মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ১১:০২ অপরাহ্ন

প্রফেসর মযহারুল ইসলাম : তাঁর ফোকলোর সংক্রান্ত কর্মধারা

প্রফেসর মযহারুল ইসলাম : তাঁর ফোকলোর সংক্রান্ত কর্মধারা

প্রফেসর মযহারুল ইসলাম প্রধানত ছিলেন শিক্ষক। এ ছাড়াও তাঁকে কবিতা নির্মাণে, গবেষণার দুর্গম পথে বিচরণে, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে অক্লান্ত পথিকের ভূমিকায় এবং শিল্পপতিদের কাতারে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করণে সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। মোটাদাগে এগুলোই হলো তাঁর পঁচাত্তর বছর জীবনের অভিযাত্রায় কর্মতৎপরতা। এর পরেও প্রফেসর ইসলাম তাঁর মূল ধারা থেকে সরে আসেননি। সেই মূল ধারা হলো ফোকলোর বিষয়ে তাঁর চিন্তা-ভাবনা এবং পরিকল্পিতভাবে একটি উন্নয়নশীল কর্মধারা প্রণয়ন করা।

তাঁর ঠিক এ পর্যায়ে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। বাংলাভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৫১) প্রাপ্তির পর তিনি শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। গবেষণার বিষয়টিও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকালে সম্পন্ন করেন। লক্ষণীয়, তাঁর গবেষণার বিষয়গুলোর কোনটিই ফোকলোর ব্যতিরেকে ছিল না। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘কবি হেয়াত মামুদ: কবি ও কাব্য’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভ রচনা করে পিএইচ.ডি. ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। তার আগে তিনি কবি পাগলা কানাই এর উপর একটি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ রচনা করেন। এ দুটি গবেষণা লোকজীবন ভিত্তিক বলেই পরবর্তীকালে যখন তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আধুনিক ফোকলোর বিষয়ে গবেষণা করতে যান, তখন এ বিষয়ে কিছুটা স্বচ্ছ ধারণা নিয়েই যেতে পেরেছিলেন।

প্রফেসর ইসলাম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রেরিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপ প্রাপ্ত প্রথম ফোকলোর গবেষক। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে সেখানে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করেন, আমাদের ফোকলোর চর্চার গতানুগতিকতা থেকে কেবল তাঁদের উত্তরণ ঘটেনি, একদল ‘ইয়ং টার্কস’ এরও সরব আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁদের ফোকলোর গবেষণায় নব নব তত্ত্বের উদ্ভাবন তাঁকে প্রবলভাবে উজ্জীবিত করে। বিশ্বনন্দিত ফোকলোর বিশেষজ্ঞদের নিকট সান্নিধ্যে এসে একটি নতুন জগতে তিনি প্রবেশ করেন। প্রফেসর এম.আর. ডরসন, প্রফেসর ওয়ারেন ই. রবার্টস, স্টিথ থমসনের মতো বিশাল বটবৃক্ষের ছায়ায় বসে তাঁদের নির্দেশে ‘হিস্ট্রি অব ইংলিশ ফোকটেলস কালেকশনস ইন ইন্ডিয়া এ্যান্ড পাকিস্তান’ অভিসন্দর্ভ রচনায় হাত দেন। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, এর উপাত্ত সংগ্রহ মোটেই সহজ নয়। ইংরেজ সিভিলিয়ান এবং খ্রিস্টান পাদ্রীদের দ্বারা সংগৃহীত এদেশীয় মৌখিক লোককাহিনীর মুদ্রিত পুস্তকাবলী মোটেই সহজলভ্য নয়। তবে এ সঙ্কট থেকে তাঁকে উদ্ধার করে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। তিনি ‘লোককাহিনী সংগ্রহের ইতিহাস’ (১৩৭৬ বঙ্গাব্দে) গ্রন্থের ‘ভূমিকা’য় লিখেছেন,

