শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:৪২ পূর্বাহ্ন

রবীন্দ্র ছোটগল্পে হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ

রবীন্দ্র ছোটগল্পে হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ

Professor Dr. Md. Abdul Jalil (প্রফেসর ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল)

লেখক: প্রফেসর ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল, উপ-উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী।

রবীন্দ্র সাহিত্য হিন্দুর নয়-মুসলমানেরও নয়। সাহিত্য কখনও জাত-পাতের নিরীখে রচিত হয় না। সাহিত্যের মূল লক্ষ্য মানুষ, মানুষের মন, মানুষের ধর্ম, মানুষের সমাজ-সংস্কৃতির সার্বিক পরিচয়ে। রবীন্দ্র সাহিত্য আজ আর শুধু বাঙালীর বাংলার সাহিত্য নয়, বিশ্বমানবের সাহিত্য। তিনি বিশ্বকবি। তাকে খন্ডিত দৃষ্টিতে দেখার কোন অবকাশ নেই।

রবীন্দ্রনাথ জন্মসূত্রে (২৫ বৈশাখ, ১৩৬৮) কলকাতা মহানগরীর এক সৌভাগ্যবান পরিবারের সন্তান। জোড়াসাঁকোতে তাঁর জন্ম। যাকে বলে সোনার চামচ মুখে নিয়েই তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ব্রাহ্মধর্মের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তাকে সম্মানিত করা হত ‘মহর্ষি ’ শিরোনামে। পিতামহ দ্বারকানাথের অভিধা ছিল ‘প্রিন্স’। অর্থে, আভিজাত্যে সেকালের বাঙলার ঠাকুর পরিবারের স্থান ছিল শীর্ষে।

রবীন্দ্রনাথের বাল্য-কৈশোর অতিক্রান্ত হয়েছিল জোড়াসাঁকোতে। শিক্ষা-দীক্ষার সবটাই মহানগর কেন্দ্রিক। কর্মসূত্রে তাঁকে আগমন করতে হয় উত্তর-মধ্যবঙ্গে। তিনি পূর্ববঙ্গের প্রকৃতিকে দেখেছেন অন্তরঙ্গ দৃষ্টিকোণ দিয়ে। তিনি নদীপথে গমনাগমন করেছেন বর্ষাকালে। তাঁর বাহন ছিল নৌকা, বাহক ছিলেন মুসলমান মাঝিমাল্লা। তিনি পদ্মা, নারদ,বড়াল,ইছামতি,হুরাসাগর হয়েই শিলাইদহ থেকে পতিসর, পতিসর থেকে শাহজাদপুরে গিয়েছেন। দূর থেকে দেখেছেন পদ্মাপাড়ের কৃষক, কৃষকের কাটা ধান, দেখেছেন তাদের ফসল ফলানোর বিচিত্র দৃশ্য। শুনেছেন মাঝিমাল্লার কন্ঠে গ্রাম্য গীত। তিনি হৃদয়ের দূরবীক্ষণে ক্ষুদ্রকে বৃহৎ, রূপকে অরুপের সৌন্দর্যলোকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁর কাছে পূর্ববঙ্গ ছিল প্রকৃতি রাজ্যের অপার বিস্ময়। তিনি দেখেছেন প্রকৃতি, সেই প্রকৃতির সন্তান মানুষ, তাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, উৎসাহ-উদ্দীপনা, অনন্ত সমস্যা ও সমাধানের চালচিত্র। মানুষের জীবনের ক্ষুদ্র-বৃহৎ, তুচ্ছ-উচ্ছ ঘটনার অনন্ত রহস্যাবৃত্ত জগতের একেকটুকরো ঘটনার উদ্ভাসনে তাঁর রচিত একেকটি ছোটগল্প। প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পের স্রষ্টা। রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পের জনক।

রবীন্দ্রনাথ গল্প লিখেছেন অনেক। প্রায় শ’খানেক (৯৫)। এর মধ্যে পারিবারিক জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা যেমন অভিব্যক্তি পেয়েছে তেমনি বিবৃত হয়েছে ইতিহাসের দুষ্প্রাপ্য ঘটনার নানা উপাত্ত; মানবজীবনের দুর্নিবার বাসনা, আভিজাত্যের অহমিকায় আত্মবিনাশী সিদ্ধান্তের করুণ পরিণতি।

রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ গল্পের বিষয় ও চরিত্র হিন্দু সমাজ, ধর্ম, বিশ্বাস ও সংস্কার নির্ভর। তিনি মুসলিম সমাজ দেখেছেন কিন্তু সেই সমাজের প্রকৃত সমস্যা নিরূপণে সক্ষম হননি। এটা যে রবীন্দ্রপ্রতিভার অপরিসীম সীমাবদ্ধতা এ সত্য অস্বীকারের কোন উপায় নেই। তার গল্প সংখ্যা ৯৫ অথচ মুসলমানদের নিয়ে রচিত গল্পের সংখ্যা মাত্র ৪। রবীন্দ্রনাথ যে চারটি গল্পে মুসলিম নির্ভর কাহিনী উপস্থাপন করেছেন এ প্রসঙ্গে তার কিছুটা ইঙ্গিত প্রদান করা আবশ্যক বোধ করি। তাঁর লেখা মুসলিম প্রধান গল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে- কাবুলীওয়ালা, দালিয়া, দুরাশা,মুসলমানীর গল্প প্রমূখ। কাবুলীওয়ালা গল্পের নায়ক রহমত পাঠান মূলুকের। দালিয়া গল্পের প্রধান চরিত্র আরাকান রাজ্যের। দুরাশা গল্পের মূখ্য চরিত্র বদ্রাওনের নবাব গোলাম কাদের খাঁ’র পুত্রী নূরউন্নীসা বা মেহের উন্নীসা বা নূর-উল-মূলক। মুসলমানী গল্পের নায়ক হবির খাঁ। বাঙালী মুসলিম সমাজ ও বাঙালী মুসলিম পরিবারের সন্তান হিসাবে প্রকৃতপক্ষে এদের প্রতিষ্ঠিত করার যথার্থ যৌক্তিকতা নেই।

প্রথম গল্প কাবুলীওয়ালা গল্পের সহ-চরিত্র মিনি নামক যাকে কল্পনা করা হয়েছে সে গ্রাম্য বালিকা নয়। কলকাতা শহরের অভিজাত এক হিন্দু পরিবারের কন্যা। রহমতের সঙ্গে মিনির সম্পর্ক বাণিজ্যসূত্রে গ্রোথিত নয়। পিতৃহৃদয়ের অপত্য স্নেহসিক্ত মিনি। রহমত একজন পিতা- দেশে তার মিনির বয়সী এক কন্যার অবস্থান। সে প্রতিদিন মিনিকে দেখার মধ্যে তার কন্যাকেই যেন হৃদয়ের দর্পণে দেখার প্রয়াস পেয়েছে। এ এক শাশ্বত পিতা। কন্যার হাতের ছাপবিশিষ্ট একটুকরো কাগজ সে দীর্ঘ লম্বা জামার ভেতরের পকেটে হৃদয়ের কাছে ধারণ করে বেসাতি করে বেড়ায়। রবীন্দ্রনাথ রহমত চরিত্রের মধ্য দিয়ে যে শাশ্বত পিতৃচরিত্র প্রতিস্থাপন করেছেন তা সত্যিই অনন্যসাধারণ গৌরবে অলঙ্কৃত। সামান্য অপরাধে কয়েক বছর কারাদন্ড ভোগের পর সে যখন মুক্তি পায় প্রথমেই আসে মিনির স্নেহার্ত মুখখানি দর্শনের জন্য। মিনির বয়স যে তখন ৭ থেকে অতিক্রম করে ১৪ তে উপনীত হয়েছে এটা সে ভাবতেও পারেনি। যেদিন সে মিনিকে দেখতে আসে সেদিন চলছিল তার বিয়ের আয়োজন। কাবুলীওয়ালাকে দেখে মিনির বাবা কিছুটা বিব্রত অবস্থায় পড়ে যায়। সে কাবুলীওয়ালাকে ফিরিয়ে দেয়। কাবুলীওয়ালা নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে উদ্যত হয়, অবশেষে দরজার কাছে ফিরে গিয়ে একটু ইতস্তত করে বলে-খোকীকে একবার দেখতে পাইবোনা? রবীন্দ্রনাথ এই সময়ের রহমতের মানসিক অবস্থা কল্পনা করতে গিয়ে বলেছেন-তাহার মনে বিশ্বাস ছিল মিনি সেইভাবেই আছে, সে যেন মনে করিয়াছিল মিনি আবার সেই পূর্বের মত কাবুলীওয়ালা,কাবুলীওয়ালা করিয়া ছুটিয়া আসিবে, তাহাদের সেই অভ্যস্ত কৌতুকাবহ পুরাতন হাস্যালাপের কোনরূপ ব্যত্যয় হইবে না। এমনকি পূর্ব বন্ধুত্ব স্মরণ করিয়া সে এক বাক্স আঙ্গুর এবং কাগজের মোড়কে কিঞ্চিত কিসমিস বাদাম বোধ করি কোন স্বদেশীয় বন্ধুর নিকট চাহিয়া-চিন্তিয়া সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিল এবং তাহার সেই নিজের ঝুলিটি আর ছিলনা। তবুও তাহাকে মিনির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হলনা। সে নিরাশ হয়ে চলেই যাচ্ছিল। সহাসা ফিরে এসে বলল- এই আঙ্গুর আর কিসমিস বাদাম খোকীর জন্য আনিয়াছিলাম।তাহাকে দিবেন।

