শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:৪৩ পূর্বাহ্ন

লালনকে জানো মানুষকে জানো

লালনকে জানো মানুষকে জানো

Professor Dr. Md. Abdul Jalil (প্রফেসর ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল)

লেখক: প্রফেসর ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল, উপ-উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী।

সাধক লালন ‘ফকির’ হিসেবে পরিচিত। কেউ কেউ লালনকে ‘শাহ’ ‘বাউল’ ইত্যাদি নামে সম্বোধন করে থাকেন। লালন সচেতনভাবে তাঁর সঙ্গীতের কোথাও ভণিতায় শাহ বা বাউল শব্দের প্রয়োগ ঘটান নি। তিনি সর্বদাই ‘লালন ফকির’ ‘ফকির লালন’ ক্ষেত্র বিশেষে ‘অধীন লালন’ শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে বিনয় প্রকাশ করেছেন।

ফকির শব্দটি ‘আরবী’; অর্থ পেশাজীবী ভিক্ষুক। কিন্তু আমাদের দেশে ফকির শব্দটি ব্যাপকার্থে মুসলিম সম্প্রদায়ের সেই শ্রেণীর সাধককে বুঝিয়ে থাকে যারা মূলত সংসার বিরাগী, অসীমের সন্ধানে আত্মনিবেদিত। প্রকৃতপক্ষে পথই এদের ঘর; নিরন্তর পথ চলাতেই এদের আনন্দ; পথের মানুষই তাঁদের পরম আরাধ্য। বাংলার অভিন্ন আদর্শে উদ্বুদ্ধ হিন্দুসাধক সম্পদ্রায়কে বাউল অথবা সন্ন্যাসী নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এই উভয় সম্প্রদায়ের সাধকেরা শাস্ত্রীয় ধর্মের বিধি-বিধান অপেক্ষা শাশ্বত মানবীয় ধর্মকেই শ্রেয় ও প্রেয় জ্ঞান করে থাকে। অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাঁদের ধ্যান-ধারণার মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে। তাঁরা সর্বদাই মনের আনন্দে মনের মানুষ তথা পরম মানুষকে সন্ধান করে ফেরে। উল্লেখ্য যে, আমাদের দেশের অনেক মুসলিম ফকিরকেও বাউল অভিধায় অভিহিত করতে দেখা যায়। যেমন- ছেউড়িয়ার লালনের আখরায় অবস্থিত সাধকেরা নিজেদের বাউল নামে পরিচয় দিতেই গর্ববোধ করে থাকে। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম যে নেই সেটাও বলা যাবে না। কেউ কেউ নিজেকে বাউল না বলে ফকির বলেও পরিচয় দেয়। সম্ভবত এ কারণেই বাউল ব্যবসায়ী এক শ্রেণীর সংস্কৃতিসেবী নির্দ্ধিধায় লালনকে শুধু বাউলই নয়-বাউল সম্রাট নামেও সম্বোধন করতে দ্বিধা করে না। লালন ফকির ‘বাউল’ না-কি ‘শাহ’ এই বিতর্কের উদ্ভব সাম্প্রতিক কালের নয়। শুরুতেই বলা যেতে পারে লালনের সমগ্র জীবন রহস্যের মোড়কে ঢাকা। তাঁর নিজের নাম থেকে শুরু করে পিতা-মাতার পরিচয়, জন্মস্থানের পরিচয়, শিক্ষা-দীক্ষার পরিচয়, সর্বক্ষেত্রেই অস্পষ্টতা। তিনি সচেতনভাবে এসবের প্রকৃত পরিচয় থেকে নিবৃত থাকার চেষ্টা করেছেন। এমনকি তাঁর যে একমাত্র দীক্ষাগুরু সিরাজ সাঁই তাঁর পরিচয়ও শুধু নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। প্রকৃতপক্ষে এ রহস্যের ধূ¤্রজাল তিনি নিজেই সৃষ্টি করেছেন।

