শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:৪২ পূর্বাহ্ন

আমার শিক্ষক আমার ভালোবাসা

আমার শিক্ষক আমার ভালোবাসা

প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম: আমার শিক্ষক আমার ভালোবাসা

ইংরেজি ১৯৬৩ সাল। আগস্ট মাসের শেষের দিকে। রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তি হয়েছি বাংলা বিভাগে। আমরা এ বিভাগে অনার্সের দ্বিতীয় ব্যাচ। প্রথম ব্যাচটি ছিল সাইয়ীদ ভাইদের (বর্তমানে আওয়ামীলীগ নেতা অধ্যাপক আবু সাইয়ীদ)। তখন বাংলা বিভাগ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনোদপুর গেট দিয়ে ঢুকে পশ্চিম পাশের ছোট একটা দোতলা বিল্ডিং-এ। ভর্তি হয়েই শুনলাম বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম দ্বিতীয়বার পি.এইচ.ডি করার জন্য গেছেন আমেরিকার ইন্ডিয়ানা ইউনিভারসিটিতে। আমি কল্পনায় তাঁর একটা ছবি মনের মধ্যে তৈরি করে নিয়েছিলাম। অল্প দিনের মধ্যেই তিনি ফিরে এসে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব নিলেন। বাস্তবে যখন তাঁকে দেখলাম, তখন আমার কল্পনার ছবির সাথে মিলল না কিছুই। দোহারা গড়ন, ধীর-স্থির গম্ভীর অথচ প্রসন্ন- অন্য রকম একটি চেহারা। আমি- শুধু আমি নই, আমরা প্রথম বর্ষের সবাই দূর থেকে তাঁকে দেখতাম। আমরা বিভাগের সবচেয়ে ছোট ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রী, তাই বড় বড় স্যারেরা আমাদের ক্লাসে খুব কম আসতেন।

একদিন বাংলা বিভাগের নিচতলায় সদ্য ফিরে-আসা বিভাগীয় প্রধান ড.মযহারুল ইসলামের সংবর্ধনার জন্য একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন হলো। মঞ্চের পর্দায় লেখা ‘আমরাও রাজহাঁস/সংসার জলধির মাঝে ভেসে ভেসে চলি বার মাস।’ জানলাম, এ দুটি স্যারের কবিতার লাইন। ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলো তাঁর আমেরিকায় অবস্থানের অভিজ্ঞতার কথা বলার জন্য। তিনি অত্যন্ত গোছালো অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে সে অভিজ্ঞতার কথা বললেন। এই প্রথম স্যারের মুখে আলোচনা শুনলাম এবং শ্রদ্ধায়-বিস্ময়ে মুগ্ধ হলাম।

তিনি জানালেন, সেখানকার এক ধনী পরিবারের গৃহিণী আমাদের দেশের কাঁসার থালা-বাটি, বাসন-পত্রের জন্যে পাগল প্রায়। চলে আসার সময় স্যার যখন বিমানে উঠছেন তখনও ওই গৃহিণী বললেন, ‘ড. ইসলাম, আপনি দেশে গিয়ে আমার কাঁসার জিনিসগুলো অবশ্যই পাঠাবেন কিন্তু।’ স্যার আমাদের বললেন যে, এ দেশ থেকে ওগুলো আমেরিকায় পাঠাতে প্রচুর খরচ, তবু ওরা এগুলো সংগ্রহের ব্যাপারে কতো আগ্রহী। এগুলো বাড়িতে থাকা সে দেশে খুব একটা বিরল গর্বের ব্যাপার। অথচ আমরা এর কদর বুঝিনা। এ কথা দিয়ে তিনি আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বের প্রতি উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রীদের সজাগ করতে চাইলেন। এই বোধ সারা জীবন তাঁর সাধনার মধ্যে জাগ্রত ছিল।