মিনির বাবা সেগুলো গ্রহণ করল এবং এর একটা মূল্য পরিশোধের চেষ্টা করল। সেই মুহূর্তে কাবুলীওয়ালার অভিব্যক্তি ছিল-আপনার বহুত দয়া আমার চিরকাল স্মরণ থাকবে। আমাকে পয়সা দিবেন না। বাবু, তোমার যেমন একটি লড়কি তেমনি দেশে আমারও একটি লড়কি আছে, আমি তাহারই মুখখানি স্মরণ করিয়া তোমার খোকীর জন্য কিছু কিছু মেওয়া হাতে লইয়া আসি, আমি তো সওদা করিতে আসি না।

এই যে, আমি তো সওদা করিতে আসিনা , একটি ছোট বাক্যের মধ্যে যেমন কন্যাদর্শন বঞ্চিত এক বিশ্বকাতর পিতার হৃদয়ের আর্তি উছলে পড়তে লাগল। ঘটনার এখানেই শেষ নয়। কাবুলীওয়ালা অতঃপর যা করল তা আরও বেদনার আর্তিতে পরিপূর্ণ। সে আপনার মস্ত ঢিলা জামাটার ভেতর হাত চালাইয়া দিয়া বুকের কাছে কোথা হইতে একটুকরা ময়লা কাগজ বাহির করিল। বহু কষ্টে ভাজ খুলিয়া দুই হস্তে আমার টেবিলের উপর মেলিয়া ধরিল। মিনির বাবার সেই মুহূর্তের অনুভূতি ছিল-দেখিলাম কাগজের উপর একটি ছোট হাতের ছাপ। ফটোগ্রাফ নহে, হাতে কিছুটা ভুষা মাখাইয়া কাগজের উপরে তাহার চিহ্ন ধরিয়া লইয়াছে। কন্যার এই স্মৃতিটুকু বুকে লইয়া প্রতিবছর কলকাতার রাস্তায় মেওয়া বেচিতে আসে। যেন সেই সুকোমল ক্ষুদ্র শিশুহস্তটুকুর স্পর্শখানি তাহার বিরাট বিরহী বক্ষের মধ্যে সুধা বিস্তার করিয়া রাখে।

অতঃপর লেখক বাঙালী পিতা ও কাবুলীওয়ালা পিতার হৃদয়ের অভিন্ন সুরতন্ত্রীর পরিচয় প্রসঙ্গে বলেছেন- দেখে আমার চোখ ছলছল করিয়া আসিল। তখন সে যে একজন কাবুলীওয়ালা আর আমি যে একজন বাঙালী সম্ভ্রান্ত বংশীয়, তাহা ভুলিয়া গেলাম। তখন বুঝিতে পারিলাম সেও যে আমিও সে। সেও পিতা, আমিও পিতা।

এই গল্পের মূল বক্তব্য মূলত এখানেই, স্নেহের কাছে সমগ্র বিশ্বের পিতৃ হদয় এক এবং অভিন্ন। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবিক চিন্তার এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

