বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ১১:৫০ পূর্বাহ্ন

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বর্তমান প্রবীণ প্রজন্মের ভূমিকা

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বর্তমান প্রবীণ প্রজন্মের ভূমিকা

Professor Dr. Abdul Khaleque (প্রফেসর ড. আবদুল খালেক)

লেখক: প্রফেসর ড. আবদুল খালেক, সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী।

১লা অক্টোবর দিনটি আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে সমগ্র বিশ্বে সুপরিচিত। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও দিনটি পালিত হবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে প্রবীণদের যে সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, আমাদের দেশে তেমনটি হয়ে ওঠে নি। মোটামোটি ৬০ বছর যাঁদের বয়স, তাদেরকেই সিনিয়র সিটিজেন বা প্রবীণ নাগরিক বলে গণ্য করা হয়ে থাকে। সে হিসেবে ১৯৫৮ সালের দিকে যাঁদের জন্ম হয়েছে, তাঁরা সিনিয়র সিটিজেনের খাতায় নাম লেখাতে পারেন। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু সম্ভবত ৭২ বছরে চলে গেছে। কাজেই আশা করা যায় আমাদের দেশের সিনিয়র সিটিজেনের তালিকা খুব ছোট হবে না।

আমরা যখন সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করতে বসি, তখন বিখ্যাত কবিদের নামে সাহিত্যের যুগবিভাগ করা হয়ে থাকে যেমন রবীন্দ্র যুগ, রবীন্দ্রোত্তর যুগ ইত্যাদি। রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনার ক্ষেত্রেও বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে যুগ বিভাজন করা যেতে পারে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বীক্ষণে মুজিব যুগ বা মুজিবোত্তর যুগ বলে উল্লেখ করলে ইতিহাস বিশ্লেষণ স্পষ্ট রূপ লাভ করবে বলে আমার বিশ্বাস।

শেখ মুজিবের জীবনকাল ১৯২০ থেকে শুরু করে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। মাত্র ৫৫ বছর বয়সে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে প্রতিবিপ্লবী তথা ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে প্রাণ হারাতে হয়েছে। যে সংজ্ঞা অনুযায়ী মানুষকে প্রবীণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, সে বয়স হবার আগেই শেখ মুজিবকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। তবে ইতিহাসের সত্য এই যে, তিনি প্রবীণ হবার আগেই স্বাধীন বাঙালি জাতির পিতা হবার গৌরব লাভ করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি নেতা, সে কথা আজ ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। হাজার বছরের ইতিহাস পাঠে জানা যায়, বাঙালি জাতি অতি পুরাতন জাতি হলেও বাঙালি জাতি কখনো স্বাধীন ছিলো না। অনুরূপভাবে বাংলাদেশ একটি পুরাতন দেশ হলেও বাংলাদেশ কখনো স্বাধীন দেশ বলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে নি। শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বলিষ্ঠ ও প্রজ্ঞাশীল নেতৃত্বের ফলে ১৯৭১ সালে একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বলিষ্ঠ কোন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া কোন দেশ কখনো স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে না। শেখ মুজিব সে কাজটি করতে পেরেছেন বলেই তিনি জাতির পিতা।

