সোমবার, ২৫ Jun ২০১৮, ১০:০৭ পূর্বাহ্ন

ফোকলোর বিজ্ঞানী প্রফেসর মযহারুল ইসলাম

ফোকলোর বিজ্ঞানী প্রফেসর মযহারুল ইসলাম

প্রফেসর মযহারুল ইসলাম ছিলেন বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর পরিচিতি ছিল একাধিক। বিচরণ ছিল কাব্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প বাণিজ্য, সমাজবিজ্ঞান, প্রশাসন, সংগঠন, এমনকি রাজনীতিতেও। আমাদের চেনাজানা পরিম-লের বাইরেও ছিল তাঁর পরিচয়। ২০০৩ সালে নভেম্বর মাসে তাঁর মৃত্যুর পর বাংলাদেশের সবগুলি জাতীয় এবং জনপ্রিয় পত্রিকা তাঁকে প্রায় একই রকম বিশেষণে আখ্যায়িত করেছিল: বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, কবি, সাহিত্যিক, সাবেক উপাচার্য, ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের বিশিষ্ট সংগঠক, শিল্পপতি, ফোকলোর বিজ্ঞানী। ড. ইসলামের কোন পরিচয়টি যে বড় সে সম্পর্কে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তিনি যে একধারে ঐ সকল গুণের অধিকারী ছিলেন সে বিষয়ে দ্বিমত নেই।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি তাঁর বিরল বৈশিষ্ট্যের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। পাবনা শাহজাদপুরের তালগাছি হাই স্কুল, রাজশাহী কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি বিদ্যাপীঠে তিনি কৃতিত্বের সাথে শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করেছিলেন।

প্রফেসর মযহারুল ইসলামকে আমি যেমন দেখেছি, যেমন শুনেছি এবং তাঁর সম্পর্কে যতই জানতে পারছি তাতে আমার মনে হয়েছে এতগুলি মানবিক গুণাবলি একই ব্যক্তির মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না। তিনি সত্যিই ছিলেন বিরল ব্যক্তিত্ব। তাঁর দেশপ্রেম, সমাজসেবা, সাধারণ মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর প্রগাঢ় আনুগত্য আমাকে সদাই মুগ্ধ করে। দেশের মানুষকে তিনি অসম্ভব ভালবাসতেন। তাদের দুঃখ বেদনা বুঝতেন বলেই তা লাঘব করার জন্য যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করতেন। এটা ছিল তাঁর সমাজ সচেতনতা এবং দেশপ্রেমের অংশ। এজন্যই বোধহয় তিনি জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে দেশ ও জাতি উপকৃত হতো।

দেশপ্রেমিক এবং সমাজ সেবক বলেই প্রফেসর মযহারুল ইসলাম তাঁর নিজ জন্মভূমি চরনবীপুর, তালগাছি, শাহজাদপুর অঞ্চলে বিভিন্ন গঠনমূলক কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি বলতে গেলে একক প্রচেষ্টায় গড়ে তুলেছেন স্কুল, কলেজ, পাঠাগার, চিকিৎসালয়। প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত হন নি, নিজের কষ্টার্জিত সম্পদের বিরাট একটা অংশ দান করে গেছেন এই সব প্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহ এবং পরিচালনার জন্য।

ছাত্রজীবন থেকেই প্রফেসর ইসলামের নাম শুনতাম। বলতে গেলে গ্রামের দিক থেকে তিনি আমাদের প্রতিবেশী। পরবর্তীতে বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। উল্লাপাড়া শাহজাদপুর অঞ্চলের গ্রামের লোকদের কাছে সবসময় তাঁর প্রশংসা শুনেছি।

রাজশাহীর পর তাঁর সাথে আবার দেখা মুজিবনগরে এক কঠিন সময়ে। তিনি রজাশাহীতে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন করার পর চলে এসেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সদ্য প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে। মুক্তিযুদ্ধকালে নিরলসভাবে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করেছেন; ভারতের বুদ্ধিজীবীদের কাছে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন, বাংলাদেশের জন্য অনানুষ্ঠানিক দূতিয়ালী করেছেন। সে সব দিন এবং ড. ইসলামের অবদান ভুলবার নয়।

তাঁর মৃত্যুর পর জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন করেছিলেন এইভাবে: ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও পঁচাত্তর পরবর্তী দুঃসময়ে তিনি অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন’। এতে এটাই প্রমাণিত হয় যে, তিনি কখনও স্বাধীনতা বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের কাছে মাথা নত করেন নি। বরং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি তাদের পরাজিত করে তাঁর নিজের আদর্শ সমুন্নত রেখেছেন।

বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর তিনি বিশাল কর্মসূচি নিয়ে জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমিকে পুনর্গঠিত করেন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার বাংলা একাডেমিকে অক্লান্ত পরিশ্রমে তিনি গড়ে তোলেন। বাংলা ভাষার উন্নয়ন, চর্চা ও গবেষণার প্রশস্ততম ক্ষেত্র হিসেবে এই প্রতিষ্ঠান সারা পৃথিবীতে পরিচিতি পেয়েছেন তাঁরই চেষ্টায়।

