রবিবার, ১৮ অগাস্ট ২০১৯, ০৩:১৫ পূর্বাহ্ন

অধ্যাপিকা রাশেদা খালেক জীবনপঞ্জি (উদ্যোক্তা ও ট্রাস্ট চেয়ারম্যান)

অধ্যাপিকা রাশেদা খালেক জীবনপঞ্জি (উদ্যোক্তা ও ট্রাস্ট চেয়ারম্যান)

Prof. Rasheda Khaleque (অধ্যাপিকা রাশেদা খালেক)

নিজস্ব প্রতিনিধি : স্বচ্ছতোয়া করতোয়া কুলকুল রবে বয়ে চলেছে সগৌরবে ডিগ্রিচর গ্রামের পাশ দিয়ে। পূর্ণ যৌবন নিয়ে। সর্বনাশা নদী ভাঙন শুরু করেছে। কী দাপটের সাথে সব ভেঙে চলেছে। এ পাড়ে উঁচু খাড়া পাড়। ঝকঝকে আকাশ। আকাশ ভরা আলো। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য্যরে মাঝে খাঁড়া পাড়ে ঘাসের বুকে চুপটি করে বসে আছে আট-নয় বছরের সুশ্রী ফুটফুটে একটি মেয়ে। নাম তার বেগম। বেগম দেখে ঢেউ তুলে নদীর বয়ে যাওয়া। দেখে লাল নীল হলুদ রঙের পাল তোলা নৌকায় মাটির হাড়ি পাতিল, নারকেল, পাট, বোঝাই হয়ে যাওয়া। কখনোবা যায় কলের গান বাজিয়ে। সন্ধ্যা নেমে এলে মাথার ওপর দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে গাঙচিল, বেলেহাঁস আর বকের সারি উড়ে যেত। কী সুন্দর হা টি টি, হা টি টি সুরে গান গাইতে গাইতে। প্রকৃতির রুপ-রস-শব্দ-গন্ধ সব যেন আকন্ঠ পান করতো বেগম। সেই শিশুকাল থেকেই প্রকৃতিকে দেখবার এবং ভালবাসবার চোখ ও মন তাঁর তৈরি হয়েছিল। তাঁর মানস গঠনে সহায়ক হয়েছিল। হয়তো সেই শিশুকালেই বেগমের অন্তরভূমিতে সাহিত্য সাধনার বীজ রোপিত হয়েছিল। কেননা পরবর্তীকালে তাঁর অনেক গল্পে অনেক লেখার পটভূমিতে জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে এই ডিগ্রিচর গ্রাম, বিত্তবৈভবেপরিপূর্ণ বিশাল নানাবাড়ি, গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ, করতোয়া নদী জায়গা জুড়ে আছে। বেগমের পুরো নাম বেগম রাশেদা। বিয়ের পর হলেন রাশেদা খালেক। বেগম রাশেদার জন্ম ১৯৪৫ সালের ২৭ জুলাই সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া থানার ডিগ্রিচর গ্রামে এক অতি সম্ভ্রান্ত ধণাঢ্য পরিবরে, নানা বাড়িতে।
মা মোসাঃ হালিমা খাতুন (মরহুম)। যেমন সুন্দরী  তেমনি মেধাবী ও ধার্মিক। বিয়ের আগে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত নিজেদের মক্তবে পড়াশুনা করেছিলেন। পরবর্তীতে নিজ চেষ্টায় অনেক পড়াশুনা করেছেন। হাতের কাছে যা পেয়েছেন তাই পড়েছেন। শিক্ষানুরাগী এই মায়ের কাছে বেগম এবং তাঁর পাঁচ ভাই-বোন লেখাপড়ার হাতেখড়ি নিয়েছে। বাংলা ইংরেজি অংক আরবি সকল বিষয়েই তিনি ছেলে মেয়েদের তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত  পড়িয়েছেন। পাড়ার এবং অন্য এলাকার মহিলারা হালিমা খাতুনের কাছে এসে শুদ্ধভাবে কোরআন শরীফ পড়া শিখতেন। তিনি ছিলেন সুকন্ঠের অধিকারি। রেকর্ড শুনে শুনে তিনি হুবহু আব্বাসউদ্দিনের গান কন্ঠে তুলে নিয়েছিলেন। যখন গাইতেন মুগ্ধ হয়ে সকলে শুনতো।
বাবা মোঃ রমজান আলি মিয়া (মরহুম) সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী থানার দীঘলকান্দি গ্রামের মো. বদরউদ্দিন মন্ডলের জেষ্ঠ্য পুত্র। ১৯৩৭ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে বি.এ পড়াকালীন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ছিলেন রেলের একজন কর্মকর্তা। রমজান আলি মিয়া ছেলে-মেয়েদের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে রাজশাহী শহরেই জায়গা কিনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর একমাত্র চাওয়া ছিল ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া শিখে যেন নিজেকে একজন সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। রমজান আলি মিয়া ছিলেন অত্যন্ত সৎ নম্্র ভদ্্র শান্ত প্রকৃতির সুদর্শন পুরুষ। বিনয়নম্্র ধর্মপ্রাণ মানুষটি ছিলেন সকলের ভালবাসার পাত্র।
