মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০১:২৬ অপরাহ্ন

বজ্রকণ্ঠ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা । প্রফেসর আবদুল খালেক

বজ্রকণ্ঠ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা । প্রফেসর আবদুল খালেক

Professor Dr. Abdul Khaleque (প্রফেসর ড. আবদুল খালেক)

নীলকণ্ঠ বললেই আমরা যেমন দেবতা শিবকে বুঝে থাকি, অনুরূপভাবে বজ্রকণ্ঠ বললেই প্রতিটি বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কণ্ঠকেই বুঝে থাকে। আধুনিক বিজ্ঞানের আশির্বাদে মানুষের কণ্ঠস্বরকে বাণীবদ্ধ করে তাকে স্থায়ীরূপ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ১৯৭১ সালে তৎকালীন রমনার রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, সেই ভাষণটি ছিল মূলত পরাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দীর্ঘ নয় মাস ধরে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগারে আটক করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ৭ই মার্চের বজ্রকন্ঠ বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে এতটা অনুপ্রানিত করে তুলেছিলো যে, দেশের জন্য অকাতরে নিজেদের জীবনকে বিলিয়ে দিতে তাঁরা কুণ্ঠিত হন নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নিয়মিত বজ্রকণ্ঠ নামের একটি অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এই অনুষ্ঠানটি ছিল প্রেরণার উৎস। একটি কণ্ঠস্বর একটি পরাধীন জাতিকে কিভাবে শৃঙ্খলমুক্ত করতে পারে, বজ্রকণ্ঠ ছিল তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইতিহাসের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে।

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বর্ষের বিভক্তি ঘটে। জন্ম লাভ করে পাকিস্তান নামের এক নতুন রাষ্ট্র। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম লগ্নেই দেখা দেয় রাষ্ট্রভাষা নিয়ে সমস্যা। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে ঘোষণা দেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এই ঘোষণার বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সমাজ তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে তরুণ শেখ মুজিবকে জেলে যেতে হয়।

চল্লিশ এবং পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তানের বৃহত্তর রাজনীতিতে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, পূর্বাঞ্চলের নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নেতা ছিলেন এ.কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আব্দুল হামিদ খান ভাসানী প্রমুখ। রাজনৈতিক আদর্শ বিচারে আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও এ.কে ফজলুল হক ছিলেন পাশ্চাত্য ধারার গণতন্ত্রের প্রবক্তা। এই প্রখ্যাত তিন নেতার মধ্য থেকে শেখ মুজিব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকেই তাঁর আদর্শ নেতা হিসেবে বেছে নেন এবং পাশ্চাত্য ধারার গণতন্ত্রকেই তিনি তাঁর রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। যে কারণে মওলানা ভাসানীর সাথে তাঁর আদর্শগত দূরত্ব বেড়ে যায়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিবের সাথে মওলানা ভাসানীর আদর্শগত পার্থক্য এক সময় এতটা প্রকট হয়ে ওঠে যে, শেষ পর্যন্ত মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। আওয়ামী লীগের মধ্যে যাঁরা কট্টর সমাজতন্ত্রীমনা রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ছিলেন, তাঁরাও আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগদান করেন। এছিল পঞ্চাশের দশকের ঘটনা।