তাঁর জীবনরহস্যের বীজটি লুক্বায়িত রয়েছে তাঁর নামের ক্ষেত্রে। লালন নামটির অর্থ স্নেহপূর্বক লালন করা। এই নামটি বাংলার হিন্দু-মুসলিম উভয় সমাজে ব্যাপকভাবে পরিচিত। লালন নামের অনুরূপ বাঙালি সমাজে আরো কিছু নাম রয়েছে যেমন-পরান, হারান, মধু, সাধু প্রভৃতি। অনুমান করা যেতে পারে এসব নামের পশ্চাতে হয়তো একেকটি বিশুদ্ধ নামেরও প্রচলন আছে। তবে একথা অস্বীকার করবার উপায় নেই যে, সমাজে বিশুদ্ধ নাম অপেক্ষা ডাকনামের জনপ্রিয়তাই বেশি।

সাম্প্রতিক কালের গবেষকদের মধ্যে যে কারণে লালনের জাত পরিচয় নিয়ে সৃষ্ট হয়েছে চরম বিতর্ক। এর উৎস মূলত সাম্প্রদায়িক মনোভাব। হিন্দু সম্প্রদায়ের গবেষকদের কাছে তিনি জন্মসূত্রে হিন্দু, ভাগ্যচক্রে মুসলমান। বিপরীতে মুসলিম সম্প্রদায়ের এক শ্রেণীর গবেষকের কাছে তিনি জন্মসূত্রেই মুসলমান। প্রকৃতপক্ষে এখন পর্যন্ত এ বিতর্কের সমাধান লাভ করা সম্ভব হয়ে ওঠে নি। আর অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব হবে বলেও মনে হয় না। কারণ লালনের জীবদ্দশাতে তাঁর ভক্তদের মধ্য থেকেই এ বিষয়ে তিনি প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়েছিলেন। আর উত্তরে লালন যা বলেছিলেন তার সবটাই ছিলো ইঙ্গিতধর্মী, বলা চলে নেতিবাচক। তিনি বলেছেন-
(ক) সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে
লালন কয় জাতের কীরূপ দেখলাম না এই নজরে।
(খ) সবে বলে লালন ফকির হিন্দু কি যবন
লালন বলে আমার আমি না জানি সন্ধান।
কিংবা,
(গ) জাতি বলিতে কি হয় বিধান
হিন্দু, যবন বৌদ্ধ খৃষ্টান
জাতের আছে কি বা প্রমাণ
শাস্ত্র খুঁজিলে।

এক্ষেত্রে তাঁর আরো একটি অভিমত রয়েছে যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন-
মানুষের নাই জাতের বিচার
একেক দেশে একেক আচার
লালন বলে জাতের ব্যবহার
গিয়েছি ভুলে।

বুদ্ধিমান লালন নিজেকে খন্ডিত করতে চান নি। তাঁর সকল জাতের ভক্তদের কাছে তিনি শুধু মানুষ নামে পরিচিত হতে চেয়েছেন। তিনি ভক্তদের উপদেশ হিসেবে যে কথাগুলো বলেছেন তার ওপর আর কোনো কথা থাকতে পারে না। যেমন-
ভক্তির দ্বারে বাঁধা আছেন সাঁই
হিন্দু কি যবন বলে তার কাছে
জাতের বিচার নাই।

তৎকালীন সমাজে জাত-পাতের ভয়াবহ বিষ-বাষ্পে মানবিক মূল্যবোধ কিভাবে ভুলুণ্ঠিত হচ্ছিল তিনি তা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। আর এ থেকে নিষ্কৃতির প্রত্যাশায় যা বলেছিলেন তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়-
এমন মানব সমাজ
কবে গো হবে
যে দিন হিন্দু মুসলমন বৌদ্ধ খৃস্টান
জাত গোত্র নাহি রবে।

আজকের দিনে লালনের এই মহা মূল্যবান বাণী অত্যন্ত যুগোপযোগীতার দাবী রাখে। সমগ্র বিশ্বে ধর্ম কলহ নিয়ে যে ভাবে ভয়াবহ হিং¯্রতা দেখা দিয়েছে তাতে বিশ্ববিবেক শোকাহত, মর্মাহত, স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে। লালনের এই বাণীতে বিবাদমান মানবসমাজের বিবেককে যদি জাগ্রত করতে পারে তবে বিশ্বে শান্তির বাতাবরণ তৈরী হবে।

