মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ১১:০৪ অপরাহ্ন

ফোকলোর চর্চায় ড. মযহারুল ইসলাম

ফোকলোর চর্চায় ড. মযহারুল ইসলাম

ড. মযহারুল ইসলাম (১৯২৮-২০০৩) স্বদেশ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একজন খ্যাতিমান ফোকলোরবিদ। ষাটের দশকে যুক্তরাজ্যের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি থেকে আমাদের দেশের যে তিনজন গবেষক ফোকলোর বিষয়ে ডক্টরেট করেছিলেন তাদের মধ্যে একমাত্র তিনিই পরবর্তীকালে বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা এবং গ্রন্থ রচনায় বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেন। তিনি এ বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন মতবাদ ও রীতি পদ্ধতির বিশ্লেষণ করেন। বিশ্বখ্যাত কয়েকজন ফোকলোরবিদ যেমন ভ্লাদিমির প্রপ, ক্লদলেভি-স্ট্রস এবং ভাষাবিজ্ঞানী নোয়ম চমস্কিকৃত লোক কাহিনীর রূপতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি নিজস্ব স্টাইল ও আঙ্গিকে বাংলা ভাষায় বাংলা লোক কাহিনী অবলম্বনে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন ড. মযহারুল ইসলাম। তিনি ফোকলোরের আজন্ম সাধক ও ফোকলোর আন্দোলনের অগ্রপথিক। মযহারুল ইসলাম ১৯৫৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বপ্রথম পি.এইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। গবেষণার বিষয় ছিল ‘মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে হেয়াত মামুদ : তুলনামূলক আলোচনা’। তিনি দ্বিতীয়বার পি.এইচ.ডি. ডিগ্রি লাভ করেন ফোকলোর বিষয়ে আমেরিকার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। থিসিসের শিরোনাম ছিল- ‘A History of Folklore Collections in India and Pakistan’। সাহিত্যের সৃজনশীল ও মননশীল ধারায় যথেষ্ট খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর প্রধান পরিচয় ফোকলোর গবেষক, ফোকলোর সংগঠক, তাত্ত্বিক, বিশ্লেষক হিসেবে। বাল্যকাল থেকেই তাঁর প্রাণের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে ঝংকৃত অনুরণিত হতো জারি, সারি, ভাটিয়ালি, মারফতির সুর লহরী। লোক কবিরা ছিলেন তাঁর প্রাণের দোসর। লালন শাহ, পাগলা কানাই-এর মরমী সংগীত শ্রবণে তাঁর হৃদয় রোমাঞ্চিত হতো। লোক সংগীত ও লোক কবিদের প্রতি তাঁর অনুরাগের প্রমাণ মেলে ১৯৫৯ সালে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ‘পাগলা কানাই’ শীর্ষক গ্রন্থ প্রকাশে। তিনি দীর্ঘদিন যাবত বৃহত্তর পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা অঞ্চল থেকে চারণ কবি পাগলা কানাই-এর ২৪০টি গান সংগ্রহ করে তার শিল্পমূল্য বিচার ও কবির জীবনদর্শন নিয়ে গ্রন্থটির প্রকাশ ঘটান।

বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে ফোকলোর পঠন-পাঠন, ফোকলোর চর্চাকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দান এবং ফোকলোরের বাণীকে বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠির কাছে পৌঁছে দেয়াকে জীবনের অন্যতম ব্রত হিসেবে বেছে নেন। ১৯৬৪ সালে তিনিই সর্বপ্রথম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির পাঠক্রমে ফোকলোরের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেন। ফোকলোরের প্রতিশব্দ নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। প্রথমদিকে তিনি ‘লোকলোর’কে ফোকলোরের প্রতিশব্দ হিসেবে গ্রহণের যুক্তি প্রদর্শন করেন। কিন্তু প্রতিশব্দটি ফোকলোর অনুরাগী পাঠক-গবেষকদের কাছে ততটা সমাদৃত না হওয়ায় তাঁর সিদ্ধান্তে পরিবর্তন ঘটান এবং নিজেই শব্দটি প্রত্যাহার করে নেন। ফোকলোরের যে কোনো প্রকার বিকল্প শব্দ বা পরিভাষা গৃহীত হতে পারে না, সে সম্পর্কেও তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বাংলা একাডেমিতে মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে উক্ত প্রতিষ্ঠানে ফোকলোর বিভাগ ও নিজ উদ্যোগে ‘বাংলাদেশ ফোকলোর সোসাইটি’ নামক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন।

