বুধবার, ১৫ অগাস্ট ২০১৮, ১০:৩২ অপরাহ্ন

কোটা সংস্কার আন্দোলন : ঔদ্ধত্যের করুণ পরিণতি

কোটা সংস্কার আন্দোলন : ঔদ্ধত্যের করুণ পরিণতি

Professor Dr. Abdul Khaleque (প্রফেসর ড. আবদুল খালেক)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন দাবি-দাওয়া নিয়ে যখন ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়, দেশের সচেতন মানুষ গুরুত্ব সহকারে তা অবলোকন করে থাকেন। এবারের ছাত্র আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটেছে। কোটা সংস্কারের নামে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যখন দানা বেঁধে উঠতে থাকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ এমন কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয়ও শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কারের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। কিন্তু তাঁদের সে সমর্থনকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা যে এভাবে অপব্যবহার করবে, তেমনটি কেউ হয়তো ভাবতে পারেন নি। উদাহরণ হিসেবে প্রফেসর জাফর ইকবালের নাম এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে পত্র-পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে আন্দোলনের নামে শিক্ষার্থীরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভবনে আক্রমন চালায়, বাসার সমস্ত আসবাবপত্র ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়, ঢাকার রাজপথ বন্ধ করে দিয়ে ভয়াবহ জন-দুর্ভোগ সৃষ্টি করে, তখন আন্দোলনকারীদের অভিসন্ধি নিয়ে প্রফেসর জাফর ইকবালের মনেও প্রশ্ন জাগে। তিনি জনকণ্ঠের ১৩ই এপ্রিল চতুরঙ্গ পৃষ্ঠায় আন্দোলনকারীদেরকে লক্ষ্য করে একটি কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। প্রশ্নটি এ রকম- ‘দাবী আদায় করার জন্য তুমি কী সবাইকে নিয়ে রাস্তাঘাট বন্ধ করে পুরো শহরকে জিম্মি করে ফেলার বিষয়টি সমর্থন করো?’ আমার দৃঢ়বিশ্বাস আন্দোলনকারী নেতৃবৃন্দ প্রশ্নটির সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হবে। আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রগণ কতটা অপরিপক্ক, সাংবাদিকদের সাথে তাদের কথোপকথনে তা খানিকটা উপলব্ধি করা গেছে। সংসদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নোত্তর পর্বে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যখন কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত দেন, লাল ক্যাপ মাথায় দেয়া আন্দোলনকারী এক ছাত্র নেতা টেলিভিশন সাংবাদিকদের কাছে বলছিলেন- ‘পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রীর মুখের কথা আমরা বিশ্বাস করি না, প্রধানমন্ত্রীকে লিখিত বক্তব্য দিতে হবে।’ পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্য নিয়ে যে ছাত্রনেতা এরকম হঠকারী বক্তব্য দিতে পারে, তার প্রজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। প্রজ্ঞাহীন এই ছেলেরা যদি বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসনে আসে,জাতির কপালে নিদারুণ দূর্ভোগ আছে। আশা করি তেমনটি হবে না।

ছাত্রদের কোটা সংস্কারের আন্দোলন মোকাবিলা করতে গিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত এবং বাস্তবধর্মী। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আন্দোলনকারী কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কোন এক কুচক্রী মহলের বেড়াজালে আটকা পড়ে গেছে, সেখান থেকে বের হয়ে আসবার ক্ষমতা তাদের নেই। বিভিন্ন ক্যাটাগরির কোটার সঠিক সংখ্যা নিরূপণে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা যে একমত হতে পারবে না, সে কথা বুঝতে প্রজ্ঞাশীল, বুদ্ধিদীপ্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তেমন একটা সময় লাগে নি। সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের উচ্ছৃঙ্খল আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কোটা বিলুপ্তির ঘোষণা ছিল সময়োপযোগী এবং যথার্থ। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের আন্দোলনে রূপান্তরিত করবার যে এক দূরভিসন্ধি জামায়াত-বিএনপির ছিল, লন্ডন থেকে তারেক জিয়া এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মামুন আহমেদের টেলি কথোপকথনে তা স্পষ্ট হয়ে গেছে।

