রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৪:৪৫ অপরাহ্ন

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকারের অর্জন (২০০৯-২০১৮)

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকারের অর্জন (২০০৯-২০১৮)

Professor Dr. Abdul Khaleque (প্রফেসর ড. আবদুল খালেক)

লেখক: প্রফেসর ড. আবদুল খালেক, সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী।

উচ্চশিক্ষা বলতে আমি স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পঠন-পাঠনকে বোঝাতে চেয়েছি। উচ্চ শিক্ষাকে নিম্নপর্যায়ের শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিচার-বিশ্লেষণ করা একটি জটিল কাজ। প্রকৃত সত্য এই, নিম্নপর্যায়ের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের উচ্চশিক্ষা। নিম্নপর্যায়ের শিক্ষার মান যদি ভাল না হয়, উচ্চশিক্ষার মান উন্নত হবে, এমনটি মনে করবার কোন কারণ নেই।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করে ৩০ লাখ শহীদের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলা গড়বার লক্ষ্যে সোনার মানুষ চেয়েছিলেন। ভালমানের শিক্ষা ছাড়া যে সোনার মানুষ গড়ে উঠবে না, বঙ্গবন্ধু ভাল করেই জানতেন। তিনি চেয়েছিলেন দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, সাম্প্রদায়িকতা ও দুর্নীতিমুক্ত এক উন্নত, সমৃদ্ধ, সুখী, মর্যাদাশীল গণতান্ত্রিক স্বাধীন বাংলাদেশ। তাঁর প্রত্যাশা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ একদিন শিক্ষা, জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। তিনি একটি যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশে হাজারো সমস্যার মধ্যে ৩৭,১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণের মাধ্যমে সোনার মানুষ গড়ার কাজে হাত দিয়েছিলেন। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে গঠিত হয় শিক্ষা কমিশন। এ কমিশন স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি আধুনিক, গণমুখী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যবর্গের নৃশংস হত্যাকান্ডের পর পরিস্থিতি পরিবর্তনের ফলে তা বাস্তবায়িত হয় নি। এরপর প্রায় অর্ধডজন শিক্ষানীতির উদ্যোগ নেয়া হলেও দুর্ভাগ্য যে, স্বাধীন দেশে একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা দীর্ঘকাল সম্ভব হয় নি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে নতুন একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন এবং ড. কুদরাত-এ-খুদা কমিশনের আলোকে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করবার উদ্যোগ গ্রহণ করেন, কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে। শিক্ষা ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করা হয়। ২০০৯ সালে একটি নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি যৌক্তিক পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে যে অর্জন সূচিত হয়েছে তার সার-সংক্ষেপ এখানে তুলে ধরছি-

১. জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।

২. ধনি-দরিদ্র নির্বিশেষে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, শিক্ষার্থীদের ঝরেপড়া রোধ, শিক্ষাকে মানসম্মত, সর্বব্যাপী ও ফলপ্রসূ করার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের কাছে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ উৎসবের দিন সমগ্র বাংলাদেশে একযোগে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মাঝে পূর্ণসেট পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হয়।

৩. ২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে সর্বপ্রথম এ পর্যন্ত ৩ হাজার ২৫জন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর মাঝে বিনামূল্যে ২৭ হাজার ৮১১টি ব্রেইল পদ্ধতির পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করা হয়েছে।

৪. ২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে সর্বপ্রথম প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৮২ হাজার ৮৯৬ জন শিক্ষার্থীর মাঝে নিজ নিজ মাতৃভাষায় ২ লক্ষ ২৬ হাজার ৫৫৮টি পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।

৫. সকল শিশুকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসার ও প্রচেষ্টা গ্রহণের ফলে প্রায় ৯৯% শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে।

৬. ঝরেপড়া রোধে বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে দুপুরে টিফিন প্রদানের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে।

৭. সাক্ষরতার হার বর্তমানে ৭৩% ছাড়িয়ে গেছে।

৮. শিক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সময়মত পরীক্ষা গ্রহণ, ফলাফল ঘোষণা এবং ক্লাশ শুরু করা হচ্ছে।

৯. পাঠ্যক্রম যুগোপযোগী করা এবং পাঠ্যক্রম অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক প্রণীত হয়েছে।

১০. শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার লক্ষ্যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র সরবরাহ করা হয়েছে।

১১. বিভিন্ন ধরনের বৃত্তি, উপবৃত্তি ও মেধাবৃত্তি বিতরণের মাধ্যমে শিক্ষায় ঝরেপড়া হ্রাস ও উচ্চশিক্ষা গ্রহণে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