লালন কবি, তবে লোককবি নন; দার্শনিক কবি, সাধক কবি। অনেকেরই ধারণা লালনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছিলো না। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ অদ্যাবধি লালনের হাতে লেখা কোনো সঙ্গীতের সন্ধান মেলে নি। তিনি যখন যা অনুভব করতেন একতারার সুর সংযোগে তা ভক্তদের কাছে পরিবেশন করতেন। ভক্তরাই পরে তা লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। লালন সাধন সিদ্ধির ক্ষেত্রে যে জ্ঞান অর্জন করেন তার সবটাই ছিলো গুরু সিরাজ সাঁই প্রদত্ত। তাঁর সাধনার ধারাটি সাধন জগতে গুরুবাদী সাধনা নামে পরিচিত। এ ধারায় গুরু তার শিষ্যত্ব প্রত্যাশীদের পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষিত করে থাকেন। অতঃপর শিষ্য যখন দৈহিক মানসিক ও যৌগিক সাধনায় বিশেষ স্তরে উপনীত হন গুরু তখন তাকে দিন-ক্ষণ দেখে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাদান করে থাকেন। এ কারণে গুরুবাদী সাধনাকে বলা হয়ে থাকে শিক্ষা ও দীক্ষার সমন্বিত সাধনা। শিক্ষাগুরু ও দীক্ষাগুরু যে অভিন্ন নয় কোনো কোনো বাউলের সঙ্গীতে তা লক্ষ করা যায়। যেমন-
দীক্ষাগুরু শিক্ষাগুরু
ইহার পরে আছে গুরু
সেই গুরু কল্পতরু
বাগেরই আশ্রয়।

এ থেকে স্পষ্টত যে ধারণা অর্জিত হলো তা থেকে অতি সহজেই মন্তব্য করা যেতে পারে শিক্ষা ও দীক্ষাদানের পদ্ধতি অভিন্ন নয়। আমরা যারা শিক্ষকতার পেশায় জীবিকা নির্বাহ করে থাকি আমাদের অধিকাংশ শিক্ষাই অপূর্ণাঙ্গ। যে কারণে শিক্ষার্থীরাও পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান লাভ থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সর্বত্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে নৈরাজ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে তার পশ্চাতে রয়েছে শিক্ষকদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষাদানে পদ্ধতিগত ব্যর্থতা। অথচ গুরুবাদী সাধনা ধারায় লক্ষ করি ভিন্নতর চিত্র। লালন অনুসারী ও অনুরাগী ভক্তরা সবাই সঙ্গীতপ্রিয়। তাদের হাতে থাকে একটি একতারা বা দোতারা, অবসর অবকাশে এমনকি ভিক্ষাবৃত্তির ক্ষেত্রেও তারা সঙ্গীতকে অবলম্বন করে থাকে। বিনয়, ভক্তি, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার মাধুর্যে সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের হৃদয়কে তারা সহজেই জয় করে ফেলে। এযেন জাদুকরের হাতের বশীকরণ মহামন্ত্রবিশেষ। এ থেকে নিঃসন্দেহে স্বীকার করতে হয় সঙ্গীত শুধু ব্যক্তি চরিত্রই নয়-জাতীয় চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও মূখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। এক্ষেত্রে শিক্ষার প্রতিটি স্তরে সঙ্গীত বিশেষ করে লোকসঙ্গীতের পঠন-পাঠনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্তির দাবী রাখে। আমরা আমাদের জাতীয় দুর্দিনে যেভাবে রবীন্দ্র নজরুলের সঙ্গীতকে স্মরণ করে থাকি একইভাবে স্মরণ করতে বলি ফকির লালনের সঙ্গীতকে। কারণ বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এই তিনটি নাম বাঙালির অন্তঃসলিলায় প্রবাহিত গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতীর মতো। এই ত্রিধারায় অবগাহন করে আমরা জাতীয় জীবনে পূত-পবিত্র ও শুচি-শুভ্র হৃদয়ের অধিকারী হতে পারি।