সেদিন আলোচনার যে কথাটা আমাকে বেশ অভিভূক্ত করেছিল তা হলো স্বদেশের প্রতি তাঁর নিবিড় মমত্ববোধ। স্যার জানালেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন তিনি যে বেতন পেতেন তার অনেক গুণ বেশি বেতনে আমেরিকায় তাঁর চাকরির সুযোগ এসেছিল। তিনি বললেন, ‘তবুও আমি যাব না। সেখানে গেলে আমি অনেক টাকা পাব সত্য, কিন্তু আমার ছেলে-মেয়েরা সে দেশের আচার-আচরণের মধ্যে বেড়ে উঠবে- এ দেশকে তারা আস্তে আস্তে ভুলে যাবে। আমি তা চাই না। তাই আমি আমার দেশ ছেড়ে কখনোই কোথাও যাবো না।’ এই চেতনা তাঁর মধ্যে শেষ পর্যন্ত অক্ষুন্ন ছিল।

এরপর আমাদের বাংলা বিভাগ জুবেরি হাউসে স্থানান্তরিত হলো। একদিন আমাদের অনার্স প্রথম বর্ষের ক্লাসের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় স্যার দেখলেন ক্লাসে শিক্ষক নেই। তিনি ক্লাসে ঢুকলেন। আমাদের জন্য সে এক দুর্লভ সৌভাগ্য। প্রথমে আমাদের পরিচয় জানলেন। তারপর খোঁজ-খবর নিলেন কেমন পড়াশোনা হচ্ছে, কে কী পড়াচ্ছেন। এক পর্যায়ে জানতে চাইলেন রবীন্দ্রনাথের কোন্ কাব্য আমাদের পাঠ্য। জবাবে আমরা ‘চিত্রা’ কাব্যের কথা বললাম। তিনি জানতে চাইলেন আমাদের কার কাছে কোন কবিতাটি (চিত্রা কাব্যের) সবচেয়ে ভালো লেগেছে। উত্তরে আমি ‘অন্তর্যামী’ কবিতার কথা বলেছিলাম। কেন ভালো লাগে তার জবাবে আমি সেদিন কী বলেছিলাম তা ঠিক মনে নেই এবং মনে থাকলে হয়তো আজ লজ্জায় মরে যেতাম। কিন্তু তবু স্যার খুব খুশি হয়েছিলেন। সেই থেকে তাঁর বিশেষ স্নেহের মধ্যে ধরা পড়ি এবং শেষ পর্যন্ত আমার প্রতি তাঁর সে স্নেহ বন্ধন কখনো শিথিল হয় নি।

বাংলা বিভাগের সে সময়ের ছাত্র-ছাত্রীদের একটি বড় সঞ্চয় এ বিভাগের বার্ষিক বনভোজনের স্মৃতি। এতো বড় পিকনিক সে কালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আর ছিলনা। বাংলা বিভাগের সব ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষক-কর্মচারীর জন্য এ পিকনিকে যাওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। আর্থিক বা অন্য কোনো অসুবিধার কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের কেউ পিকনিকে না যেতে চাইলে স্যার নিজে সেই সমস্যার সমাধান করে তাকে পিকনিকে নিয়ে যেতেন। কারণ কেউ আনন্দ থেকে বঞ্চিত হোক তা তিনি চাইতেন না। শুধু তাই নয়, বনভোজনের অনেক কাজে তিনি নিজে অংশ গ্রহণ করতেন। পিকনিকের আগের রাতে তাঁর বাসায় খাসি জবাই করে মাংস তৈরির সময় তিনি নিজে উপস্থিত থেকে দেখাশোনা করতেন, পরামর্শ দিতেন। খাবার সময় নিজে তদারকি করে খাওয়াতেন, নিজে হাতে পরিবেশন করতেন।