বেগম রাশেদা ১৯৬০ সালে যশোর মোমেন গার্লস হাই স্কুল হতে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৬২ সালে যশোর এম.এম কলেজ হতে আই.এ. এবং ১৯৬৪ সালে যশোর এম.এম. কলেজ হতে বি.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়তে এম.এ. পূর্বভাগে ভর্তি হন। কিন্তু নানা কারণে আর নিয়মিত লেখাপড়া করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে বেগম রাশেদা খালেক কৃতিত্বের সাথে বাংলা সাহিত্যে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন।
এম.এ পড়াকালীন ১৯৬৫ সালে রাশেদা খালেক রা.বি. বাংলা বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক গবেষক খ্যাতনামা ফোকলোরবিশারদ প্রফেসর ড. আবদুল খালেকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রফেসর খালেক পরবর্তীতে বিভাগীয় চেয়ারম্যান, কলা অনুষদের ডীন, উপ-উপাচার্য এবং উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করে অবসরে যান। বর্তমানে তিনি রাজশাহীতে অবস্থিত নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি উপাচার্যর দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাশেদা খালেক তিন কন্যা এক পুত্র সন্তানের জননী। বড় মেয়ে ফারহানা শাওন একজন জিওফিজিস্ট। বর্তমানে উপ-মহাব্যবস্থাপক, অনুসন্ধান বিভাগ, পেট্রোবাংলা, ঢাকা। মেজ মেয়ে ড. ফারজানা নিক্কন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর। ছোট মেয়ে ফারাহ দীনা গুঞ্জন রা.বি. বাংলা বিভাগ হতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে বর্তমানে নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগের প্রভাষক। একমাত্র পুত্র ফয়সাল খালিদ (শুভেচ্ছা) রা.বি. মার্কেটিং বিভাগ হতে এম.বি.এ ডিগ্রি করে উচ্চ শিক্ষার্থে অস্ট্রেলিয়া যায়। অস্ট্রেলিয়ার সিডনী বিশ্ববিদ্যালয় হতে এম.আই.টি ও একাউটেন্সিতে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করে। বর্তমানে সিডনীতে একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
রাশেদা খালেক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নার্সারী ও জুনিয়র স্কুলের (বর্তমানে শেখ রাসেল মডেল স্কুল) প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষা। ১৯৮৬ সালে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে স্কুল গড়ার দায়িত্বে নিয়োজিত হন। অক্লান্ত সাধনা, তিল তিল মমতা ও ভালবাসা দিয়ে তিনি স্কুলটিকে গড়ে তোলেন। অচিরেই স্কুলটি প্রথম শ্রেণীর নার্সারী স্কুল হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। দীর্ঘ নয় বছর তিনি স্কুলকে সেবা দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এর শক্ত ভিত ও মজবুত ফান্ড। নার্সারী ও জুনিয়র স্কুলটি আজো সগৌরবে আপন মহিমা নিয়ে রাবি চত্বরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রাশেদা খালেক এই স্কুলের সাথে জড়িয়ে আছেন। তিনি স্কুল পরিচালনা পরিষদের সাবেক সভানেত্রী ও স্থায়ী সদস্য।