লালনের সাধনায় গুরুত্ব পেয়েছে মানুষ ও মানুষের হৃদয়বৃত্তি। অতঃপর গুরুত্ব পেয়েছে জ্ঞানানুশীল, সত্যনিষ্ঠা ও সময়োপযোগিতা। লালন যে জ্ঞানের ক্ষেত্রে কিরূপ অসামান্য ছিলেন তার প্রমাণ মেলে তার সঙ্গীতের বিষয়-বৈচিত্র্যে। তাঁর সঙ্গীতে ইসলামের সুফীদর্শন, হিন্দু-বৌদ্ধের তান্ত্রিক দর্শন, গৌড়ীয় বৈষ্ণব-দর্শন ও বাংলার লোকায়াত দর্শনের সাথে কোরআন-হাদিস, বেদ-পুরান বাইবেলের মতো শাস্ত্রীয় গ্রন্থের তত্ত্বকথাও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। তিনি সর্বদাই নানামতের তত্ত্বকথার তুলনামূলক আলোচনার প্রেক্ষিতে একটা গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার প্রয়াস পেয়েছেন। একথা সর্বজনস্বীকৃত যে ধর্মের ক্ষেত্রে Comparative Study তথা তুলনামূলক আলোচনা ব্যতীত সর্বজনগ্রাহ্য অসাম্প্রদায়িক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। লালনের দুর্ভাগ্য এখানে। তৎকালে এবং অদ্যাবধি বাংলার উচ্চবিত্ত ও বর্ণের হিন্দু-মুসলিম যারা লালনকে বেশরা ফকির, নেড়ের ফকির, নাস্তিক ফকির হিসেবে চিহ্নিত ক’রে তার বিরুদ্ধে বিষোদগারণ করে থাকেন তাদের সকলের ধর্মীয় জ্ঞানই একদিকদর্শী। মুসলমানের যেমন বেদ-পুরান, বাইবেল, ত্রিপিটক পাঠ করেন না; তেমনি হিন্দুরাও কোরআন-হাদিস ফেকা শাস্ত্রের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখার প্রয়াস পান না। এ মনোভাব শুধু সাধারণ সমাজ মানসকেই আক্রান্ত করে নি; দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী ও সংস্কৃত ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষকদের মধ্যেও একই ধারণা বিরাজমান। এই শ্রেণীর ধর্মীয় শাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের কেউই লালন সঙ্গীত পাঠ করা প্রয়োজনবোধ করেন না। পাঠ করলেও অর্থোদ্ধারে যোগ্যতা রাখেন না।

লালনকে বৃহত্তর গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা এবং লালন দর্শনের বিরুদ্ধে বৈরী মনোভাব তৈরীর ক্ষেত্রে শুধু হিন্দু মুসলিম বুদ্ধিজীবীরাই দায়ী নয়- তার চেয়ে অধিকতর দায়ী লালন অনুরাগী ও অনুসারী ভক্ত শিষ্যরা। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে লালনের নামে যে সব আখড়া গড়ে উঠেছে এবং যারা এসব আখড়া পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে তাদের অধিকাংশই অশিক্ষিত অথবা স্বল্পশিক্ষিত। এরা যেমন প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ তেমনি গুরুবাদী দর্শন উপলব্ধির ক্ষেত্রেও প্রায় অজ্ঞ। এই অশিক্ষিত ও অজ্ঞ লালনভক্তদের দ্বারা লালন দর্শনের বিকাশ না ঘটে বিনাশই ত্বরান্বিত হয়ে উঠছে।

সম্প্রতি লালন গবেষণায় দেশী-বিদেশীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। এদের আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে লালন সঙ্গীতের বিষয়ভিত্তিক আলোচনা-পর্যালোচনা। লালনের এমন কিছু সঙ্গীত রয়েছে যার মর্মোদ্ধার করা গবেষক তো দূরের কথা লালনপন্থী উচ্চমার্গের সাধকদের পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না। যেমন-
(ক) যেই পিতা সেইতো পতি
গঠলেন সাঁই আদম ছফি।
কে বোঝে তার কুদরতি
কেশের আড়ে পাহাড় লুকায়।
(খ) মাকে ছুলে পুত্রের মরণ
জীবগণে তাই করেন ধারণ।
ভেবে কয় ফকির লালন
হাটে হাড়ি ভাঙ্গবার নয়।

