বুধবার, ১৭ Jul ২০১৯, ০২:৫০ অপরাহ্ন

আমার বাবা আহমদ আলী | প্রফেসর ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল

আমার বাবা আহমদ আলী | প্রফেসর ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল

প্রকৃতপক্ষে বাল্যে বাবার সঙ্গে আমার তেমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে নি। এটা বুঝতে পারি ৪/৫ বছর বয়সে আমি যখন টাইফয়েডে আক্রান্ত হই। গ্রামের লোকের কাছে রোগটি কালাজ্বর নামেই অধিক পরিচিত ছিলো। এ রোগ হলে অনেকেই মারা যেতো। কেউ কেউ বেঁচে থাকলেও কোনো না কোনো অঙ্গহানী ঘটতোই।

আমার সে দিনের চেহারার কথা ভালোভাবেই মনে পরে। পেটটা অসাধারণ বড়। হাত-পা শুকনো। আমার মাথাটা বাল্যকাল থেকেই আকৃতিতে অনেকটাই বড় ছিলো। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র ‘ভবিষ্যতের মানুষ’ এর মতোই আমার সে দিনের চেহারা। আমি পরতাম খাকি কাপড়ের একটা হাফপ্যান্ট। ফিতেয় বাঁধা কোমর। আমার এক ভাবী আমাকে দেখে বিদ্রুপ করে বলতো গোবিন্দ দফাদার হয়েছে জুলমাত।

সে সময় আমার নাম জলিল ছিলো না। এ নামটা রেখেছিলেন আমার প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক আশরাফ আলী সাহেব। তাঁর জ্ঞান ও পা-িত্যের প্রতি আমার সীমাহীন শ্রদ্ধা। পাঠশালার দরজা অতিক্রম করার পর আর কোনো দিন তাঁর সঙ্গে দেখা হয় নি। সে আজ থেকে ৬০ বছর আগের কথা। সম্প্রতি তিনি প্রয়াত হয়েছেন।

বাবা আমাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতেন আমার গ্রাম হলদিঘর থেকে তিন মাইল পশ্চিমে ভাটবেড়া গ্রামে। ডাক্তার বাবুর নাম ছিলো লোহা ঘোষ। নাদুস-নুদুস চেহারা। গোয়াল ভর্তি গরু। গাভীর সংখ্যাই অধিক। ডাক্তার বাবুর জন্য সকাল বেলা তাঁর এক গৃহকর্মী একবাটি দুধের সর এনে খেতে দিতেন। ডাক্তার বাবু চামচ দিয়ে রসিয়ে রসিয়ে দীর্ঘসময় যাবৎ সরগুলো খেতেন। রোগীরা সবাই অধিক আগ্রহে ডাক্তার বাবুর ভোজনপিয়াসী দৃশ্য দেখতেন। আমি কিন্তু কখনো ডাক্তার বাবুর প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে পারি নি। এটা শিষ্টাচার বিরোধী কাজ। বয়স কম হলেও এই বোধটি তখনই আমার প্রখর ছিলো।

বাবা আমাকে দীর্ঘপথ বহন করে আনতেন কাঁধে করে। একবার বা-কাঁধ আরেকবার ডান-কাঁধ। বয়স কম হলেও ওজনটা নেহায়েত নগণ্য ছিলো না। বাবা আমাকে ডাক্তারের ঘরে রোগীর সারিতে বসিয়ে দিয়ে বাইরে চলে যেতেন। দীর্ঘপথ একাকি আসলেও বাবা কখনো আমার ভালোলাগা মন্দলাগা সম্পর্কে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করতেন না। বাবার এই নিরাসক্ত ভাব দেখে আমার সবসময়ই মনে হয়েছে তিনি আমার সুস্থতা কামনা করেন নি। চিকিৎসকের কাছে নিতে হয় তাই নিয়েছেন। বলতে কি বাবার এহেন অনাদরে আমার প্রতি যমের উপেক্ষা ঘটে। সম্ভবত এ কারণে যম আমার কাছে এখনো দেখা করে নি।

নিজের পিতা সম্পর্কে এ ধরনের মূল্যায়নে অনেক পাঠকের মনেই বিস্ময়ের উদ্রেক ঘটতে পারে। সত্যি কথা বলতে কি আমার পিতা স্নেহ-ভালোবাসার মতো ভাবাবেগে কখনোই ততটা উদ্রিক্ত হতেন না। এর পশ্চাতে রয়েছে তাঁর বাল্যকালের সীমাহীন দুঃখবোধ, অনাদর-উপেক্ষার চরম অভিজ্ঞতা।