বাংলাদেশে আজকে যাঁরা প্রবীণ নাগরিক বলে চিহ্নিত, তাঁরা সবাই মুজিব যুগের মানুষ। পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে ত্রিশ, চল্লিশ এবং পঞ্চাশের দশকে যাঁদের জন্ম, তাঁরাই শেখ মুজিবের ডাকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। নেতা যত বড় মাপেরই হোন না কেন, তাঁর ডাকে দেশের আপামর জনসাধারণ ব্যাপকভাবে সাড়া না দিলে মুক্তিযুদ্ধ সফল করা কোনভাবেই সম্ভব হতো না। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তারিখে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে উল্লেখ করেছিলেন; যার হাতে যা আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশ ১৯৭১ সালে বাংলার মানুষ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। ১৯৭০ সালে দেশে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিব দেশের মানুষকে নৌকায় ভোট দিতে বলেছিলেন। দেশের শতকরা ৯৯% ভাল মানুষ নৌকায় ভোট দিয়ে সমগ্র বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিলেন একমাত্র শেখ মুজিবই পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা। ইতিহাস এ কথাই বলবে ১৯৭০ সালে দেশের সকল মানুষ নৌকায় ভোট না দিলে শেখ মুজিব ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার যোগ্যতা অর্জন করতে পারতেন না। ১৯৭০ সালে নৌকায় ভোট না দিলে দেশে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হতো না। শেখ মুজিবের ডাকে ১৯৭১ সালে যে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়, সেটি ছিল জনযুদ্ধ। উক্ত জনযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। যে কারণে পাকিস্তানের ৯০ হাজার প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী যুদ্ধ পরিত্যাগ করতে অথবা বলা যেতে পারে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সফল নেতৃত্ব দানের জন্য যেমন বলা হয় বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ নেতা, অনুরূপভাবে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৭০ সালে যাঁরা নৌকায় ভোট দিয়েছিলেন ১৯৭১ সালে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ তথা জনযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁদেরকেও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ নাগরিক বলে চিহ্নিত করলে বোধ করি অতিরিক্ত কিছু বলা হবে না। বাংলাদেশে আজকে যাঁদেরকে প্রবীণ নাগরিক বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তাঁরাই সে কৃতিত্বের অধিকারী। শুধুমাত্র সনদধারী কতিপয় মুক্তিযোদ্ধার কারণে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, কথাটি আদৌ সত্য নয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাতকোটি। উক্ত জনসংখ্যার শিশু, কিশোর-কিশোরীদেরকে বাদ দিলে মোটামোটি পাঁচ কোটি বাঙালি মুক্তযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। কথাটির সত্যতা প্রমাণের জন্য মুক্তিযুদ্ধের কিছু নমুনা তুলে ধরা যেতে পারে।

আগেই বলা হয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে জনযুদ্ধ বলে বিবেচিত। সম্মুখ যুদ্ধ অপেক্ষা গেরিলা যুদ্ধ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। পাকিস্তানি প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী সম্মুখ সমরে সাফল্য লাভ করেছিল, কিন্তু গেরিলা যুদ্ধে তারা অসহায় হয়ে পড়েছিল। আমি নিজে মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। উল্লাপাড়া-শাহজাদপুর অঞ্চলের একটি গেরিলা যুদ্ধের উদাহরণ এখানে তুলে ধরা যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধে উল্লাপাড়া- শাহজাদপুর অঞ্চলের নেতৃত্বে ছিলেন লতিফ মির্জা। শ্রাবণ মাসের একটি ঘটনা। বন্যার পানিতে করতোয়া নদী ভরপুর। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লোকজন সাঁতারে অপটু। বন্যার পানিকে তারা ভয় পাচ্ছিল। বাঙালি গেরিলাদেরকে মোকাবিলার জন্য তারা করতোয়া নদীর পশ্চিম পারে কিছু কিছু ঘাঁটি তৈরি করে নিয়েছিল। তাদের একটা ঘাঁটি ছিল আমাদের গ্রামের পশ্চিম দিকে গাঁরাদহ নামক গ্রামের খেয়াঘাটে। গাঁরাদহের খেয়াঘাটে অবস্থিত পাকিস্তানি বাহিনীকে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাগণ যে কৌশলে পরাভূত করে, সে চিত্রটি এখানে তুলে ধরছি।