বাংলাদেশের ফোকলোর চর্চাকে বহির্বিশ্বে পৌঁছে দেয়া এবং বহির্বিশ্বের ফোকলোর চর্চার সর্বাধুনিক পদ্ধতির সঙ্গে বাংলাদেশের ফোকলোর গবেষকদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রয়াস ছিল যুগান্তকারী। ১৯৯০ সাল থেকে ২০০২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ফোকলোর সোসাইটির উদ্যোগে ও তাঁর একক অর্থানুকূল্যে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মানের ৬টি সেমিনারের আয়োজন; তাতে ভারত, ভুটান, নেপাল, আমেরিকা থেকে প্রখ্যাত ফোকলোরবিদদের অংশগ্রহণ, সর্বোপরি ফোকলোর সোসাইটির মুখপত্র ‘ফোকলোর’ গবেষণা পত্রিকার ১১টি সংখ্যা প্রকাশ করে তিনি ফোকলোর চর্চার এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ে একটি ফোকলোর ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর ফোকলোর আন্দোলনের ফসল হিসেবে ১৯৯৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম ফোকলোর বিভাগ প্রতিষ্ঠায় তিনি কিছুটা প্রশান্তি লাভ করেন।

ড. মযহারুল ইসলামের প্রায় দুই শতাধিক গবেষণাধর্মী ফোকলোর বিষয়ক প্রবন্ধ-নিবন্ধ বিভিন্ন দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকা ও জার্নালে ছাপা হয়েছে। তাঁর গবেষণাধর্মী উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধের মধ্যে রয়েছে- ১. পূর্ব-পাকিস্তানের লৌকিক পুরাকাহিনী ও লোক গীতিকা। ২. পাক-ভারতীয় লোক গল্পের একটি দিক; বোকা জামাতা। ৩. একটি লোককাহিনীর পাঠ পর্যালোচনা। ৪. ফোকলোর সম্পর্কিত প্রচলিত মত। ৫. লোককাহিনী সম্পাদনার রীতি ও পদ্ধতি। ৬. ইউরোপীয় লোককাহিনীর আফ্রিকান ও আমেরিকান ইন্ডিয়ান পাঠান্তর। ৭. বিশ শতকের পাক ভারতীয় লোককাহিনীর পঠন-পাঠনে আমেরিকা প-িতদের অবদান। ৮. ইংরেজি লোকগীতিকার শিল্পকৌশলগত বৈশিষ্ট্য। ৯. ইংরেজি ঐতিহ্যিক লোকগীতিকায় অতিপ্রাকৃত উপাদান ও লোকবিশ্বাস। ১০. বাংলাদেশের আধুনিক সমাজ ও ফোকলোর। ১১. ফোকলোর সংগ্রহের মূলকথা। ১২. বর্তমান বিশ্বে ফোকলোর। ১৩. ফোকলোর শব্দটির জন্মতত্ত্ব এবং উইলিয়াম থম্পাস। ১৪. লোক-ঐতিহ্যে আত্মকরণের মৌলিকতা। ১৫. মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ফোকলোর এবং বাংলাদেশের সমাজ। ১৬. বিশ্ব পথিকৃত ফোকলোরবিদ। ১৭. দুইজন আন্তর্জাতিক ফোকলোরবিদ। ১৮. ফোকলোরবিদদের তীর্থদর্শন। ১৯. আন্তর্জাতিক ফোকলোরবিদ হিসেবে উইল হেলমম্যান হার্ডট। ২০. ‘The Study of Folklore in the Modern World’ ইত্যাদি প্রবন্ধ তাকে দেশে বিদেশে পরিচিত করেছেন।