হয়তো ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ব্যবহারের ও ফোকলোর বিভাগে অধ্যায়নের সুযোগ না লাভ করলে আমার পক্ষে এই কাজ সমাপ্ত করা সম্ভব হতো না। এজন্য যাঁর নিকট আমার প্রথম সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা দরকার তিনি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক রিচার্ড এম. ডরসন। অপর ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন আমার শিক্ষক অধ্যাপক ওয়ারেন ই. রবার্টস, ও বন্ধুবর অধ্যাপক এলান ডান্ডিস এর ঋণ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি (পৃষ্ঠা-১)।

তিনি ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে উক্ত অভিসন্দর্ভ রচনা করে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি. ডিগ্রি নিয়ে স্বদেশে ফিরে আসেন এবং স্বপেশায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা কালে তিনি ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা করতে যান। সেখানে থাকতে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং ফোর্ড ফাউ-েশন থেকে স্কলারশিপ দিয়ে গবেষণার কাজ সুসম্পন্ন করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। যা হোক, তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলা বিভাগে যোগদান করে অধ্যাপনায় আত্মনিয়োগ করেন। স্মর্তব্য, তিনি ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা বিভাগের প্রধান নিযুক্ত হন। ওই পদে থেকেই তিনি চলে যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচ.ডি. করতে। ফিরে এসে সে পদেই তিনি যোগ দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সিলেবাসে লোকসাহিত্য বিষয়টি যুক্ত করেন। এ সময় ‘সাহিত্যিকী’ নামে একটি গবেষণা পত্রিকা নিজের সম্পাদনায় বাংলা বিভাগ থেকে প্রকাশ করতে থাকেন এবং ফোকলোর সংক্রান্ত গবেষণামূলক প্রবন্ধাদি প্রকাশ করতে থাকেন। প্রফেসর মযহারুল ইসলাম এবং ড. আশরাফ সিদ্দিকীর পর ফোকলোর বিদ্যাশৃঙ্খলায় যাঁর নাম শ্রদ্ধার সাথে উল্লিখিত হয়ে থাকে তিনি হলেন প্রফেসর ইসলামের যোগ্য ছাত্র অধ্যাপক আবদুল হাফিজ। তাঁর হাত দিয়ে ড. মুহম্মদ আবদুল খালেক, ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল প্রমুখ ফোকলোরবিদ বেরিয়ে এসেছেন। রাজশাহীতে তিনি ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর সময়েই ডিপার্টমেন্টে একটি সমৃদ্ধ ফোকলোর গ্রন্থাগার গড়ে উঠেছে। আধুনিক ফোকলোরের ধারণা এ সব গ্রন্থ থেকেই তাঁর ছাত্রেরা পেয়েছিলেন। সাবেক পূর্ব পাকিস্তান একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে রূপায়িত হয়। বাংলা একাডেমি এবং কেন্দ্রীয় বাঙলা উন্নয়ন বোর্ড সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে সমন্বিত হয়ে নতুন অবয়ব পায়। বাংলা একাডেমির কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে বিস্তৃতি লাভ করে। প্রথম মহাপরিচালক পদে নিযুক্তি পেয়ে এ প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বিভাগের অন্তর্গত ‘লোকসাহিত্য শাখা’কে তিনি বিভাগে উন্নীত করেন। এ সম্পর্কে তাঁর কিছু পরিকল্পনা হয়তো ছিল। কিন্তু যে কারণেই হোক স্বল্প কালে তাঁর পক্ষে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তিনি ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিযুক্তি পেয়ে সেখানে যোগদান করেন। এখানে থাকতে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও কবি জসীমউদ্দীনকে প্রধান উপদেষ্টা করে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এ প্রতিষ্ঠানের সভাপতি এবং জনাব মোস্তফা জামান আব্বাসী সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনীত হন। এ প্রতিষ্ঠানটিও শেষ পর্যন্ত তাঁর অবর্তমানে নিষ্ক্রীয় হয়ে যায়। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে ড. আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে যোগদান করে এ প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন করেন। অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুর উদ্দীনকে প্রধান উপদেষ্টা করে ড. সিদ্দিকী এবং জনাব মোস্তফা জামান আব্বাসীকে যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হয়।