রাশেদা খালেক কাটাখালি আদর্শ ডিগ্রি কলেজে বাংলার প্রভাষক পদে যোগদান করে দীর্ঘ আঠারো বছর সাফল্যের সাথে শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করে সহকারি অধ্যাপক পদে অবসরে যান। তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিতেও দু’বছর খন্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন। অধ্যাপিকা রাশেদা খালেক নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহীর উদ্যোক্তা। বর্তমানে তিনি  নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টিবোর্ডের চেয়ারম্যানের গুরু দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৮২ সাল হতে রাশেদা খালেক বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীর সাথে জড়িত। তিনি নিয়মিত শিশুমেলা আসরের গ্রন্থনা ও পরিচালনা করে থাকেন। তাঁর অনেক গল্প কবিতা প্রবন্ধ রাজশাহী বেতার হতে প্রচারিত হয়ে আসছে। বিশেষ বিশেষ জাতীয় দিবস ও সাহিত্য আসর তিনি পরিচালনা করে থাকেন।
শিক্ষা ও কর্ম জীবনের পাশাপাশি ষাটের দশক থেকে রাশেদা খালেক সাহিত্যচর্চা করে আসছেন। কলেজে পড়াকালীন দেয়াল পত্রিকায় তাঁর রচিত ফিচার সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রাশেদা খালেক একজন মানবতাবাদী লেখক। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের প্রতি তাঁর রয়েছে প্রচন্ড ঘৃণা ও অসন্তোষ। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ও কন্ঠ সমান সোচ্চার। দেশপ্রেম, স্বাজাত্যবোধ, ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা তাঁর জীবন দর্শন।
তাঁর একক প্রকাশনা  গল্পগ্রন্থ ‘অন্তরে অনির্বান’ (২০০২), ‘আমার দেখা জেনেভা ও প্যারিস’ ভ্রমণ কাহিনী (২০০৮)। গল্পগ্রন্থ- ‘একাত্তরের বীরাঙ্গনা’ (২০১৩), ‘নারীমুক্তির পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার আগে ও পরে’ (যন্ত্রস্থ), ‘কাশ্মীর-দিল্লি-আগ্রা সৌন্দর্যের অপার রহস্য দেখে এলাম’ (যন্ত্রস্থ), ‘একান্ত জীবনে আপন ভুবনে রবীন্দ্রনাথ’ (যন্ত্রস্থ), কাব্যগ্রন্থ- ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ (যন্ত্রস্থ)’, ‘জেনোলেন কেভস আশ্চর্য এক জগৎ’ তাঁর আর এক অনবদ্য সৃষ্টি (২০১১), ঈদসংখ্যা- সোনার দেশ, কাশ্মীর দেখে এলাম (১৯৮৩, ভারত বিচিত্রা), ঘুরে এলাম জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ি (১৯৮৩, ভারত বিচিত্রা), ‘দার্জিলিংয়ে কয়েকদিন’ (১৯৮৪, ভারত বিচিত্র) উপভোগ্য এ সব লেখাগুলি পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।
যৌথ প্রকাশনা: গল্প, কবিতা, উপন্যাস গ্রন্থের সংখ্যাÑ ২৬/২৭টি, প্রবন্ধ সংখ্যা ২০/২২টি।
রাশেদা খালেক বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ রাজশাহী হতে প্রকাশিত কয়েকটি গ্রন্থের সম্পাদনা করেছেন। যেমন- ‘আপন ভুবনে বৈরী বাতাস’ (২০০৮), ‘একাত্তরের আঙিনায়’ (২০১০), ‘অন্তর সুবাস’ (২০১২), ‘রাজশাহীর সাহিত্যাঙ্গনে আলোকিত নারী’ (যন্ত্রস্থ), ‘প্রফেসর ড. আবদুল খালেক এর ৮০ বছর পূর্তি সংবর্ধনা গ্রন্থ’, ‘ভুবনের ঘাটে ঘাটে’ অনন্য স্বাদের ভ্রমণ আলেখ্য বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, রাজশাহী; ‘গল্পকথা’ গল্প সংকলন, সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র, এনবিআইইউ, রাজশাহী।