কোটা সংস্কারের আন্দোলনে যে সমস্ত শিক্ষার্থী নেতৃত্ব দিয়েছে, সম্ভবত তারা ষড়যন্ত্রকারীদের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় কথিত মেধাবী ছাত্র নেতাদের সেটুকু বুঝবার ক্ষমতাও নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয়ের বাসভবন গভীর রাতে যখন মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়, আন্দোলনকারী নেতাগণ নিজেদেরকে এ ব্যাপারে নির্দোষ বলে দাবি করেছে। মাননীয় উপাচার্য মহোদয়ও অন্ধ স্নেহে বলে দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছাত্র উপাচার্যের বাসা ভাঙচুর করতে পারে না। আমি তাঁর সাথে একমত হতে পারছি না বলে আন্তরিকভাবে দুঃখিত। উপাচার্য ভবন ভাঙতে আমাদের কিছু কিছু ছাত্রের হাত যে মোটেই কাঁপে না, নিজ চোখে আমি তা প্রত্যক্ষ করেছি। ১৯৯৭ সালে আমাকে যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করা হয় ,অনার্সে ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হাতে উপাচার্য ভবনের আসবাবপত্র মারাত্মকভাবে ভাঙচুর হয় এবং আমার পুত্র আক্রমনকারীদের হাত থেকে কোন রকমে রক্ষা পায়। ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল মূলত শিবিরপন্থী শিক্ষার্থীরা। শিবিরপন্থী হলেও তারা তো আমার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যলয়েরই ছাত্র। আমি আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলাম এবং সে মামলায় নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছিল। মনে রাখতে হবে শিবিরের অনেক সক্রিয় কর্মী বর্তমানকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। তারাও কিন্তু উপাচার্য মহোদয়ের ছাত্র। কাজেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছাত্র ভাঙচুরের জন্য দায়ী নয়, এমন কথা বলা সমীচীন হবে না।

পত্র-পত্রিকায় আমরা দেখেছি উপাচার্য মহোদয়ের বাসা ভাঙচুরের সময় পাঁচ শতাধিক মানুষের উপস্থিতি ছিল। বর্তমান সময়ে দেশে যে রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করছে, সরকার বিরোধী আন্দোলনে যে জামায়াত-বিএনপি আন্দোলনের মাঠে ১০০জন কর্মীকে নামানোর ক্ষমতা রাখে না, তারা মুহূর্তের মধ্যে ৫০০ বহিরাগত লোক নিয়ে এসে উপাচার্য মহোদয়ের বাড়ি ভাঙচুরে লাগিয়ে দিয়েছে, বিষয়টি এত সরলীকরণের কোন সুযোগ নেই। কোটা সংস্কার আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, উপাচার্য মহোদয়ের বাড়ি ভাঙচুরের দায়-দায়িত্ব তারা এড়িয়ে যেতে পারে না। কোন আন্দোলনের যখন ডাক দেয়া হয়, তখন আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণে রাখবার দায়িত্ব পালন করতে হয় নেতাদেরকে। আন্দোলনের মাধ্যমে জানমালের কোন ক্ষতি হলে তার দায়ভার নেতাদেরকেই বহন করতে হয়। উদাহরণ হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলার কথা এখানে উল্লেখ করতে পারি। বেগম খালেদা জিয়ার ডাকে হরতাল পালন করতে গিয়ে কুমিল্লায় আন্দোলনকারীগণ একটি পাবলিক বাসে পেট্রোল বোমা হামলা চালিয়েছিল এবং বাসের কিছু যাত্রী অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়া নিজ হাতে বোমা হামলা চালিয়েছেন, একথা মনে করবার কোন কারণ নেই, কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া উক্ত হত্যাকা-ের হুকুমের আসামি হিসেবে এবং এ জন্য তিনি কারাবন্দী হয়ে আছেন।