দেশের অভ্যন্তরে আমরা প্রফেসর ইসলামকে যেভাবে জানি তার চাইতে বোধ হয় তিনি আন্তর্জাতিকভাবে বেশি স্বীকৃত একজন প-িত, গবেষক এবং ফোকলোর বিজ্ঞানীরূপে। লোকসাহিত্য, লোককাহিনী, ফোকলোরের সর্বত্র ছিল তাঁর সমান বিচরণ। তাঁর গবেষণালব্ধ নানা রকম রচনা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পঠিত ও আলোচিত হয়। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ক্ষেত্রে আমার জ্ঞান অতি সীমাবদ্ধ। প্রফেসর ইসলামের গবেষণা বা তাঁর কাজের ওপর কোন মন্তব্য করা আমার জন্য ধৃষ্টতা হবে। তবে আমি এটুকু বলতে পারি যে, হার্ভার্ড, শিকাগো, দিল্লী, কোলকাতা, বিশ্বভারতী, রাঁচী ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয়ে যিনি অধ্যাপনা করেছেন এবং যাঁর লিখিত বই ও রচনা পাঠ্য পুস্তকরূপে গৃহীত তিনি অবশ্যই সর্বজনস্বীকৃত সাহিত্যিক ও গবেষক হবেন। বিশ্বের এই সব বিদ্যাপীঠে তিনি আমাদের লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি এক অনন্য মহিমায় তুলে ধরেছেন। এটাই তাঁর বড় স্বীকৃতি, পরিচয়। সে দিক থেকে বিচার করলে ড. মযহারুল ইসলাম আবহমান বাংলার এক অবিস্মরণীয় ভ্রাম্যমান সাংস্কৃতিক দূত।

প্রফেসর ইসলাম বাংলা সাহিত্য চর্চার জন্য সম্পাদন করতেন দুটি পত্রিকা: ‘মেঘবাহন’ ও ‘ফোকলোর’। শুধু সম্পাদনা করতেন বললে ভুল হবে। তিনি ছিলেন একাধারে প্রকাশক, সম্পাদক এবং মূল প্রেরণা। দুটো পত্রিকাই তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে। পেশায় তিনি মূলত অধ্যাপক ও চাকুরিজীবী হয়েও সাহিত্যচর্চা, গবেষণা কাজে তিনি তাঁর সমগ্র জীবন অতিবাহিত করেছেন। এদেশের ফোকলোরকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় সমুন্নত করতে তাঁর অবিরাম প্রচেষ্ট চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। পত্রিকা প্রকাশ ছাড়াও তাঁর প্রকাশিত অসংখ্য গ্রন্থ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ‘মাটির ফসল’ (১৯৫৫), ‘বিচ্ছিন্ন প্রতিলিপি’ (১৯৭০), ‘আর্তনাদে বিবর্ণ’ (১৯৭০), ‘যেখানে বাঘের থানা’ (১৯৭৮), ‘অপরাহ্নে বিবস্ত্র প্রাতঃরাশ’ (১৯৭৯), ‘দুঃসময়ের ছড়া’ (১৯৮৮), ‘কবি পাগলা কানাই’ (১৯৭৮), ‘কবি হেয়াত মামুদ’ (১৯৬১), ‘ফোকলোর পরিচিতি ও লোক সাহিত্যের পঠন-পাঠন’ (১৯৬৭), ‘লোকসাহিনী সংগ্রহের ইতিহাস’ (১৯৭০), ‘সাহিত্য পথে’, ‘সতী ময়না ও লোরচন্দ্রানী’ (১৯৮০), ‘ফোকলোর চর্চায় রূপতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি’ (১৯৮২) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তাঁর দীর্ঘ দিনের বাসনা ছিল একটি ফোকলোর ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা। জীবদ্দশায় তিনি অনেকটা অগ্রসর হয়েছিলেন। তাঁর সুযোগ্য পতœী বেগম নূরজাহান মযহার শাহজাদপুরে তাঁদের নিজ আবাস ‘নূরজাহান’ এই উদ্দেশ্যে দান করেছেন। তাঁরই তত্ত্বাবধানে ভবনটি এখন সম্প্রসারণ করা হয়েছে ফোকলোর সোসাইটি স্থাপনের জন্য। অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজও সমাপ্তির পথে। প্রফেসর ইসলামের আরাধ্য ও অসমাপ্ত কাজ তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের চার সন্তান সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে ব্রতী হয়েছেন। বাংলাদেশ ফোকলোর ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার কাজ অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে তার কাজ আরম্ভ হবে। ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ (১৯৬৭) এবং ‘দাউদ পুরস্কারে’ (১৯৭০) ভূষিত প্রফেসর মযহারুল ইসলামের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে সেটিই হবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক: হোসেন তৌফিক ইমাম, সাবেক সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার; উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।


নিউজটি অন্যকে শেয়ার করুন...

আর্কাইভ

business add here
© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com