সর্বশেষ চরণটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গুরুবাদী সাধনায় এমন কিছু গুহ্য বিষয়ের অবতারণা ঘটেছে যা একমাত্র গুরুই অতি সংগোপনে শিষ্যের কাছে ব্যাখ্যা করতে পারে। এগুলো সর্বসমক্ষে প্রকাশযোগ্য নয়। অর্থাৎ হাটে হাড়ি ভাঙ্গবার নয়।

লালন শুধু একজন গীতিকার ও সুরকারই নন, তিনি একজন উচ্চমার্গের দার্শনিক। দার্শনিক পরিভাষা উপলব্ধি করতে হলে গবেষককেও দর্শন শাস্ত্রে দীর্ঘদিনের অধ্যয়নের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। সর্বোপরি একজন অধ্যাত্মবাদী সাধককে জানতে হলে গবেষককেও এধারার সাধক হতে হয়। এ পর্যন্ত লালন গবেষণার ধারায় সাফল্যের খাতায় যেটুকু যুক্ত হয়েছে তাতে শূন্য ছাড়া আর কোনো সংখ্যাই সংযোজিত হতে পারে নি।

লালনকে বুঝতে গেলে একদিকে যেমন বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস সম্পর্কে ব্যাপক অভিজ্ঞতার প্রয়োজন তেমনি দেহের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠনপ্রণালী ও তার কার্যকারীতা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানের অধিকারী হতে হয়। এ সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি সঙ্গীত উল্লেখ করার প্রয়োজনবোধ করছি। প্রথম সঙ্গীতটি-
তিন পাগলে হলো দেখা নদেয় এসে,
তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে।
একটা নারকোলের মালা,
তাতে জল তোলা ফেলা করঙ্গ সে,
হরিবলে পড়ছে ঢলে ধুলার মাঝে।
একটা পাগলামী করে
যাত দেয় অজাতেরে দৌড়ে গিয়ে।
পাগল হবি পাগলের সঙ্গে যাবি
বুঝবি শেষে।
পাগলের নাম এমনি
বলতে ফকির লালন
ভয় তরা সে,
চৈতে নিতে অদেয় পাগল
নাম ধরে সে।

লালন সাধনায় কল্পজগতের কোনো তত্ত্ব বা আখ্যান স্থান পায় নি। তিনি সর্বদাই তার চারপাশের বাস্তব জগত ও জীবনের কথাই কখনো সহজ-সরলভাবে কখনো বা তত্ত্বের আবরণে উপস্থাপন করার প্রয়াসী হয়েছেন। বিশেষ করে মানুষের জন্ম-কর্ম-ধর্ম ও মৃত্যু চিন্তা এক্ষেত্রে অধিকতর প্রাধান্য পেয়েছে।

তিনি ইসলামের তাত্ত্বিকদের অনুরূপ মানুষকে আশরাফুল মখলুকাত অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা জীব মনে করেছেন। তাই তিনি বলেছেন-
অনন্ত রূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই
মানবের চেয়ে উত্তম কিছু নাই।
দেব-দেবতাগণ করে আরাধন
জন্ম নিতে এ মানবে।

তিনি মানব জন্মের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে গিয়ে আরো উল্লেখ করেছেন-
আপন সুরাতে আদম
গঠলেন দয়া ময়।
নইলে কি ফেরেস্তারে
সিজদা দিতে কয়?