বাংলা বিভাগের বনভোজনের একটা বিশেষ আনন্দ ছিল এর সরস সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতি বনভোজনেই খাওয়া-দাওয়ার পর কোথাও ঘাসের উপরে অথবা গাছের নিচে গোল হয়ে বসে একটি সরস অনুষ্ঠান করা হতো। এখানে শিক্ষক এবং ছাত্র-ছাত্রীরা স্বরচিত কবিতা, গান এবং অন্যান্য বিষয় পরিবেশন করতেন। এর একটি মজা ছিল খুব পরিচিত জনপ্রিয় কবিতা ও গানের প্যারোডি। মনে আছে, একবার এ রকম অনুষ্ঠানে মাস্টার্সের বড় ভাই আমজাদ সাহেবের লেখা জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত কবিতা ‘বনলতা সেন’- এর প্যারোডি সবাইকে অসম্ভব আনন্দ দিয়েছিল। একটি লাইন এখনো মনে আছে- “পচা ডিমে খোসার মতো চোখ তুলে শুধালেন মতিহারের গোল আলু সেন।” শিতলাইয়ের পিকনিকে স্যার পাঠ করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা “শিলাইদহে সন্ধ্যা।” তিনি নিজে অংশ নিতেন এবং ছাত্র-ছাত্রীদের অংশ গ্রহণ করার জন্যে উৎসাহিত করতেন। আমার জীবনে এই প্রথম বনভোজন, যেখানে দেখলাম খাওয়া দাওয়া এবং অন্যান্য আনন্দের সাথে যুক্ত ছিল সুন্দর একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

দ্বিতীয় পিকনিক অনুষ্ঠিত হয় নাটোরের দিঘাপতিয়া রাজবাড়ির (বর্তমান উত্তরা গণভবন) সম্মুখের আমবাগানের পুকুর পাড়ে। তৃতীয় পিকনিক হয়েছিল বানেশ্বরের সরদামুখী রাস্তার পুব পাশের বিশাল আমবাগানে। এই বনভোজনের একটি অনন্য দিক ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য শ্রদ্ধেয় প্রফেসর শামসুল হক (পরবর্তীকালে দুইবার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী) সাহেবের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিতি। বনভোজনের ইতিহাসে তখনকার দিনে এটি একটি বিরল ঘটনা। বলাবাহুল্য, এসবই সম্ভব হয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মযহারুল ইসলামের ব্যক্তিত্বের গ্রহণ যোগ্যতার কারণে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার চতুর্থ এবং শেষ পিকনিক হয় রাজশাহী জেলার আড়ানি রেলস্টেশনের অদূরে বড়াল নদীর পশ্চিম তীরে। এই পিকনিকের সাথে স্মৃতি জড়িয়ে আছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শহীদ ড. শামসুজ্জোহার। তিনি আমাদের পিকনিকের গেস্ট হিসেবে সস্ত্রীক উপস্থিত ছিলেন। এখানকার অনুষ্ঠানে আমাদের শ্রদ্ধেয় স্যার প্রফেসর আবদুল খালেক চীনা ভাষায় গান গেয়েছিলেন। এ পিকনিকের আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা আছে। আমরা গিয়েছিলাম ট্রেনে। ট্রেন যাবার সময় আমাদের ওইখানে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল এবং আসার সময় সেখান থেকে তুলে নিবে সে রকম ব্যবস্থা করা ছিল। সন্ধ্যার পর যখন ট্রেন এসে থামল তখন অন্ধকারে রেল লাইনের বিশাল উঁচু পাড় বেয়ে উপরে উঠে ট্রেনে চড়া বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল- বিশেষকরে মেয়েদের জন্য। ট্রেন অল্প সময় থামল। তাই তাড়াহুড়ো করে যে যেখানে পারল উঠে পড়ল। কে কোথায় উঠল এবং সবাই উঠল কিনা তা নিশ্চিত হওয়া গেল না। আমি স্যারের গাড়িতেই ছিলাম। স্যারের স্ত্রী খুব উৎকণ্ঠিত হয়ে বিচলিত কণ্ঠে বললেন ‘আমার আর একটি মেয়ে পাচ্ছিনা। একটু দেখো।’ উত্তরে স্যার খুব দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি এক মেয়ের জন্য অস্থির হচ্ছো, আমার অনেক মেয়ে, আমি তাদের কথা ভাবছি।’ স্যারের সেই মুহূর্তের একথা আমি কখনো ভুলতে পারি না। এ যেন ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এর চিত্রাঙ্গদার অভিযোগের জবাবে পিতা রাবণের উক্তির মতো- ‘এক পুত্রশোকে তুমি আকুলা ললনে,/ শত পুত্র শোকে বুক আমার ফাটিছে দিবানিশি।’

