, দেশপ্রেম বা দেশজোড়া স্বদেশী আন্দোলন রবীন্দ্রনাথকে লোকসংস্কৃতির কর্মপ্রচেষ্টায় ব্যাপকভাবে সক্রিয় করে তুললেও রবীন্দ্রনাথের মনন প্রচেষ্টায় লোকসংস্কৃতি সম্পর্কিত সক্রিয়তা পূর্ব থেকেই ছিল বহুপ্রসারী।বিশেষত আমৃত্যু রবীন্দ্রনাথ লোকসংস্কৃতির বহুমুখী কর্মকা-ের সঙ্গে নিজেকে যেভাবে যুক্ত রেখেছিলেন, সে সম্পর্কে আনুপূর্বিক অবহিত হবার পর নিছক প্রেম-প্রীতির গ-ীর মধ্যে সেই প্রচেষ্টাকে আর আবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়।

ভারতী পত্রিকায় (১২০৯) প্রকাশিত ‘বাউলের গান’ শীর্ষক রচনাটি রবীন্দ্রনাথের লোকসাহিত্য তথা লোকসংস্কৃতি বিষয়ে প্রাথমিক আগ্রহের প্রধান হিসেবে বিশেষজ্ঞগণ কর্তৃক বহু আলোচিত। মাত্র বাইশ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ বাউল সঙ্গীতের পর্যালোচনায় বাংলা সাহিত্যের অবিনাশী মর্মস্থানটি আবিষ্কারে সক্ষম হন। তবে আবিষ্কারের প্রস্তুতি ছিল পূর্ব থেকেই। প্রথমবার বিলেত প্রবাসের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, দেশে ফিরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অন্তরঙ্গ সাহচর্য লাভ, চন্দননগরে মোরাল সাহেবের বাগান বাড়িতে বাস, গঙ্গার দুই তীরবর্তী জীবন প্রবাহকে কাছ থেকে দেখা, বাল্মিকী প্রতিভা, রুদ্রচন্ড, কাল-মৃগয়া প্রভৃতি গীতি নাট্যের রচনা, বিশেষত ‘বাল্মিকি প্রতিভা ও কাল মৃগয়ায় দস্যুদলের রূপ-পরিকল্পনায় লৌকিক বিশ্বাস-সংস্কার, লৌকিক ভাষা রীতির ব্যবহার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থাৎ সাহিত্য-সংস্কৃতির মর্মমূলের অবস্থানটি সম্পর্কে যুবক কবি পূর্ব থেকেই সচেতন ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেনÑ “লোকসংস্কৃতির চর্চা কেবলমাত্র ভদ্রলোকের অবসর বিনোদন বা নিছক অতীত অনুশীলন নয়, এর মধ্যে নিহিত রয়েছে সমাজ ও সভ্যতার মূলবান সব উপকরণ।”

রবীন্দ্রনাথের এ বক্তব্যের মধ্যে লোকসংস্কৃতি সম্পর্কিত আধুনিক সচেতনতা প্রকাশিত হয়েছে।

‘বাউলের গান’ প্রবন্ধের অব্যবহিত পরবর্তী রচনা হিসেবে ‘প্রভাত সঙ্গীতে’র (১৮৮৩) অন্তর্গত পুনর্মিলন, ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থের (১৮৮৪) মাতাল এবং ‘কড়ি ও কোমল’ (১৮৮৬) এর অন্তর্গত ‘উপকথা’ প্রভৃতি কবিতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলার রূপকথার প্রভাব উক্ত তিনটি কবিতাতেই স্পষ্ট। ইতিপূর্বে ‘বালক’ পত্রিকার (১৮৮৫) ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ ও ‘সাত ভাই চম্পা’ কবিতা দুটি বাংলার লৌকিক ছড়া রূপকথার অনুষঙ্গে রচনা করেন। কবিতা দুটি পরে যথাক্রমে ‘শিশু’ এবং ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যগ্রন্থে সংযোজিত হয়েছে। ১২৯৮-৯৯ সনে। ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘রাজার ছেলে ও রাজার মেয়ে, বিম্ববতী, নিদ্রিতা, সুপ্তোক্ষিতা প্রভৃতি রূপকথা অবলম্বনে লেখা কবিতাগুলোও এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য।