দ্বিতীয় গল্পের পটভূমি আরাকান। আরাকানী যুবক দালিয়ার সঙ্গে শাহজাদা সুজার তনয়া আমিনার সখ্যতার এক অভূতপূর্ব প্রেমানুভূতির বর্ণনা। স¤্রাট শাহজাহানের পুত্র বাঙলার সুবাদার শাহজাদা সুজা আওরঙ্গজেবের ভয়ে ভীত হয়ে তিন কন্যা সহ পালিয়ে গিয়ে আরাকানে আশ্রয় গ্রহণ করে। এক পর্যায়ে আরাকান রাজ তার তিন পুত্রের সঙ্গে সুজার তিন কন্যার বিয়ের প্রস্তাব করলে শাহজাদা সুজা তা প্রত্যাখান করে। ইতোপূর্বে তার প্রথম কন্যা আত্মহত্যা করে। আরাকান রাজ শাহজাদা সুজা ও তার দুই কন্যাকে জলে ডুবিয়ে হত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সুজা তার কনিষ্ঠ কন্যা আমিনাকে এই সময় জলে নিক্ষেপ করে। আমিনা সৌভাগ্যক্রমে এক জেলের জালে আটকা পড়ে জীবন রক্ষার সুযোগ পায়। জেলের আদরে ক্রমবর্ধিত হতে থাকে আমিনা।দালিয়া এক পর্যায়ে আমিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশার সুযোগ লাভ করে। ক্রমান্বয়ে তাদের মধ্যে সখ্যতা বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয় কন্যা জুলেখা শাহজাদা সুজার এক বিশ্বস্ত কর্মচারী রহমত আলীর সহায়তায় আরাকানে পালিয়ে থাকতে সক্ষম হয়। একপর্যায়ে জুলেখা ঘুরতে ঘুরতে জেলের ঘরে লালিত-পালিত আমিনার সাক্ষাত পায় এবং পরষ্পরের পরিচয়ের মধ্য দিয়ে জুলেখা আমিনাকে আরাকান রাজ হত্যায় উদ্বুদ্ধ করে। এক পর্যায়ে আরাকান রাজ তাদের পরিচয় জানতে পারে এবং তাদের পুত্রদের সঙ্গে পুনরায় বিয়ের আয়োজন করে। আরাকান রাজ যে শিবিকায় সুজার দুই কন্যাকে রাজ পরিবারে নিয়ে যায় সেসময় জুলেখা আমিনার হাতে একটি ছুরিকা তুলে দেয়। লক্ষ্য বিবাহ রজনীতেই আরাকান রাজপুত্রকে হত্যার মধ্য দিয়ে পিতৃহন্তার প্রতিশোধ গ্রহণ করা। দালিয়া জানত যে জুলেখা ও আমিনা তার পিতৃহন্তা হতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তখনও সে নিজের পরিচয় অব্যক্ত রাখে। বিবাহ বাসরে গিয়ে আমিনা দেখতে পায় দালিয়া বরবেশে শয্যায় উপবিষ্ট। আমিনা দালিয়াকে দেখেই ভয়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে। দালিয়া আমিনাকে কোলে করে উঠিয়ে শয্যায় শুইয়ে দেয়। গল্পকার এই কাহিনীর মধ্য দিয়ে ট্র্যাজিক ঘটনাকে মিলনাত্মক ঘটনায় রূপান্তরিত করে গল্পটির যথেষ্ট চমতকারিত্ব দান করেছেন। মূলত রবীন্দ্র ছোটগল্পের শৈল্পিক উপস্থাপনার এ এক অভিনব কৌশল।

তৃতীয় গল্প ‘দুরাশা’র কাহিনী দাজ্জিলিং এর ক্যালকাটা রোডের ধারে উপবিষ্ট এক সন্ন্যাসীনির জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে। প্রকৃতপক্ষে এই সন্ন্যাসীনি ছিলেন বদ্রাওনের নবাব গোলাম কাদের খাঁর কন্যা নাম নূরউন্নীসা বা মেহেরউন্নীসা বা নূর-উল-মূলক। কিভাবে এই নবাবপুত্রী ঘটনাক্রমে তারই পিতার সেনাধ্যক্ষ কেশরলালের প্রণয়াসক্ত হয়ে পড়ে এবং জীবনের ভয়াবহ করুণ পরিণতির সম্মুখীন হয় তারই পরিচয় এ গল্পের মূখ্য বিষয়। সন্ন্যাসীনির ভাষ্যে-‘কেশরলাল পরম হিন্দু ছিল। আমি প্রত্যহ প্রত্যুষে উঠিয়া অন্তঃপুরের গবাক্ষ হইতে দেখিতাম, কেশরলাল আবক্ষ যমুনার জলে নিমগ্ন হইয়া প্রদক্ষিণ করিতে করিতে জোর করে উর্ধ্বমুখে নবোদিত সূর্যের উদ্দেশে অঞ্চলি প্রদান করিত।পরে সিক্ত বস্ত্রে ঘাটে বসিয়া একাগ্র মনে যপ সমাপ্ত করিয়া পরিষ্কার সুকন্ঠে ভৈর‌্যেঁ রাগে ভজন গান করিতে করিতে গৃহে ফিরিয়া আসিত’।