শুধু বনভোজন নয়, নানা আনন্দ উৎসব অনুষ্ঠানে বাংলা বিভাগ ছিল তখন সতত প্রাণময়। রবীন্দ্র-নজরুল জন্ম-মৃত্যু বার্ষিকী, বসন্ত উৎসব, শীত উৎসব- নানা অনুষ্ঠান প্রায়ই হতো। এছাড়া ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বা অন্য কোনো বরেণ্য অতিথি বাংলা বিভাগে আসলে তাঁদের সম্মানে প্রায়ই অনুষ্ঠান হতো। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর আশি বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘অশিতি বর্ষ পূর্তি সংবর্ধনা’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। স্যারের সভাপতিত্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন জিন্নাহ্ হল (বর্তমানে শেরে বাংলা হল) মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠান হয়েছিল। এ অনুষ্ঠানেই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র নিজের মুখে তাঁর জীবন শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব অনুষ্ঠান যথেষ্ট সুশৃঙ্খল সুন্দর ছিল। কখনো কোথাও কোন অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা হতে দেখি নি। বলা নি®প্রয়োজন, তখনকার শিক্ষকদের- বিশেষ করে, হেড স্যারের সুদক্ষ প্রশাসনিক বিচক্ষণতার ফলেই এটা সম্ভব হয়েছিল।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে এখনো এই প্রাণ এবং শৃঙ্খলা আছে কিনা জানিনে। আমরা আশা করবো, তখনকার স্যারদের সৃষ্ট সেই ঐতিহ্য অক্ষুন্ন অম্লান থাক।

বাংলা বিভাগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল অবাধ। বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরা যোগ্যতানুসারে যাতে বৃত্তি বা অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয় সে বিষয়ে স্যার অত্যন্ত সজাগ ছিলেন। পাস করে-যাওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের চাকরির প্রয়োজনে চিঠি লিখে দেওয়া বা অন্য যে-কোনো রকম সুপারিশের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত উদার এবং আন্তরিক।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র মৃত্যু সংবাদ বেতারে প্রচারিত হয়েছে। সেদিন আমি গেছি স্যারের সঙ্গে দেখা করতে। আমার যাওয়ার কথা শুনে তিনি হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে আসলেন। বললেন, ‘মালিথা, শুনেছো কী সর্বনাশ হয়েছে! ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ মারা গেছেন। এখনই তাঁর উপর একটা লেখা নিয়ে আমাকে রাজশাহী বেতার কেন্দ্রে যেতে হবে। বুঝতেই পারছো মনের অবস্থা। পরে এক সময় এসো।’ খুব আবেগ জড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলতে বলতে তিনি আমার পিঠে হাত বুলিয়ে ছিলেন। ওই মুহূর্তে তিনি আমার সাথে দেখা নাও করতে পারতেন এবং তাতে আমার মনে করার কিছুই ছিল না। তবু তিনি আমাকে ফিরিয়ে দেন নি। কখনোই কোনো ছাত্র-ছাত্রী দেখা করতে এসে তাঁর স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয় নি।