অধ্যাপিকা রাশেদা খালেক প্রতি বছর বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী স্মরণে তাঁদের জন্ম ও মৃত্যু দিবসে প্রবন্ধ নিবন্ধ রচনা করেন এবং স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকে তা প্রকাশিত হয়ে থাকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসিমউদ্দিন, প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন, বেগম সুফিয়া কামাল, প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দার, মনোরমা বসু, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম প্রমূখ ব্যক্তিত্বকে নিয়ে এবং একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, বাংলার নববর্ষ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস, সিডও সনদ দিবস, মুক্তিযুদ্ধে নারী সমাজের অবদান বা ভূমিকা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা দিবস নিয়ে রাশেদা খালেক নিয়মিত লিখে থাকেন। তিনি একজন কলাম লেখক।
বাংলাদেশের একমাত্র জনপ্রিয় রহস্য সিরিজ নারী লেখক ঔপন্যাসিক ’রোমেনা আফাজ’-কে নিয়ে রচিত রাশেদা খালেকের গবেষণাধর্মী লেখাটি বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, ঢাকা হতে প্রকাশিত ‘সাহিত্যে অর্জন: বাংলাদেশের নারী’ শীর্ষক মূল্যবান গ্রন্থের প্রথম খন্ডে মুদ্রিত হয়েছে। দ্বিতীয় খন্ডে মুদ্রিত হচ্ছে কবি খোন্দকার জাহানারা বেগমকে নিয়ে রচিত লেখিকার আর এক গবেষণাধর্মী মূল্যবান রচনা। ‘বরেন্দ্র বাতিঘর’ দ্বিতীয় খন্ডে প্রকাশিত রাশেদা খালেকের ‘সমাজ সংগঠনে রাজশাহীর নারীদের ভূমিকা’ শীর্ষক গবেষণাধর্মী মূল্যবান প্রবন্ধটি সুধী সমাজে সমাদৃত হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী এসোসিয়েশন সাহিত্য পত্রিকা-রবীন্দ্র সার্ধশত ক্রোড়পত্রে রাশেদা খালেকের ‘একান্ত জীবনে আপন ভুবনে রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক রচনাটি প্রশংসিত হয়।
অধ্যাপিকা রাশেদা খালেকের লেখাগুলো দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক জনপদ, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বার্তা, দৈনিক জনকন্ঠ, দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক সোনালী সংবাদ, দৈনিক সোনার দেশ, দৈনিক বাংলাদেশ বার্তা, সাপ্তাহিক রোববার, ভারত বিচিত্রা এবং নন্দিনী সহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
দেশভ্রমণের প্রতি রাশেদা খালেকের রয়েছে প্রবল আকর্ষণ। বেশ কয়েকবার তিনি কলিকাতা, শান্তিনিকেতন, দিল্লী, আগ্রা, জয়পুর, আজমির, রাজস্থান, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, চন্ডীগড়, উড়িষ্যা, দার্জিলিং, কাশ্মীর ভ্রমণ করেছেন। ভারতবর্ষ ছাড়াও ভ্রমণ করেছেন সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, ব্যাংকক ও অষ্ট্রেলিয়া।
অধ্যাপিকা রাশেদা খালেক সংগঠন প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তিনি তিলোত্তমা সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভানেত্রী, রা.বি. ঘরোয়া সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংঘের উদ্যোক্তা/অন্যতম সংগঠক, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘের প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সম্পাদক/ সভানেত্রী, রা.বি. মহিলা ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা/সাবেক সাধারণ সম্পাদক/সভানেত্রী/সদস্যা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ রা.বি. শাখার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক/ভারপ্রাপ্ত সভানেত্রী/কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্রের উপদেষ্টা, ধানসিঁড়ি সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা, জেলা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদস্য, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সমিতির সদস্য, সাংস্কৃতিক একাডেমি রাজশাহীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসহ অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।
