বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ১১:৫০ পূর্বাহ্ন

অধ্যাপক অমৃতলাল বালার সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য

অধ্যাপক অমৃতলাল বালার সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য

অধ্যাপক ড. অমৃতলাল বালার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় প্রায় ৪০ বছর আগে ১৯৮০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তেমন পূর্বপরিচয় না থাকা সত্ত্বেও প্রথম সাক্ষাতেই আমার পায়ের ধুলো মাথায় নিলেন। বললেন, আপনি আমার দাদা। আমি আপনার ছোট ভাই। আপনার আশীর্বাদ আমার একান্ত কাম্য। আমি তাকে আশীর্বাদ বঞ্চিত করতে পারিনি। ভারত সরকারের বৃত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরীর ক্ষেত্রে আমার অবদান কম ছিল না। আমি তাকে সর্বদাই অনুজের মত ‘অমৃত’ বলেই ডাকতাম। ‘বালা’ শব্দটি ব্যবহার করিনি। ওটা নাম নয়, ওটা ওর পারিবারিক উপাধি। অমৃত খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন না। মাধ্যমিক থেকে এমএ শেষ শ্রেণী পর্যন্ত সর্বত্রই দ্বিতীয় বিভাগ ও শ্রেণী লাভ করেন। পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিষয় ছিল ‘আলাওলের কাব্যে হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতি’। তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। সাফল্যের সঙ্গে ডিগ্রী অর্জন করলেন ১৯৮৯ সালে। দু’বছর পরেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসাবে যোগদান করেন। যোগদানের তারিখ ছিল ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ সাল। অল্পদিনের ব্যবধানেই হলেন সহযোগী অধ্যাপক, হলেন অধ্যাপক।

তিনি অনুগ্রহে পদোন্নতি লাভ করেন নি। এজন্য তাকে সীমাহীন শ্রম দিতে হয়েছে। অল্পদিনের ব্যবধানে তিনি ৮টি গবেষণা গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। রচনা করেছেন অর্ধশতাধিক প্রবন্ধ। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ গবেষক। তিনি নিজেই শুধু গবেষণা করেন নি গবেষক তৈরির ক্ষেত্রেও অসামান্য অবদান রেখেছেন। তার সম্পাদনায় ‘ধ্রুব’ নামক একটি সাহিত্য পত্রিকা বাংলা বিভাগ থেকে প্রকাশিত হত। এতে শুধু বিভাগীয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীই নয় দেশের খ্যাতিমান অনেক গবেষক লেখা দিয়ে পত্রিকাটিকে গবেষণা পত্রিকার ধারায় উন্নত স্তরে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন দক্ষ প্রশাসক। যার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অল্প কিছুদিনের জন্য বাংলা বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব অলঙ্কৃত করেন। তিনি জন্মসূত্রে ছিলেন খুলনার লোক। খুলনা জেলার রংপুর গ্রামে তার জন্ম। পিতা- কিরণচন্দ্র বালা, মাতা- তোলাবতী বালা। জন্মভূমির টানেই তিনি হয়ত খুলনায় গিয়েছিলেন। মন বসাতে পারেন নি। যে কারণে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যেই ফিরে আসেন পুরাতন কর্মস্থল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে।

তার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল অধ্যাপনার পেশায়। ১৯৭৯ সালের ২১ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯১ সালের ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডুমুরিয়া কলেজে অধ্যাপনা করেন। তিনি প্রকৃতপক্ষেই একজন অধ্যাপক ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সর্বদাই আমাকে এবং ড. বালাকে একটু ভিন্ন মর্যাদায় মূল্যায়ন করতেন। তারা মনে করতেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচ্যের সবচেয়ে প্রাচীন এবং খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা সেই গৌরবোজ্জ্বল প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। অমৃতলাল স্বভাবে ছিলেন বিনয়ী। সহজে কারও সঙ্গে কলহে লিপ্ত হতেন না। যে কারণে তিনি বয়োজ্যেষ্ঠদের নিকটে ছিলেন আশীর্বাদ ধন্য।

অমৃতলালের দাম্পত্যজীবন ছিল অত্যন্ত সুখের, অত্যন্ত আনন্দের। তার স্ত্রী উষা রাণী সরকার ছিলেন তারই সহপাঠী। তার দুটি সন্তান অত্যন্ত মেধাবী। প্রথম সন্তান বুয়েটের আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ার। দ্বিতীয় সন্তান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী। উষা রাণী সরকার নিজেও একজন লেখক ও গবেষক। তিনি অর্জন করেছিলেন পিএইচডি ডিগ্রী। লিখেছেন মূল্যবান গবেষণা গ্রন্থ, লিখেছেন অনেক গবেষণামূলক প্রবন্ধ।

লেখক: মুহম্মদ আবদুল জলিল (পিএইচডি), অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপ-উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী।


নিউজটি অন্যকে শেয়ার করুন...

আর্কাইভ

business add here
© VarsityNews24.Com
Developed by TipuIT.Com