আর একদিন স্যারের ঢাকার বাসায় গেছি। স্যার আসলে দেখলাম তাঁর গলা দিয়ে একদম কথা বের হচ্ছে না। কথা বলা ডাক্তারের নিষেধ। আমি স্যারকে কথা বলতে না করলাম। তিনি অতি কষ্টে অস্ফুট কণ্ঠে বললেন- ‘তোমরা দেখা করতে এসে ফিরে যাবে, তা কি হয়।’ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি তাঁর এই স্নেহ-মমত্বের দ্বার অবারিত ছিল। এ কথা শুধু আমি নই, তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই বলবেন। আর যদি কেউ তা না বলতে পারেন তাহলে সেটি সে ছাত্রের নিদারুণ দুর্ভাগ্য। শুধু ছাত্র-ছাত্রী নয়, বাংলা বিভাগের কর্মচারীদের মুখে প্রায়ই শুনেছি স্যারের স্নেহ এবং ভালোবাসার কথা। আবার ড. শহীদুল্লাহ্, ড. এনামুল হক প্রমুখ শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি বাংলা বিভাগে আসলে তিনি কী যে সম্মান এবং যতœ করতেন তাঁদের!

স্নেহ ভালোবাসায় তিনি যেমন ছিলেন উদার, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং শাসনের ক্ষেত্রে তেমনি ছিলেন অনমনীয় কঠোর। এম.এ শেষ পর্বে টিউটোরিয়ালে আমি তাঁর গ্রুপে ছিলাম। ‘বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষা-শিল্প’ শিরোনামে একটি টিউটোরিয়াল দিয়েছিলেন বাড়ি থেকে লিখে আনার জন্য। নির্দিষ্ট দিনে আমি টিউটোরিয়ালটি জমা দিতে পারি নি। স্যার আমার উপর এতো রেগে গিয়েছিলেন যে, তা আমি বুঝাতে পারবো না। টিউটোরিয়ালের রেকর্ড খাতায় আমার নামের পাশে একটি শূন্য দিলেন। তাতেও তাঁর রাগ নিবৃত হলো না, তিনি শূন্যের পাশে বেশ বড় করে Zero কথাটি লিখে দিলেন। আমি কখনোই আর ওই টিউটোরিয়ালের কথা তাঁকে বলতে পারিনি। ছাত্র-ছাত্রীদের ভালো-মন্দ এবং স্নেহ-শাসনের প্রশ্নে তিনি এতোটাই নিরপেক্ষ ছিলেন।

আমি অনার্স পাশ করার পরও বঙ্কিমচন্দ্রকে বুঝতে পারি নি। সমালোচকরা এবং শিক্ষকরা যে রকম বলেন আমার কাছে সে রকম মনে হয় না। এরপর এম.এ শেষ পর্বে ড. ইসলাম আমাদের বঙ্কিমচন্দ্র পড়ালেন। মাত্র কয়েকটি ক্লাস নিতেই আমি অনুভব করলাম বঙ্কিমচন্দ্র কতো বড় শিল্পী। স্যারের ক্লাসে পড়ানো এবং কোনো কিছু আলোচনার যে দিকটি আমার কাছে সবচেয়ে বড় মনে হয়েছে সেটি হচ্ছে- খুব কঠিন বিষয়কে খুব সহজ করে মিষ্টি করে বলতে পারতেন তিনি। এমন করে বলতেন যেন তা খুব সহজেই শিক্ষার্থীর কানের ভিতর দিয়ে মরমে পৌঁছে যেত। তাঁর ইংরেজি বক্তৃতার ক্ষেত্রেও এ কথা সমানভাবে সত্য। শিক্ষকের জন্য এর চেয়ে বড় সার্থকতা এবং সাফল্য আর নেই।