‘সাধনা’ (১৩০১) পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের ‘মেয়েলি ছড়া’ নামের একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটির শুরুতেই তিনি লিখেছিলেন, “বাংলা ভাষায় ছেলে ভুলাইবার জন্য যে সকল মেয়েলি ছড়া প্রচলিত আছে, কিছুকাল হইতে আমি তাহা সংগ্রহ করিতে প্রবৃত্ত ছিলাম।” (লোকসাহিত্য, ১৯৭১ খৃ., পৃ. ৫) দেখা যাচ্ছে, বাংলার প্রধান গাথা-গীত, কথা ও ছড়ার প্রতি রবীন্দ্রনাথের যে আকর্ষণ তা ক্রমশই বিস্তৃত রূপ ধারণ করেছে।

‘সাধনা’র পর রবীন্দ্রনাথ ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ পত্রিকায় (মাঘ ১৩০১) ‘ছেলে ভুলানো ছড়া’ নামে এক সংক্ষিপ্ত রচনা করেন এবং ‘কলিকাতায় সংগৃহীত ছড়া’র (৩০টি) সংকলন প্রকাশ করেন এবং পরবর্তীকালে এই পত্রিকাতেই (কার্তিক ১৩০২) ‘মেয়েলি ছড়া’ নাম দিয়ে আরও ৫৫টি ছড়ার সংগ্রহ তিনি প্রকাশ করেছিলেন। সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় প্রথম কিস্তির ছড়া সংগ্রহ প্রকাশ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লোকসংস্কৃতির উপকরণগুলো সংগ্রহ-সংরক্ষণ বিষয়ে কয়েকটি মূল্যবান উক্তি করেছিলেন যার মধ্যে তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচয়টি স্পষ্ট।

শুধু ছড়ার আলোচনাই নয়, এই পর্বে তিনি লোকসংস্কৃতি বিষয়ে আরো দুটি প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। প্রথমটি ‘সাধনা’ পত্রিকায় (জ্যৈষ্ঠ ১৩০২) কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সংগৃহীত ও প্রকাশিত ‘গুপ্ত-রতেœান্ধার বা প্রাচীন কবি সঙ্গীত সংগ্রহ’ এবং অপরটি হল ‘ভারতীতে (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩০৫) লেখা ‘গ্রাম্য সাহিত্য’। ‘গ্রাম্য সাহিত্যে’র আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ যে সচেতনতার পরিচয় দিয়েছিলেন তা বিস্ময়কর।

শাহজাদপুর-শিলাইদহ বাসের অভিজ্ঞতা তথা পল্লী জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় ও রোমান্টিক পল্লী প্রীতিকেও বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞগণ লোকসংস্কৃতি প্রচেষ্টায় রবীন্দ্রনাথের বিজড়িত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন (১৮৯১-১৯০১) এই সময়কালে রচিত লোকসংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ (লোকসাহিত্য গ্রন্থের অন্তর্গত প্রবন্ধ ত্রয়ী) ছড়ার সংকলন, ব্রতের ভূমিকা, রূপকথা বিষয়ক কাব্য-কবিতার কথা এখানে স্মরণ করা যেতে পারে। রবীন্দ্র সাহিত্যের সমালোচকগণ সাধারণভাবে এই কালটিকে তাঁর রচনা পর্বের সমৃদ্ধতম কাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অসংখ্য ছোট গল্প, কাব্য-কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ ও উপন্যাস এই সময় তিনি রচনা করেছিলেন। সমালোচক প্রমথনাথ বিশী ‘ছিন্ন পত্রাবলী’কে তো ‘পদ্মাতীর বাসের মহাকাব্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। (প্রমথনাথ বিশী, শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ, বাংলা পকেট বই, মিত্র ও ঘোষ, ১৯৭২, পৃ. ৩৬।)