এছাড়া বিপুল সংখ্যক বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভৌত অবকাঠামোর ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষার পটভূমি হিসেবে নিম্নপর্যায়ের শিক্ষার গতি-প্রকৃতি পর্যালোচনা করা হলো। এবার আমরা আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার সরকার উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যে সাফল্য অর্জন করেছে, সে দিকে দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে।

একটি দেশ সত্যিকার অর্থে কতটা উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে, উচ্চশিক্ষা বিশেষ করে উচ্চতর গবেষণার দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০০৯ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করবার পরপরই প্রথম নজর দেন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে শেখ হাসিনা সরকার যেভাবে সাজিয়েছিলেন, ২০০১ সালে বিএনপি সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে শিক্ষা ব্যবস্থাকে উল্টো ধারায় নিয়ে যায়। পাঠ্য তালিকায় এমন কিছু বিষয় নিয়ে আসা হয়, যেখানে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটে এবং সাম্প্রদায়িক চেতনা প্রাধান্য লাভ করে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভের পরপরই ইতিহাস বিকৃতি রোধকল্পে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন করেন এবং দ্রুততার সাথে ২০১০ শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের কাজে হাত দেন।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় মূলত ১৯৯২ সালে। ১৯৯২ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে নানা রকম ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল। সে কারণে দেশে অসংখ্য শাখা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছিল। এর ফলে উচ্চশিক্ষার মান আশক্সকাজনকভাবে নেমে যায়। শাখা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সার্টিফিকেট বিক্রির কারখানায় রূপান্তরিত হয়। উচ্চশিক্ষা ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে উচ্চশিক্ষার মান-সম্মান বাঁচানোর লক্ষ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৯২ আইনটিকে বাতিল করে একটি নতুন আইন প্রণয়নের কাজে হাত দেন। অল্পসময়ের মধ্যে উচ্চশিক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণীত হয় এবং পার্লামেন্টে পাস করানো হয়, যে আইনটির নামকরণ হয়েছে “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ২০১০”। আইনটি প্রয়োগের ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। অবৈধ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ হয়ে গেছে।

এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ, ইউজিসি অনুমোদিত সরকারি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষা প্রদান করা হয়ে থাকে, সেই শিক্ষা ব্যবস্থাকেই আমরা মোটামুটি উচ্চশিক্ষার স্তর বলে বিবেচনা করতে পারি। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর অতিক্রম করছে। তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে না পারলে দেশে বেকারের সংখ্যা বিপুল হারে বেড়ে যাবে। সে কথা বিবেচনা করে শেখ হাসিনা সরকার দেশে প্রচুর পরিমাণ নতুন নতুন কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ব্যবস্থা করেছে। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশে কি পরিমাণ নতুন কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেদিকে একটু দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে।

উল্লিখিত সময়ের মধ্যে ১৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৫০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে আরও ৬টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বর্তমানকালে দেশে ৪৮টি পাবলিক ও ১০৩টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট ১৫১টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে স্থায়ী রূপ দেয়ার জন্য এবং নলেজ বেইজ্ড সোসাইটি গড়ে তুলে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে এবং উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১৭ এবং শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১৭ ইতোমধ্যে মহান জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশে যে ক’টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নতুন একাডেমিক ভবন, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য হল নির্মাণ, শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণে সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরিসংখ্যান এখানে তুলে ধরছি। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭৫৭.২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮টি প্রকল্পের বাস্তবায়ন সমাপ্ত হয়েছে। সমাপ্ত প্রকল্পসমূহের জন্য মোট ১০৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রায় ৭০৭.২৭ কোটি টাকার অপর প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। সমাপ্ত ৮টি প্রকল্পের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৫টি অত্যাবশ্যক ভবন নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি একাডেমিক ভবন, ১টি প্রশাসনিক ভবন, ২৫টি আবাসিক ভবন, শিক্ষার্থীদের জন্য ৮টি হল (ছাত্র হল ৫টি ও ছাত্রী হল ৩টি) এবং শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২৯টি আবাসিক ভবন নির্মিত হয়েছে।