১৯৮২ সালে দৈনিক বার্তা রজশাহীর তিলোত্তমা সাহিত্য পরিষদ আয়োজিত ভাষা আন্দোলন বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতায় প্রবন্ধ লিখে রাশেদা খালেক প্রথম স্থান অধিকার করে পুরস্কৃত হন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ঢাকা আয়োজিত বেগম রোকেয়ার উপর প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি দ্বিতীয় স্থান লাভ করে পুরস্কৃত হন ১৯৮৩ সালে। নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্র আয়োজিত গল্পলেখা প্রতিযোগিতায় ছোটগল্প লিখে ২০০২ এবং ২০০৪ সালে দু’বার রাশেদা খালেক প্রথম পুরস্কার লাভ করেন।
রাজশাহী লেখক পরিষদ রাশেদা খালেককে সাহিত্যকর্মে ¯ী^কৃতি স্বরুপ ২০১০ সালে সাহিত্য স্মারক সন্মাননা প্রদান করেন। নারী মুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখার জন্য বাংলাদেশ শিক্ষা পর্যবেক্ষক সোসাইটি ঢাকা ২০১০ সালে রাশেদা খালেককে বেগম রোকেয়া সাহিত্য স্মারক সন্মাননা প্রদান করেন। সাহিত্য কর্মে অবদানের জন্য বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, ঢাকা রাশেদা খালেককে গুণীজন সংবর্ধনা ও সাহিত্য স্মারক সন্মানন প্রদান করেন ২০১২ সালে। নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্র, ঢাকা রাশেদা খালেককে সাহিত্য পদকে ভূষিত করেন ২০১২ সালে। এছাড়াও তিনি অন্যন্য পুরস্কার লাভ করেছেন।
রাশেদা খালেক ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোকলোর সোসাইটি আয়োজিত সেমিনার ও সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। সম্প্রতি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গভাষা ও সাহিত্য বিভাগ আয়োজিত ২০১৩ এর নভেম্বর ১৯-২২ নভেম্বর চারদিন ব্যাপী ৩য় আন্তর্জাতিক বঙ্গবিদ্যা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে অধ্যাপিকা রাশেদা খালেক অংশগ্রহণ করেন এবং একটি সেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
রাশেদা খালেকের গল্পগ্রন্থ, ভ্রমণ কাহিনী ও কবিতার কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো :
ক. মায়ের কথায় ইমন হাঃ হাঃ করে হাসে। বলে, মা তুমি বিশ্বাসের কথা বলছো? বিশ্বাস বলে কিছু আছে? আমাদের এই সমাজ দেহের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ থেকে বিশ্বাসের পলেস্তারা খসে পড়ে তার যে কি বিভৎস নগ্নরুপ বের হয়েছে তা যদি তুমি সব দেখতে মা তাহলে শিউরে উঠতে (লাশের চোখ, অন্তরে অনির্বাণ)।
খ. প্রতিবার এই ঠান্ডা নীল নীল মোহময় ঘরে পা রেখেই বুঝতে পেরেছে ঘরময় ছড়িয়ে রয়েছে নতুন মিস্টি সুর, মিষ্টি সুবাস। পায়েল কখনও বুঝতে পারে নি ঘরে পা দেবা মাত্র স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় চালু হয়েছে ক্যামেরা। ওদের আবেগঘন…ক্যামেরাবন্দী। পায়েল ঘুণাক্ষরেও জানতে পারে নি ওর স্বপ্নের ঘর, বিশ্বাসের ঘর ওর জন্য পেতে রেখেছে মরণ ফাঁদ (মরণ ফাঁদ, একাত্তরের বীরাঙ্গনা)।