মনে হতে পারে এরপর থেকে প্রফেসর ইসলামের ফোকলোর বিষয়ে কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে যায়। আপাতদৃষ্টে তা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি কখনো ফোকলোরের সাথে সম্পর্কচ্যুত হননি। নানা ধরনের সমস্যা-সঙ্কট এবং কর্মব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও তিনি বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কর্মরত থেকেছেন। বিভিন্ন ফোকলোর সেমিনার ও কনফারেন্সে তিনি বিভিন্ন সময় আমন্ত্রিত হয়েছেন। গবেষণার কাজও থেমে থাকেনি। সংখ্যায় বহুলপ্রসূ না হলেও তাঁর ফোকলোর সম্পর্কিত গ্রন্থগুলো গবেষণা সমৃদ্ধ। শিল্পপতি হওয়ার পরেও এ ভূমিকা থেকে তাঁকে কখনো বিচ্যুত হতে দেখা যায়নি। ব্যবসায়িক কর্মকা-ে শত ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়কে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

তারই ফলশ্রুতিতে আমরা দেখি ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে ‘বাংলাদেশ ফোকলোর সোসাইটি’ গঠন করে সকল ফোকলোরবিদ ও অনুরাগীদের তিনি একত্রিত করেছেন। বিশেষ একটি পরিকল্পনা নিয়েই এ সোসাইটি তিনি গঠন করেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল একটি ফোকলোর ইনস্টিটিউট গঠন করা। ব্যবসায়িক কাজে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থেকেও মাথায় এ ভাবনাটা সর্বক্ষণ পুষে রেখেছিলেন। দুই বছর অন্তর একটি করে আন্তর্জাতিক ফোকলোর কনফারেন্স এর আয়োজন, সোসাইটির মুখপত্র ‘ফোকলোর’ প্রকাশ নিজ ব্যয়ে সুচারুভাবে সম্পন্ন ও প্রকাশ করেছেন। ফোকলোর ইনস্টিটিউটের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সচিবালয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে তিনি পেশ করেছিলেন। অবাক বিস্ময়ে তিনি দেখলেন, পরিকল্পনাটি মন্ত্রণালয় অনুমোদন করেনি। এজন্য আমাদের দেশের সরকারি আমলা আর মন্ত্রীদের মন মানসিকতার সংকীর্ণতা তাঁকে ব্যথিত করেছে, কিন্তু উক্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিজ ব্যয়ে হলেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তিনি পরিকল্পনা নিয়েছিলেন শাহজাদপুরে তাঁর নিজ বাড়িতেই ইনস্টিটিউটটি স্থাপন করবেন। তার আগেই তিনি পার্থিব সকল কর্মকা-ের অবসান ঘটিয়ে অমরলোকে চলে গেলেন। তাঁরই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন পরিবারের সদস্যবৃন্দ, যার অগ্রবর্তী ভূমিকায় আছেন মিসেস নূরজাহান মযহার।

এখানেই শেষ করা যেতো। কিন্তু একটি বিষয় এখানে উল্লেখের প্রয়োজন আছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ফোকলোর বিভাগ খোলা হয়েছে, তার পশ্চাতে প্রফেসর ইসলামের অবদান রয়েছে। তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা ড. মুহম্মদ আবদুল খালেক তাঁরই হাতে গড়া ফোকলোরবিদ। অপর ছাত্র প্রফেসর মুহম্মদ আবদুল জলিলও তাঁর নিকট থেকে ফোকলোর বিষয়ে কেবল পাঠ নেননি, প্রফেসর ইসলামের স্বপ্নের অনুষঙ্গ ফোকলোর বিভাগ খোলার অদম্য প্রচেষ্টা চালানোর মূলে প্রফেসর ইসলামের অনুপ্রেরণা ছিল। ড. খালেক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি চারা পুঁতেছিলেন, তাঁকে মহীরুহের রূপদান করতে এগিয়ে আসেন তাঁরই মানস সন্তানেরা। তাই মনে করি, প্রফেসর ইসলামের কর্মধারায় এ বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হবে।

লেখক: মোমেন চৌধুরী, প্রাক্তন উপ-পরিচালক, বাংলা একাডেমি, ঢাকা


নিউজটি অন্যকে শেয়ার করুন...

আর্কাইভ

business add here
© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com