গাঁরাদহের উজানে করতোয়া নদীর পূর্ব পারে চরতারাবাড়ীয়া খেয়াঘাটের দিকে কতিপয় মুক্তিযোদ্ধা ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিতে থাকে। জয় বাংলা শ্লোগান শুনে গাঁরাদহে অবস্থিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেয়। অপরদিকে চরতারাবাড়ীয়া খেয়াঘাটে অবস্থানরত গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা কালিমাখা কিছু মাটির কলস করতোয়া নদীতে ভাসিয়ে দেয়, কলসগুলো যখন ভাসতে ভাসতে গাঁরাদহ খেয়া ঘাটের দিকে যেতে থাকে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ধারণা জন্মে মুক্তিযোদ্ধারা সাঁতার কেটে নদী পার হয়ে তাদেরকে আক্রমণ করতে আসছে। মুক্তিযোদ্ধা ভেবে ভাসমান মাটির কলসগুলোর ওপর প্রচন্ডভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গুলি চালাতে থাকে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন মুক্তিযোদ্ধা ভেবে মাটির কলসের সাথে যুদ্ধরত, ঠিক সেই সময় কতিপয় মুক্তিযোদ্ধা গাঁরাদহ গ্রাম দিয়ে এসে পেছন দিক থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতি আক্রমণ চালায়। অতর্কিত আক্রমণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। এরকম গেরিলা যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কোন রকম প্রস্তুতি ছিল না, যে কারণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শেষ পর্যন্ত পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কোন শহর কেন্দ্রিক যুদ্ধ ছিল না, যুদ্ধটি ছিল মূলত গ্রাম কেন্দ্রিক। গ্রামের প্রতিটি মানুষ নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত করে ফেলে। গ্রামের মেয়েরাও মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র-শস্ত্র গ্রামের মেয়েরাই নানাভাবে লুকিয়ে রাখে। মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ভাত রান্না করে খাইয়েছে মেয়েরা, রুটি তৈরি করে খাইয়েছে মেয়েরা। কাজেই মুক্তিযুদ্ধে মেয়েদের ভূমিকাকে ছোট করে দেখবার কোন সুযোগ নেই। এমন কি পাকিস্তানি বাহিনী যে আনসার বাহিনীকে ব্রিজ পাহারায় নিয়োজিত রেখেছিল, সুযোগ বুঝে তারাও হাতের অস্ত্র মুক্তিযুদ্ধোদের হাতে তুলে দিয়েছে। কাজেই বলা যেতে পারে কতিপয় রাজাকার-আলবদর ছাড়া বাংলাদেশের শতকরা ৯৫% ভাগ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ। শুধুমাত্র সনদধারী কতিপয় মুক্তিযোদ্ধার কারণে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, এমন ধারণা ঠিক নয়। মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করা বিশেষ জরুরি। ১৯৭০ সালে শতকরা ৯৯% ভাগ মানুষ শেখ মুজিবের নির্দেশ মেনে নৌকায় ভোট দিয়েছিলেন। ১৯৭০ সালে নৌকায় ভোট না দিলে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হতো না, একথা আজ ঐতিহাসিকভাবে সত্য। কাজেই ১৯৭০ সালের নির্বাচনকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখবার কোন সুযোগ নেই। সে বিচারে ১৯৭০ সালে যাঁরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আহ্বানে নৌকায় ভোট দিয়েছিলেন, তাঁরাও মুক্তিযোদ্ধা। ভোটযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ এক সূতোয় গাঁথা পড়ে আছে।

১৯৭০-১৯৭১ সালে যাঁরা ভোট যুদ্ধে এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁদের বয়স এখন ৬৫ থেকে ৮৫ বছরের মধ্যে বিস্তৃত। তাঁরাই এখন মূলত প্রবীণ প্রজন্ম বলে চিহ্নিত হবেন। তাঁরা মুজিব যুগের কৃতি সন্তান, তাঁরা সবাই মুজিব আদর্শের ধারক ও বাহক, তাঁরা সবাই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁদের হাতেই হাজার বছরের পরাধীন বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার মুখ দেখেছে। কাজেই উপসংহারে বলা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যেমন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ নেতা, বঙ্গবন্ধুকে যারা সার্বিকভাবে সহযোগিতা দিয়েছেন, তাঁরা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ নাগরিক। সেই শ্রেষ্ঠ নাগরিকরাই আজকের সিনিয়র সিটিজেন বা প্রবীণ নাগরিক। তাঁরা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন।


নিউজটি অন্যকে শেয়ার করুন...

আর্কাইভ

business add here
© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com