বাংলা ভাষা-সাহিত্য এবং সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ছিল অবিচল নিষ্ঠা। ইসলামের ধোয়া তুলে পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালি-চেতনা প্রবাহকে রোধ করতে চাইলে যাঁরা সাহসের সাথে প্রতিরোধে সচেষ্ট হয়েছিলেন প্রফেসর মযহারুল ইসলাম তাঁদের একজন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে আমতলায় একটি ছোট শহীদ মিনার ছিল। একবার একুশে ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠানে সেই শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে তিনি অকম্পিত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে ঈদের মতোই একুশে ফেব্রুয়ারি পবিত্র দিন।’ এ কথার কার কাছে কী অর্থ হবে আমি জানি না, তবে আইয়ুব খানের দুর্দ- শাসনামলে সেদিন প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে এ রকম কথা বলার খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। ওই বছরই স্যারের লেখা বিখ্যাত ‘অগ্নিবলয়ের প্রান্তে’ কবিতায় একুশে ফেব্রুয়ারিকে তিনি এক প্রকা- অগ্নিবলয়ের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন যে, সেখান থেকে উত্তাপ সংগ্রহ করে আমরা সারা বছর বেঁচে থাকি-
“এই অগ্নিবলয়ের প্রান্তে
সরব হয়েছে অগণিত মানুষের দল
ঝড়ে ঝাপটায় ছিন্ন বিচ্ছিন্ন তরী
ভিড়েছে এই আলোর উপান্তে
যেখান থেকে ইতিহাসের যাত্রারম্ভ
যেখান থেকে সব মিছিলের
নব দিগন্তে পদ-সঞ্চার।”
(বিচ্ছিন্ন প্রতিলিপি)

আবার এদেশে রবীন্দ্র-চর্চা নিষিদ্ধ করার পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন। ভাইভা বোর্ডে বসেও এ প্রসঙ্গে কথা উঠলে ড. শহীদুল্লাহ্কে উদ্দেশ্য করে বলতে শুনেছি- ‘স্যার, আপনাকে আরো জোর দিয়ে বলতে হবে- রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আমাদের চলবে না, চলতে পারে না।’ তিনি উপাচার্য থাকা কালেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্র-কলাভবন, শহীদুল্লাহ্ কলা ভবন ইত্যাদি নামকরণ করেছেন। বাঙালি চেতনাকে সংগঠিত করার কাজে সবসময়ই সতেজ ছিলেন তিনি।

প্রফেসর মযহারুল ইসলাম ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি এবং ধর্মান্ধতা পছন্দ করতেন না। মানবতা এবং মানব কল্যাণ বোধের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল গভীর। দেশ, জাতি, দেশের মানুষ এবং দেশের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসাকেও তিনি ধর্ম বলে মনে করতেন। অসাম্প্রদায়িক উদার মানবিক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। ধর্মহীনতার চেয়ে ধর্মান্ধতাকে বেশি ঘৃণা করতেন।

স্যার শাহজাদপুরে নির্বাচন করতে এলেন। তাঁকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, কেন তিনি নির্বাচন করবেন। কোন্ মন্ত্রী-এম.পি তাঁর চেয়ে বড়। উত্তরে তিনি বললেন, ‘মানুষ তো চিরদিন বাঁচে না। আমি শাহজাদপুরের জন্য কিছু কাজ করতে চাই। এ মাটির কাছে আমার অনেক ঋণ।’ আমি আর কিছু বলি নি।

প্রথমবার নির্বাচনে স্যার হেরে গেলেন। আমি তাঁর চরনবীপুরের বাড়িতে গিয়ে স্যারকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিলাম। স্যার আমাকে সান্ত¡না দিয়ে বললেন, ‘কাঁদো কেন? এটাই তো গণতন্ত্র। জনগণের রায় সহজভাবে মেনে নেওয়ার মতো শক্তি থাকতে হবে।’