৮টি ছাত্র-ছাত্রী আবাসিক ভবনে অতিরিক্ত ৫ হাজার শিক্ষার্থীর আবাসিক সুবিধা তৈরি হয়েছে। নির্মিত ল্যাবসমূহে অতিরিক্ত ৪ হাজার জন শিক্ষার্থীর বিজ্ঞান গবেষণা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ২টি প্রকল্পের আওতায় মোট ৮টি অত্যাবশ্যক ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ১টি একাডেমিক ভবন নির্মাণ (২১তলা ভিতে ২১তলা), ৯টি ভবনের উর্দ্ধমুখী সম্প্রসারণ, ছাত্রদের জন্য অতিরিক্ত ২০০০ হাজার আসন বিশিষ্ট ২টি ছাত্র হল, শিক্ষকদের জন্য ২টি ১১তলা ভবন (৪০টি ফ্ল্যাট) নির্মাণ এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ২টি (কর্মকর্তাদের জন্য ১৫২টি ফ্ল্যাট ও কর্মচারীদের জন্য ১৫২টি ফ্ল্যাট) টাওয়ার ভবন নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়নের যে পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো, দেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় একই ধারায় উন্নয়নমূলক কাজ চলছে।

এবার বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) উন্নয়নের গতি-প্রকৃতির দিকে একটু দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে। দেশে টেক্সটাইল সেক্টরসহ অন্যান্য সেক্টরে দক্ষ ও যুগোপযোগী প্রকৌশলী তৈরি করার জন্য বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০০৯-২০১৮ মেয়াদকালে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় গৃহিত উন্নয়ন কার্যক্রম নিম্নরূপ:

২০০৯ সালে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বস্ত্রশিল্পে দক্ষ জনবল সরবরাহের লক্ষ্যে ২০১০ সালের ২২শে ডিসেম্বর ‘জ্ঞানই শক্তি’ শ্লোগানে কলেজ অব টেক্সটাইল টেকনোলজিকে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পূর্বে ২০০৯-২০১০ শিক্ষাবর্ষে বুটেক্সের বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রামে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল মাত্র ২৪০জন। বর্তমানকালে তা ৬০০ জনে উন্নীত হয়েছে। তখন বিভাগ ছিল মাত্র ৪টি, আর বর্তমানে বিভাগ হয়েছে ৯টি। এছাড়া বুটেক্স এর অধিভুক্ত ৬টি কলেজের প্রতিটিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১২০ জনে উন্নীত করা হয়েছে। ২০১৫ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসি’র সার্বিক সহযোগিতায় ১২০৪টি পদের একটি অর্গানোগ্রাম অনুমোদিত হয়। অর্গানোগ্রাম অনুমোদনের পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পদ ছিল মোট ২৭৫টি। বর্তমানে শিক্ষক পদ ৩৪০টি, কর্মকর্তা পদ ২৬০টি এবং কর্মচারী পদ ৬০৪টি সহ মোট ১২০৪টি পদ অনুমোদিত আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পরের বছর ২০১১-১২ অর্থবছরে বুটেক্স এর রাজস্ব বাজেট ছিল ৫ কোটি ৪২ লক্ষ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯ কোটি টাকা। ১৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ১৩তলা ভবন ও একটি ছাত্রাবাসসহ বিদ্যমান ভবনসমূহের সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে যা ডিসেম্বর ২০১৯ এর মধ্যে সমাপ্ত হবে। ১৫তলা একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবন (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভবন) নির্মাণাধীন। এছাড়া ৬তলা বিশিষ্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম হল নির্মাণ করা হয়েছে।

এবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে একটু দৃষ্টি দেয়া যাক। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ৬টি আঞ্চলিক কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ৫০ হাজার বর্গফুট জমির উপর ১০তলা বিশিষ্ট প্রাথমিক পর্যায়ে ৩টি স্থায়ী আঞ্চলিক কেন্দ্র (সকল বিভাগীয় শহরে) নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একটি টাওয়ার ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে। সে অনুযায়ী ১৪তলা বিশিষ্ট ডরমিটরি ভবন, ৭তলা বিশিষ্ট আইসিটি ভবন, ৬তলা বিশিষ্ট সিনেট ভবন, ১০তলা বিশিষ্ট কর্মকর্তা আবাসিক ভবন, ১০তলা বিশিষ্ট কর্মচারী ভবন নির্মাণ কাজ বর্তমানে চলছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ৫ বছর মেয়াদি ১৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের (১০৪০ কোটি টাকা) সিইডিডি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে এবং ২০১৬ সাল থেকে এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজের পরীক্ষার ফলাফল, শিক্ষার পরিবেশ, অবকাঠামো, শিক্ষকদের যোগ্যতা ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে ৩১টি পূর্ব নির্ধারিত দক্ষতা সূচকের ভিত্তিতে (কেপিআই) কলেজ পারফরম্যান্স ব্যাংকিং প্রবর্তন করা হয়েছে।