জাতীয় পর্যায়ের যে কোন আন্দোলনের পরিসমাপ্তির পর তার অর্জন-বিসর্জনের বিষয়টি আলোচিত হয়ে থাকে। কোটা সংস্কারের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিক নিয়ে এখন আলোচনা করা যেতেই পারে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের ইতিবাচক দিক অপেক্ষা নেতিবাচক দিকটাই আমার কাছে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। প্রথমেই নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা যাক-

১. কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভবনে ব্যাপক ভাঙচুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এমনটি কখনও ঘটে নি।

২. আন্দোলনের নামে রাস্তা-ঘাট বন্ধ করে দিয়ে ঢাকা শহরের মানুষদেরকে জিম্মি করে ফেলায় জনসাধারণের কাছে আন্দোলনকারীগণ ধিকৃত হয়েছে। সাধারণ মানুষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতি ভয়ানক বিরক্ত হয়েছে।

৩. আন্দোলনকারীগণের ঔদ্ধত্যের কারণে কোটা পদ্ধতির সংস্কার হয় নি বরং সামগ্রিকভাবে কোটা পদ্ধতি সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে গেছে। এর অর্থ ছাত্র আন্দোলনটি ব্যর্থ হয়ে গেছে।

৪. কোটা পদ্ধতি বাতিলের ফলে মেয়েরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এজন্য আন্দোলনকারী মেয়েরাই মূলত দায়ী। কিছু দিনের মধ্যেই মেয়েরা তাদের ক্ষতির পরিমান উপলব্ধি করতে পারবে।

৫. মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জাতির আবেগ আছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের ফলে জাতির আবেগে আঘাত লেগেছে। তবে মনে রাখতে হবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল প্রকৃত অর্থে জনযুদ্ধ। দেশের কতিপয় রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী ছাড়া দেশের সবাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণে ভুল ছিল। যে কারণে ভুয়া সার্টিফিকেটধারী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়ে গেছে এবং তাদের দ্বারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভুলুণ্ঠিত হয়েছে। সনদধারী যে সমস্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের সন্তান-নাতী-নাতনীরা জয়বাংলা বলতে পারেন না এবং মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত চেতনাকে যাঁরা বিসর্জন দিয়েছেন,মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুযোগ তাঁরা পাবেন কেন?

এবার কোটা সংস্কার আন্দোলনের কিছু ইতিবাচক দিকের প্রতি দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে-
১. তারেক জিয়া লন্ডনে বসে ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন, এমন কথা আমরা বিশিষ্ট কলাম লেখক জনাব আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা থেকে জানতে পেরেছিলাম। কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে তারেক জিয়ার মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। সরকারের জন্য এটি সতর্ক বার্তা।

২. সাধারণ ছাত্রদের নামে ব্যানার টাঙিয়ে ছাত্র নেতা সেজে আন্দোলন শিক্ষাঙ্গনের জন্য যে কত বিপদজনক, কোটা সংস্কার আন্দোলনে তা প্রমাণিত হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের করুণ পরিণতি থেকে সাধারণ শিক্ষর্থীদের অনেক কিছু শিক্ষা হবে। রাতারাতি ছাত্রনেতা সাজবার প্রবণতা বন্ধ হবে।

৩. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ঐক্যবদ্ধ এবং সতর্ক থাকলে ছাত্র আন্দোলন বিপথগামী হতে পারতো না বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভবন ঐতিহ্যের প্রতীক। সেই ঐতিহ্যকে আঘাত করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান-সম্মান কিছু থাকে না। কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যা কিছু ঘটেছে, তা থেকে শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকদেরকেও সতর্ক অবস্থানে থাকতে সহায়তা করবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্পষ্ট ভাষায় জাতিকে জানিয়ে রেখেছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালিয়েছে, এজন্য অপরাধীদেরকে শাস্তি পেতেই হবে। আমরাও মনে করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়।

লেখক : প্রফেসর ড. আবদুল খালেক, সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী।


নিউজটি অন্যকে শেয়ার করুন...

আর্কাইভ

business add here
© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com