গ. ট্রেন এখন তুষার রাজ্যে প্রবেশ করছে। এই ¯েœা জোন যেন এক নতুন পৃথিবী। সমতল ভূমি থেকে অনেক উঁচুতে পাহাড় কাটা আঁকা বাঁকা পথ ধরে চলেছি। রাস্তার দু’পাশে ন্যাড়া গাছে থোকা থোকা বরফের সাদা ফুল। লোক বসতি নেই বললেই চলে। অদূরে আল্পস্ পর্বতমালা, বাড়ির টালির ছাদ, গাছ গাছালি সব বরফাচ্ছন্ন। বিস্ময় আর আনন্দে নীলিমকে জড়িয়ে ধরে শুধু বলি আহ্ কি সুন্দর! কি সুন্দর (আমার দেখা জেনেভা ও প্যারিস)।
ঙ. তুমি আসবে অন্ধকারের ঢেউ ভেঙে ভেঙে/ মহাসিন্ধুর ওপার থেকে/ পালতোলা নৌকার গলুইয়ে বসে
ভোরের বাতাসে উড়বে তোমার ধবল শাড়ির আঁচল/উড়বে তোমার দীঘল কালো কেশ
দু’চোখ ভরে দেখব তোমায় / লাগবে আমার বেশ (অপেক্ষা, স্বপ্নের ঠিকানা)।
রাশেদা খালেকের গল্পগ্রন্থ, ভ্রমণ কাহিনি এবং কবিতা পড়ে প্রাজ্ঞ এবং বিজ্ঞ জনের অভিমতের অংশবিশেষ সন্নিবেশিত হলো :
রাশেদা খালেকের ছোটগল্পগুলো বিশেষ প্রতীতিজাত সংক্ষিপ্ত গদ্যকাহিনি। আর এই প্রতীতি প্রবন্ধনের সূত্র কখনো প্রেম, কখনো দ্রোহ-শোষণ-বঞ্চনা, আবার কখনো বা একান্ত মানবিক আবেগের পরিপ্রেক্ষিত। এছাড়া বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধও তাঁর অন্যতম অনুষঙ্গ। গল্প বলার বিশেষ ঢঙ, ঘটনাটি দেখার বিশেষ কোণ, পরিপাশ্বের ওপর আলোকসম্পাতের বিশেষ বিন্যাস এবং সমগ্রতাকে দেখার ও দেখাবার বিশেষ ভঙ্গি সব মিলিয়ে দেখা যায় রাশেদা খালেকের গল্পগুলো শিল্পগুণ বিচারে, অভিনবত্ব এবং জীবন চেতনায় নতুন মাত্রা লাভ করেছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ ও বিশুদ্ধ নন্দনতাত্বিক দৃষ্টিকোণ এ দুটি বিচ্ছিন্ন সমান্তরাল ধারার সমন্বয় ও সংশ্লেষও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গভীরতর অর্থে, চেতনার পরিমাপে মুক্তিযুদ্ধ একটি ব্যাপক এবং বহুমাত্রিক রুপ ও স্বরুপে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্যে অভিব্যক্ত হয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই এবং চেতনার পুনর্গঠনের প্রাসঙ্গিকতা থেকেই রাশেদা খালেকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পগুলো নিবিড় পুনর্পাঠ দাবি করে।
মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও কথাশিল্পী রাশেদা খালেক তাঁর অন্যান্য গল্পতেও কখনো সমকাল বিস্মৃত হন নি। সমাজে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ তাঁর গল্পের চরিত্র হয়ে এসেছে। চরিত্র সৃষ্টিতে তিনি একজন দক্ষ কারিগর। মানুষের সামগ্রিক অবস্থার রুপায়ণই তাঁর গল্পের প্রধান লক্ষ্য। তাঁর গল্পের ভাষা সরল, সাধারণ। বলা যেতে পারে সুঠাম, মেদহীন। অতিরিক্ত শব্দের ব্যবহার নেই। কোন কোন বাক্যের একটি শব্দই আগাম অনেক কিছুই আমাদের জানান দেয়। বাক্যে শব্দ ব্যবহারে তিনি নিয়ত সজাগ ও সচেতন। এ যেন গল্পের ছলে গল্প লেখা নয়। একটু অন্য আঙ্গিকে, অন্য প্রকরণে অপূর্ব এক ভিন্ন মাত্রার নিজস্ব স্টাইল তুলে ধরেছেন।
জীবনবাদী দর্শনের কারণেই রাশেদা খালেকের গল্পগুলোর বিষয়বস্তুতে ব্যাপক অভিনবত্ব এসেছে। গল্পগুলোতে তিনি মানুষের যাপিত জীবনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছেন। তাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, অগ্রসর-অনগ্রসর বাদ-প্রতিবাদেও দ্বান্দ্বিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রতিরোধের শক্তি অর্জন ও সামর্থের নিপুণ কাহিনি রচনা করেছেন। যা মানুষের প্রতি লেখকের দায়বদ্ধ মানসিকতার পরিচয় বহন করে। আর এখানেই রাশেদা খালেকের গল্পের নিজস্বতা। তাঁর গল্পগুলো সাধারণ মানুষের ভেতর থেকে উঠে অসায় সমকালিন বাস্তবতার প্রয়োগে হয়ে উঠেছে বাস্তব সমাজের প্রতিচ্ছবি। তাঁর গল্পের নিবিড় পাঠে এটাই প্রমানিত হয় তিনি সমপদক্ষেপে বাংলা ছোটগল্পের এক নতুন ধরনের দ্রষ্টা এবং ¯্রষ্টা। (আবুল ফজল, কৃতি ছাত্র, বাংলা বিভাগ, রা,বি)