ষাটের দশকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আকস্মিক মৃত্যুর ফলে আওয়ামী লীগের সার্বিক নেতৃত্ব চলে আসে শেখ মুজিবের হাতে। দলের সামনে তখন এক কঠিন পরীক্ষা। আমরা লক্ষ্য করেছি বয়সে তরুণ হলেও শেখ মুজিব তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার দ্বারা এই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কাঠামো ছিল অনেকটা পাশ্চাত্যের পূঁজিবাদী গণতন্ত্রের অনুরূপ। ষাটের দশকে সমগ্র বিশ্বে সমাজতন্ত্রের একটা রমরমা ভাব দেখা দেয়। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন অন্য দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সমগ্র বিশ্ব তখন গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র এই দুটো ধারায় বিভক্ত। বিশ্বের অনুন্নত দেশ সমূহ সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনসাধারণের মধ্যেও সেই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিষয়টি শেখ মুজিবের দৃষ্টি এড়ায়নি। জনসাধারণের আশা আকাঙ্খার কথা বিবেচনা করে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক আদর্শের সাথে সমাজতন্ত্রের আদর্শের এক সমন্বয় সাধনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। যার নামকরণ হয় গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র। এর মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবের গতিশীল নেতৃত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবের ৬ দফা কর্মসূচী ঘোষণা, ১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী হিসেবে কারাবরণ, ১৯৭০ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অসাধারণ বিজয় শেখ মুজিবকে নেতৃত্বের সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে জনসাধারণের দ্বারা তিনি বঙ্গবন্ধু অভিধায় ভুষিত হন। ১৯৭০ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে, তবে পাকিস্তানী শাসকদের ষড়যন্ত্রের ফলে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারেনি। অধিকার বঞ্চিত মানুষের পক্ষ থেকে শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ তারিখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে হয়। স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মেহেরপুরের মুজিব নগরে গঠন করা হয় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর নাগপাশ থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা হয়। প্রতিবেশী ভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের সাহায্যে এগিয়ে আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করে। চীনের নৈতিক সমর্থন পাকিস্তানের দিকে চলে যায়। পাকিস্তানের নিজস্ব সামরিক শক্তি কম ছিল না, তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সহযোগিতা পাকিস্তান লাভ করে। তা সত্ত্বেও ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানকে হার মানতে হয় বাংলাদেশের কাছে। পরাজিত পাকিস্তানী শাসকবর্গ শেষ পর্যন্ত তাদের হাতে বন্দি শেখ মুজিবকে ফাঁসির ভয় দেখিয়ে একটি সমঝোতার চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে কোনরকম সমঝোতা করতে বা ছাড় দিতে রাজী হননি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ফাঁসিতে প্রাণ দিতেও তাঁর আপত্তি ছিল না। আন্তর্জাতিক চাপের ফলে পাকিস্তান সরকার শেষ পর্যন্ত ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী তারিখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের বন্দিশালা থেকে মুক্ত করে দিতে বাধ্য হয়। এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এতবড় পরাজয় হজম করেছে এ কথা ভেবে যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও শেখ মুজিব যে দেশের নেতা, সে দেশ পূজিবাদী গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবেই থাকবে সমাজতান্ত্রিক দেশ হবে না, কারণ শেখ মুজিবের সমাজতান্ত্রিক প্রশিক্ষণ নেই। তিনি গণতন্ত্রের ভাবধারায় লালিত পালিত।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে আসবার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আদর্শের রাজনৈতিক দলসমূহ থেকে বঙ্গবন্ধুর ওপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে যাতে সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা হয়। কিন্তু গণতন্ত্রের মানসপুত্র বলে সুপরিচিত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে যাঁর রাজনৈতিক দীক্ষা, সেই শেখ মুজিব গণতন্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই সমাজতন্ত্রের পথে পা বাড়াবেন, তেমনটি আশা করা যায় না। বাস্তবে সেটাই ঘটেছিল। তবে সমাজতন্ত্রের প্রভাব থেকে বের হয়ে আসাটাও সে সময় অত সহজ ছিল না। কারণ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় একদিকে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের আন্তরিক সহযোগিতা অন্যদিকে গণতান্ত্রিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার বিষয়টিকে হালকা করে দেখবার সুযোগ ছিল না। এর ফলাফল আমরা ১৯৭২ সালের সংবিধানে লক্ষ্য করেছি। যে চারটি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হয়েছে, সেখানে গণতন্ত্রের পাশাপাশি সমাজতন্ত্রের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ ভাবখানা এ রকম, যদি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি না ঘটে, সে ক্ষেত্রে তিনি যেন সমাজতন্ত্রের দিকে পা বাড়াতে পারেন। পূজিবাদী গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য কতটা ফলপ্রসু হয়, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবার জন্য বঙ্গবন্ধু দেশবাসীর কাছ থেকে তিন বছর সময় চেয়ে নিয়েছিলেন। তিন বছরের মাথায় দেশে যখন দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি দেখা দেয়, তখন বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত বিচলিত হয়ে ওঠেন। ত্রিশ লক্ষ মানুষের রক্ত আর দু’লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে যে দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই দেশের মানুষ অনাহারে প্রাণ হারাবে, বস্ত্রহীন অবস্থায় ঘুরে বেড়াবে, বঙ্গবন্ধুর কাছে এ দৃশ্য ছিল অসহনীয়। স্বাধীনতার পূর্বে অন্ন-বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসার যে ওয়াদা তিনি দেশবাসীর কাছে করেছিলেন, সোনার বাংলা গড়বার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন ১৯৭৪ সালে দেশের সার্বিক অবনতিশীল পরিস্থিতিতে তার স্বপ্নভঙ্গ ঘটে। যে শাসন পদ্ধতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইচেছ করলেই দেশে দুর্ভিক্ষ ঘটিয়ে দিতে পারে, সে শাসন পদ্ধতির প্রতি আস্থা রাখা যায় কিভাবে? বঙ্গবন্ধুর কাছে তখন পদ্ধতির চেয়ে মানুষ বড়। মানুষকে বাঁচাতে হবে, অর্থনৈতিক সংকট থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে।কিন্তু কোন পথে ? পরামর্শ আসে দেশের সমাজতান্ত্রিক দল এবং নেতাদের কাছ থেকে। সমাজতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রই পারে দেশকে এই ভয়াবহ খাদ্য সংকট এবং অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে। বঙ্গবন্ধুর সাথে খুব ঘনিষ্ট ছিলেন আমার অগ্রজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর মযহারুল ইসলাম। তাঁর কাছ থেকে জেনেছি, ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর বাসায় খাওয়ার টেবিলে বসে একদিন তিনি বঙ্গবন্ধুকে কাঁদতে দেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধু কান্নাজড়িত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন “কামালের মা, দেশের মানুষ আজ না খেয়ে আছে, আমি খাই কি করে? খাওয়া তো আমার গলা দিয়ে নামে না”। দেশের মানুষকে কতখানি ভাল বাসলে একজন রাষ্ট্র প্রধানের মুখে এ ধরনের বাক্য উচ্চারিত হতে পারে, তা আমাদের অনুধাবন করে দেখতে হবে। ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগ যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়, তখন উল্লেখযোগ্য বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিক নেতা হিসেবে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা হলেন- ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির নেতা কমরেড মনি সিং, কমরেড ফরহাদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা জনাব আব্দুর রব, জনাব আব্দুল জলিল প্রমুখ। এখানে যে সমস্ত রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিক নেতাদের নাম উল্লেখ করা হলো, দলগুলো সব সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গঠিত এবং নেতাগণ সবাই সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা। ১৯৭৪ সালে জামায়াতে ইসলাম, মুসলিম লীগের মত সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন দলগুলোর কোন রকম কার্যক্রম ছিল না বললেই চলে। কারণ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এ সমস্ত মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক দল জনবিচিছন্ন হয়ে পড়ে এবং দেশের আপামর জনসাধারণ এই দলগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে।