ফোকলোরের পঠন-পাঠন উপযোগী গ্রন্থ প্রণয়ন ও ফোকলোরের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তাঁর কৃতিত্ব অসামান্য। তাঁর ‘ফোকলোর চর্চায় রূপতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি’ (১৯৮২), ‘The Theoretical Study of Falklore’ (১৯৯৮), ‘আঙ্গিকতার আলোকে ফোকলোর’ (১৯৯৯), ‘ফোকলোর পরিচিতি ও পঠন-পাঠন’ (১৯৬৭, ১৯৭০), ‘The Social Change and Folklore’ (১৯৮৫), ‘Folklore : The Pulse of the People’ (১৯৮৪), ফোকলোর পরিচিতি ও লোকসাহিত্যের পঠন-পাঠন (১৯৬৮), লোককাহিনী সংগ্রহের ইতিহাস (১৯৭০), সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী- সম্পাদনা (১৯৮০), বিচিত্র দৃষ্টিতে ফোকলোর- সম্পাদিত (১৯৯৭), বঙ্গভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি (২০০০) প্রভৃতি গ্রন্থ যার অনন্য দৃষ্টান্ত।

ড. মযহারুল ইসলাম (১৯২৮-২০০৩) বিশ্ব ফোকলোর চর্চার যাবতীয় খোঁজ-খবর রাখতেন। তাই তিনি পাশ্চাত্যের তুলনায় আমাদের দেশের গবেষণার নি¤œমান সম্পর্কে অতিমাত্রায় সচেতন ছিলেন। প্রফেসর Alan Dundes তাঁর সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন, ‘Dr. Islam never lost his interest in the theory of Folklore and Folkloristic’। ফোকলোর ছিল তাঁর প্রেম এবং সারাজীবনের ধ্যান-জ্ঞান। এ বিষয়ে নিরন্তর গবেষণা করে এবং বই লিখে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন কী করে বিজ্ঞান নির্ভর বিশ্লেষণ করতে হয়। এ ভালোবাসায় তাড়িত হয়ে তিনিই প্রথম মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লোকসাহিত্য সংগ্রহ করে প্রবন্ধ লিখেছেন। ফোকলোর কেন্দ্রিকপ্রেম তাঁর মৌলবাদ বিরোধী অবস্থান ও গভীর দেশপ্রেম থেকে উৎসরিত।

ড. মযহারুল ইসলাম (১৯২৮-২০০৩) বাংলা গীতিকাকে লোকগীতিকা বা লোকগাঁথা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লোকসাহিত্য বিশেষজ্ঞ, ফোকলোর বিশেষজ্ঞ ও ফোকলোর বিশারদ এবং ফোকলোর বিজ্ঞানী। আন্তর্জাতিক ফোকলোরবিদ হিসেবে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণের সৌভাগ্য অর্জন করেন। পরিদর্শক অধ্যাপক হিসেবে তিনি ভারতের ত্রিবান্দ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, মহীশুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও ড. মযহারুল ইসলাম আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, টেকসাস বিশ্ববিদ্যালয়, ইলিনেশন বিশ্ববিদ্যালয়, মিনিসোটা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাপানের মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন।

ফোকলোর চর্চায় অসাধারণ অবদানের জন্য ড. মযহারুল ইসলাম (১৯২৮-২০০৩) চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন।

তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশের ফোকলোর চর্চার ইতিবৃত্ত, ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল, অনার্য, ঢাকা, ২০১১।
২. বিশ শতকের বাংলা, ড. মো. মাহবুবর রহমান সম্পাদিত, আইবিএস, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, ২০১০।
৩. সিরাজগঞ্জের ইতিহাস, খন্দকার আবদুর রহিম, টাঙ্গাইল, ১৯৯৫।
৪. শাহজাদপুরের ইতিহাস, ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল, বিশ্বসাহিত্য ভবন, ঢাকা, ২০০৯।
৫. রেখাচিত্র যাঁদের হারিয়ে খুঁজি, মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ, বইপত্র, ঢাকা, ২০০৬।
৬. বাংলার ফোকলোর মনীষা, ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল, তিশা বুক ট্রেড, ঢাকা, ২০০৭।
৭. বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান, সেলিনা হোসেন ও অন্যান্য সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৮৫।
৮. বাংলা একাডেমি লেখক অভিধান, আশফাক উল আলম ও অন্যান্য সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৮।
৯. বাংলা বিভাগের পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস, ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৫।

লেখক: মামুন তরফদার, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও লোকসাহিত্য সংগ্রাহক, ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল।


নিউজটি অন্যকে শেয়ার করুন...

আর্কাইভ

business add here
© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com