গ্রামের জীবন ও প্রকৃতির প্রতি নিবিড় ভালোবাসাই তাঁকে লোকসাহিত্য, লোকসংস্কৃতি তথা ফোকলোর চর্চায় করেছে নিবেদিত প্রাণ। এই ভালোবাসা আমৃত্যু টেনেছে তাঁকে। তাইতো নাগরিক সমাজ যখন তাঁকে যশ-খ্যাতি প্রতিপত্তির শীর্ষে স্থান দিয়েছে, তখনো তাঁর নিজ গ্রামের কথা, শৈশবের ঈদের আনন্দের কথা ভোলেন নি। ঈদের দিনে গ্রামের মানুষের গরুকে গোছল করানো, সেজেগুঁজে ঈদগাহে যাওয়া, নামাজ শেষে সবাই মিলে শিরনি খাওয়া এবং রাত্রে তাঁর নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় গানের আসর সমস্ত কিছুর আনন্দ-স্মৃতি তাঁকে সারা জীবন উদ্বেল করেছে। মৃত্যুর মাত্র একবছর আগে ‘গানে গানে ঈদ’ শীর্ষক লেখায় সে আনন্দ-চিত্রের কি অন্তরঙ্গ বর্ণনা দিয়েছেন তিনি! গ্রামের এই জীবন-ধারা তাঁর হৃদয়ের প্রান্তরে জীবনভর বহমান ছিল। তাঁর ‘চল ফিরে যাই’ কবিতায় কী অপূর্ব আবেগে শ্রদ্ধায় বর্ণিত হয়েছে গ্রামে ফিরে যাবার ব্যাকুলতা। শহরের নি®প্রাণ দেঁতো হাসিতে তিনি হাঁপিয়ে উঠেছেন। এখানে শুধু ওষ্ঠের ভাষা, হৃদয় কথা বলেনা এখানে। তাই তিনি ব্যাকুল হয়েছেন গ্রামে ফিরে যেতে।-
“ফুল ফোটে, ফুল ঝরে, মায়ের কোলের মতো ঠাঁই-
সেখানে ফিরে যাই, চল ফিরে যাই। …
যেখানে পাতার ছায়ে সোনার স্বপন মাখা গ্রাম
শিশির কণিকা দিয়ে ঘাসে ঘাসে লেখা মোর নাম, …
সেই তো আমার গ্রাম, মধুমাখা মধুমতী নদীটির তীরে
চল যাই চল যাই ফিরে।”

এই গ্রামে আসার ডাক স্যারের শেষ জীবনে ক্রমশ দুর্বার হয়ে উঠে। এ জন্য তিনি গ্রামের মানুষের কাছে এসে তাদের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আমরা হতভাগ্য, তাই তাঁর সে ভালোবাসার হাত আমরা ধরতে পারি নি। দেশ বিদেশের নানা ডাক, নানা প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে তিনি চলে এসেছেন শাহজাদপুর শক্তিপুরের বাড়িতে। এখানে এসে তিনি অনেকটা নিভৃতে থাকতেই ভালোবাসতেন। স্যারের আসার সংবাদ পেলেই আমি তাঁর কাছে এসেছি। তার চিরাচরিত মধুর সম্ভাষণে আমাকে কাছে বসাতেন।

একদিন সন্ধ্যার একটু আগে আমি তাঁর কাছে এলাম। তখন গরমের দিন। কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। আকাশে চাঁদ উঠল। স্যার বললেন, ‘মালিথা, চলো পুকুর পাড়ে গিয়ে বসি। খুব ভাল লাগবে।’ পুকুর পাড়ে গিয়ে সিঁড়ির উপর দক্ষিণ দিকে মুখ দিয়ে বসলাম আমরা দুজনে। আর কেউ নেই। আমাদের গুরু শিষ্যের একান্ত কথা শোনার জন্য মাথার উপর আড়ি পেতে রইল চাঁদ। নানা কথার এক পর্যায়ে স্যার বললেন, ‘এই চাঁদের আলো আর এই বাতাস কোথায় পাবে তুমি।’ আস্তে আস্তে রাত বাড়তে লাগল। পুকুর ঘাট থেকে উঠে স্যার ঘরে গেলেন। আমি চলে এলাম। এ মাটির প্রতি মমতা-জড়ানো তাঁর সে উচ্চারণ আজও আমার কানে বাজে। তাঁর ভালোবাসার সেই চাঁদ- সেই বাতাস সবার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে তাঁকে হৃদয়ের মধ্যে রেখে দিলো অনন্তকালের জন্য।