১৯৬০ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যে বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো, সমগ্র বিশ্বের রাজনৈতিক বিভাজন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজন প্রায় অভিন্ন ছিল। ষাট এবং সত্তরের দশকে সমগ্র বিশ্ব মোটামুটি দুটো ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে একটি গণতন্ত্রের ধারা, অপরটি সমাজতন্ত্রের ধারা। ১৯৭১ সালে নব্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনও ঠিক একই ধারায় প্রবাহিত হয়। বঙ্গবন্ধু মূলতঃ ছিলেন একজন গণতান্ত্রিক নেতা। গণতন্ত্রের মূলকথা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আশা আকাঙ্খার প্রতি সম্মান প্রদর্শন। ১৯৭২ সালের সংবিধান রচনার সময় আমরা লক্ষ্য করেছি বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্রের ভাবাদর্শে লালিত হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবীকে তিনি উপেক্ষা করেননি। সে দাবী দেশকে সমাজতন্ত্রীকরণের দাবী। বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং নেতাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের সংবিধানের চারটি মূলনীতির মধ্যে গণতন্ত্রের পাশাপাশি সমাজতন্ত্রকেও রেখে দিয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালের বাকশাল গঠন ১৯৭২ সালের সাংবিধানিক পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছু নয়। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা দেশকে অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্ত করতে পারছে না, গণতন্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য দেশবাসীর কাছে তিনি যে তিন বছর সময় চেয়ে নিয়েছিলেন, সে সময়সীমা পার হয়ে গেছে। কাজেই ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের সময় দেশবাসীর কাছ যে ওয়াদা তিনি করেছিলেন সেই ওয়াদা রক্ষার জন্যই তাঁকে বাকশাল গঠন তথা সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েমের উদ্যোগ নিতে হয়।