বাবার বয়স যখন ৬/৭ বছর তিনি তখন পিতৃহীন হন। অতঃপর অল্পবয়সী মাতার অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। এদিক থেকে তিনি পিতা-মাতা উভয়েরই স্নেহ-বঞ্চিত হন। তাঁর আশ্রয় ঘটে মামার বাড়ি চকহরিপুর গ্রামে। বাবার এক মামার নাম ছিলো বেলায়েত আলী অন্যজনের নাম কোরবান আলী। তাঁরা ভীষণ অমায়িক ব্যক্তি ছিলেন। বাল্যকালে আমি প্রায়শই যেতাম তাদের বাড়িতে। তাঁদের আদর আপ্যায়নের কোনো সীমা ছিলো না। বাবা তাঁর মামাদের আশ্রয়ে ছিলেন ১২/১৩ বছর। আমার দাদারা বলতেন তোর বাবা ভীষণ ডানপিটে ছিলো। না যেতো স্কুলে না যেতো মাঠের কাজে। দুষ্টুমি করেই সারাটা দিন কাটিয়ে দিতো।

বাবা স্বগ্রামে ফিরে আসেন বৈবাহিকসূত্রে। আমার নানা হাফেজ প্রামাণিক ছিলেন অসাধারণ এক গুণী ব্যক্তি। তিনি ছিলেন শিক্ষানুরাগী। তাঁর বাড়িতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়। তিনি ছিলেন দুই পুত্র তিন কন্যার জনক। তাঁর পুত্রদের বয়স যখন ১০/১২ বছর সেই সময় কলেরা আক্রান্ত হয়ে দুই পুত্র এবং এক কন্যা সাত দিনের মধ্যে মারা যান। একে একে সবাই যখন মারা যাচ্ছে সেই দুঃসময়ে আমার প্রতিবেশী এক আত্মীয় মাকে তাঁর কাছে টেনে নেন। আমার মায়ের বড় বোন ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও মৃত ভাই-বোনদের দেখার জন্য আসতে পারেন নি। তাঁর শ্বশুর পরিবারের সবাই তাঁকে আসতে বারণ করেন।

দুর্ভাগ্য যার ললাট লিখন তাঁর দুঃখ খ-াবে কে? ধীরে ধীরে আমার মায়ের বয়স যখন ১২/১৩ বছর তখনই বিয়ে হলো এই অনাথ বালকের সঙ্গে। আমার বাবা আহমদ আলী, মা জেলেমুন নেছা। যাঁদের নিয়ে আমি গর্ববোধ করে থাকি।

আমার নানার যেমন অনেক সম্পত্তি ছিলো ততোধিক সম্পতি ছিল আমার দাদার। একই গ্রামে দাদা-নানার বাড়ি, একই মাঠে সম্পত্তি। যে বাবা সারাদিন তাঁর মামার বাড়িতে দুষ্টুমি করে কাটিয়েছেন, বিয়ের পর সহসাই তাঁর যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে। বাবা হলেন একজন নিষ্ঠাবান কৃষক। তাঁর মতো পরিশ্রমী মানুষ আমাদের গ্রামে অন্য আর কেউ ছিলো না বলে সবার ধারণা।

আমাদের গ্রামের পরিবেশটি ছিলো অপূর্ব। পূর্বপ্রান্তে ছোট্ট নদী ফুলছরি। নদীর অপরপাড়ে গারাদহ গ্রামের হিন্দুপাড়া, গ্রাম্য বাজার। হিন্দুপাড়ায় ছিলো কামার, কুমোর, ছুতার, ধোপা, নাপিত, ডোম, বাগদি, ব্রাহ্মণ, পুরোহিত। গ্রামটি ছিলো জমিদার প্রধান। যে কারণে ১২ মাসে ১৩ পার্বণ লেগেই থাকতো। এছাড়া জারি, সারি, ধুয়া, পালাগান ছিলো মুসলিম সমাজের চিত্তবিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। বাবা দক্ষ কৃষক ছিলেন স্বভাবে ছিলেন অতি সৌখিন। তিনি আসরে দাড়িয়ে জারি সারি গানের পাল্লা দিয়েছেন। নৌকা বাইচের সময় নৌকার মাঝি হয়ে নেচেছেন-গেয়েছেন। আমাদের এলাকায় লালন শাহের তেমন জনপ্রিয়তা ছিলো না কিন্তু অতি জনপ্রিয় ছিলেন পাগলা কানাই। অনেকবার এই চারণকবি আমাদের এলাকায় গানের প্রতিযোগিতার জন্য এসেছেন, তৈরি করেছিলেন অসংখ্য অনুরাগী ভক্ত। আমার এক দাদার নাম ছিলো সের আলী ফকির। তাঁর কণ্ঠে আমি পাগলা কানাইয়ের অসংখ্য গান শুনেছি। আমার বাবাকেও সময় সময় পাগলা কানাইয়ের গান পরিবেশন করতে দেখেছি। লোকসংস্কৃতির প্রতি আমার দুর্বার আকর্ষণের মূল প্রেরণা আমার সংস্কৃতিপাগল পিতা আহমদ আলী। পরিণত বয়সে তিনি যতোবার আমার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বাড়িতে এসেছেন দেখেছি তিনি একা একাই পাগলা কানাইয়ের গান গেয়ে চলেছেন।