‘একাত্তরের বীরাঙ্গনার’- সবকটি গল্পই মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। কোন কোন গল্প একবার-দুইবার-তিনবার। ‘মমতা প্যাটেল’ গল্পটি পড়লাম চারবার, একটি চরিত্রের দুর্বোধ্যতা ও রহস্যময়তার কারণে। সবগুলো গল্পই বাস্তবতার নিরিখে উত্তীর্ণ। ‘বিতর্কিত সংজ্ঞা’ গল্পটি মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। দক্ষিণাঞ্চলের ঐ প্রবল ঝড়-জলোচ্ছাসে বাংলার মানুষ তাদের লক্ষ লক্ষ প্রিয়জনকে হারিয়েছে। গল্পের হৃদয় বিদারক ঘটনাটি মনকে ছুঁয়ে যায়। ‘ফুলজান বিবির ঘর বসতি’-র মত গল্পের কি শেষ আছে? এখনও ঘরে ঘরে মেয়েদের বন্দীদশা। শান্তি ততদিন স্বাধীনতাও ততদিন যতদিন সে বাপের ঘরে থাকে। আমরা এ ব্যাধি থেকে মুক্ত হতে পারব কি? ‘তহুরা’ গল্পের তহুরারা আগুনে পোড়ে, এসিডে দগ্ধ হয়, বখাটের হাতে প্রাণ দেয়। এ সব নিয়ে লিখলে মন পোড়ে। ‘একাত্তরের বীরাঙ্গনা’ বইটির প্রতিটি গল্পই গভীর আবেদনে পূর্ণহৃদয় স্পর্শী। রাশেদা খালেকের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গল্পগুলো শুধু স্মৃতি জাগানিয়াই নয় ইতিহাসের অংশও বটে। সমাজ দেহের ক্ষতগুলো রাশেদা খালেক তাঁর অন্যান্য গল্পগুলোতে সঠিকভাবে তুলে ধরে মনকে রক্তাক্ত চেতনাকে শাণিত করেছেন। লেখকের দায়বদ্ধতার জায়গাটি তিনি সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন। (নয়ন রহমান, উপদেষ্টা, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, ঢাকা)
শব্দ এবং বাক্যের হের ফের ঘটিয়ে রাশেদা খালেকের গল্পগুলো প্রসঙ্গে এই একই ধরনের মন্তব্য করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন প্রথিতযষা বুদ্ধিজীবী প্রফেসর ড. আবদুল খালেক, প্রফেসর ড. শাহানারা হোসেন, প্রফেসর হাসান আজিজুল হক, প্রফেসর ড. অনীক মাহমুদ, অধ্যক্ষা আখতার বানু, প্রফেসর ড. আবদুল জলিল, অধ্যক্ষা ড. ফরিদা সুলতানা প্রমূখ আলোচক ও সমালোচকগণ।
রাশেদা খালেকের লেখা ‘আমার দেখা জেনেভা ও প্যারিস’ গ্রন্থটি যারা পড়েছেন তারা অপরিসীম আনন্দ লাভ করবেন এবং তাঁর লেখার মধ্যে আবিষ্কার করবেন মৌলিক প্রতিভার স্বাক্ষর ও ভিন্ন মাত্রিকতার আস্বাদন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘সহজ কথা কইতে আমায় কহ যে/সহজ কথা যায় না বলা সহজে।’ রাশেদা খালেক তাঁর বইয়ে রীন্দ্রনাথের এ উক্তির অনেকখানি অসারতা প্রমান করেছেন। এমন সহজ-সরল ভাষায় সাবলীল চিত্ররুপময় বর্ণনা লেখিকা হিসাবে তাঁর নিরন্তর অনুশীলন ও বৈদগ্ধের পরিচয় বহন করে। জেনেভা এবং প্যারিসের যে স্থানে তিনি গিয়েছেন সেখানকার চারপাশের সব কিছুই দেখেছেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, অপরিসীম রসময়তার সঙ্গে। তাঁর সে নিখুঁত নিপাট বর্ণনার সঙ্গে তুলনা করা চলে পুনশ্চ ‘কাব্যের সহযাত্রী’ কবিতার নায়কের দেখার সঙ্গে। এ রকম পরিপূর্ণ নিখুঁত দৃষ্টিকে বোধহয় বলা যায় ফটোজনিক দৃষ্টি। এ দৃষ্টি শুধু দেখে না, ছবি তোলে দৃষ্টিগ্রাহ্য সব কিছুর। এক একটা দেখা যেন এক একটা ছবি। সাদা কালো নয়, ঝকঝকে রঙিন ছবি-ত্রুটিমুক্ত এবং দৃষ্টিনন্দন। এ বই পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হবে তিনি নিজেও যেন লেখিকার সহযাত্রী হিসাবে তঁর মত প্রতিটি প্রাকৃতিক দৃশ্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা, ভাস্কর্যের সৌকর্য, ভৌগলিক অবস্থান এবং চোখ জুড়ানো নানান অবিশ্বাস্য নান্দনিক সৌন্দর্য সম্ভোগে একাত্ম। বইটি উপহার দেয়ার জন্য সাহিত্য রসিক ও বিদগ্ধ পাঠকের পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে লেখিকাকে আন্তরিক অভিনন্দন শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানাই অপরিমেয়। (ড. মো. হারুন-আর-রশীদ, চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, রা.বি)