নদী যেমন পাহাড়, পর্বত, উপত্যকা, সমতল, ফসলের মাঠ আর বহু বিচিত্র জনপদ পেরিয়ে সাগরে এসে শান্ত হয়, তেমনি স্যারও বিরাট বৈচিত্র্যময় জীবন-পরিক্রমা শেষে তাঁর আজন্ম ভালোবাসার শাহজাদপুরে এসে চিরশান্তিতে ঘুমিয়ে রইলেন। ‘মায়ের কোলের মত।’ -তাঁর এই ঠাঁই থেকে আর কেউ কোনোদিন তাঁকে কোলাহলের মধ্যে নিয়ে যেতে পারবে না।

শুধু শহরে যাঁদের জন্ম এবং বেড়ে উঠা তাঁদের অনেকে বিদ্যা-বুদ্ধি ও জ্ঞান-গরিমায় বড় হয়েছেন। কিন্তু তাঁদের জীবন অভিজ্ঞতায় অবশ্যই কোথাও ফাঁক থেকে যায়। কোলকাতার জোড়াসাঁকোর রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জ, মাঠ-প্রান্তর, নদ-নদী, বৃক্ষ-লতা এবং জীবন জনপদের ঐশ্বর্যের মধ্যে এসেই ষোলকলায় পূর্ণ হয়েছেন। প্রফেসর মযহারুল ইসলামের জীবন-বোধের বিস্তারও এই একই সত্যে বাঁধা। তিনি একই সাথে নিজের মধ্যে গ্রাম ও শহরের, দেশ ও বিদেশের জীবন এবং প্রকৃতিকে সমানভাবে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। আর সে কারণেই তাঁর জীবনবোধ এবং চেতনা এতো বিশাল, জীবনগন্ধী এবং হৃদয়স্পর্শী। যাঁরা তাঁর কাছে থেকে- তাঁর ভালোবাসার মধ্য থেকে তাঁকে জানার সুযোগ পেয়েছেন তাঁরা অবশ্যই এ সত্য উপলব্ধি করেছেন।

ঢাকা জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক ফোকলোর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আরিচা মহাসড়কে (তখন যমুনা সেতু হয় নি) যানজটের কারণে আমি অনুষ্ঠানে যথা সময়ে পৌঁছাতে পারি নি। আমার মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগেই সেখানে এসেছিল। আমি গেলে মেয়ে জানালো স্যার আমাকে খুঁজেছেন। ঠিক তখনি সুপ্রসন্নমুখে স্যার আমার কাছে এসে বললেন, ‘তোমার কন্যাকে তোমার কথা জিজ্ঞেস করলাম। দেরী করলে কেন?’ তিনি আরও বললেন, ‘তুমি থাকলে আমার ভালো লাগে।’ আরও বহুদিন হয়তো বাংলাদেশ ফোকলোর সোসাইটির বড় বড় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু স্যারের সেই সস্নেহ দুটি চোখ আমাকে আর কখনো খুঁজবেনা, আমার না থাকার কথা আর কেউ কখনো অমন ব্যাকুল কণ্ঠে কাউকে জিজ্ঞাসা করবে না। এ শূন্যতা আমরণ রিক্ত করে রাখবে আমাকে।

লেখক: নাসিম উদ্দিন মালিথা, সাবেক অধ্যাপক, শাহজাদপুর সরকারি কলেজ, সিরাজগঞ্জ।


নিউজটি অন্যকে শেয়ার করুন...

আর্কাইভ

business add here
© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com