সারাদেশব্যাপী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোকে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হাই-কানেক্টিভিটির আওতায় এনে বিষয়ভিত্তিক ভবিষ্যৎমুখী কনটেন্ট তৈরি ও শিক্ষার্থীদের মাঝে তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা সম্বলিত লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) গড়ে তোলা হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটবে।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ( বাউবি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নবদিগন্তের উন্মোচন ঘটিয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে বাউবি মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা করার জন্য গবেষণা ফেলোশিপ ও বৃত্তি চালু করা হয়েছে। ঘরে বসেই শিক্ষার্থীরা যেন সহজেই বিভিন্ন প্রোগ্রামের জন্য মুদ্রিত বইগুলো পড়তে ও ডাউনলোড করতে পারে সেই লক্ষ্যে প্রায় চারশত পঞ্চাশটি ই-বুক বাউবির ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়েছে। উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষণের সুযোগকে আরো প্রসারিত করার লক্ষ্যে বাউবির সকল Learning Material কে Open Education Research (OER) হিসেবে সকলের নিকট উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। ইউজিসি’র সহায়তায় Quality Assurance Cell প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বাউবি ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, ভাষাশিক্ষা, শিক্ষক ও গবেষক প্রশিক্ষণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ওপেন ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য (OU, UK) ওপেন ইউনিভার্সিটি অব শ্রীলঙ্কা (OUSL), চীনের উনান বিশ্ববিদ্যালয়, ওপেন ইউনিভার্সিটি অব মালয়েশিয়ার সাথে সহযোগিতা চুক্তি।

বাউবিতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জাতীয় নেতাদের অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে ‘স্বাধীনতা চিরন্তন’ নামক ম্যুরাল নির্মাণ। অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা অডিটোরিয়াম কাম ট্রেনিং সেন্টার নির্মাণ। শিক্ষক এবং অফিসারদের অফিসের কাজের সুবিধার্থে প্রশাসনিক ভবনের ঊর্দ্ধমুখী সম্প্রসারণ। গোপালগঞ্জ, পাবনা, জামালপুর ও মানিকগঞ্জ উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে সৈয়দপুর, মধুপুর এবং চাঁদপুরে জমি অধিগ্রহণ। বাউবিতে উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষণ শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও উন্নতকরণের জন্য চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায় ‘বাংলাদেশ দূর শিক্ষণ উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষামূলক টেলিভিশন চ্যানেল স্থাপন শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এসব কর্মকান্ড থেকে প্রমাণিত হয় শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে উন্নয়নের শীর্ষে নিয়ে এসেছেন।

শেখ হাসিনা সরকার বিগত দশ বছর ধরে বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার দিকে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছে। দেশে বিগত দশ বছর ধরে উচ্চশিক্ষার জন্য যে সমস্ত নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। তার মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে বাজেট অনেক বৃদ্ধি করা হয়েছে। কারিগরি শিক্ষায় কি পরিমাণ আগ্রগতি হয়েছে, সে দিকে একটু নজর দেয়া যেতে পারে।

কারিগরি শিক্ষায় এনরোলমেন্ট ৯ বছর পূর্বে ১% এর কম ছিল, তা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৬% এ উন্নীত হয়েছে। ২০২০ সাল নাগাদ কারিগরি শিক্ষায় ২০% এনরোলমেন্টের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ডিপ্লোমা কোর্সে আসন সংখ্যা ১২,৫০০ থেকে ৫৭,৭৮০ বৃদ্ধি করা হয়েছে। কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে ২০১০ সাল থেকে অনলাইন ভর্তি কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। ১১৯টি প্রতিষ্ঠানে ৯৫০টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুমে ১,০৯৯টি মাল্টি মিডিয়া প্রজেক্টর চালু করা হয়েছে। চীন স্কলারশীপ প্রোগ্রামে ২০১৭ এর আওতায় চীনের ১০টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোট ৫৮১জন শিক্ষার্থীকে ডিপ্লোমা। এসোসিয়েট ডিগ্রি অর্জনের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে এবং ২০১৮ সালে ৮৫০জন শিক্ষার্থী প্রেরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। স্কিলস এন্ড এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট (STEP) প্রকল্পের আওতায় ডিপ্লোমা পর্যায়ে ৩ লক্ষ ৫৮ হাজার ৬ শত ১৫ জন শিক্ষার্থীকে মাসিক ৮০০ টাকা হারে বৃদ্ধি প্রদান করা হয়। কর্মমূখী প্রশিক্ষণ বাবদ ১ লক্ষ ১৮ হাজার ২ শত ৮৫ জনকে মাসিক ৭০০ টাকা হারে বৃত্তি প্রদান করা হয়। সরকারি পলিটেকনিকে ডাবল শিফ্ট চালু, এসব প্রতিষ্ঠানে ২০০৮ সালে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১২,৩৭৫; বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিবছর ৫৮,৭৮০ জনে। বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ১,৬৭৪টি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের ১৮,৪৯৭ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে এম.পি.ও. ভুক্ত করা হয়েছে। কারিগরি শিক্ষায় গবেষণামূলক কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে একটি ‘রিসার্স ও নলেজ ম্যানেজমেন্ট সেল’ চালু করা হয়েছে। এসব উদাহরণ থেকে প্রমাণিত হয় শেখ হাসিনা সরকার কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ করে রেখেছেন।