বিশিষ্ট গবেষক ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে, শাহজাদপুর-শিলাইদহের পল্লীতে জীবন-যাপনের মাধ্যমে বাংলার সাধারণ জীবনের নিবিড়তম সংস্পর্শে আসবার সুযোগ তিনি লাভ করেছিলেন। যে কারণে দেখা যায় রবীন্দ্র সাধনার সমৃদ্ধতম যুগেই তাঁর লোকসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত প্রবন্ধগুলো তিনি রচনা করেছিলেন। (ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলার লোকসাহিত্য, ১৯৬২, পৃ. ১১৬-১৭।)

এ কথা ঠিকই যে, পল্লীবাসের সূত্রে পল্লীর মানুষজনের প্রত্যক্ষ জীবনযাত্রার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তা লোকসংস্কৃতি প্রচেষ্টায় তাঁকে বিশেষভাবে আগ্রহী ও উৎসাহী করে তুলেছিল। তবে পল্লী বাংলার উদার প্রকৃতির রোমান্টিক অনুপ্রাণনায় যে অর্থে তাঁর কাব্য সাহিত্যের ব্যাপক উৎসার ঘটেছিল, লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ছিল কিছুটা ভিন্ন। লোকসংস্কৃতি চর্চার প্রয়োজনীয়তা নৃতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব, পুরাতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্বের ক্ষেত্রে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তথা লোকসংস্কৃতির আধুনিক বিষয়গত শৃঙ্খলার সঙ্গে পূর্বেই তাঁর পরিচয় ঘটেছিল। এইবার শাহজাদপুর-শিলাইদহে এসে বাস্তব ক্ষেত্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও গভীর সংযোগের ফলে যা ছিল এতদিন তত্ত্বরূপে জানা, তা সত্যরূপে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। বাংলার পল্লী অঞ্চলের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসে সরল, নিরক্ষর সাধারণ মানুষ ও লোকায়ত সংস্কৃতির প্রতি তিনি একদিকে যেমন গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন, তেমনি বাস্তব ক্ষেত্রে দেশীয় সংস্কৃতির পুনরুদ্ধার ও পুনরুজ্জীবনে সক্রিয় কর্মোদ্যোগও এই সময় গ্রহণ করেছিলেন।

লোকসঙ্গীতের বিপুল বিস্তার ও ঐশ্বর্যের সঙ্গে সর্বপ্রথম সাক্ষাৎ পরিচয় রবীন্দ্রনাথের ঘটেছিল পাবনা-কুষ্টিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ঠাকুরবাড়ির জমিদারী পরগণার তদারকি করার সূত্রে। পদ্মা নদীর গান শুনলেন তাঁর মাঝিদের মুখে। এমন উদার, করুণ অথচ অপরূপ সঙ্গীত ধ্বনি যে নিরক্ষর মাঝিদের মুখ থেকে নিঃসৃত হতে পারে তার প্রথম অভিজ্ঞতা পাবনা-কুষ্টিয়া এসে কবির হল। পূর্ববঙ্গের বিখ্যাত বাউল সম্প্রদায়ের গানের সঙ্গেও তাঁর অন্তরঙ্গ পরিচয় এখানে এসেই ঘটে। বাউল গান কবি কোলকাতাতেও শুনেছিলেন, কিন্তু এবারের শোনার অভিজ্ঞতা অভিনব। এমন করে পল্লীকে দেখা ও ভালবাসার সুযোগ পূর্বে আর কখনও তাঁর ঘটে নি। ফলে পল্লীর গান, পল্লীর শিল্প, তার সাহিত্য, পালা-পার্বন, নৃত্যানুষ্ঠানÑ সবকিছুই তাঁর কাছে সেদিন জাতির মূল্যবান সম্পদ হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল।