রাশেদা খালেকের লেখা আমার ‘দেখা জেনেভা ও প্যারিস’ খুব আগ্রহ নিয়ে এক রাতেই পড়ে ফেললাম। চমৎকার এই গ্রন্থটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বোধ করি আমার জেনেভা ও প্যারিস দেখাও হয়ে গেল। রাশেদা খালেকের গ্রন্থটিতে জেনেভা ও প্যারিসের প্রাকৃতিক  দৃশ্যাবলীর বর্ণনা, ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ, সেখানকার সমাজ-শিল্প-সংস্কৃতির বিবরণ নিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আর এ কারণেই বইটি যে কোন পাঠককে বিমুগ্ধ করবে। জেনেভা ও প্যারিসে বসবাসরত নানা পরিবারের নানা মানুষের কথা, ভালোবাসা ও আন্তরিক আতিথেয়তার ছবি অন্তরঙ্গ আলোকে উদ্ভাসিত। এ কথা সহজেই বলা যায় যে, রাশেদা খালেকের ভাষা ঝরঝরে এবং নির্ভার। বর্ণনাভঙ্গি আকর্ষণীয় এবং সুখপাঠ্য। (অধ্যক্ষা আখতার বানু)
বইটি পড়ে প্রায় একই ধরণের উচ্ছসিত প্রশংসা করেছেন বেশ ককেজন বুদ্ধিজীবী সাহিত্যিক  সমালোচক প্রফেসর রুহুল আমিন প্রামানিক, প্রফেসর ড. আবদুস সোবহান, প্রফেসর মুহম্মদ নূরুল্লাহ্, অধ্যক্ষা ফরিদা সুলতানা, ড. তসিকুল ইসলাম রাজা সহ আরো অনেকে।
পরিণত বয়সে রাশেদা খালেকের হিসেবের ঝুলিতে আনন্দের ঘটনার ঘাটতি নেই। অল্প কথায় বললে বলতে হয় প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অন্তরে অনির্বাণ’ প্রকাশ পাওয়া। নবজাতক সন্তানের মুখ দর্শন, বুকের ওমে সন্তানের যাদুকরী স্পর্শে রোমাঞ্চকর অনুভূতি এবং মাতৃত্বের স্বাদ লাভ করা। এ ছাড়াও রয়েছে মাতৃভূমির মুক্তি। একাত্তুরে নয়মাসব্যাপী সংঘটিত রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের ভয়াল আতঙ্কে মোড়া দিনগুলিতে বাঁচবার আশায় একটুখানি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে রাশেদা খালেক শহর থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে শহরে স্বামী ও শিশুকন্যাসহ ছুটে বেড়িয়েছেন। এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করা, অস্ত্র লুকিয়ে রাখাা ইত্যাদি কাজগুলি করেছেন। অতঃপর ১৬ ডিসেম্বর আসেসেই মাহেন্দ্রক্ষণ-মহান বিজয় দিবস। বিজয়ের আনন্দ বুকে নিয়ে রাশেদা খালেক তৈরি করলেন জাতীয় পতাকা। রাশেদাখালেকের হাতের তৈরি জাতীয় পতাকা চরনবীপুর গ্রামে প্রথম পত্ পত্ করে উড়তে থাকলো। ‘আহা! কি আনন্দ আজি আকাশে বাতাসে’। এর চেয়ে বড় আনন্দ মানুষের জীবনে আর কি হতে পারে! বেদনার কথা বলতে প্রিয় মা-বাবাকে হারানো, তাঁদের জান্নাতবাসী হওয়া রাশেদা খালেকের জীবনে সবচেয়ে বড় বেদনা।
রাশেদা খালেকের ব্যস্ত সময় কাটে সংগঠন ও নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কাজে, লেখালেখি করে, টিভি দেখে, বই পড়ে ও ঘর-সংসারের দায়িত্ব পালন করে। এমনিভাবে তিনি জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত কাজ করে যেতে চান।


Share this post in your social media

© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com