আমরা মাঝে মাঝে দেশে ঐকমত্যের শাসন ব্যবস্থা কায়েমের কথা বলি। বাকশাল কি সেই ঐকমত্যের শাসন ব্যবস্থা নয় ? বাকশালের মধ্যে বঙ্গবন্ধু বহু দলের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। বাকশাল নামের ঐক্য ফোরামে অসাম্প্রদায়িক সকল রাজনৈতিক দল এবং নেতাকে বাকশালের ভিতরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, কমরেড মনি সিং, কমরেড ফরহাদ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, সবাইকে স্থান দেয়া হয়েছিল বাকশালে। এর চেয়ে ঐকমত্যের শাসন ব্যবস্থা আর কি হতে পারে? শুধু রাজনৈতিক নেতাদেরকে নয়, পেশাজীবী এবং বুদ্ধিজীবীদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল বাকশালে। বাকশাল তো ছিল আসলে একের ভিতর পাঁচ। অর্থাৎ পাঁচ মিলে এক।

সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বহু দল গঠনের কোন সুযোগ নেই। বহুদলীয় সমাজতন্ত্র, পৃথিবীর কোথাও আছে বলে কেউ প্রমাণ দিতে পারবেন বলে মনে হয় না। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সকল বামপন্থী বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দেশে সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েমের জন্য অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন। তাঁদের দাবীর পরিপ্রেক্ষিতেই বলা যেতে পারে বঙ্গবন্ধু সমাজতন্ত্রের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন। দুর্ভাগ্য, যাঁদের দাবীর প্রতি সন্মান প্রদর্শন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু সমাজতন্ত্রের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেই সমস্ত বামপন্থী বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক নেতাগণও বঙ্গবন্ধুর প্রতি সুবিচার করেন নি। অথচ বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে গিয়েই বঙ্গবন্ধুকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে। সমাজতন্ত্র কায়েম করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু যে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন সে কথা সর্বজন বিদিত। সমগ্র বিশ্বজুড়ে মূল দ্বন্দ্ব তখন ছিল গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অপরদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সোভিয়েত ইউনিয়নের অসাধারণ অবদান রয়েছে এবং সে কারণে বঙ্গবন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবেন, এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক। ১৯৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল বটে, কিন্তু যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে ঝুলানো হোক, এটি তারা চায়নি। এবার ছিল তাদের ভিন্ন কৌশল। বঙ্গবন্ধু যতদিন পূঁজিবাদী গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে লালন করেছেন, দেশের অর্থনীতি যত সংকটময় যত বিপন্নই হোক না কেন, বঙ্গবন্ধুর জীবন বিপন্ন হয়নি। কিন্তু যখনই তিনি সমাজতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতির মাধ্যমে দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে গেছেন, শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তখনই তাঁর জীবন বিপন্ন হয়েছে। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন।

পৃথিবীর ইতিহাস পাঠে আমরা এমন কিছু মহামানবের সন্ধান পাই যাঁরা দৈহিকভাবে পৃথিবী থেকে চলে গেছেন, কিন্তু তাঁদের কথা, তাঁদের কাজ, পৃথিবীতে অমরত্ব লাভ করেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তেমনি একজন মহামানব। বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে, মানুষের মন থেকে মুছে ফেলবার কতই না ষড়যন্ত্র হয়েছে, কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদের চেষ্টা বার বার নিস্ফল হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে যারা হত্যা করেছিল ১৯৭৫ সালে সেই হত্যাকারীরা অত্যন্ত দম্ভের সাথে উচ্চারণ করেছিল, শেখ মুজিব শেষ এবং তাঁর গঠিত আওয়ামী লীগকেও শেষ করে দেয়া হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত ঘটনা অন্যরকম। হত্যাকারীদের দম্ভ মিথ্যে হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুকে দৈহিকভাবে হত্যা করলেও ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নামটি মুছে ফেলা সম্ভব হয় নি।

জামায়াত-বিএনপি জোট বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়, ১৯৭১ সালে ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর দেয়া ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ তারিখে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা, ইতিহাসের এত বড় বড় ঘটনাকে বিএনপি-জামায়াত জোট তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চাইছে। পাকিস্তান সরকার এবং সমগ্র বিশ্ব ভাল করেই জানে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রকৃত ঘোষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। কোন বজ্রকণ্ঠের নির্দেশে পাকিস্তান ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেছে, সমগ্র জাতির কাছে আজ তা স্পষ্ট । যতদিন বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতি থাকবে, ততদিন বজ্রকণ্ঠের কোন বিনাশ নেই।

*সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।


Share this post in your social media

© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com