এই সময় তাঁর সৃষ্টিশীল সাহিত্য জীবনের ও চরম উৎসার ঘটেছিল। ‘সাধনা’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও এই সময়েই (১৩০১-২) কবির উপর ন্যাস্ত ছিল। প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত ‘সাধনা’র পৃষ্ঠাগুলো উল্টালেই দেখা যাবে লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা সেখানে বিশেষ গুরুত্ব ও প্রাধান্য পেয়েছে। ছড়া বিষয়ক প্রবন্ধ রচনার পরেই রবীন্দ্রনাথ ‘সাধনা’র পৃষ্ঠায় কবি গান সম্পর্কে এক প্রবন্ধ লেখেন (১৩০২)।

ভারতীতে প্রকাশিত ‘গ্রাম্য সাহিত্য’ (১৩০৫) প্রবন্ধটিও পাবনা-কুষ্টিয়া অঞ্চলের প্রত্যক্ষ প্রভাব জাত। পদ্মাবসে নৌকায় ভ্রমণ করতে গিয়ে কবি শুনলেন মাঝিদের তারুণ্য-উচ্ছ্বল সারি গানÑ

‘যুবতী ক্যান বা কর মন ভারী
পাবনা থ্যাহ্যা আন্যা দেব ট্যাহা দামের মোটরী ॥’

কবির মনে হলো “শ্রাবণে ভরা বর্ষার জল প্লাবনের মধ্যে সমস্ত গ্রামগুলি যেন কথা কহিয়া উঠিল।” পাবনা-কুষ্টিয়া থাকার সময় পল্লী বাংলার বাউল ও কীর্তন গানের সঙ্গে কবির অন্তরঙ্গ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল যা তাঁর সমসাময়িক ও পরবর্তীকালের সঙ্গীত রচনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। নিজের লেখাতে রবীন্দ্রনাথ যে দু’জন লোকসঙ্গীত শিল্পীর নাম উল্লেখ করেছিলেন তাঁরা হলেনÑ গগন হরকরা ও সর্বখেপী। গগন ছিল শিলাইদহ অঞ্চলের পোস্ট অফিসের ডাকহর করা। গগনের গান রবীন্দ্রনাথ নিজে শুনেছিলেন (শচীন্দ্রনাথ অধিকারী, রবীন্দ্রমানসের উৎস সন্ধানে, ১৩৬৬, পৃ. ৩৬)। গগন হরকরা রচিত “আমি কেথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে” গানটি সংগ্রহ ও প্রকাশ করে তিনি প্রবাসী (১৩২২) পত্রিকায় সুবিখ্যাত হারামনি বিভাগের সূচনা করেছিলেন। সর্বখেপী ছিল শিলাইদহ অঞ্চলের এক বোষ্টমী। সর্বখেপী চরিত্রটি অবলম্বনে কবি তাঁর ‘গল্পগুচ্ছের’ অন্তর্গত ‘বোষ্টমী’ গল্পের আনন্দীর রূপকল্পনা করেছিলেন। কুষ্টিয়া অঞ্চলে রবীন্দ্রনাথকে সবচেয়ে বেশি মথিত করেছিল লালনের গান। এ কথা সত্য লালন ফকিরের বাউল গান রবীন্দ্রনাথের কাব্য সাধনা, সঙ্গীত রচনা ও অধ্যাত্মভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় (আশ্বিন ১৩২২) হারামনি পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ প্রথম কিস্তিতে লালন ফকিরের ছয়টি গান প্রকাশ করেন। এরপর অগ্রহায়ণ সংখ্যায় তিনটি, পৌষ সংখ্যায় পাঁচটি এবং মাঘ সংখ্যায় পুনরায় ছয়টি এই মোট ২০টি লালনের গান তিনি প্রকাশ করেছিলেন।