মাদ্রাসা শিক্ষা- বর্তমান সরকারের অন্যতম সাফল্য হলো মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য আলাদা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা। মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে ১২৬৬ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ২৮১টি মাদ্রাসায় কারিগরি শিক্ষা চালু করা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় সাধন করে যুগোপযোগী শিক্ষার প্রচলন করা হয়েছে। দেশে নতুন একটি ‘ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়’ চালু করা হয়েছে। কওমি মাদ্রাসার ডিগ্রিকে সরকারি স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত কওমি মাদ্রাসাসমূহের ‘দাউরায়ে হাদিস-এর সনদকে মাস্টার ডিগ্রির সমমান দেয়া হয়েছে। দেশের বৃহত্তর একটি জনগোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন করে রাখলে দেশের কল্যাণ হবে না, সে ভাবনা থেকেই শেখ হাসিনা সরকার মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতির সাথে সমন্বয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এভাবে আমরা যদি শিক্ষার প্রতিটি সেক্টর নিয়ে পর্যালোচনা করি তাহলে দেখা যাবে উক্ত শিক্ষার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকারের অর্জন আকাশচুম্বী।

প্রশ্ন তোলা হয় শিক্ষা ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকার প্রচুর অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই, সে অর্থে নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, নতুন নতুন ভবন তৈরি হয়েছে, কিন্তু উচ্চশিক্ষার মান উন্নত হয় নি, দেশের উচ্চতর গবেষণার পথ প্রশস্ত হয় নি। অভিযোগটি পুরোপুরি সত্য নয়। উচ্চতর গবেষণার ক্ষেত্রে অর্জনের কিছু উদাহরণ এখানে তুলে ধরা যেতে পারে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় উচ্চশিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০৯ সালে Higher Education Quality Enhancement Project (HEQEP) প্রকল্পের কার্যক্রম চালু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২০৫৪ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

HEQEP প্রকল্পের একাডেমিক ইনোভেশন কম্পোনেন্টের আওতায় ৩৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৪২টি উপ-প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে উপ-প্রকল্পের আওতায় একদল গবেষক নন-লিনিয়ার অপটিক্স গবেষণায় ক্যান্সার শনাক্তকরণের সাশ্রয়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। গত ৯ জুলাই ২০১৮ সালে এই উদ্ধাবিত প্রযুক্তি “Method and system based on Non-Liner optical characteristics of Body Fluid for Diagnostic of Neoplasia Cancer” শিরোনামে ইউএসএ ও বাংলাদেশে পেটেন্ট এর জন্য আবেদন করা হয়েছে। ক্যান্সার শনাক্তকরণের এই নতুন পদ্ধতিটি ইতোপূর্বে কখনোই কোথাও ব্যবহৃত হয় নি। কাজেই আশা করা যায়, ক্যান্সার রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে উদ্ভাবিত এই পদ্ধতি সম্ভাবনার এক নতুন দ্বার উন্মোচন করবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চতর গবেষণা সহায়তা কর্মসূচি থেকে প্রাপ্ত আর্থিক সহায়তায় পাটের সেলুলোজ থেকে পরিবেশবান্ধব পলিমার উৎপাদন করা হয়েছে। এই পলিমারের তৈরি ব্যাগ সহজে মাটিতে মিশে যাবে ফলে পরিবেশের কোন ক্ষতি হবে না।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কিছু কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর গবেষণার কাজ চলছে এবং তার শুভ ফল দেশবাসী পেতে শুরু করেছে। কিছু কিছু উদাহরণ এ ক্ষেত্রে তুলে ধরা যেতে পারে।