মানুষকে ফেরেস্তার সেজদা দেওয়ার কথা পবিত্র কুরআনের সূরা বাক্কারাহর ৩৪ সংখ্যক আয়াতে স্থান পেয়েছে। এতে উল্লেখ আছে ‘যখন আমি (আল্লাহ) ফিরিস্তাদের বললাম আদমকে সিজদা করো; তখন ইবলিশ ব্যতীত সবায় সিজদা করলো।’ কুরআনের এই তথ্যের আলোকে এদেশের পীরত্ববাদী কিছু ব্যক্তি শিষ্যদের পীরকে সিজদা করার অনুমতি দিয়ে থাকে। লালন ভক্তরা কিন্তু কোনক্রমেই তাঁদের সাঁইকে তথা গুরুদের সিজদার পরামর্শ প্রদান করে না।

রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ লালন সম্পর্কে যে সব ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে থাকেন আদৌ তা সত্যনিষ্ঠ নয়। পরমশ্রষ্টা আল্লাহর প্রতি লালনের নিষ্ঠা যে কত সুগভীর একটি সঙ্গীত পাঠ করলেই সে সম্পর্কে সুষ্পষ্ট ধারণা অর্জন করা যেতে পারে-
আল্লার নাম সার করে
যে জন বসে রয়,
তার কিসের কালের ভয়।
আল্লার নাম মুখে বল
সময় তো বয়ে গেল
মালিকুল মউত বলবে চল
সেকি করবে ভয়।
আল্লার নামে নাই তুলনা
আল্লাহ ডাকলে বিপদ থাকে না
দেখতে পায় জ্যোতির্ময়।

পরমসত্তা আল্লার পরেই লালনের হৃদয় অধিকার করেছিল প্রিয় রাসূল। তিনি গেয়েছেন-
ভুলো না মন কারো ভোলে
রাসূলের দ্বীন সত্য মানো
ডাক সদায় আল্লা বলে
খোদা প্রাপ্তি মূল সাধনা
রাসূল বিনে কেউ জানে না
জাহির বাতিন উপসনা
রাসূল হতে প্রকাশিলে।

আল্লাহ ও রাসূলের বিশ্বাসের নামই ঈমান। যে প্রকৃত ঈমানদার সেই নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাতে নিষ্ঠাবান। লালন নামাজের প্রতি এতো বেশী গুরুত্ব আরোপ করতেন যে দিন-রাত পাঁচবার মাত্র নয়-প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে তথা দমে দমে তিনি আল্লার নাম জিকির করার নির্দেশ দিয়েছেন আর এই নামাজকেই তিনি অভিহিত করেছেন দায়েমী নামাজ রূপে-
পড়বে দায়েমী নামাজ
দিন হলো আখেরী
মা শুক রূপ রেখে দিলে
দেখ ইশকের বাতি জ্বলে
কিবা সকাল কী বৈকালে
দায়েমির নাই অবধারি।

একথা স্বীকার্য যে তিনি শরীয়তের স্তর অতিক্রম করে তরিকতের সিঁড়ি বেয়ে মারফতের স্তরে উন্নীত হতে পেরেছিলেন। যে কারণে তিনি কোনক্রমেই শরীয়তকে উপেক্ষা করেন নি। এ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য অতি স্পষ্ট-
শরীয়ত আর মারফত যেমন
দুগ্ধেতে মিশানো মাখন,
মাখন তুললে দুগ্ধ তখন
ঘোল বলে তা জানে সবাই।
এতদ্সত্ত্বেও লালন সর্বদায়ই শরীয়তপন্থীদের বিরাগভাজনই থেকে গেছেন।

লালন ছিলেন সুফী সাধনার ধারায় এক উচ্চমার্গের সাধক। সুফী সাধকদের মূল লক্ষ থাকে দেহ থেকে দেহাতিতের তথা অতিন্দ্রীয়লোকে উপনীত হওয়া। একেই বলে হকিকতের স্তর। সুফী দর্শনের বিখ্যাত উক্তি-
‘মানআরাফা নাফছাহু
ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু’

অর্থাৎ যে নিজেকে জেনেছে সে তার রবকে জেনেছে। পাশ্চাত্য দার্শনিকেরা একেই বলেছেন- Knoweth thyself (নিজেকে জানো), ভারতীয় উপনীষদে একই কথা উক্ত হয়েছে- আত্মানাং বিদ্ধি অর্থাৎ নিজেকে জানো। লালনের একটি গানেও এই শাশ্বত দর্শনের অভিব্যক্তি ঘটেছে-
খোদ চিনলে খোদা চিনে
খোদ খোদা বলেছে আপনি
মানআরাফা নাফছাহু বাণী
বোঝ তার কি হয় মানে।