পল্লী বাংলার সরল, সাধারণ ও নিরক্ষর মানুষের মধ্যে স্বদেশ চেতনার উন্মেষ ঘটানোর উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি পাবনা কুষ্টিয়ায় ‘স্বদেশী মেলা’র প্রবর্তন করেছিলেন। মেলা প্রাঙ্গনে পল্লীশিল্পের নানাবিধ উপকরণসমূহের ব্যাপক সমাবেশ ঘটিয়ে ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা করে গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনে সহায়তাদান করাও ছিল তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য। ‘রাখী বন্ধন’ অনুষ্ঠানটিকে যুগগত প্রয়োজনে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংহতি রক্ষার উপায় হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ আধুনিক মনস্ক কবি-সাহিত্যিক বলেই লোকসংস্কৃতি অন্বেষা বা বিজ্ঞান বিষয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ অসম্ভব বা তা একান্তই আকস্মিক, এটি মনে করবার কোন কারণ নেই, আসলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ বিস্ময়কর এক ভারসাম্যের পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের লোকসংস্কৃতি সংক্রান্ত ধ্যান-ধারণা ও কর্মপ্রচেষ্টার সুদীর্ঘ পরিক্রমা শেষে এ কথাই বলতে হয় যে, রসবাদিতা, দেশপ্রেম প্রভৃতির সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞান মনস্কতার এমন এক সম্মিলন এক্ষেত্রে ঘটেছে, যা তাঁর মননশীল প্রতিভাকে উন্মোচিত করেছে। রবীন্দ্রনাথের লোকসংস্কৃতি অন্বেষা বিষয়ক আলোচনায় আমরা স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পেরেছি আধুনিক লোকসংস্কৃতি বিজ্ঞানে লোকসংস্কৃতিকে যে অর্থে অতীতের মূল্যবান উপাদান ও চলমান কালের সজীব প্রতিরূপ হিসেবে গণ্য করা হয়, রবীন্দ্রনাথের লোকসাহিত্য সম্পর্কিত আলোচনায় যেন তারই দৃঢ় উপলব্ধি ব্যক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ লোকসংস্কৃতির ব্যবহারিক প্রয়োগগত দিকটিও প্রত্যক্ষ করেছিলেন। লোকসংস্কৃতির এই ব্যবহারিক ও প্রয়োগগত দিক সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ সচেতন ছিলেন বলেই শাহজাদপুর, শিলাইদহ, পতিসর ও শান্তি নিকেতনের বাস্তব কর্মপ্রয়াসে, অর্থাৎ স্বদেশপ্রেমের উদ্বোধনে, পল্লীশিল্পের পুনরুজ্জীবনে এবং শিক্ষার সর্বজনীন প্রসারে লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানসমূহকে তিনি সার্থক ও শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার পক্ষপাতী ছিলেন এবং সাধ্যানুযায়ী উপযুক্ত ক্ষেত্রে ব্যবহারও করেছেন। আসলে জীবনের সর্বক্ষেত্রেই রবীন্দ্রনাথ বিস্ময়কর এক ভারসাম্যের পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছিলেন, যার ফলে জীবন ব্যাপী সুন্দরের অনুধ্যান ও রসোপলদ্ধির সঙ্গে বিজ্ঞান জিজ্ঞাসার কোন বিরোধ কখনও উপস্থিত হয় নি। এই বিস্ময়কর ভারসাম্যের বোধ বা সমন্বয় ধর্মিতাই হল রবীন্দ্র প্রতিভার তথা রবীন্দ্র জীবন চর্চার মূল কথা।

সহায়ক গ্রন্থাবলী :

১. সলিল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি, দে’জ পাবলিশিং, কলিকাতা, ১৯৯৪
২. প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্র জীবনী, ১ম খ-, ১৩৭৭ সং
৩. ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য, রবীন্দ্রনাথ ও লোকসাহিত্য, ১৯৭৩
৪. বিনয় ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ও বাংলার লোকসংস্কৃতি, ১৩৬৮
৫. ড. নীহার রঞ্জন রায়, রবীন্দ্র সাহিত্যের ভূমিকা, ১৩৬৯

*উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনালইউনিভার্সিটি; সাবেকউপাচার্য, রাজশাহীবিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।


নিউজটি অন্যকে শেয়ার করুন...

আর্কাইভ

business add here
© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com