নবাবপুত্রীর এই যখন হৃদয়ের অবস্থা তখনই কোম্পানির লোকের সঙ্গে নবাববাহিনীর কলহের সূত্রপাত। নবাব ছিলেন সমঝোতার পক্ষে কিন্তু কেশরলাল কোনক্রমেই কোম্পানির কাছে নতি স্বীকার করতে রাজি ছিলনা। যার ফলে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। পরাজিত হয় নবাব বাহিনী। যুদ্ধ ক্ষেত্রে আহত কেশরলালের জীবন সঙ্কটাপন্ন হয়ে ওঠে। সেই দুঃসময়ে নবাবপুত্রী তার সেবায় আত্মনিবেদিত হয়। কেশরলাল যখন জল তৃষ্ণায় ব্যাকুল সেই মুহূর্তে মেহেরুননেসা যমুনা থেকে গাত্রবস্ত্র ভিজিয়ে সেই জল কেশরলালকে পান করিয়ে কিছুটা সুস্থ করে তোলে। কেশরলাল যখন জানতে পারে সে নবাব কন্যার সেবিত জলে সুস্থতা লাভ করেছে তখনই কেশরলাল ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। নবাবপুত্রীর ভাষায়-আমার পরিচয় পাইবা মাত্র কেশরলাল সিংহের ন্যায় গর্জন করিয়া উঠিয়া বলিলেন-বেঈমানের কন্যা, বেধর্মী। মৃত্যুকালে যবনের জল দিয়া তুই আমার ধর্ম নষ্ট করলি। এই বলিয়া প্রবল বলে আমার কপোল দেশে দক্ষিণ করতলের আঘাত করিলেন। আমি মূর্ছিত প্রায় হইয়া চোক্ষে অন্ধকার দেখিতে লাগিলাম।

অতঃপর যে ঘটনার অবতারণা করা হয়েছে তার সবটাই বেদনাবিধূর। নবাবপুত্রী কেশরলালের সাক্ষাতের জন্য ভারতের নানা স্থানে এমনকি নেপাল পর্যন্ত গিয়েছেন। অবশেষে সে জানতে পারে কেশরলাল দার্জিলিংয়ে অবস্থান করছে। কেশরলালের ধর্মেও অহমিকা বৃথা, বৃথা তার দৈহিক সুচিতায়। এর প্রমাণ সে দার্জিলিং এ এসে এক ভুটিয়া রমণীর পাণি গ্রহণ করেছে। তার পুত্র-পৌত্র রয়েছে। নবাবপুত্রী আটত্রিশ বছর ছুটেছে কেশরলালের সান্নিধ্য লাভের প্রত্যাশায়। সান্নিধ্য মেলেনি। দর্শন মিলেছে দূর থেকে। জীবন সায়াহ্নে উপনীত হয়ে দৈহিক সৌন্দর্য হারিয়েছে, হারিয়েছে সুস্থতা। জীবনযন্ত্রণা যেন ধূপের ঘ্রাণের মত আটত্রিশ বছরের প্রেমের সুঘ্রাণের মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে। একটি কল্পিত কাহিনীর মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ এক ব্যর্থ প্রেমিকার যে জীবনচিত্র উপস্থাপন করেছেন তা সত্যি অপূর্ব।

রবীন্দ্রনাথ জীবন সায়াহ্নে উপনীত হয়ে লেখেন ‘মুসলমানীর গল্প’। গল্পটির রচনাকাল ২৪-২৫ জুন ১৯৪১। সম্ভবত আত্মবিশ্লেষণী মনোভাব থেকেই এমন একটি গল্পের অবতারণা। পূর্বের তিনটি গল্পই ছিল ভিনদেশী পটভূমিকায় রচিত। প্রথম গল্পের নায়ক পাঠান মূলুকের রহমত, দ্বিতীয় গল্পের দালিয়া আরাকান রাজপুত্র, তৃতীয় গল্পের নূরউন্নীসা বদ্রাওনের নবাব গোলাম কাদের খাঁ’র কন্যা। এখানে নেই বাঙালী মুসলিম সমাজ, নেই বাঙালী মুসলিম চরিত্র।