অন্য একটি গানে আরো বলেছেন-
আপনারে আপনি যদি চেনা যায়
তবে তারে চিনতে পারি
সাঁই পরিচয়।

এরূপ তাত্ত্বিকতার জগতে সকলের পক্ষে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে ভক্তদের উদ্দেশ্যে তিনি যা বলেছেন তাও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সত্য বল সুপথে চলো ওরে আমার মন
সত্য সুপথ না চিনিলে পাবি না মানুষের দর্শন।

মানুষকে সত্য ও সুপথে চলতে গেলে অর্জন করতে হয় পঙ্কিলতা বর্জিত এক নির্মল জীবন। যেটা সাধারণের পক্ষে অনুসরণ করা অনেকটাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এ সম্পর্কে লালন বলেছেন-
না গোচিলে মনের ময়লা
সেই সত্য পথে না যায় চলা।
মন পরিষ্কার কর আগে
অন্তর বাহির হবে খোলা।
তবে যত্ন হলে রত্ন পাবে
এড়াবে সংসার জ্বালা।

গুরুবাদী সাধনায় সিদ্ধিলক্ষ্যে সর্বদাই সময়নিষ্ঠ হতে হয়। প্রাতের কাজ সন্ধ্যায়, সন্ধ্যার কাজ বিকেলে করলে সিদ্ধির পথ ত্বরান্বিত হয় না। এক্ষেত্রে গুরুর বিরাগভাজন হতে হয়। যে কারণে গুরু শিষ্যদের সময়ের প্রতি সচেতন হওয়ার নির্দেশ দান করে থাকেন-
সময় গেলে সাধন হবে না
দিন থাকিতে দীনের সাধন,
কেন করলে না।

আলস্য পরিহার ছাড়া জীবনে সাফল্যের কোনো স্তরেই অতিক্রম করা সম্ভব নয়। লালন এর দৃষ্টান্ত দিতে গিয়েই বলেছেন-
অসময়ে কৃষি করে
মিছাঁমিছি খেটে মরে
গাছ যদিও হয় বীজের জোরে
ফলতো ধরে না।

সাধকেরা মানবদেহকে কৃষি জমির সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। যথাযথভাবে কর্ষণ ছাড়া ভালো ফসল প্রত্যাশা করা যায় না। লালন সে কথাই বলেছেন-
সময় বুঝে কেন বাঁধাল বাঁধলে না
জল শুকাবে মিন পলাবে পস্তাবই ভাইমনা।

এখানে আখ্যারিক অর্থে জলের সঙ্গে মাছের সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ জমিদে আইল দিয়ে যদি জল ধরে রাখা না যায় তবে মাছ পালিয়ে যাবে। লালন এ থেকে ভাবার্থে বুঝাতে চেয়েছেন দৈহিক সুস্থতা সচেতন না হলে মীন রূপ বীর্য অকালে ধ্বংস হয়ে যাবে। দেহের বীজ নামান্তর মনিই যদি না থাকে সে দেহধারণও সম্ভব হয় না।

মানুষের চিরন্তন জিজ্ঞাসা-আত্মা কি? আত্মার সঙ্গে পরমত্মারই বা সম্পর্ক কি? দেহ ও আত্মার সম্পর্কের স্বরূপ কি? এই সব জটিল প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছেন লালন। তিনি আত্মা বলতে দেহাধারে প্রবাহিত বায়ুকে নির্দেশ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে আত্মা নিরাবয়ব, অনুভূতি সাপেক্ষ, অদৃশ্যমান। তার কথায়-
মন আমার কি ছার গৌরব
করছো ভবে,
দেখনারে মন হাওয়ার খেলা
হাওয়া বন্ধ হতে দেরী কি হবে।

সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করার উদ্দেশ্যে লালন আত্মাকে রূপকার্থে পাখি আর দেহকে খাঁচা বা ঘর হিসেবে তুলনা করেছেন। যেমন-
(ক) আমার এ ঘরখানায় কে
বিরাজ করে
আমি জনম ভরে একদিন
দেখলাম নারে।
(খ) খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কমনে আসে যায়
ধরতে পারলে মন বেড়ী
দিতাম পাখির পায়।
(গ) কি এক অচিন পাখি
পুষলাম খাঁচায়,
হলো না জনম ভরে
তার পরিচয়।

আত্মা সম্পর্কে লালনের ভিন্নতর দর্শনের পরিচয়ও লক্ষ করা যায়। সুফী দর্শনের আশিক-মাশুক তত্ত্ব, বৈষ্ণব দর্শনের রাধা-কৃষ্ণ তত্ত্ব তথা জীবাত্মা-পরমাত্মার কথা বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। বৈষ্ণবেরা কৃষ্ণকে পরমাত্মা আর রাধাকে জীবাত্মার প্রতীকে সাধনার প্রয়াস পেয়েছেন। লালন এই দর্শনের প্রভাবকে তাঁর সাধনায় অঙ্গীভুত করতে পেলেছিলেন বলেই আত্মাকে ভালোবেসে ‘মানুষ’ ‘মনের মানুষ’ ‘সহজ মানুষ’ ‘অধর মানুষ’ ভাবের মানুষ’ ‘সোনার মানুষ’ ‘আলেখ মানুষ’ সাঁই ইত্যাদি নামে সম্বোধন করেছেন। একটি গানের মাধ্যমে বলেছেন-
এই মানুষে সেই মানুষ আছে
কত মনি ঋষি চারযুগ ধরে
বেড়াচ্ছে খুঁজে।

এখানে সেই ‘মানুষ’ বলতে লালন খোদাকেই বোঝাতে চেয়েছেন। লালনের অন্য একটি গানেও এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যথা-
মানুষে মানুষ রয়েছে মিশে
তোর নাই জ্ঞান নয়ন
ওরে অবোধ মন
সে মানুষ রতন
তুই চিনবি কিসে।

মানুষ আর স্রষ্টার সত্তাকে একাকার করে দেখার এই যে তত্ত্ব একেই লালন বলেছেন ‘মানুষ তত্ত্ব’। তার কথায়-
ওগো মানুষের তত্ত্ব বল না
ভাবের মানুষ কয়জনা।

লালনের সাধনার স্বরূপ উদ্ধার করতে পারলে, এই মানুষের মধ্যেই যে সোনার মানুষের সন্ধান পাওয়া যাবে এতে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকবে না। লালন দৃঢ়তার সঙ্গে যে কথাটি ব্যক্ত করেছেন তা হলো-
ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
সর্বসাধন সিদ্ধি হয় তার।

এ প্রসঙ্গে তাঁর সর্বশেষ পরামর্শ- ‘মানুষ ভজে সোনার মানুষ হনা’।

পৃথিবীর সকল ধর্মশাস্ত্রেই এপার-ওপারের কথা অর্থাৎ ইহকাল-পরকালের কথা স্থান পেয়েছে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে। জীবনের পরন্ত বেলায় উপনীত হয়ে লালনও পরম স্রষ্টা আল্লাহর কাছে আত্মনিবেদন করেছেন। তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলেছেন-
পারে লয়ে যাও আমায়
আমি অপার হয়ে বসে আছি
ওহে দয়াময়।

স্রষ্টার প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধা, বিনয়, ভালোবাসার নিদর্শন থেকে লালনকে একজন আস্তিক্যবাদী সাধকের ধারায় দেখা যেতে পারে। তবে এ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার সময় এখনো আসে নি। কারণ লালনকে নিয়ে প্রকৃতপক্ষে কোনো গবেষণাই হয় নি। তাঁর সম্পর্কে যেটুকু ধারণা আমার অর্জিত হয়েছে তা থেকে বড় জোর বিশাল বারিধি থেকে উত্তোলিত এক ঘটি জলের সঙ্গেই আমার এই প্রবন্ধটির বিষয় তুলনা করা যেতে পারে।


নিউজটি অন্যকে শেয়ার করুন...

আর্কাইভ

business add here
© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com