একবার তাঁর অসুস্থতার কথা শুনে বাড়িতে গিয়েছি। বাবার বিছানার পাশে বসে আছি। বাবা হঠাৎ একটি গান গেয়ে উঠলেন, যে গানের মূল বক্তব্য ছিলোÑ শাহজাদপুরের জমিদার ঠাকুর বাবুর কথা। এই ঠাকুর বাবু হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যে গানটি আমার বাবার মুখে শুনেছিলাম তা যদি রেকর্ড করে রাখতে পারতাম তাহলে জমিদার রবীন্দ্রনাথের একটি ভিন্ন পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হতো। আমি ছাত্রজীবন থেকে নাটক করেছি যাত্রা করেছি। বাবা কোনোদিন এই কাজে আমাকে বাধা প্রদান করেন নি। বরং আমি যখন যাত্রা শোনার জন্য কোথাও গিয়েছি বাবা আমার হাতে টিকিট কেনার জন্য টাকা ধরিয়ে দিয়েছেন।

বাবা ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়বান ব্যক্তি। তিনি তাঁর জীবনের একটি ঘটনার কথা আমার কাছে ব্যক্ত করেছিলেন। ঘটনাটি ছিলো- “তিনি একবার গ্রাম্য সালিশের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। আর সেই সালিশে পক্ষপাতিত্ব করে ৫ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করেছিলেন। সকাল বেলা দেখতে পেলেন তাঁর পালের বড় গরুটি মরে পরে আছে। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন জীবনে আর কোনো দিন উৎকোচ গ্রহণ করবেন না। ৮৬ বছর বয়সে তিনি যখন মারাযান তখন পর্যন্ত তাঁর এই সিদ্ধান্তে কোনো ব্যত্যয় ঘটে নি।

বাবা ছিলেন ধার্মিক ব্যক্তি। নিয়মিত নামাজ পড়তেন রোজা রাখতেন। জীবনে কখনো রোজা ভেঙেছেন এমন দৃশ্য আমার চোখে পড়ে নি। ১৯৭৮ সালে বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি হজ্ব করতে যাবেন। এ জন্য তিনি আমার কাছে হাত পাতলেন না। বাইশ শতাংশ জমি বাইশত টাকায় বিক্রি করে হজ্বে গেলেন। তখন সমুদ্র পথে স্বল্পখরচে হজ্বে যাওয়া যেতো। বাবা হজ্ব থেকে ফিরে এসে আর সংসারমুখী হন নি। বছরের প্রায় অধিক সময় তবলীগ জামায়াতের সঙ্গে ঘুরে বেরিয়েছেন। আমার বাবার এই বিস্ময়কর পরিবর্তনকে আমি স্বাগত জানিয়েছি। বাবা সারাজীবন পাইলস রোগে ভুগেছেন। কখনো কখনো মল ত্যাগের সময় শরীর থেকে প্রচুর রক্ত ঝরে যেতো। অনেক সময় শয্যাসায়ী হয়ে পড়তেন। তবুও বাবাকে কখনো অপারেশনে রাজী করাতে পারি নি। মৃত্যুর মাস তিনেক আগে বিছানা থেকে দ্রুত উঠতে গিয়ে মাটিতে পড়ে যান। কোমরে ভীষণ আঘাত লাগে। এটাই তাঁর জীবনে কাল হয়ে দেখা দেয়।

১৯০৫ সালের ৩১ মার্চ রাতে এশার নামাজের পর বাবা শরীরে কাঁপনি অনুভব করেন। মা তাঁকে একটার পরিবর্তে দুইটা লেপে ঢেকে দেয়। ধীরে ধীরে বাবা ঘুমিয়ে পড়েন। এই ঘুমই তাঁকে অনন্ত ঘুমের জগতে নিয়ে যায়। বাবা জীবনের অন্তীম কথা কাউকে বলে যেতে পারেন নি। বাবার এই অকস্মাৎ মৃত্যুর ঘটনা আমি কখনো কল্পনা করতে পারি নি। মৃত্যুর আগে বাবা বার বার আমাকে সংবাদ দিয়েছেন তাঁর সঙ্গে দেখা করবার জন্যে। কিন্তু বাংলা বিভাগের সভাপতির কাজে তখন এতোই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে তাঁর ডাকে সারা সম্ভব দেয়া হয় নি। বাবার শেষ কথাও শোনার সৌভাগ্য আমার জীবনে ঘটে নি। হয়তো আমারও সুযোগ হবে না পুত্রের কাছে শেষ কথা বলে যাওয়া। বাবা চলে গেছেন, একদিন আমাকেও চলে যেতে হবে। এটাই সত্য, এটাই শাশ্বত।

*উপ-উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী।


Please share this post in your social media

আর্কাইভ

© varsitynews24.com
Developed by TipuIT.Com