মুসলমানী গল্পে মুসলিম সমাজের কলঙ্ক-অকলঙ্ক উভয় দিকই প্রাধান্য পেয়েছে। গল্পকার যে তালতড়ি এলাকার কথা উল্লেখ করেছেন তা ছিল মূলত মুসলিম দস্যুদের নৈরাজ্য অধ্যুষিত এলাকা। এ এলাকার মধু মোল্লা ডাকাত দলের সর্দার। অথচ একই এলাকায় বাস হবির খাঁ’র। যে কিনা দস্যুদের আক্রমণ থেকে নববিবাহিতা হিন্দু কূলবধূদের উদ্ধারে ব্রতী। নববধূ কমলা মধুমোল্লার ডাকাত দল কর্তৃক আক্রান্ত হলে হবির খাঁ উপস্থিত হয় উদ্ধারের ভূমিকায়। ডাকাত দল কমলাকে ছেড়ে দেয়। সে ফিরে যেতে চায় তার পিতৃব্যের কাছে। কিন্তু অনুদার হিন্দু সমাজ কখনও মুসলমানদের সংস্পর্শে আগত কোন নারীকে আর সমাজে গ্রহণ করেনা। গ্রহণ করেনি কমলাকে।

হবির খাঁ ভিন্নজাতের এক অভিজাত মুসলমান। যার মা রাজপুতানি। তার আটমহলা বাড়ি, একটি মহলই রয়েছে রাজপুতানির নামে। এখানে সমাজ পরিত্যক্ত হিন্দু কূলবধুরা আশ্রয় লাভ করে। যেখানে ব্রাহ্মণ তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকে। এই আঙিনায় রয়েছে শিব মন্দির, রয়েছে পুজার উপকরণ। কমলা পিতৃব্য পরিত্যক্ত হয়ে হবির খাঁ’র রাজপুতানি মহলে ফিরে আসে। ধীরে ধীরে হবির খাঁ’র পুত্র করিম খাঁ’র সঙ্গে হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। এই পর্যায়ে এসে কমলা হবির খাঁ’কে বলে-বাবা, আমার কোন ধর্ম নেই, আমি যাকে ভালোবাসি সেই ভাগ্যবানই আমার ধর্ম। যে ধর্ম চিরদিন আমাকে জীবনের সব ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেছে, অবজ্ঞার আস্তাকুঁড়ের পাশে আমাকে ফেলে রেখে দিয়েছে, সে ধর্মের মধ্যে আমি তো দেবতার প্রসন্নতা কোনদিন দেখতে পেলুম না। যেখানকার দেবতা আমাকে প্রতিদিন অপমানিত করেছে সে কথা আজও আমি ভুলতে পারিনে। এ প্রসঙ্গে কমলা আরও বলেছে-যে দেবতা আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন সেই ভালোবাসার সম্মানের মধ্যে তাকেই আমি পুজো করি। তিনিই আমার দেবতা। তিনি হিন্দুও নন, মুসলমানও নন।

প্রকৃতপক্ষে মানুষের পরিচয় জাত-পাতে নয়, মনুষ্যত্বে, ভালোবাসায়। রবীন্দ্রনাথ মুসলমানীর গল্পের মধ্য দিয়ে হবির খাঁ’র ঔদার্য্যরে পরিচয় তথা অভিজাত শ্রেণীর মুসলিম সমাজেরই গৌরবগাথা তুলে ধরেছেন।

রবীন্দ্রনাথ বাংলার মুসলমান সমাজ প্রত্যক্ষ করেছেন ঠিকই, তবে বাঙালী মুসলমান আর বহিরাগত মুসলমানের মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান দৃশ্যমান সে দিকটির পরিচয় তিনি যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হননি। রবীন্দ্রজীবনের এই যে সীমাবদ্ধতা সেই সীমাবদ্ধতার সত্যটি প্রতিষ্ঠায় তার অন্তঃদৃষ্টি ছিল স্বচ্ছ, নির্মল ও পবিত্র। ছোটগল্পে বাঙালী মুসলমানের অনুপস্থিতির অভাব রবীন্দ্রনাথ সর্বদাই উপলব্ধি করতে পেরেছেন এবং তা থেকেই এমন একটি গল্প রচনা করে কিছুটা হলেও আত্মস্খালনে সচেষ্ট হয়েছেন।


নিউজটি অন্যকে শেয়ার করুন...

আর্কাইভ

business add here
© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com