আমাদের দেশে জমি বাড়ে নি, কিন্তু উৎপাদন অনেক গুণ বেড়ে গেছে। দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ কৃতিত্ব আমাদের দেশের কৃষিবিদদের। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ফসল আমাদের কৃষির উন্নয়ন। দেশে মাছ উৎপাদনে বড় রকমের সাফল্য পাওয়া গেছে, এ সাফল্য আমাদের দেশের মৎস বিজ্ঞানীদের। যে কোন জটিল রোগের সুচিকিৎসা এখন দেশেই পাওয়া যাচ্ছে, এ কৃতিত্ব আমাদের দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের। দেশে বড় বড় রাস্তা নির্মাণ হচ্ছে, বিশাল বিশাল ভবন নির্মিত হচ্ছে এমন কি পদ্মা নদীতে একটি ঐতিহাসিক সেতু নির্মিত হচ্ছে। আমাদের দেশের দক্ষ প্রকৌশলীরাই মূলত কাজগুলো করছেন, বাইরের প্রকৌশলী প্রয়োজন হচ্ছে না। দেশে আজ যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে, তা দৃশ্যমান। সমস্ত বিশ্ব আজ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বলা যেতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদদের সাফল্য। রাজনৈতিক অঙ্গনে আমাদের সাফল্য কম নয়, এ কৃতিত্ব আমাদের রাজনীতিবিদদের। বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশ হতে যাচ্ছে, ২০৪০ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে রূপান্তরিত হবে বলে আশা করা যায়। প্রতিটি সেক্টরে এত যে উন্নয়ন, এজন্য বিদেশ থেকে কোন দক্ষ লোককে আমদানী করতে হয় নি। নিজেদের জনশক্তি দ্বারাই দেশ উন্নতির পথে এগিয়ে চলেছে।

আমরা বলে থাকি শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড, শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। কথাগুলো খুব তাৎপর্যপূর্ণ। উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে জাতির মেরুদন্ড শক্ত হয়েছে বলেই দেশের উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে। আমরা দৃঢ় কণ্ঠে বলতে পারি শিক্ষার উন্নয়ন এবং জাতীয় উন্নয়ন একে অপরের পরিপূরক। ১০ বছর আগে বাংলাদেশ ছিল একটি দরিদ্র দেশ। শেখ হাসিনার ১০ বছরের শাসনকালে দেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চলেছে। এটি আমাদের মনগড়া কথা নয়, বিশ্বসংস্থা থেকেই স্বীকৃতি মিলছে। মধ্য আয়ের দেশ হতে গেলে মধ্য মানের শিক্ষা ব্যবস্থাও দেশে থাকতে হবে। শেখ হাসিনার সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে প্রচুর পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে। বাজেটের অর্থ সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেছে বলেই শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। দেশের উন্নয়নকে অব্যাহত রাখতে হলে শিক্ষার উন্নয়নকেও চলমান রাখতে হবে। উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য গবেষণা। গবেষণালব্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তির মাধ্যমেই দেশের উন্নয়ন টেকসই হবে। দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তাঁর বিগত দশ বছর শাসনকালে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি সাধন করেছেন, তার সাথে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন অবিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরের স্বপ্ন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন দারিদ্র, নিরক্ষরতা, সাম্প্রদায়িকতা ও দুর্নীতিমুক্ত এক উন্নত সমৃদ্ধমুখী মর্যাদাশীল গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। তেমন দেশ গড়তে হলে উচ্চশিক্ষিত দক্ষ জনগোষ্ঠী অপরিহার্য। সেই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তাঁর দশ বছরের শাসনকালে উচ্চ শিক্ষার উন্নয়নে যে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন, তা প্রায় অতুলনীয়।

তথ্যসূত্র:
১. শিক্ষা খাতে ঐতিহাসিক সংস্কার ও যুগান্তকারী পরিবর্তন, সম্পাদনায় নূরুল ইসলাম নাহিদ, প্রকাশনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ২০১২।
২. যেতে হবে বহুদূর, সম্পাদনায় নূরুল ইসলাম নাহিদ, প্রকাশনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ২০১৬।
৩. শিক্ষা ক্ষেত্রে যুগান্তকারী উন্নয়ন, সম্পাদনায় নূরুল ইসলাম নাহিদ, প্রকাশনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ২০১৮।


Share this post in your social media

© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com